যে কাল হরিয়া লয় ধন সেই কাল করিছে হরণ সে ধনের ক্ষতি। তাই বসুমতী নিত্য আছে বসুন্ধরা। একে একে পাখি যায়, গানের পসরা। কোথাও না হয় শূন্য, আঘাতের অন্ত নেই, তবুও অক্ষুণ্ন বিপুল সংসার। দুঃখ শুধু তোমার আমার নিমেষের বেড়া-ঘেরা এখানে ওখানে। সে বেড়া পারায়ে তাহা পৌঁছায় না নিখিলের পানে। ওরে তুমি, ওরে আমি, যেখানে তোদের যাত্রা একদিন যাবে থামি সেখানে দেখিতে পাবি ধন আর ক্ষতি তরঙ্গের ওঠা নামা,একই খেলা, একই তার গতি। কান্না আর হাসি এক বীণাতন্ত্রীতারে একই গান উঠিছে উচ্ছ্বাসি, একই শমে এসে মহামৌনে মিলে যায় শেষে। তোমার হৃদয়তাপ তোমার বিলাপ চাপা থাক্ আপনার ক্ষুদ্রতার তলে। যেইখানে লোকযাত্রা চলে সেখানে সবার সাথে নির্বিকার চলো একসারে, দেখা দাও শান্তিসৌম্য আপনারে -- যে-শান্তি মৃত্যুর প্রান্তে বৈরাগ্যে নিভৃত, আত্মসমাহিত; দিবসের যত ধূলিচিহ্ন, যত কিছু ক্ষত লুপ্ত হল যে শান্তির অন্তিম তিমিরে; সংসারের শেষ তীরে সপ্তর্ষির ধ্যানপুণ্য রাতে হারায় যে শান্তিসিন্ধু আপনারি অন্ত আপনাতে; যে শান্তি নিবিড় প্রেমে স্তব্ধ আছে থেমে, যে-প্রেম শরীরমন অতিক্রম করিয়া সুদূরে একান্ত মধুরে লভিয়াছে আপনার চরম বিস্মৃতি। সে পরম শান্তি-মাঝে হোক তব অচঞ্চল স্থিতি।
কেমন করে তড়িৎ-আলোয় দেখতে পেলেম মনে তোমার বিপুল সৃষ্টি চলে আমার এই জীবনে। সে সৃষ্টি যে কালের পটে লোকে লোকান্তরে রটে, একটু তারি আভাস কেবল দেখি ক্ষণে ক্ষণে। মনে ভাবি, কান্নাহাসি আদর অবহেলা সবই যেন আমায় নিয়ে আমারি ঢেউ-খেলা। সেই আমি তো বাহনমাত্র, যায় সে ভেঙে মাটির পাত্র-- যা রেখে যায় তোমার সে ধন রয় তা তোমার সনে। তোমার বিশ্বে জড়িয়ে থাকে আমার চাওয়া পাওয়া। ভরিয়ে তোলে নিত্যকালের ফাল্গুনেরই হাওয়া। জীবন আমার দুঃখে সুখে দোলে ত্রিভুবনের বুকে, আমার দিবানিশির মালা জড়ায় শ্রীচরণে। আপন-মাঝে আপন জীবন দেখে যে মন কাঁদে। নিমেষগুলি শিকল হয়ে আমায় তখন বাঁধে। মিটল দুঃখ, টুটল বন্ধ-- আমার মাঝে হে আনন্দ, তোমার প্রকাশ দেখে মোহ ঘুচল এ নয়নে।