আমার কাছে রাজা আমার রইল অজানা। তাই সে যখন তলব করে খাজানা মনে করি পালিয়ে গিয়ে দেব তারে ফাঁকি, রাখব দেনা বাকি। যেখানেতেই পালাই আমি গোপনে দিনে কাজের আড়ালেতে, রাতে স্বপনে, তলব তারি আসে নিশ্বাসে নিশ্বাসে। তাই জেনেছি, আমি তাহার নইকো অজানা। তাই জেনেছি ঋণের দায়ে ডাইনে বাঁয়ে বিকিয়ে বাসা নাইকো আমার ঠিকানা। তাই ভেবেছি জীবন-মরণে যা আছে সব চুকিয়ে দেব চরণে। তাহার পরে নিজের জোরে নিজেরি স্বত্বে মিলবে আমার আপন বাসা তাঁহার রাজত্বে।
তখন নিশীথরাত্রি; গেলে ঘর হতে যে পথে চল নি কভু সে অজানা পথে। যাবার বেলায় কোনো বলিলে না কথা, লইয়া গেলে না কারো বিদায়বারতা। সুপ্তিমগ্ন বিশ্ব-মাঝে বাহিরিলে একা-- অন্ধকারে খুঁজিলাম, না পেলাম দেখা। মঙ্গলমুরতি সেই চিরপরিচিত অগণ্য তারার মাঝে কোথায় অন্তর্হিত! গেলে যদি একেবারে গেলে রিক্ত হাতে? এ ঘর হইতে কিছু নিলে না কি সাথে? বিশ বৎসরের তব সুখদুঃখভার ফেলে রেখে দিয়ে গেলে কোলেতে আমার! প্রতিদিবসের প্রেমে কতদিন ধরে যে ঘর বাঁধিলে তুমি সুমঙ্গল-করে পরিপূর্ণ করি তারে স্নেহের সঞ্চয়ে, আজ তুমি চলে গেলে কিছু নাহি লয়ে? তোমার সংসার-মাঝে, হায়, তোমা-হীন এখনো আসিবে কত সুদিন-দুর্দিন-- তখন এ শূন্য ঘরে চিরাভ্যাস-টানে তোমারে খুঁজিতে এসে চাব কার পানে? আজ শুধু এক প্রশ্ন মোর মনে জাগে-- হে কল্যাণী, গেলে যদি, গেলে মোর আগে, মোর লাগি কোথাও কি দুটি স্নিগ্ধ করে রাখিবে পাতিয়া শয্যা চিরসন্ধ্যা-তরে?
নদীর প্রবাহের এক ধারে সামান্য একটা ভাঙা ডাল আটকা পড়েছিল। সেইটেতে ঘোলা জল থেকে পলি ছেঁকে নিতে লাগল। সেইখানে ক্রমে একটা দ্বীপ জমিয়ে তুললে। ভেসে-আসা নানা-কিছু অবান্তর জিনিস দল বাঁধল সেখানে, শৈবাল ঘন হয়ে সেখানে ঠেকল এসে , মাছ পেল আশ্রয়, এক পায়ে বক রইল দাঁড়িয়ে শিকারের লোভে, খানিকটুকু সীমানা নিয়ে একটা অভাবিত দৃশ্য জেগে উঠল--তার সঙ্গে চার দিকের বিশেষ মিল নেই। চৈতালি তেমনি এক-টুকরো কাব্য যা অপ্রত্যাশিত। স্রোত চলছিল যে রূপ নিয়ে অল্প-কিছু বাইরের জিনিসের সঞ্চয় জ'মে ক্ষণকালের জন্যে তার মধ্যে আকস্মিকের আবির্ভাব হল। পতিসরের নাগর নদী নিতান্তই গ্রাম্য। অল্প তার পরিসর, মন্থর তার স্রোত। তার এক তীরে দরিদ্র লোকালয়, গোয়ালঘর, ধানের মরাই, বিচালির স্তূপ; অন্য তীরে বিস্তীর্ণ ফসল-কাটা শস্যখেত ধূ ধূ করছে। কোনো-এক গ্রীষ্মকাল এইখানে আমি বোট বেঁধে কাটিয়েছি। দুঃসহ গরম। মন দিয়ে বই পড়বার মতো অবস্থা নয়। বোটের জানালা বন্ধ করে খড়খড়ি খুলে সেই ফাঁকে দেখছি বাইরের দিকে চেয়ে। মনটা আছে ক্যামেরার চোখ নিয়ে, ছোটো ছোটো ছবির ছায়া ছাপ দিচ্ছে অন্তরে। অল্প পরিধির মধ্যে দেখছি বলেই এত স্পষ্ট করে দেখছি। সেই স্পষ্ট দেখার স্মৃতিকে ভরে রাখছিলুম নিরলংকৃত ভাষায়। অলংকার-প্রয়োগের চেষ্টা জাগে মনে যখন প্রত্যক্ষবোধের স্পষ্টতা সম্বন্ধে সংশয় থাকে। যেটা দেখছি মন যখন বলে, "এটাই যথেষ্ট' তখন তার উপরে রঙ লাগাবার ইচ্ছাই থাকে না। চৈতালীর ভাষা সহজ হয়েছে এইজন্যেই। তুমি যদি বক্ষোমাঝে থাক নিরবধি, তোমার আনন্দমূর্তি নিত্য হেরে যদি এ মুগ্ধ নয়ন মোর,--পরাণ-বল্লভ, তোমার কোমলকান্ত চরণ পল্লব চিরস্পর্শ রেখে দেয় জীবন তরীতে,-- কোনো ভয় নাহি করি বাঁচিতে মরিতে।