চিত্রকর
Stories
ময়মনসিংহ ইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে আমাদের গোবিন্দ এল কলকাতায়। বিধবা মায়ের অল্প কিছু সম্বল ছিল। কিন্তু, সব-চেয়ে তার বড়ো সম্বল ছিল নিজের অবিচলিত সংকল্পের মধ্যে। সে ঠিক করেছিল, 'পয়সা' করবই, সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে দিয়ে।' সর্বদাই তার ভাষায় ধনকে সে উল্লেখ করত 'পয়সা' বলে। অর্থাৎ, তার মনে খুব একটা দর্শন স্পর্শন ঘ্রাণের যোগ্য প্রত্যক্ষ পদার্থ ছিল; তার মধ্যে বড়ো নামের মোহ ছিল না; অত্যন্ত সাধারণ পয়সা, হাটে হাটে হাতে হাতে ঘুরে ঘুরে ক্ষয়ে যাওয়া, মলিন হয়ে যাওয়া পয়সা, তাম্রগন্ধী পয়সা, কুবেরের আদিম স্বরূপ, যা রুপোয় সোনায় কাগজে দলিলে নানা মূর্তি পরিগ্রহ করে মানুষের মনকে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
নানা বাঁকা পথের ভিতর দিয়ে নানা পঙ্কে আবিল হতে হতে আজ গোবিন্দ তার পয়সাপ্রবাহিণীর প্রশস্তধারার পাকা বাঁধানো ঘাটে এসে পৌঁচেছে। গানিব্যাগ্‌ওয়ালা বড়োসাহেব ম্যাক্‌ডুগালের বড়োবাবুর আসনে তার ধ্রুব প্রতিষ্ঠা। সবাই তাকে নাম দিয়েছিল ম্যাক্‌দুলাল।
আরো দেখুন
বিচারক
Stories
অনেক অবস্থান্তরের পর অবশেষে গতযৌবনা ক্ষীরোদা যে পুরুষের আশ্রয় প্রাপ্ত হইয়াছিল সেও যখন তাহাকে জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া গেল, তখন অন্নমুষ্টির জন্য দ্বিতীয় আশ্রয় অন্বেষণের চেষ্টা করিতে তাহার অত্যন্ত ধিক্‌কার বোধ হইল।
যৌবনের শেষে শুভ্র শরৎকালের ন্যায় একটি গভীর প্রশান্ত প্রগাঢ় সুন্দর বয়স আসে যখন জীবনের ফল ফলিবার এবং শস্য পাকিবার সময়। তখন আর উদ্দাম যৌবনের বসন্তচঞ্চলতা শোভা পায় না। ততদিনে সংসারের মাঝখানে আমাদের ঘর বাঁধা একপ্রকার সাঙ্গ হইয়া গিয়াছে; অনেক ভালোমন্দ, অনেক সুখদুঃখ, জীবনের মধ্যে পরিপাক প্রাপ্ত হইয়া অন্তরের মানুষটিকে পরিণত করিয়া তুলিয়াছে; আমাদের আয়ত্তের অতীত কুহকিনী দুরাশার কল্পনালোক হইতে সমস্ত উদ্‌ভ্রান্ত বাসনাকে প্রত্যাহরণ করিয়া আপন ক্ষুদ্র ক্ষমতার গৃহপ্রাচীরমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি; তখন নূতন প্রণয়ের মুগ্ধদৃষ্টি আর আকর্ষণ করা যায় না, কিন্তু পুরাতন লোকের কাছে মানুষ আরো প্রিয়তর হইয়া উঠে। তখন যৌবনলাবণ্য অল্পে অল্পে বিশীর্ণ হইয়া আসিতে থাকে, কিন্তু জরাবিহীন অন্তরপ্রকৃতি বহুকালের সহবাসক্রমে মুখে চক্ষে যেন স্ফুটতর রূপে অঙ্কিত হইয়া যায়, হাসিটি দৃষ্টিপাতটি কণ্ঠস্বরটি ভিতরকার মানুষটির দ্বারা ওতপ্রোত হইয়া উঠে। যাহা-কিছু পাই নাই তাহার আশা ছাড়িয়া, যাহারা ত্যাগ করিয়া গিয়াছে তাহাদের জন্য শোক সমাপ্ত করিয়া, যাহারা বঞ্চনা করিয়াছে তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া-- যাহারা কাছে আসিয়াছে, ভালোবাসিয়াছে, সংসারের সমস্ত ঝড়ঝঞ্ঝা শোকতাপ বিচ্ছেদের মধ্যে যে কয়টি প্রাণী নিকটে অবশিষ্ট রহিয়াছে তাহাদিগকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া সুনিশ্চিত সুপরীক্ষিত চিরপরিচিতগণের প্রীতিপরিবেষ্টনের মধ্যে নিরাপদ নীড় রচনা করিয়া তাহারই মধ্যে সমস্ত চেষ্টার অবসান এবং সমস্ত আকাঙক্ষার পরিতৃপ্তি লাভ করা যায়। যৌবনের সেই স্নিগ্ধ সায়াহ্নে জীবনের সেই শান্তিপর্বেও যাহাকে নূতন সঞ্চয়, নূতন পরিচয়, নূতন বন্ধনের বৃথা আশ্বাসে নূতন চেষ্টায় ধাবিত হইতে হয়-- তখনো যাহার বিশ্রামের জন্য শয্যা রচিত হয় নাই, যাহার গৃহপ্রত্যাবর্তনের জন্য সন্ধ্যাদীপ প্রজ্জ্বলিত হয় নাই, সংসারে তাহার মতো শোচনীয় আর কেহ নাই।
আরো দেখুন
অসম্ভব কথা
Stories
এক যে ছিল রাজা।
তখন ইহার বেশি কিছু জানিবার আবশ্যক ছিল না। কোথাকার রাজা, রাজার নাম কী, এ সকল প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া গল্পের প্রবাহ রোধ করিতাম না। রাজার নাম শিলাদিত্য কি শালিবাহন, কাশী কাঞ্চি কনোজ কোশল অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গের মধ্যে ঠিক কোন্‌খানটিতে তাঁহার রাজত্ব, এ সকল ইতিহাস-ভূগোলের তর্ক আমাদের কাছে নিতান্তই তুচ্ছ ছিল,-- আসল যে-কথাটি শুনিলে অন্তর পুলকিত হইয়া উঠিত এবং সমস্ত হৃদয় একমুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুদ্বেগে চুম্বকের মতো আকৃষ্ট হইত সেটি হইতেছে-- এক যে ছিল রাজা।
আরো দেখুন
অতিবাদ
Verses
আজ বসন্তে বিশ্বখাতায়
হিসেব নেইকো পুষ্পে পাতায়,
জগৎ যেন ঝোঁকের মাথায়
     সকল কথাই বাড়িয়ে বলে।
ভুলিয়ে দিয়ে সত্যি মিথ্যে,
ঘুলিয়ে দিয়ে নিত্যানিত্যে,
দু ধারে সব উদারচিত্তে
     বিধিবিধান ছাড়িয়ে চলে।
                  আমারো দ্বার মুক্ত পেয়ে
                       সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,
                  আজকে আমি কোনোমতেই
                       বলব নাকো সত্য কথা।
প্রিয়ার পুণ্যে হলেম রে আজ
একটা রাতের রাজ্যাধিরাজ,
ভাণ্ডারে আজ করছে বিরাজ
     সকল প্রকার অজস্রত্ব।
কেন রাখব কথার ওজন?
কৃপণতায় কোন্‌ প্রয়োজন?
ছুটুক বাণী যোজন যোজন
     উড়িয়ে দিয়ে ষত্ব ণত্ব।
                  চিত্তদুয়ার মুক্ত ক'রে
                        সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,
                 আজকে আমি কোনোমতেই
                        বলব নাকো সত্য কথা।
হে প্রেয়সী স্বর্গদূতী,
আমার যত কাব্যপুঁথি
তোমার পায়ে পড়ে স্তুতি,
তোমারি নাম বেড়ায় রটি;
থাকো হৃদয়-পদ্মটিতে
এক দেবতা আমার চিতে--
চাই নে তোমায় খবর দিতে
     আরো আছেন তিরিশ কোটি।
                 চিত্তদুয়ার মুক্ত ক'রে
                      সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,
                 আজকে আমি কোনোমতেই
                       বলব নাকো সত্য কথা।
ত্রিভুবনে সবার বাড়া
একলা তুমি সুধার ধারা,
উষার ভালে একটি তারা,
     এ জীবনে একটি আলো--
সন্ধ্যাতারা ছিলেন কে কে
সে-সব কথা যাব ঢেকে,
সময় বুঝে মানুষ দেখে
     তুচ্ছ কথা ভোলাই ভালো।
                চিত্তদুয়ার মুক্ত রেখে
                     সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,
                আজকে আমি কোনোমতেই
                    বলব নাকো সত্য কথা।
সত্য থাকুন ধরিত্রীতে
শুষ্ক রুক্ষ ঋষির চিতে,
জ্যামিতি আর বীজগণিতে,
     কারো ইথে আপত্তি নেই--
কিন্তু আমার প্রিয়ার কানে
এবং আমার কবির গানে
পঞ্চশরের পুষ্পবাণে
     মিথ্যে থাকুন রাত্রিদিনেই।
                চিত্তদুয়ার মুক্ত রেখে
                     সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,
                আজকে আমি কোনোমতেই
                    বলব নাকো সত্য কথা।
ওগো সত্য বেঁটেখাটো,
বীণার তন্ত্রী যতই ছাঁটো,
কণ্ঠ আমার যতই আঁটো,
     বলব তবু উচ্চ সুরে--
আমার প্রিয়ার মুগ্ধ দৃষ্টি
করছে ভুবন নূতন সৃষ্টি,
মুচকি হাসির সুধার বৃষ্টি
     চলছে আজি জগৎ জুড়ে।
                 চিত্তদুয়ার মুক্ত রেখে
                      সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,
                 আজকে আমি কোনোমতেই
                     বলব নাকো সত্য কথা।
যদি বল "আর বছরে
এই কথাটাই এমনি করে
বলেছিলি, কিন্তু ওরে
     শুনেছিলেন আরেক জনে'--
জেনো তবে মূঢ়মত্ত,
আর বসন্তে সেটাই সত্য,
এবারো সেই প্রাচীন তত্ত্ব
ফুটল নূতন চোখের কোণে।
                  চিত্তদুয়ার মুক্ত রেখে    
                       সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,
                  আজকে আমি কোনোমতেই
                       বলব নাকো সত্য কথা।
আজ বসন্তে বকুল ফুলে
যে গান বায়ু বেড়ায় বুলে
কাল সকালে যাবে ভুলে--
      কোথায় বাতাস, কোথায় সে ফুল!
হে সুন্দরী, তেমনি কবে
এ-সব কথা ভুলব যবে
মনে রেখো আমায় তবে--
     ক্ষমা কোরো আমার সে ভুল।
                  চিত্তদুয়ার মুক্ত রেখে
                       সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,
                  আজকে আমি কোনোমতেই
                       বলব নাকো সত্য কথা।
আরো দেখুন
শাস্তি
Stories
দুখিরাম রুই এবং ছিদাম রুই দুই ভাই সকালে যখন দা হাতে লইয়া জন খাটিতে বাহির হইল তখন তাহাদের দুই স্ত্রীর মধ্যে বকাবকি চেঁচামেচি চলিতেছে। কিন্তু প্রকৃতির অন্যান্য নানাবিধ নিত্য কলরবের ন্যায় এই কলহ-কোলাহলও পাড়াসুদ্ধ লোকের অভ্যাস হইয়া গেছে। তীব্র কণ্ঠস্বর শুনিবামাত্র লোকে পরস্পরকে বলে--'ওই রে বাধিয়া গিয়াছে,' অর্থাৎ যেমনটি আশা করা যায় ঠিক তেমনিটি ঘটিয়াছে, আজও স্বভাবের নিয়মের কোনোরূপ ব্যত্যয় হয় নাই। প্রভাতে পূর্বদিকে সূর্য উঠিলে যেমন কেহ তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করে না, তেমনি এই কুরিদের বাড়িতে দুই জায়ের মধ্যে যখন একটা হৈ-হৈ পড়িয়া যায় তখন তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করে না, তেমনি এই কুরিদের বাড়িতে দুই জায়ের মধ্যে যখন একটা হৈ-হৈ পড়িয়া যায় তখন তাহার কারণ নির্ণয়ের জন্য কাহারও কোনোরূপ কৌতূহলের উদ্রেক হয় না।
অবশ্য এই কোন্দল আন্দোলন প্রতিবেশীদের অপেক্ষা দুই স্বামীকে বেশি স্পর্শ করিত সন্দেহ নাই, কিন্তু সেটা তাহারা কোনোরূপ অসুবিধার মধ্যে গণ্য করিত না। তাহারা দুই ভাই যেন দীর্ঘ সংসারপথ একটা এক্কাগাড়িতে করিয়া চলিয়াছে, দুই দিকের দুই স্প্রিংবিহীন চাকার অবিশ্রাম ছড়ছড় খড়খড় শব্দটাকে জীবনরথযাত্রার একটা বিধিবিহিত নিয়মের মধ্যেই ধরিয়া লইয়াছে।
আরো দেখুন
সিয়াম
Verses
বিদায়কালে
      কোন্‌ সে সুদূর মৈত্রী আপন প্রচ্ছন্ন অভিজ্ঞানে
                    আমার গোপন ধ্যানে
                       চিহ্নিত করেছে তব নাম,
                                হে সিয়াম,
      বহু পূর্বে যুগান্তরে মিলনের দিনে।
                 মুহূর্তে লয়েছি তাই চিনে
                       তোমারে আপন বলি,
             তাই আজ ভরিয়াছি ক্ষণিকের পথিক-অঞ্জলি
                   পুরাতন প্রণয়ের স্মরণের দানে,
           সপ্তাহ হয়েছে পূর্ণ শতাব্দীর শব্দহীন গানে।
                 চিরন্তন আত্মীয়জনারে
                    দেখিয়াছি বারে বারে
                       তোমার ভাষায়,
           তোমার ভক্তিতে, তব মুক্তির আশায়,
                 সুন্দরের তপস্যাতে
           যে অর্ঘ্য রচিলে তব সুনিপুণ হাতে
                 তাহারি শোভন রূপে --
           পূজার প্রদীপে তব, প্রজ্বলিত ধূপে।
                 আজি বিদায়ের ক্ষণে
           চাহিলাম স্নিগ্ধ তব উদার নয়নে,
                 দাঁড়ানু ক্ষণিক তব অঙ্গনের তলে,
                            পরাইনু গলে
                       বরমাল্য পূর্ণ অনুরাগে --
           অম্লান কুসুম যার ফুটেছিল বহুযুগ আগে।
আরো দেখুন
নীল আকাশের কোণে
Songs
নীল আকাশের কোণে কোণে ওই বুঝি আজ শিহর লাগে   আহা।
শাল-পিয়ালের বনে বনে কেমন যেন কাঁপন জাগে   আহা ॥
          সুদূরে কার পায়ের ধ্বনি   গণি গণি দিন-রজনী
              ধরণী তার চরণ মাগে   আহা ॥
দখিন-হাওয়া ক্ষণে ক্ষণে কেন ডাকিস "জাগো জাগো'।
ফিরিস মেতে শিরীষবনে, শোনাস কানে কোন্‌ কথা গো।
          শূন্যে তোমার ওগো প্রিয়   উত্তরীয় উড়ল কি ও
              রবির আলো রঙিন রাগে   আহা ॥
আরো দেখুন
প্রায়শ্চিত্ত
Stories
মণীন্দ্র ছেলেটির বয়স হবে চোদ্দ। তার বুদ্ধি খুব তীক্ষ্ণ কিন্তু পড়াশুনায় বিশেষ মনোযোগ নেই। তবু সে স্বভাবতই মেধাবী বলে বৎসরে বৎসরে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। কিন্তু অধ্যাপকেরা তার কাছে যতটা প্রত্যাশা করেন সে-অনুরূপ ফল হয় না। মণীন্দ্রের পিতা দিব্যেন্দু ছিলেন এই বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ। কর্তব্যে ছেলের শৈথিল্য দেখে তাঁর মন উদ্‌বিগ্ন ছিল।
অক্ষয় মণীন্দ্রের সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ে। সে বড়ো দরিদ্র। ছাত্রবৃত্তির 'পরেই তার নির্ভর। মা বিধবা। বহু কষ্টে অক্ষয়কে মানুষ করেছেন। তার পিতা প্রিয়নাথ যখন জীবিত ছিলেন তখন যথেষ্ট উপার্জন করতেন। লোকের কাছে তাঁর সম্মানও ছিল খুব বেশি। কিন্তু ব্যয় করতেও তিনি মুক্ত হস্ত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে দেখা গেল যত তাঁর ঋণ, সম্পত্তি তার অর্ধেকও নয়। অক্ষয়ের মা সাবিত্রী তাঁর যত কিছু অলংকার, গাড়ি ঘোড়া বাড়ি গৃহসজ্জা প্রভৃতি সমস্ত বিক্রয় করে ক্রমে ক্রমে স্বামীর ঋণ শোধ করেছেন।
আরো দেখুন