মধু মাঝির ওই যে নৌকোখানা বাঁধা আছে রাজগঞ্জের ঘাটে, কারো কোনো কাজে লাগছে না তো, বোঝাই করা আছে কেবল পাটে। আমায় যদি দেয় তারা নৌকাটি আমি তবে একশোটা দাঁড় আঁটি, পাল তুলে দিই চারটে পাঁচটা ছটা -- মিথ্যে ঘুরে বেড়াই নাকো হাটে। আমি কেবল যাই একটিবার সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার। তখন তুমি কেঁদো না মা, যেন বসে বসে একলা ঘরের কোণে -- আমি তো মা, যাচ্ছি নেকো চলে রামের মতো চোদ্দ বছর বনে। আমি যাব রাজপুত্রু হয়ে নৌকো-ভরা সোনামানিক বয়ে, আশুকে আর শ্যামকে নেব সাথে, আমরা শুধু যাব মা তিন জনে। আমি কেবল যাব একটিবার সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার। ভোরের বেলা দেব নৌকো ছেড়ে, দেখতে দেখতে কোথায় যাব ভেসে। দুপুরবেলা তুমি পুকুর-ঘাটে, আমরা তখন নতুন রাজার দেশে। পেরিয়ে যাব তির্পুর্নির ঘাট, পেরিয়ে যাব তেপান্তরের মাঠ, ফিরে আসতে সন্ধে হয়ে যাবে, গল্প বলব তোমার কোলে এসে। আমি কেবল যাব একটিবার সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার।
স্বপ্ন যদি হ'ত জাগরণ, সত্য যদি হ'ত কল্পনা, তবে এ ভালোবাসা হ'ত না হত-আশা কেবল কবিতার জল্পনা। মেঘের খেলা-সম হ'ত সব মধুর মায়াময় ছায়াময়। কেবল আনাগোনা, নীরবে জানাশোনা, জগতে কিছু আর কিছু নয়। কেবল মেলামেশা গগনে, সুনীল সাগরের পরপারে সুদূরে ছায়াগিরি তাহারে ঘিরি ঘিরি শ্যামল ধরণীর ধারে ধারে। কখনো ধীরে ধীরে ভেসে যায়, কখনো মিশে যায় ভাঙিয়া-- কখনো ঘননীল বিজুলি-ঝিলিমিলি, কখনো উষারাগে রাঙিয়া। যেমন প্রাণপণ বাসনা তেমনি বাধা তার সুকঠিন সকলি লঘু হয়ে কোথায় যেত বয়ে, ছায়ার মতো হত কায়াহীন। চাঁদের আলো হত সুখহাস, অশ্রু শরতের বরষণ। সাক্ষী করি বিধু মিলন হত মৃদু কেবল প্রাণে প্রাণে পরশন। শান্তি পেত এই চিরতৃষা চিত্ত চঞ্চল সকাতর, প্রেমের থরে থরে বিরাম জাগিত রে-- দুখের ছায়া মাঝে রবিকর।