বাবা যদি রামের মতো পাঠায় আমায় বনে যেতে আমি পারি নে কি তুমি ভাবছ মনে? চোদ্দ বছর ক' দিনে হয় জানি নে মা ঠিক, দণ্ডক বন আছে কোথায় ওই মাঠে কোন্ দিক। কিন্তু আমি পারি যেতে, ভয় করি নে তাতে-- লক্ষ্ণণ ভাই যদি আমার থাকত সাথে সাথে। বনের মধ্যে গাছের ছায়ায় বেঁধে নিতেম ঘর-- সামনে দিয়ে বইত নদী, পড়ত বালির চর। ছোটো একটি থাকত ডিঙি পারে যেতেম বেয়ে-- হরিণ চ'রে বেড়ায় সেথা, কাছে আসত ধেয়ে। গাছের পাতা খাইয়ে দিতেম আমি নিজের হাতে-- লক্ষ্ণণ ভাই যদি আমার থাকত সাথে সাথে। কত যে গাছ ছেয়ে থাকত কত রকম ফুলে, মালা গেঁথে পরে নিতেম জড়িয়ে মাথার চুলে। নানা রঙের ফলগুলি সব ভুঁয়ে পড়ত পেকে, ঝুড়ি ভরে ভরে এনে ঘরে দিতেম রেখে; খিদে পেলে দুই ভায়েতে খেতেম পদ্মপাতে-- লক্ষ্ণণ ভাই যদি আমার থাকত সাথে সাথে। রোদের বেলায় অশথ-তলায় ঘাসের 'পরে আসি রাখাল-ছেলের মতো কেবল বাজাই বসে বাঁশি। ডালের 'পরে ময়ূর থাকে, পেখম পড়ে ঝুলে-- কাঠবিড়ালি ছুটে বেড়ায় ন্যাজটি পিঠে তুলে। কখন আমি ঘুমিয়ে যেতেম দুপুরবেলার তাতে-- লক্ষ্ণণ ভাই যদি আমার থাকত সাথে সাথে। সন্ধেবেলায় কুড়িয়ে আনি শুকোনো ডালপালা, বনের ধারে বসে থাকি আগুন হলে জ্বালা। পাখিরা সব বাসায় ফেরে, দূরে শেয়াল ডাকে, সন্ধেতারা দেখা যে যায় ডালের ফাঁকে ফাঁকে। মায়ের কথা মনে করি বসে আঁধার রাতে -- লক্ষ্ণণ ভাই যদি আমার থাকত সাথে সাথে। ঠাকুরদাদার মতো বনে আছেন ঋষি মুনি, তাঁদের পায়ে প্রণাম করে গল্প অনেক শুনি। রাক্ষসেরে ভয় করি নে, আছে গুহক মিতা -- রাবণ আমার কী করবে মা, নেই তো আমার সীতা। হনুমানকে যত্ন করে খাওয়াই দুধে-ভাতে-- লক্ষ্ণণ ভাই যদি আমার থাকত সাথে সাথে। মা গো, আমায় দে-না কেন একটি ছোটো ভাই-- দুইজনেতে মিলে আমরা বনে চলে যাই। আমাকে মা, শিখিয়ে দিবি রাম-যাত্রার গান, মাথায় বেঁধে দিবি চুড়ো, হাতে ধনুক-বাণ। চিত্রকূটের পাহাড়ে যাই এম্নি বরষাতে-- লক্ষ্ণণ ভাই যদি আমার থাকত সাথে সাথে।
বিশ্বের বিপুল বস্তুরাশি উঠে অট্টহাসি; ধুলা বালি দিয়ে করতালি নিত্য নিত্য করে নৃত্য দিকে দিকে দলে দলে; আকাশে শিশুর মতো অবিরত কোলাহলে। মানুষের লক্ষ লক্ষ অলক্ষ্য ভাবনা, অসংখ্য কামনা, রূপে মত্ত বস্তুর আহ্বানে উঠে মাতি তাদের খেলায় হতে সাথি। স্বপ্ন যত অব্যক্ত আকুল খুঁজে মরে কূল; অস্পষ্টের অতল প্রবাহে পড়ি চায় এরা প্রাণপণে ধরণীরে ধরিতে আঁকড়ি কাষ্ঠ-লোষ্ট্র-সুদৃঢ় মুষ্টিতে, ক্ষণকাল মাটিতে তিষ্ঠিতে। চিত্তের কঠিন চেষ্টা বস্তুরূপে স্তূপে স্তূপে উঠিতেছে ভরি-- সেই তো নগরী। এ তো শুধু নহে ঘর, নহে শুধু ইষ্টক প্রস্তর। অতীতের গৃহছাড়া কত যে অশ্রুত বাণী শূন্যে শূন্যে করে কানাকানি; খোঁজে তারা আমার বাণীরে লোকালয়-তীরে-তীরে। আলোকতীর্থের পথে আলোহীন সেই যাত্রীদল চলিয়াছে অশ্রান্ত চঞ্চল। তাদের নীরব কোলাহলে অস্ফুট ভাবনা যত দলে দলে ছুটে চলে মোর চিত্তগুহা ছাড়ি, দেয় পাড়ি অদৃশ্যের অন্ধ মরু ব্যগ্র ঊর্ধ্বশ্বাসে আকারের অসহ্য পিয়াসে। কী জানি কে তারা কবে কোথা পার হবে যুগান্তরে, দূর সৃষ্টি-'পরে পাবে আপনার রূপ অপূর্ব আলোতে। আজ তারা কোথা হতে মেলেছিল ডানা সেদিন তা রহিবে অজানা। অকস্মাৎ পাবে তারে কোন্ কবি, বাঁধিবে তাহারে কোন্ ছবি গাঁথিবে তাহারে কোন্ হর্ম্যচূড়ে, সেই রাজপুরে আজি যার কোনো দেশে কোনো চিহ্ন নাই। তার তরে কোথা রচে ঠাঁই অরচিত দূর যজ্ঞভূমে। কামানের ধূমে কোন্ ভাবী ভীষণ সংগ্রাম রণশৃঙ্গে আহ্বান করিছে তার নাম!