এ কথা স্মরণে রাখা কেন গো কঠিন তুমি আছ সব চেয়ে, আছ নিশিদিন, আছ প্রতি ক্ষণে--আছ দূরে, আছ কাছে, যাহা-কিছু আছে, তুমি আছ ব'লে আছে। যেমনি প্রবেশ আমি করি লোকালয়ে, যখনি মানুষ আসে স্তুতিনিন্দা লয়ে-- লয়ে রাগ, লয়ে দ্বেষ, লয়ে গর্ব তার অমনি সংসার ধরে পর্বত-আকার আবরিয়া ঊর্ধ্বলোক; তরঙ্গিয়া উঠে লাভজয় লোভক্ষোভ; নরের মুকুটে যে হীরক জ্বলে তারি আলোক-ঝলকে অন্য আলো নাহি হেরি দ্যুলোকে ভূলোকে। মানুষ সম্মুখে এলে কেন সেই ক্ষণে তোমার সম্মুখে আছি নাহি পড়ে মনে?
হৃদয়ের অসংখ্য অদৃশ্য পত্রপুট গুচ্ছে গুচ্ছে অঞ্জলি মেলে আছে আমার চার দিকে চিরকাল ধ'রে আমি-বনস্পতির এরা কিরণপিপাসু পল্লবস্তবক, এরা মাধুকরী-ব্রতীর দল । প্রতিদিন আকাশে থেকে এরা ভরে নিয়েছে আলোকের তেজোরস, নিহিত করেছে সেই অলক্ষ্য অপ্রজ্বলিত অগ্নিসঞ্চয় এই জীবনের গূঢ়তম মজ্জার মধ্যে । সুন্দরের কাছে পেয়েছে অমৃতের কণা ফুলের থেকে, পাখির গানের থেকে, প্রিয়ার স্পর্শ থেকে, প্রণয়ের প্রতিশ্রুতি থেকে, আত্মনিবেদনের অশ্রুগদ্গদ আকুতি থেকে --- মাধুর্যের কত স্মৃতরূপ কত বিস্মৃতরূপ দিয়ে গেছে অমৃতের স্বাদ, আমার নাড়ীতে নাড়ীতে । নানা ঘাতে প্রতিঘাতে সংক্ষুব্ধ সুখদুঃখের ঝোড়ো হাওয়া নাড়া দিয়েছে আমার চিত্তের স্পর্শবেদনাবাহিনী পাতায় পাতায় । লেগেছে নিবিড় হর্ষের অনুকম্পন, এসেছে লজ্জার ধিক্কার, ভয়ের সংকোচ,কলঙ্কের গ্লানি, জীবনবহনের প্রতিবাদ । ভালোমন্দের বিচিত্র বিপরীত বেগ নিয়ে গেছে আন্দোলন প্রাণরসপ্র#বাহে । তার আবেগে বহে নিয়ে গেছে সর্বগৃধ্নূ চেতনাকে জগতের সর্বদানযজ্ঞের প্রাঙ্গণে। এই চিরচঞ্চল চিন্ময় পল্লবের অশ্রুত মর্মরধ্বনি উধাও করে দেয় আমার জাগ্রত স্বপ্নকে চিল-উড়ে-যাওয়া দূর দিগন্তে জনহীন মধ্যদিনে মৌমাছির-গুঞ্জন-মুখর অবকাশে । হাত-ধরে-বসে-থাকা বাষ্পাকুল নির্বাক্ ভালোবাসায় নেমে আসে এদেরই শ্যামল ছায়ার করুণা । এদেরই মৃদুবীজন এসে লাগে শয্যাপ্রান্তে নিদ্রিত দয়িতার নিশ্বাসস্ফুরিত বক্ষের চেলাঞ্চলে । প্রিয়প্রত্যাশিত দিনের চিরায়মান উৎকন্ঠিত প্রহরে শিহর লাগাতে থাকে এদেরই দোলায়িত কম্পনে । বিশ্বভুবনের সমস্ত ঐশ্বর্যের সঙ্গে আমার যোগ হয়েছে মনোবৃক্ষের এই ছড়িয়ে-পড়া রসলোলুপ পাতাগুলির সম্বেদনে । এরা ধরেছে সূক্ষ্ণকে,বস্তুর অতীতকে; এরা তাল দিয়েছে সেই গানের ছন্দে যার সুর যায় না শোনা । এরা নারীর হৃদয় থেকে এনে দিয়েছে আমার হৃদয়ে প্রাণলীলার প্রথম ইন্দ্রজাল আদিযুগের, অনন্ত পুরাতনের আত্মবিলাস নব নব যুগলের মায়ারূপের মধ্যে । এরা স্পন্দিত হয়েছে পুরুষের জয়শঙ্খধ্বনিতে মর্তলোকে যার আবির্ভাব মৃত্যুর আলোকে আপন অমৃতকে উদ্বারিত করবার জন্যে দুর্দাম উদ্যমে, জল-স্থল-আকাশ-পথে দুর্গমজয়ের স্পর্ধিত যার অধ্যবসায় । আজ আমার এই পত্রপুঞ্জের ঝরবার দিন এল জানি । শুধাই আজ অন্তরীক্ষের দিকে চেয়ে --- কোথায় গো সৃষ্টির আনন্দনিকেতনের প্রভু, জীবনের অলক্ষ্য গভীরে আমার এই পত্রদূতগুলির সম্বাহিত দিনরাত্রির যে সঞ্চয় অসংখ্য অপূর্ব অপরিমেয় যা অখণ্ড ঐক্যে মিলে গিয়েছে আমার আত্মরূপে, যে রূপের দ্বিতীয় নেই কোনোখানে কোনো কালে, তাকে রেখে দিয়ে যাব কোন্ গুণীর কোন্ রসজ্ঞের দৃষ্টির সন্মুখে, কার দক্ষিণ করতলের ছায়ায়, অগণ্যের মধ্যে কে তাকে নেবে স্বীকার করে ।
বিধাতা যেদিন মোর মন করিলা সৃজন বহু-কক্ষে-ভাগ-করা হর্ম্যের মতন, শুধু তার বাহিরের ঘরে প্রস্তুত রহিল সজ্জা নানামতো অতিথির তরে; নীরব নির্জন অন্তঃপুরে তালা তার বন্ধ করি চাবিখানি ফেলি দিলা দূরে। মাঝে মাঝে পান্থ এসে দাঁড়ায়েছে দ্বারে, বলিয়াছে "খুলে দাও'-- উপায় জানি না খুলিবারে। বাহিরে আকাশ তাই ধুলায় আকুল করে হাওয়া; সেখানেই যত খেলা, যত মেলা, যত আসাযাওয়া। অন্তরের জনহীন পথে হিমে-ভেজা ঘাসে ঘাসে শেফালিকা লুটায় শরতে। আষাঢ়ের আর্দ্রবায়ুভরে কদম্বকেশরে চিহ্ন তার পড়ে ঢাকা। চৈত্র সে বিচিত্র বর্ণে কুসুমের আলিম্পনে আঁকা। সেথায় লাজুক পাখি ছায়াঘন শাখে, মধ্যাহ্নে করুণ কণ্ঠে উদাসীন প্রেয়সীরে ডাকে। সন্ধ্যাতারা দিগন্তের কোণে শিরীষ পাতার ফাঁকে কান পেতে শোনে যেন কার পদধ্বনি দক্ষিণ-বাতাসে। ঝরাপাতা-বিছানো সে ঘাসে বাঁশরি বাজাই আমি কুসুমসুগন্ধি অবকাশে। দূরে চেয়ে থাকি একা-- মনে করি যদি কভু পাই তার দেখা যে পথিক একদিন অজানা সমুদ্র উপকূলে কুড়ায়ে পেয়েছে চাবি, বক্ষে নিয়ে তুলে শুনিতে পেয়েছে যেন অনাদি কালের কোন্ বাণী, সেই হতে ফিরিতেছে বিরাম না জানি। অবশেষে মৌমাছির পরিচিত এ নিভৃত পথপ্রান্তে এসে যাত্রা তার হবে অবসান; খুলিবে সে গুপ্ত দ্বার কেহ যার পায় নি সন্ধান।