তুমি বল তিনু প্রশ্রয় পায় আমার কাছে-- তাই রাগ কর তুমি। ওকে ভালোবাসি, তাই ওকে দুষ্টু ব'লে দেখি, দোষী ব'লে দেখি নে-- রাগও করি ওর 'পরে ভালোও লাগে ওকে এ কথাটা মিছে নয় হয়তো। এক-একজন মানুষ অমন থাকে সে লোক নেহাত মন্দ নয়, সেইজন্যেই সহজে তার মন্দটাই পড়ে ধরা। সে হতভাগা রঙে মন্দ, কিন্তু মন্দ নয় রসে; তার দোষ স্তূপে বেশি, ভারে বেশি নয়-- তাই দেখতে যতটা লাগে গায়ে লাগে না তত। মনটা ওর হালকা ছিপ্ছিপে নৌকো, হূহু করে চলে যায় ভেসে; ভালোই বল আর মন্দই বল জমতে দেয় না বেশিক্ষণ-- এ পারের বোঝা ও পারে চালান করে দেয় দেখতে দেখতে; ওকে কিছুই চাপ দেয় না, তেমনি ও দেয় না চাপ। স্বভাব ওর আসর-জমানো, কথা কয় বিস্তর, তাই বিস্তর মিছে বলতে হয়-- নইলে ফাঁক পড়ে কথার ঠাস-বুনোনিতে। মিছেটা নয় ওর মনে, সে ওর ভাষায়। ওর ব্যাকরণটা যার জানা তবু বুঝতে হয় না দেরি। ওকে তুমি বল নিন্দুক-- তা সত্য। সত্যকে বাড়িয়ে তুলে বাঁকিয়ে দিয়ে ও নিন্দে বানায়-- যার নিন্দে করে তার মন্দ হবে ব'লে নয়, যারা নিন্দে শোনে তাদের ভালো লাগবে ব'লে। তারা আছে সমস্ত সংসার জুড়ে। তারা নিন্দের নীহারিকা, ও হল নিন্দের তারা, ওর জ্যোতি তাদেরই কাছ থেকে পাওয়া। আসল কথা ওর বুদ্ধি আছে, নেই বিবেচনা। তাই ওর অপরাধ নিয়ে হাসি চলে। যারা ভালোমন্দ বিবেচনা করে সূক্ষ্ম তৌলের মাপে তাদের দেখে হাসি যায় বন্ধ হয়ে; তাদের সঙ্গটা ওজনে হয় ভারী, সয় না বেশিক্ষণ; দৈবে তাদের ত্রুটি যদি হয় অসাবধানে হাঁপ ছেড়ে বাঁচে লোকে। বুঝিয়ে বলি কাকে বলে অবিবেচনা-- মাখন লক্ষ্মীছাড়াটা সংস্কৃতর ক্লাসে চৌকিতে লাগিয়ে রেখেছিল ভুসো; ছাপ লেগেছিল পণ্ডিতমশায়ের জামার পিঠে; সে হেসেছিল, সবাই হেসেছিল পণ্ডিতমশায় ছাড়া। হেডমাস্টার দিলেন ছেলেটাকে একেবারে তাড়িয়ে; তিনি অত্যন্ত গম্ভীর, তিনি অত্যন্ত বিবেচক। তাঁর ভাব-গতিক দেখে হাসি বন্ধ হয়ে যায়। তিনু অপকার করে কিছু না ভেবে, উপকার করে অনায়াসে, কোনোটাই মনে রাখে না। ও ধার নেয়, খেয়াল নেই শোধ করবার; যারা ধার নেয় ওর কাছে পাওনার তলব নেই তাদের দরজায়। মোটের উপর ওরই লোকসান হয় বেশি। তোমাকে আমি বলি, ওকে গাল দিয়ো যা খুশি, আবার হেসো মনে মনে-- নইলে ভুল হবে। আমি ওকে দেখি কাছের থেকে, মানুষ ব'লে, ভালো মন্দ পেরিয়ে। তুমি দেখ দূরে ব'সে, বিশেষণের কাঠগড়ায় ওকে খাড়া রেখে। আমি ওকে লাঞ্ছনা দিই তোমার চেয়ে বেশি-- ক্ষমা করি তোমার চেয়ে বড়ো ক'রে। সাজা দিই, নির্বাসন দিই নে। ও আমার কাছেই রয়ে গেল, রাগ কোরো না তাই নিয়ে।
তব দক্ষিণ হাতের পরশ কর নি সমর্পণ। লেখে আর মোছে তব আলো ছায়া ভাবনার প্রাঙ্গণে খনে খনে আলিপন। বৈশাখে কৃশ নদী পূর্ণ স্রোতের প্রসাদ না দিল যদি শুধু কুণ্ঠিত বিশীর্ণ ধারা তীরের প্রান্তে জাগালো পিয়াসি মন। যতটুকু পাই ভীরু বাসনার অঞ্জলিতে নাই বা উচ্ছলিল, সারা দিবসের দৈন্যের শেষে সঞ্চয় সে যে সারা জীবনের স্বপ্নের আয়োজন।
কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও। তারি রথ নিত্যই উধাও জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন, চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন। ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল-- তুলে নিল দ্রুতরথে দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে তোমা হতে বহুদূরে। মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে পার হয়ে আসিলাম আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়, রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায় আমার পুরানো নাম। ফিরিবার পথ নাহি; দূর হতে যদি দেখ চাহি পারিবে না চিনিতে আমায়। হে বন্ধু, বিদায়। কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে, বসন্তবাতাসে অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস, ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ, সেইক্ষণে খুঁজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতপ্রদোষে হয়তো দিবে সে জ্যোতি, হয়তো ধরিবে কভু নামহারা-স্বপ্নের মুরতি। তবু সে তো স্বপ্ন নয়, সব চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়, সে আমার প্রেম। তারে আমি রাখিয়া এলেম অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে। পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে কালের যাত্রায়। হে বন্ধু, বিদায়। তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃত-মুরতি যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি হোক তব সন্ধ্যাবেলা। পূজার সে খেলা ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লানস্পর্শ লেগে; তৃষার্ত আবেগবেগে ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে। তোমার মানসভোজে সযত্নে সাজালে যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়, তার সাথে দিব না মিশায়ে যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে। আজও তুমি নিজে হয়তো বা করিবে রচন মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন। ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়। হে বন্ধু, বিদায়। মোর লাগি করিয়ো না শোক, আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক। মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই, শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই। উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে সেই ধন্য করিবে আমাকে। শুক্লপক্ষ হতে আনি রজনীগন্ধার বৃন্তখানি যে পারে সাজাতে অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ-রাতে, যে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায় ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি, এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি। তোমারে যা দিয়েছিনু, তার পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার। হেথা মোর তিলে তিলে দান, করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম। ওগো তুমি নিরুপম, হে ঐশ্বর্যবান, তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান; গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়। হে বন্ধু, বিদায়।