আমি এ কেবল মিছে বলি, শুধু আপনার মন ছলি। কঠিন বচন শুনায়ে তোমারে আপন মর্মে জ্বলি। থাক্ তবে থাক্ ক্ষীণ প্রতারণা, কী হবে লুকায়ে বাসনা বেদনা, যেমন আমার হৃদয়-পরান তেমনি দেখাব খুলি। আমি মনে করি যাই দূরে, তুমি রয়েছ বিশ্ব জুড়ে। যত দূরে যাই ততই তোমার কাছাকাছি ফিরি ঘুরে। চোখে চোখে থেকে কাছে নহ তবু, দূরেতে থেকেও দূর নহ কভু, সৃষ্টি ব্যাপিয়া রয়েছ তবুও আপন অন্তঃপুরে। আমি যেমনি করিয়া চাই, আমি যেমনি করিয়া গাই, বেদনাবিহীন ওই হাসিমুখ সমান দেখিতে পাই। ওই রূপরাশি আপনা বিকাশি রয়েছে পূর্ণ গৌরবে ভাসি, আমার ভিখারি প্রাণের বাসনা হোথায় না পায় ঠাঁই। শুধু ফুটন্ত ফুল-মাঝে দেবী, তোমার চরণ সাজে। অভাবকঠিন মলিন মর্ত্য কোমল চরণে বাজে। জেনে শুনে তবু কী ভ্রমে ভুলিয়া আপনারে আমি এনেছি তুলিয়া, বাহিরে আসিয়া দরিদ্র আশা লুকাতে চাহিছে লাজে। তবু থাক্ পড়ে ওইখানে, চেয়ে তোমার চরণ-পানে। যা দিয়েছি তাহা গেছে চিরকাল আর ফিরিবে না প্রাণে। তবে ভালো করে দেখো একবার দীনতা হীনতা যা আছে আমার, ছিন্ন মলিন অনাবৃত হিয়া অভিমান নাহি জানে। তবে লুকাব না আমি আর এই ব্যথিত হৃদয়ভার। আপনার হাতে চাব না রাখিতে আপনার অধিকার। বাঁচিলাম প্রাণে তেয়াগিয়া লাজ, বদ্ধ বেদনা ছাড়া পেল আজ, আশা-নিরাশায় তোমারি যে আমি জানাইনু শত বার।
দেহে আর মনে প্রাণে হয়ে একাকার একি অপরূপ লীলা এ অঙ্গে আমার! একি জ্যোতি, একি ব্যোম দীপ্ত দীপ-জ্বালা দিন আর রজনীর চিরনাট্যশালা! একি শ্যাম বসুন্ধরা, সমুদ্রে চঞ্চল, পর্বতে কঠিন, তরুপল্লবে কোমল, অরণ্যে আঁধার! একি বিচিত্র বিশাল অবিশ্রাম রচিতেছে সৃজনের জাল আমার ইন্দ্রিয়যন্ত্রে ইন্দ্রজালবৎ! প্রত্যেক প্রাণীর মাঝে প্রকাণ্ড জগৎ। তোমারি মিলনশয্যা, হে মোর রাজন্, ক্ষুদ্র এ আমার মাঝে অনন্ত আসন অসীম বিচিত্রকান্ত। ওগো বিশ্বভূপ, দেহে মনে প্রাণে আমি একি অপরূপ!