প্রতিহিংসা
Stories
মুকুন্দবাবুদের ভূতপূর্ব দেওয়ানের পৌত্রী, বর্তমান ম্যানেজারের স্ত্রী ইন্দ্রাণী অশুভক্ষণে বাবুদের বাড়িতে তাঁহাদের দৌহিত্রের বিবাহে বউভাতের নিমন্ত্রণে উপস্থিত ছিলেন।
তৎপূর্বকার ইতিহাস সংক্ষেপে বলিয়া রাখিলে কথাটা পরিষ্কার হইবে।
আরো দেখুন
সখী, আর কত দিন, সুখহীন শান্তিহীন
Songs
       সখী, আর কত দিন           সুখহীন শান্তিহীন
             হা হা করে বেড়াইব নিরাশ্রয় মন লয়ে ।
       পারি নে, পারি নে আর—       পাষাণ মনের ভার
             বহিয়া পড়েছি, সখী, অতি শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে ।
       সম্মুখে জীবন মম             হেরি মরুভূমিসম,
             নিরাশা বুকেতে বসি ফেলিতেছে বিষশ্বাস ।
       উঠিতে শকতি নাই            যে দিকে ফিরিয়া চাই
             শূন্য—শূন্য—মহাশূন্য নয়নেতে পরকাশ ।
       কে আছে, কে আছে সখী,       এ শ্রান্ত মস্তক মম
             বুকেতে রাখিবে ঢাকি যতনে জননীসম ।
       মন, যত দিন যায়, মুদিয়া আসিছে হায়—
             শুকায়ে শুকায়ে শেষে মাটিতে পড়িবে ঝরি ।।
আরো দেখুন
লটারিতে পেল পীতু
Verses
লটারিতে পেল পীতু
     হাজার পঁচাত্তর,
জীবনী লেখার লোক
     জুটিল সে-মাত্তর।
যখনি পড়িল চোখে
     চেহারাটা চেক্‌টার
'আমি পিসে' কহে এসে
     ড্রেন্‌ইন্‌স্‌পেক্‌টার।
গুরু-ট্রেনিঙের এক
     পিলেওয়ালা ছাত্তর
অযাচিত এল তার
     কন্যার পাত্তর।
আরো দেখুন
চতুরঙ্গ
Novels
আমি পাড়াগাঁ হইতে কলিকাতায় আসিয়া কালেজে প্রবেশ করিলাম। শচীশ তখন বি. এ. ক্লাসে পড়িতেছে। আমাদের বয়স প্রায় সমান হইবে।
শচীশকে দেখিলে মনে হয় যেন একটা জ্যোতিষ্ক-- তার চোখ জ্বলিতেছে; তার লম্বা সরু আঙুলগুলি যেন আগুনের শিখা; তার গায়ের রঙ যেন রঙ নহে, তাহা আভা। শচীশকে যখন দেখিলাম অমনি যেন তার অন্তরাত্মাকে দেখিতে পাইলাম; তাই একমুহূর্তে তাহাকে ভালোবাসিলাম।
আরো দেখুন
মাস্টারমশায়
Stories
রাত্রি তখন প্রায় দুটা। কলিকাতার নিস্তব্ধ শব্দসমুদ্রে একটুখানি ঢেউ তুলিয়া একটা বড়ো জুড়িগাড়ি ভবানীপুরের দিক হইতে আসিয়া বির্জিতলাওয়ের মোড়ের কাছে থামিল। সেখানে একটা ঠিকাগাড়ি দেখিয়া, আরোহী বাবু তাহাকে ডাকিয়া আনাইলেন। তাহার পাশে একটি কোট-হ্যাট-পরা বাঙালি বিলাতফের্তা যুবা সম্মুখের আসনে দুই পা তুলিয়া দিয়া একটু মদমত্ত অবস্থায় ঘাড় নামাইয়া ঘুমাইতেছিল। এই যুবকটি নূতন বিলাত হইতে আসিয়াছে। ইহারই অভ্যর্থনা উপলক্ষে বন্ধুমহলে একটা খানা হইয়া গেছে। সেই খানা হইতে ফিরিবার পথে একজন বন্ধু তাহাকে কিছুদূর অগ্রসর করিবার জন্য নিজের গাড়িতে তুলিয়া লইয়াছেন। তিনি ইহাকে দু-তিনবার ঠেলা দিয়া জাগাইয়া কহিলেন, 'মজুমদার, গাড়ি পাওয়া গেছে, বাড়ি যাও।'
মজুমদার সচকিত হইয়া একটা বিলাতি দিব্য গালিয়া ভাড়াটে গাড়িতে উঠিয়া পড়িল। তাহার গাড়োয়ানকে ভালো করিয়া ঠিকানা বাতলাইয়া দিয়া ব্রুহাম গাড়ির আরোহী নিজের গম্যপথে চলিয়া গেলেন।
আরো দেখুন
দুঃখের বরষায়
Songs
দুঃখের বরষায়   চক্ষের জল যেই   নামল
বক্ষের দরজায়    বন্ধুর রথ সেই    থামল ॥
মিলনের পাত্রটি   পূর্ণ যে বিচ্ছেদ  -বেদনায়;
অর্পিনু হাতে তার,   খেদ নাই আর মোর   খেদ নাই ॥
বহুদিনবঞ্চিত   অন্তরে সঞ্চিত   কী আশা,
চক্ষের নিমেষেই   মিটল সে পরশের   তিয়াষা।
এত দিনে জানলেম   যে কাঁদন কাঁদলেম   সে কাহার জন্য।
ধন্য এ জাগরণ,   ধন্য এ ক্রন্দন, ধন্য রে ধন্য ॥
আরো দেখুন
বাণী
Verses
পক্ষে বহিয়া অসীম কালের বার্তা
      যুগে যুগে চলে অনাদি জ্যোতির যাত্রা
                       কালের রাত্রি ভেদি
                  অব্যক্তের কুজ্ঝটিজাল ছেদি
      পথে পথে রচি আলিম্পনের লেখা।
      পাখার কাঁপনে গগনে গগনে
                  উজ্জ্বলি উঠে দিক্‌প্রাঙ্গণে
                         অগ্নিচক্ররেখা।
      অস্তিত্বের গহনতত্ত্ব ছিল মূক বাণীহীন--
                         অবশেষে একদিন
                  যুগান্তরের প্রদোষ-আঁধারে
                         শূন্যপাথারে
            মানবাত্মার প্রকাশ উঠিল ফুটি।
                  মহাদুঃখের মহানন্দের
                  সংঘাত লাগি চিরদ্বন্দ্বের
      চিৎপদ্মের আবরণ গেল টুটি।
                         শতদলে দিল দেখা
            অসীমের পানে মেলিয়া নয়ন
                  দাঁড়ায়ে রয়েছে একা
                      প্রথম পরম বাণী
                              বীণা হাতে বীণাপাণি।
আরো দেখুন
মুকুট
Stories
ত্রিপুরার রাজা অমরমাণিক্যের কনিষ্ঠ পুত্র রাজধর সেনাপতি ইশা খাঁকে বলিলেন, "দেখো সেনাপতি, আমি বারবার বলিতেছি তুমি আমাকে অসম্মান করিয়ো না।"
পাঠান ইশা খাঁ কতকগুলি তীরের ফলা লইয়া তাহাদের ধার পরীক্ষা করিতেছিলেন। রাজধরের কথা শুনিয়া কিছুই বলিলেন না, কেবল মুখ তুলিয়া ভুরু উঠাইয়া একবার তাঁহার মুখের দিকে চাহিলেন। আবার তখনই মুখ নত করিয়া তীরের ফলার দিকে মনোযোগ দিলেন।
আরো দেখুন
প্রায়শ্চিত্ত
Stories
স্বর্গ ও মর্তের মাঝখানে একটা অনির্দেশ্য অরাজক স্থান আছে যেখানে ত্রিশঙ্কু রাজা ভাসিয়া বেড়াইতেছেন, যেখানে আকাশকুসুমের অজস্র আবাদ হইয়া থাকে। সেই বায়ুদুর্গবেষ্টিত মহাদেশের নাম 'হইলে-হইতে-পারিত'। যাঁহারা মহৎ কার্য করিয়া অমরতা লাভ করিয়াছেন তাঁহারা ধন্য হইয়াছেন, যাঁহারা সামান্য ক্ষমতা লইয়া সাধারণ মানবের মধ্যে সাধারণভাবে সংসারের প্রাত্যহিক কর্তব্যসাধনে সহায়তা করিতেছেন তাঁহারাও ধন্য; কিন্তু যাঁহারা অদৃষ্টের ভ্রমক্রমে হঠাৎ দুয়ের মাঝখানে পড়িয়াছেন তাঁহাদের আর কোনো উপায় নাই। তাঁহারা একটা কিছু হইলে হইতে পারিতেন কিন্তু সেই কারণেই তাঁহাদের পক্ষে কিছু-একটা হওয়া সর্বাপেক্ষা অসম্ভব।
আমাদের অনাথবন্ধু সেই মধ্যদেশবিলম্বিত বিধিবিড়ম্বিত যুবক। সকলেরই বিশ্বাস, তিনি ইচ্ছা করিলে সকল বিষয়েই কৃতকার্য হইতে পারিতেন। কিন্তু কোনো কালে তিনি ইচ্ছাও করিলেন না এবং কোনো বিষয়ে তিনি কৃতকার্যও হইলেন না, এবং সকলের বিশ্বাস তাঁহার প্রতি অটল রহিয়া গেল। সকলে বলিল, তিনি পরীক্ষায় ফার্‌স্ট্‌ হইবেন; তিনি আর পরীক্ষা দিলেন না। সকলের বিশ্বাস চাকরিতে প্রবিষ্ট হইলে যে কোনো ডিপার্টমেন্টের উচ্চতম স্থান তিনি অনায়াসে গ্রহণ করিতে পারিবেন; তিনি কোনো চাকরিই গ্রহণ করিলেন না। সাধারণ লোকের প্রতি তাঁহার বিশেষ অবজ্ঞা, কারণ তাহারা অত্যন্ত সামান্য; অসাধারণ লোকের প্রতি তাঁহার কিছুমাত্র শ্রদ্ধা ছিল না, কারণ মনে করিলেই তিনি তাহাদের অপেক্ষা অসাধারণতর হইতে পারিতেন।
আরো দেখুন
নদী
Verses
ওরে         তোরা কি জানিস কেউ
জলে         কেন ওঠে এত ঢেউ।
ওরা         দিবস-রজনী নাচে,
তাহা        শিখেছে কাহার কাছে।
শোন্‌        চলচল্‌  ছলছল্‌
সদাই        গাহিয়া চলেছে জল।
ওরা         কারে ডাকে বাহু তুলে,
ওরা         কার কোলে ব'সে দুলে।
সদা         হেসে করে লুটোপুটি,
চলে        কোন্‌খানে ছুটোছুটি।
ওরা         সকলের মন তুষি
আছে       আপনার মনে খুশি।
আমি       বসে বসে তাই ভাবি,
নদী        কোথা হতে এল নাবি।
কোথায়   পাহাড় সে কোন্‌খানে,
তাহার     নাম কি কেহই জানে।
কেহ       যেতে পারে তার কাছে,
সেথায়     মানুষ কি কেউ আছে।
সেথা       নাহি তরু নাহি ঘাস,
নাহি       পশুপাখিদের বাস,
সেথা      শবদ কিছু না শুনি,
পাহাড়     বসে আছে মহামুনি।
তাহার     মাথার উপরে শুধু
সাদা        বরফ করিছে ধু ধু।
সেথা       রাশি রাশি মেঘ যত
থাকে      ঘরের ছেলের মতো।
শুধু        হিমের মতন হাওয়া
সেথায়     করে সদা আসা-যাওয়া,
শুধু        সারা রাত তারাগুলি
তারে      চেয়ে দেখে আঁখি খুলি।
শুধু        ভোরের কিরণ এসে
তারে      মুকুট পরায় হেসে।
সেই       নীল আকাশের পায়ে
সেথা      কোমল মেঘের গায়ে
সেথা      সাদা বরফের বুকে
নদী       ঘুমায় স্বপনসুখে।
কবে      মুখে তার রোদ লেগে
নদী       আপনি উঠিল জেগে,
কবে      একদা রোদের বেলা
তাহার    মনে পড়ে গেল খেলা।
সেখায়    একা ছিল দিনরাতি,
কেহই     ছিল না খেলার সাথি।
সেথায়     কথা নাহি কারো ঘরে,
সেথায়     গান কেহ নাহি করে।
তাই       ঝুরু ঝুরু ঝিরি ঝিরি।
নদী        বাহিরিল ধীরি ধীরি।
মনে        ভাবিল, যা আছে ভবে
সবই       দেখিয়া লইতে হবে।
নীচে      পাহাড়ের বুক জুড়ে
গাছ       উঠেছে আকাশ ফুঁড়ে।
তারা      বুড়ো বুড়ো তরু যত
তাদের    বয়স কে জানে কত।
তাদের    খোপে খোপে গাঁঠে গাঁঠে
পাখি       বাসা বাঁধে কুটো-কাঠে।
তারা       ডাল তুলে কালো কালো
আড়াল     করেছে রবির আলো।
তাদের     শাখায় জটার মতো
ঝুলে      পড়েছে শেওলা যত।
তারা       মিলায়ে মিলায়ে কাঁধ
যেন        পেতেছে আঁধার-ফাঁদ।
তাদের     তলে তলে নিরিবিলি
নদী        হেসে চলে খিলিখিলি।
তারে      কে পারে রাখিতে ধরে,
সে যে     ছুটোছুটি যায় সরে।
সে যে      সদা খেলে লুকোচুরি,
তাহার    পায়ে পায়ে বাজে নুড়ি।
পথে       শিলা আছে রাশি রাশি,
তাহা      ঠেলে চলে হাসি হাসি।
পাহাড়     যদি থাকে পথ জুড়ে  
নদী        হেসে যায় বেঁকেচুরে।
সেথায়    বাস করে শিং-তোলা
যত       বুনো ছাগ দাড়ি-ঝোলা।
সেথায়    হরিণ রোঁয়ায় ভরা
তারা      কারেও দেয় না ধরা।
সেথায়     মানুষ নূতনতর,
তাদের     শরীর কঠিন বড়ো।
তাদের     চোখ দুটো নয় সোজা,
তাদের     কথা নাহি যায় বোঝা।
তারা       পাহাড়ের ছেলেমেয়ে
সদাই       কাজ করে গান গেয়ে।
তারা       সারা দিনমান খেটে
আনে      বোঝাভরা কাঠ কেটে।
তারা       চড়িয়া শিখর-'পরে
বনের      হরিণ শিকার করে।
নদী         যত আগে আগে চলে
ততই      সাথি জোটে দলে দলে।
তারা       তারি মতো, ঘর হতে
সবাই       বাহির হয়েছে পথে।
পায়ে       ঠুনু ঠুনু বাজে নুড়ি,
যেন        বাজিতেছে মল চুড়ি।
গায়ে       আলো করে ঝিকিঝিক,
যেন        পরেছে হীরার চিক।
মুখে       কলকল কত ভাষে
এত        কথা কোথা হতে আসে।
শেষে       সখীতে সখীতে মেলি
হেসে       গায়ে গায়ে হেলাহেলি।
শেষে       কোলাকুলি কলরবে
তারা       এক হয়ে যায় সবে।
তখন       কলকল ছুটে জল--
কাঁপে       টলমল ধরাতল,
কোথাও    নীচে পড়ে ঝরঝর--
পাথর       কেঁপে ওঠে থরথর,
শিলা        খান্‌ খান্‌ যায় টুটে--
নদী         চলে পথ কেটে কুটে।
ধারে        গাছগুলো বড়ো বড়ো
তারা        হয়ে পড়ে পড়ো-পড়ো।
কত        বড়ো পাথরের চাপ
জলে       খসে পড়ে ঝুপঝাপ।
তখন      মাটি-গোলা ঘোলা জলে
ফেনা      ভেসে যায় দলে দলে।
জলে       পাক ঘুরে ঘুরে ওঠে,
যেন       পাগলের মতো ছোটে।
শেষে      পাহাড় ছাড়িয়ে এসে
নদী        পড়ে বাহিরের দেশে।
হেথা       যেখানে চাহিয়া দেখে
চোখে      সকলি নূতন ঠেকে।
হেথা       চারি দিকে খোলা মাঠ,
হেথা       সমতল পথঘাট।
কোথাও    চাষিরা করিছে চাষ,
কোথাও    গোরুতে খেতেছে ঘাস।
কোথাও    বৃহৎ অশথ গাছে
পাখি        শিস দিয়ে দিয়ে নাচে।
কোথাও     রাখাল ছেলের দলে
খেলা        করিছে গাছের তলে।
কোথাও     নিকটে গ্রামের মাঝে
লোকে      ফিরিছে নানান কাজে।
কোথাও     বাধা কিছু নাহি পথে,
নদী          চলেছে আপন মতে।
পথে        বরষার জলধারা
আসে       চারি দিক হতে তারা,
নদী         দেখিতে দেখিতে বাড়ে,
এখন       কে রাখে ধরিয়া তারে।
তাহার      দুই কূলে উঠে ঘাস,
সেথায়     যতেক বকের বাস।
সেথা        মহিষের দল থাকে,
তারা        লুটায় নদীর পাঁকে।
যত         বুনো বরা সেথা ফেরে
তারা        দাঁত দিয়ে মাটি চেরে।
সেথা       শেয়াল লুকায়ে থাকে,
রাতে       হুয়া হুয়া করে ডাকে।
দেখে        এইমতো কত দেশ,
কে বা       গনিয়া করিবে শেষ।
কোথাও    কেবল বালির ডাঙা,
কোথাও    মাটিগুলো রাঙা রাঙা,
কোথাও    ধারে ধারে উঠে বেত,
কোথাও    দুধারে গমের খেত।
কোথাও    ছোটোখাটো গ্রামখানি,
কোথাও    মাথা তোলে রাজধানী--
সেথায়      নবাবের বড়ো কোঠা,
তারি       পাথরের থাম মোটা।
তারি        ঘাটের সোপান যত,
জলে        নামিয়াছে শত শত।
কোথাও     সাদা পাথরের পুলে
নদী          বাঁধিয়াছে দুই কূলে।
কোথাও     লোহার সাঁকোয় গাড়ি
চলে          ধকো ধকো ডাক ছাড়ি।
নদী          এইমতো অবশেষে
এল          নরম মাটির দেশে।
হেথা        যেথায় মোদের বাড়ি
নদী         আসিল দুয়ারে তারি।
হেথায়      নদী নালা বিল খালে
দেশ        ঘিরেছে জলের জালে।
কত        মেয়েরা নাহিছে ঘাটে,
কত        ছেলেরা সাঁতার কাটে;
কত        জেলেরা ফেলিছে জাল,
কত        মাঝিরা ধরেছে হাল,
সুখে        সারিগান গায় দাঁড়ি,
কত        খেয়া-তরী দেয় পাড়ি।
কোথাও    পুরাতন শিবালয়
তীরে       সারি সারি জেগে রয়।
সেথায়      দু-বেলা সকালে সাঁঝে
পূজার      কাঁসর-ঘণ্টা বাজে।
কত         জটাধারী ছাইমাখা
ঘাটে        বসে আছে যেন আঁকা।
তীরে       কোথাও বসেছে হাট,
নৌকা       ভরিয়া রয়েছে ঘাট।
মাঠে        কলাই সরিষা ধান,
তাহার      কে করিবে পরিমাণ।
কোথাও    নিবিড় আখের বনে
শালিক      চরিছে আপন মনে।
কোথাও    ধু ধু করে বালুচর
সেথায়      গাঙশালিকের ঘর।
সেথায়      কাছিম বালির তলে
আপন      ডিম পেড়ে আসে চলে।
সেথায়      শীতকালে বুনো হাঁস
কত        ঝাঁকে ঝাঁকে করে বাস।
সেথায়     দলে দলে চখাচখী
করে       সারাদিন বকাবকি।
সেথায়     কাদাখোঁচা তীরে তীরে
কাদায়      খোঁচা দিয়ে দিয়ে ফিরে।
কোথাও   ধানের খেতের ধারে
ঘন        কলাবন বাঁশঝাঁড়ে
ঘন        আম-কাঁঠালের বনে
গ্রাম       দেখা যায় এক কোণে।
সেথা      আছে ধান গোলাভরা,
সেথা      খড়গুলা রাশ-করা।
সেথা      গোয়ালেতে গোরু বাঁধা
কত       কালো পাটকিলে সাদা।
কোথাও   কলুদের কুঁড়েখানি,
সেথায়     ক্যাঁ কোঁ ক'রে ঘোরে ঘানি।
কোথাও   কুমারের ঘরে চাক,
দেয়        সারাদিন ধরে পাক।
মুদি        দোকানেতে সারাখন  
বসে        পড়িতেছে রামায়ণ।
কোথাও    বসি পাঠশালা-ঘরে
যত        ছেলেরা চেঁচিয়ে পড়ে,
বড়ো       বেতখানি লয়ে কোলে
ঘুমে       গুরুমহাশয় ঢোলে।
হেথায়     এঁকে বেঁকে ভেঙে চুরে
গ্রামের     পথ গেছে বহু দূরে।
সেথায়     বোঝাই গোরুর গাড়ি
ধীরে       চলিয়াছে ডাক ছাড়ি।
রোগা      গ্রামের কুকুরগুলো
ক্ষুধায়     শুঁকিয়া বেড়ায় ধুলো।
যেদিন     পুরনিমা রাতি আসে
চাঁদ        আকাশ জুড়িয়া হাসে।
বনে        ও পারে আঁধার কালো,
জলে       ঝিকিমিকি করে আলো।
বালি       চিকিচিকি করে চরে,
ছায়া       ঝোপে বসি থাকে ডরে।
সবাই      ঘুমায় কুটিরতলে,
তরী       একটিও নাহি চলে।
গাছে       পাতাটিও নাহি নড়ে,
জলে       ঢেউ নাহি ওঠে পড়ে।
কভু       ঘুম যদি যায় ছুটে
কোকিল   কুহু কুহু গেয়ে উঠে,
কভু       ও পারে চরের পাখি
রাতে      স্বপনে উঠিছে ডাকি।
নদী        চলেছে ডাহিনে বামে,
কভু       কোথাও সে নাহি থামে।
সেথায়     গহন গভীর বন,
তীরে      নাহি লোক নাহি জন।
শুধু        কুমির নদীর ধারে
সুখে       রোদ পোহাইছে পাড়ে।
বাঘ        ফিরিতেছে ঝোপে ঝাপে,
ঘাড়ে       পড়ে আসি এক লাফে।
কোথাও   দেখা যায় চিতাবাঘ,
তাহার     গায়ে চাকা চাকা দাগ।
রাতে      চুপিচুপি আসে ঘাটে,
জল        চকো চকো করি চাটে।
হেথায়     যখন জোয়ার ছোটে,
নদী        ফুলিয়ে ঘুলিয়ে ওঠে।
তখন      কানায় কানায় জল,
কত       ভেসে আসে ফুল ফল।
ঢেউ       হেসে ওঠে খলখল,
তরী       করি ওঠে টলমল।
নদী        অজগরসম ফুলে
গিলে       খেতে চায় দুই কূলে।
আবার     ক্রমে আসে ভাঁটা পড়ে,
তখন      জল যায় সরে সরে।
তখন      নদী রোগা হয়ে আসে,
কাদা       দেখা দেয় দুই পাশে।
বেরোয়    ঘাটের সোপান যত
যেন        বুকের হাড়ের মতো।
নদী        চলে যায় যত দূরে
ততই      জল ওঠে পুরে পুরে।
শেষে      দেখা নাহি যায় কূল,
চোখে      দিক হয়ে যায় ভুল।
নীল        হয়ে আসে জলধারা,
মুখে       লাগে যেন নুন-পারা।
ক্রমে       নীচে নাহি পাই তল,
ক্রমে       আকাশে মিশায় জল,
ডাঙা       কোন্‌খানে পড়ে রয়--
শুধু        জলে জলে জলময়।
ওরে       একি শুনি কোলাহল,
হেরি       একি ঘন নীল জল।
ওই         বুঝি রে সাগর হোথা,
উহার      কিনারা কে জানে কোথা।
ওই         লাখো লাখো ঢেউ উঠে
সদাই       মরিতেছে মাথা কুটে।
ওঠে        সাদা সাদা ফেনা যত
যেন        বিষম রাগের মতো।
জল        গরজি গরজি ধায়,
যেন        আকাশ কাড়িতে চায়।
বায়ু        কোথা হতে আসে ছুটে,
ঢেউয়ে    হাহা করে পড়ে লুটে।
যেন        পাঠশালা-ছাড়া ছেলে
ছুটে        লাফায়ে বেড়ায় খেলে।
হেথা       যতদূর পানে চাই
কোথাও   কিছু নাই, কিছু নাই।
শুধু        আকাশ বাতাস জল,
শুধুই      কলকল কোলাহল,
শুধু        ফেনা আর শুধু ঢেউ--
আর       নাহি কিছু নাহি কেউ।
হেথায়    ফুরাইল সব দেশ,
নদীর      ভ্রমণ হইল শেষ।
হেথা      সারাদিন সারাবেলা
তাহার    ফুরাবে না আর খেলা।
তাহার    সারাদিন নাচ গান
কভু      হবে নাকো অবসান।
এখন      কোথাও হবে না যেতে,
সাগর     নিল তারে বুক পেতে।
তারে     নীল বিছানায় থুয়ে
তাহার    কাদামাটি দিবে ধুয়ে।
তারে     ফেনার কাপড়ে ঢেকে,
তারে     ঢেউয়ের দোলায় রেখে,
তার      কানে কানে গেয়ে সুর
তার      শ্রম করি দিবে দূর।
নদী       চিরদিন চিরনিশি
রবে       অতল আদরে মিশি।
আরো দেখুন
চন্দনী
Stories
জানোই তো সেদিন কী কাণ্ড। একেবারে তলিয়ে গিয়েছিলেম আর-কি, কিন্তু তলায় কোথায় যে ফুটো হয়েছে তার কোনো খবর পাওয়া যায় নি। না মাথা ধরা, না মাথা ঘোরা, না গায়ে কোথাও ব্যথা, না পেটের মধ্যে একটুও খোঁচাখুঁচির তাগিদ। যমরাজার চরগুলি খবর আসার সব দরজাগুলো বন্ধ করে ফিস্‌ ফিস্‌ ক'রে মন্ত্রণা করছিল। এমন সুবিধে আর হয় না! ডাক্তারেরা কলকাতায় নব্বই মাইল দূরে। সেদিনকার এই অবস্থা।
সন্ধে হয়ে এসেছে। বারান্দায় বসে আছি। ঘন মেঘ ক'রে এল। বৃষ্টি হবে বুঝি। আমার সভাসদ্‌রা বললে, ঠাকুরদা, একসময় শুনেছি তুমি মুখে মুখে গল্প ব'লে শোনাতে, এখন শোনাও না কেন।
আরো দেখুন