ফুরিয়ে গেল পৌষের দিন; কৌতূহলী ভোরের আলো কুয়াশার আবরণ দিলে সরিয়ে। হঠাৎ দেখি শিশিরে-ভেজা বাতাবি গাছে ধরেছে কচি পাতা; সে যেন আপনি বিস্মিত। একদিন তমসার কূলে বাল্মীকি আপনার প্রথম নিশ্বসিত ছন্দে চকিত হয়েছিলেন নিজে,-- তেমনি দেখলেম ওকে। অনেকদিনকার নিঃশব্দ অবহেলা থেকে অরুণ-আলোতে অকুণ্ঠিত বাণী এনেছে এই কয়টি কিশলয়; সে যেন সেই একটুখানি কথা তুমিই বলতে পারতে, কিন্তু না ব'লে গিয়েছ চলে। সেদিন বসন্ত ছিল অনতিদূরে; তোমার আমার মাঝখানে ছিল আধ-চেনার যবনিকা কেঁপে উঠল সেটা মাঝে মাঝে; মাঝে মাঝে তার একটা কোণ গেল উড়ে; দুরন্ত হয়ে উঠল দক্ষিণ বাতাস, তবু সরাতে পারেনি অন্তরাল। উচ্ছৃঙ্খল অবকাশ ঘটল না; ঘণ্টা গেল বেজে, সায়াহ্নে তুমি চলে গেলে অব্যক্তের অনালোকে।
ভালোবাসার মূল্য আমায় দু হাত ভরে যতই দেবে বেশি করে, ততই আমার অন্তরের এই গভীর ফাঁকি আপনি ধরা পড়বে না কি। তাহার চেয়ে ঋণের রাশি রিক্ত করি যাই-না নিয়ে শূন্য তরী। বরং রব ক্ষুধার কাতর ভালো সেও, সুধার ভরা হৃদয় তোমার ফিরিয়ে নিয়ে চলে যেয়ো। পাছে আমার আপন ব্যথা মিটাইতে ব্যথা জাগাই তোমার চিতে, পাছে আমার আপন বোঝা লাঘব-তরে চাপাই বোঝা তোমার 'পরে, পাছে আমার একলা প্রাণের ক্ষুব্ধ ডাকে রাত্রে তোমায় জাগিয়ে রাখে, সেই ভয়েতেই মনের কথা কই নে খুলে। ভুলতে যদি পারো তবে সেই ভালো গো, যেয়ো ভুলে। বিজন পথে চলেছিলেম, তুমি এলে মুখে আমার নয়ন মেলে। ভেবেছিলেম বলি তোমায়, "সঙ্গে চলো, আমায় কিছু কথা বলো।' হঠাৎ তোমার মুখে চেয়ে কী কারণে ভয় হল যে আমার মনে। দেখেছিলেম সুপ্ত আগুন লুকিয়ে জ্বলে তোমার প্রাণের নিশীথ রাতের অন্ধকারের গভীর তলে। তপস্বিনী, তোমার তপের শিখাগুলি হঠাৎ যদি জাগিয়ে তুলি, তবে যে সেই দীপ্ত আলোয় আড়াল টুটে দৈন্য আমার উঠিবে ফুটে। হবি হবে তোমার প্রেমের হোমাগ্নিতে এমন কী মোর আছে দিতে। তাই তো আমি বলি তোমায় নতশিরে-- তোমার দেখার স্মৃতি নিয়ে একলা আমি যাব ফিরে।