বিচারক
Stories
অনেক অবস্থান্তরের পর অবশেষে গতযৌবনা ক্ষীরোদা যে পুরুষের আশ্রয় প্রাপ্ত হইয়াছিল সেও যখন তাহাকে জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া গেল, তখন অন্নমুষ্টির জন্য দ্বিতীয় আশ্রয় অন্বেষণের চেষ্টা করিতে তাহার অত্যন্ত ধিক্‌কার বোধ হইল।
যৌবনের শেষে শুভ্র শরৎকালের ন্যায় একটি গভীর প্রশান্ত প্রগাঢ় সুন্দর বয়স আসে যখন জীবনের ফল ফলিবার এবং শস্য পাকিবার সময়। তখন আর উদ্দাম যৌবনের বসন্তচঞ্চলতা শোভা পায় না। ততদিনে সংসারের মাঝখানে আমাদের ঘর বাঁধা একপ্রকার সাঙ্গ হইয়া গিয়াছে; অনেক ভালোমন্দ, অনেক সুখদুঃখ, জীবনের মধ্যে পরিপাক প্রাপ্ত হইয়া অন্তরের মানুষটিকে পরিণত করিয়া তুলিয়াছে; আমাদের আয়ত্তের অতীত কুহকিনী দুরাশার কল্পনালোক হইতে সমস্ত উদ্‌ভ্রান্ত বাসনাকে প্রত্যাহরণ করিয়া আপন ক্ষুদ্র ক্ষমতার গৃহপ্রাচীরমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি; তখন নূতন প্রণয়ের মুগ্ধদৃষ্টি আর আকর্ষণ করা যায় না, কিন্তু পুরাতন লোকের কাছে মানুষ আরো প্রিয়তর হইয়া উঠে। তখন যৌবনলাবণ্য অল্পে অল্পে বিশীর্ণ হইয়া আসিতে থাকে, কিন্তু জরাবিহীন অন্তরপ্রকৃতি বহুকালের সহবাসক্রমে মুখে চক্ষে যেন স্ফুটতর রূপে অঙ্কিত হইয়া যায়, হাসিটি দৃষ্টিপাতটি কণ্ঠস্বরটি ভিতরকার মানুষটির দ্বারা ওতপ্রোত হইয়া উঠে। যাহা-কিছু পাই নাই তাহার আশা ছাড়িয়া, যাহারা ত্যাগ করিয়া গিয়াছে তাহাদের জন্য শোক সমাপ্ত করিয়া, যাহারা বঞ্চনা করিয়াছে তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া-- যাহারা কাছে আসিয়াছে, ভালোবাসিয়াছে, সংসারের সমস্ত ঝড়ঝঞ্ঝা শোকতাপ বিচ্ছেদের মধ্যে যে কয়টি প্রাণী নিকটে অবশিষ্ট রহিয়াছে তাহাদিগকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া সুনিশ্চিত সুপরীক্ষিত চিরপরিচিতগণের প্রীতিপরিবেষ্টনের মধ্যে নিরাপদ নীড় রচনা করিয়া তাহারই মধ্যে সমস্ত চেষ্টার অবসান এবং সমস্ত আকাঙক্ষার পরিতৃপ্তি লাভ করা যায়। যৌবনের সেই স্নিগ্ধ সায়াহ্নে জীবনের সেই শান্তিপর্বেও যাহাকে নূতন সঞ্চয়, নূতন পরিচয়, নূতন বন্ধনের বৃথা আশ্বাসে নূতন চেষ্টায় ধাবিত হইতে হয়-- তখনো যাহার বিশ্রামের জন্য শয্যা রচিত হয় নাই, যাহার গৃহপ্রত্যাবর্তনের জন্য সন্ধ্যাদীপ প্রজ্জ্বলিত হয় নাই, সংসারে তাহার মতো শোচনীয় আর কেহ নাই।
আরো দেখুন
১৩৫
Verses
১৩৫
দেবতা যে চায় পরিতে গলায়
         মানুষের গাঁথা মালা,
মাটির কোলেতে তাই রেখে যায়
         আপন ফুলের ডালা॥  
আরো দেখুন
অসম্ভব কথা
Stories
এক যে ছিল রাজা।
তখন ইহার বেশি কিছু জানিবার আবশ্যক ছিল না। কোথাকার রাজা, রাজার নাম কী, এ সকল প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া গল্পের প্রবাহ রোধ করিতাম না। রাজার নাম শিলাদিত্য কি শালিবাহন, কাশী কাঞ্চি কনোজ কোশল অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গের মধ্যে ঠিক কোন্‌খানটিতে তাঁহার রাজত্ব, এ সকল ইতিহাস-ভূগোলের তর্ক আমাদের কাছে নিতান্তই তুচ্ছ ছিল,-- আসল যে-কথাটি শুনিলে অন্তর পুলকিত হইয়া উঠিত এবং সমস্ত হৃদয় একমুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুদ্বেগে চুম্বকের মতো আকৃষ্ট হইত সেটি হইতেছে-- এক যে ছিল রাজা।
আরো দেখুন
ক্ষুধিত পাষাণ
Stories
আমি এবং আমার আত্মীয় পূজার ছুটিতে দেশভ্রমণ সারিয়া কলিকাতায় ফিরিয়া আসিতেছিলাম, এমন সময় রেলগাড়িতে বাবুটির সঙ্গে দেখা হয়। তাঁহার বেশভূষা দেখিয়া প্রথমটা তাঁহাকে পশ্চিমদেশীয় মুসলমান বলিয়া ভ্রম হইয়াছিল। তাঁহার কথাবার্তা শুনিয়া আরো ধাঁধা লাগিয়া যায়। পৃথিবীর সকল বিষয়েই এমন করিয়া আলাপ করিতে লাগিলেন, যেন তাঁহার সহিত প্রথম পরামর্শ করিয়া বিশ্ববিধাতা সকল কাজ করিয়া থাকেন। বিশ্বসংসারের ভিতরে ভিতরে যে এমন-সকল অশ্রুতপূর্ব নিগূঢ় ঘটনা ঘটিতেছিল, রুশিয়ানরা যে এতদূর অগ্রসর হইয়াছে, ইংরাজদের যে এমন-সকল গোপন মতলব আছে, দেশীয় রাজাদের মধ্যে যে একটা খিচুড়ি পাকিয়া উঠিয়াছে, এ-সমস্ত কিছুই না জানিয়া আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হইয়া ছিলাম। আমাদের নবপরিচিত আলাপটি ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন: There happen more things in heaven and earth, Horatio, than are reported in your newspapers।আমরা এই প্রথম ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়াছি, সুতরাং লোকটির রকমসকম দেখিয়া অবাক হইয়া গেলাম। লোকটা সামান্য উপলক্ষে কখনো বিজ্ঞান বলে, কখনো বেদের ব্যাখ্যা করে, আবার হঠাৎ কখনো পার্সি বয়েত আওড়াইতে থাকে। বিজ্ঞান বেদ এবং পার্সিভাষায় আমাদের কোনোরূপ অধিকার না থাকাতে তাঁহার প্রতি আমাদের ভক্তি উত্তরোত্তর বাড়িতে লাগিল। এমন-কি, আমার থিয়সফিস্ট্‌ আত্মীয়টির মনে দৃঢ় বিশ্বাস হইল যে, আমাদের এই সহযাত্রীর সহিত কোনো এক রকমের অলৌকিক ব্যাপারের কিছু-একটা যোগ আছে; কোনো একটা অর্পূব ম্যাগ্‌নেটিজ্‌ম্‌ অথবা দৈবশক্তি, অথবা সূক্ষ্ণ শরীর, অথবা ঐ ভাবের একটা-কিছু। তিনি এই অসামান্য লোকের সমস্ত সামান্য কথাও ভক্তিবিহ্বল মুগ্ধভাবে শুনিতেছিলেন এবং গোপনে নোট করিয়া লইতেছিলেন; আমার ভাবে বোধ হইল, অসামান্য ব্যক্তিটিও গোপনে তাহা বুঝিতে পারিয়াছিলেন এবং কিছু খুশি হইয়াছিলেন।
গাড়িটি আসিয়া জংশনে থামিলে আমরা দ্বিতীয় গাড়ির অপেক্ষায় ওয়েটিংরুমে সমবেত হইলাম। তখন রাত্রি সাড়ে দশটা। পথের মধ্যে একটা কী ব্যাঘাত হওয়াতে গাড়ি অনেক বিলম্বে আসিবে শুনিলাম। আমি ইতিমধ্যে টেবিলের উপর বিছানা পাতিয়া ঘুমাইব স্থির করিয়াছি, এমন সময়ে সেই অসামান্য ব্যক্তিটি নিম্নলিখিত গল্প ফাঁদিয়া বসিলেন। সে রাত্রে আমার আর ঘুম হইল না।
আরো দেখুন
রাজটিকা
Stories
নবেন্দুশেখরের সহিত অরুণলেখার যখন বিবাহ হইল, তখন হোমধূমের অন্তরাল হইতে ভগবান প্রজাপতি ঈষৎ একটু হাস্য করিলেন। হায়, প্রজাপতির পক্ষে যাহা খেলা আমাদের পক্ষে তাহা সকল সময়ে কৌতুকের নহে।
নবেন্দুশেখরের পিতা পূর্ণেন্দুশেখর ইংরাজরাজ-সরকারে বিখ্যাত। তিনি এই ভবসমুদ্রে কেবলমাত্র দ্রুতবেগে সেলাম-চালনা দ্বারা রায়বাহাদুর পদবীর উৎতুঙ্গ মরুকূলে উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন; আরো দুর্গমতর সম্মানপথের পাথেয় তাঁহার ছিল, কিন্তু পঞ্চান্ন বৎসর বয়ঃক্রমকালে অনতিদূরবর্তী রাজখেতাবের কুহেলিকাচ্ছন্ন গিরিচূড়ার প্রতি করুণ লোলুপ দৃষ্টি স্থিরনিবদ্ধ করিয়া এই রাজানুগৃহীত ব্যাক্তি অকস্মাৎ খেতাববর্জিত লোকে গমন করিলেন এবং তাঁহার বহু-সেলাম-শিথিল গ্রীবাগ্রন্থি শ্মশানশয্যায় বিশ্রাম লাভ করিল।
আরো দেখুন
উলুখড়ের বিপদ
Stories
বাবুদের নায়েব গিরিশ বসুর অন্তঃপুরে প্যারী বলিয়া একটি নূতন দাসী নিযুক্ত হইয়াছিল। তাহার বয়স অল্প; চরিত্র ভালো। দূর বিদেশ হইতে আসিয়া কিছুদিন  কাজ করার পরেই একদিন সে বৃদ্ধ নায়েবের অনুরাগদৃষ্টি হইতে আত্মরক্ষার জন্য গৃহিণীর নিকট কাঁদিয়া গিয়া পড়িল। গৃহিণী কহিলেন, "বাছা, তুমি অন্য কোথাও যাও; তুমি ভালোমানুষের মেয়ে, এখানে থাকিলে তোমার সুবিধা হইবে না।" বলিয়া গোপনে কিছু অর্থ দিয়া বিদায় করিয়া দিলেন।
কিন্তু পালানো সহজ ব্যাপার নহে, হাতে পথ-খরচও সামান্য, সেইজন্য প্যারী গ্রামে হরিহর ভট্টাচার্য মহাশয়ের নিকটে গিয়া আশ্রয় লইল। বিবেচক ছেলেরা কহিল, "বাবা, কেন বিপদ ঘরে আনিতেছেন।" হরিহর কহিলেন, "বিপদ স্বয়ং আসিয়া আশ্রয় প্রার্থনা করিলে তাহাকে ফিরাইতে পারি না।"
গিরিশ বসু সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া কহিল, "ভট্টাচার্যমহাশয়, আপনি আমার ঝি ভাঙাইয়া আনিলেন কেন। ঘরে কাজের ভারি অসুবিধা হইতেছে।" ইহার উত্তরে হরিহর    দু-চারটে সত্য কথা খুব শক্ত করিয়াই বলিলেন। তিনি মানী লোক ছিলেন, কাহারো খাতিরে কোনো কথা ঘুরাইয়া বলিতে জানিতেন না। নায়েব মনে মনে উদ্‌গতপক্ষ পিপীলিকার সহিত তাঁহার তুলনা করিয়া চলিয়া গেল। যাইবার সময় খুব ঘটা করিয়া পায়ের ধুলা লইল। দুই-চারি দিনের মধ্যেই ভট্টাচার্যের বাড়িতে পুলিসের সমাগম হইল। গৃহিণীঠাকুরানীর বালিশের নীচে হইতে নায়েবের স্ত্রীর একজোড়া ইয়ারিং বাহির হইল। ঝি প্যারী চোর সাব্যস্ত হইয়া জেলে গেল। ভট্টাচার্যমহাশয় দেশবিখ্যাত প্রতিপত্তির জোরে চোরাই-মাল রক্ষার অভিযোগ হইতে নিষ্কৃতি পাইলেন। নায়েব পুনশ্চ ব্রাহ্মণের পদধূলি লইয়া গেল। ব্রাহ্মণ বুঝিলেন, হতভাগিনীকে তিনি আশ্রয় দেওয়াতেই প্যারীর সর্বনাশ ঘটিল। তাঁহার মনে শেল বিঁধিয়া রহিল। ছেলেরা কহিল, "জমিজমা বেচিয়া কলিকাতায় যাওয়া যাক, এখানে বড়ো মুশকিল দেখিতেছি।" হরিহর কহিলেন, "পৈতৃক ভিটা ছাড়িতে পারিব না, অদৃষ্টে থাকিলে বিপদ কোথায় না ঘটে।"ইতিমধ্যে নায়েব গ্রামে অতিমাত্রায় খাজনা বৃদ্ধির চেষ্টা করায় প্রজারা বিদ্রোহী হইল। হরিহরের সমস্ত ব্রহ্মোত্তর জমা, জমিদারের সঙ্গে কোনো সম্বন্ধ নাই। নায়েব তাহার প্রভুকে জানাইল, হরিহরই প্রজাদিগকে প্রশ্রয় দিয়া বিদ্রোহী করিয়া তুলিয়াছে। জমিদার কহিলেন, "যেমন করিয়া পার ভট্টাচার্যকে শাসন করো।" নায়েব ভট্টাচার্যের পদধূলি লইয়া কহিল,  "সামনের ঐ জমিটা পরগনার ভিটার মধ্যে পড়িতেছে; ওটা তো ছাড়িয়া দিতে হয়।" হরিহর কহিলেন, "সে কী কথা। ও যে আমার বহুকালের ব্রহ্মত্র।" হরিহরের গৃহপ্রাঙ্গণের সংলগ্ন পৈতৃক জমি জমিদারের পরগনার অন্তর্গত বলিয়া নালিশ রুজু হইল। হরিহর বলিলেন,"এ জমিটা তো তবে ছাড়িয়া দিতে হয়, আমি তো  বৃদ্ধ বয়সে আদালতে সাক্ষী দিতে পারিব না।" ছেলেরা বলিল, "বাড়ির সংলগ্ন জমিটাই যদি ছাড়িয়া দিতে হয় তবে ভিটায় টিঁকিব কী করিয়া।"
প্রাণাধিক পৈতৃক ভিটার মায়ায় বৃদ্ধ কম্পিতপদে আদালতের সাক্ষ্যমঞ্চে গিয়া দাঁড়াইলেন। মুন্সেফ নবগোপালবাবু তাঁহার সাক্ষ্যই প্রামাণ্য করিয়া মকদ্দমা ডিস্‌মিস্‌ করিয়া দিলেন। ভট্টাচার্যের খাস প্রজারা ইহা লইয়া গ্রামে ভারি উৎসবসমারোহ আরম্ভ করিয়া দিল। হরিহর তাড়াতাড়ি তাহাদিগকে থামাইয়া দিলেন। নায়েব আসিয়া পরম আড়ম্বরে ভট্টাচার্যের পদধূলি লইয়া গায়ে মাথায় মাখিল এবং আপিল রুজু করিল। উকিলরা হরিহরের নিকট হইতে টাকা লন না। তাঁহারা ব্রাহ্মণকে বারম্বার আশ্বাস দিলেন, এ মকদ্দমায় হারিবার কোনো সম্ভাবনা নাই। দিন কি কখনো রাত হইতে পারে। শুনিয়া হরিহর নিশ্চিন্ত হইয়া ঘরে বসিয়া রহিলেন।
একদিন জমিদারি কাছারিতে ঢাকঢোল বাজিয়া উঠিল, পাঁঠা কাটিয়া নায়েবের বাসায় কালীপূজা হইবে। ব্যাপারখানা কী। ভট্টাচার্য খবর পাইলেন, আপিলে তাঁহার হার হইয়াছে।
ভট্টাচার্য মাথা চাপড়াইয়া উকিলকে জিজ্ঞাসা করিলেন, বসন্তবাবু, করিলেন কী। আমার কী দশা হইবে।"
দিন যে কেমন করিয়া রাত হইল, বসন্তবাবু তাহার নিগূঢ় বৃত্তান্ত বলিলেন, "সম্প্রতি যিনি নূতন অ৻াডিশনাল জজ হইয়া আসিয়াছেন তিনি মুন্সেফ থাকা কালে মুন্সেফ নবগোপালবাবুর সহিত তাঁহার ভারি খিটিমিটি বাধিয়াছিল। তখন কিছু করিয়া উঠিতে পারেন নাই; আজ জজের আসনে বসিয়া নবগোপালবাবুর রায় পাইবামাত্র উলটাইয়া দিতেছেন; আপনি হারিলেন সেইজন্য।"  ব্যাকুল হরিহর কহিলেন, "হাইকোর্টে ইহার কোনো আপিল নাই?" বসন্ত কহিলেন, জজবাবু আপিলেফল পাইবার সম্ভাবনা মাত্র রাখেন নাই। তিনি আপনাদের সাক্ষীকে সন্দেহ করিয়া বিরুদ্ধ পক্ষের সাক্ষীকেই বিশ্বাস করিয়া গিয়াছেন। হাইকোর্টে তো সাক্ষীর বিচার হইবে না।"
বৃদ্ধ সাশ্রুনেত্রে কহিলেন, "তবে আমার উপায়?"
উকিল কহিলেন, "উপায় কিছুই দেখি না।"
গিরিশ বসু পরদিন লোকজন সঙ্গে লইয়া ঘটা করিয়া ব্রাহ্মণের পদধূলি লইয়া গেল এবং বিদায়কালে উচ্ছ্বসিত দীর্ঘনিশ্বাসে কহিল, "প্রভু, তোমারই ইচ্ছা।"
আরো দেখুন
মুক্তি
Stories
বিরহিণী তার ফুলবাগানের এক ধারে বেদী সাজিয়ে তার উপর মূর্তি গড়তে বসল। তার মনের মধ্যে যে মানুষটি ছিল বাইরে তারই প্রতিরূপ প্রতিদিন একটু একটু করে গড়ে, আর চেয়ে চেয়ে দেখে, আর ভাবে, আর চোখ দিয়ে জল পড়ে।
কিন্তু, যে রূপটি একদিন তার চিত্তপটে স্পষ্ট ছিল তার উপরে ক্রমে যেন ছায়া পড়ে আসছে। রাতের বেলাকার পদ্মের মতো স্মৃতির পাপড়িগুলি অল্প অল্প করে যেন মুদে এল।
আরো দেখুন
খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন
Stories
রাইচরণ যখন বাবুদের বাড়ি প্রথম চাকরি করিতে আসে তখন তাহার বয়স বারো। যশোহর জিলায় বাড়ি, লম্বা চুল, বড়ো বড়ো চোখ, শ্যামচিক্কণ ছিপ্‌ছিপে বালক। জাতিতে কায়স্থ। তাহার প্রভুরাও কায়স্থ। বাবুদের এক-বৎসর-বয়স্ক একটি শিশুর রক্ষণ ও পালন-কার্যে সহায়তা করা তাহার প্রধান কর্তব্য ছিল।
সেই শিশুটি কালক্রমে রাইচরণের কক্ষ ছাড়িয়া স্কুলে, স্কুল ছাড়িয়া কলেজে, অবশেষে কলেজ ছাড়িয়া মুন্‌সেফিতে প্রবেশ করিয়াছে। রাইচরণ এখনো তাঁহার ভৃত্য।
আরো দেখুন
শেষের কবিতা
Novels
অমিত রায় ব্যারিস্টার। ইংরেজি ছাঁদে রায় পদবী "রয়" ও "রে" রূপান্তর যখন ধারণ করলে তখন তার শ্রী গেল ঘুচে কিন্তু সংখ্যা হল বৃদ্ধি। এই কারণে, নামের অসামান্যতা কামনা করে অমিত এমন একটি বানান বানালে যাতে ইংরেজ বন্ধু ও বন্ধুনীদের মুখে তার উচ্চারণ দাঁড়িয়ে গেল-- অমিট রায়ে।
অমিতর বাপ ছিলেন দিগ্‌বিজয়ী ব্যারিস্টার। যে পরিমাণ টাকা তিনি জমিয়ে গেছেন সেটা অধস্তন তিন পুরুষকে অধঃপাতে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু পৈতৃক সম্পত্তির সাংঘাতিক সংঘাতেও অমিত বিনা বিপত্তিতে এ যাত্রা টিঁকে গেল।
                         আনিলাম
               অপরিচিতের নাম
                                   ধরণীতে,
               পরিচিত জনতার সরণীতে।
                                   আমি আগন্তুক,
               আমি জনগণেশের প্রচণ্ড কৌতুক।
                                   খোলো দ্বার,
               বার্তা আনিয়াছি বিধাতার।
                         মহাকালেশ্বর
               পাঠায়েছে দুর্লক্ষ্য অক্ষর,
                         বল্‌ দুঃসাহসী কে কে
                         মৃত্যু পণ রেখে
               দিবি তার দুরূহ উত্তর।
               শুনিবে না।
                         মূঢ়তার সেনা
                                   করে পথরোধ।
                             ব্যর্থ ক্রোধ
                         হুংকারিয়া পড়ে বুকে,
                                   তরঙ্গের নিষ্ফলতা
                                            নিত্য যথা
                                   মরে মাথা ঠুকে
                                   শৈলতট-'পরে
                                            আত্মঘাতী দম্ভভরে।
                         পুষ্পমাল্য নাহি মোর, রিক্ত বক্ষতল,
                                   নাহি বর্ম অঙ্গদ কুণ্ডল।
                         শূন্য এ ললাটপট্টে লিখা।
                                   গূঢ় জয়টিকা।
                         ছিন্ন কন্থা দরিদ্রের বেশ।
                                   করিব নিঃশেষ
                                            তোমার ভাণ্ডার।
                                   খোলো খোলো দ্বার।
                                                অকস্মাৎ
                                   বাড়ায়েছি হাত,
                                            যা দিবার দাও অচিরাৎ।
                                  বক্ষ তব কেঁপে উঠে, কম্পিত অর্গল,
                                            পৃথ্বী টলমল।
                         ভয়ে আর্ত উঠিছে চীৎকারি
                                   দিগন্ত বিদারি,
                                            "ফিরে যা এখনি,
                                   রে দুর্দান্ত দুরন্ত ভিখারি,
                                            তোর কণ্ঠধ্বনি
                                   ঘুরি ঘুরি
                         নিশীথনিদ্রার বক্ষে হানে তীব্র ছুরি।"
                                   অস্ত্র আনো।
                         ঝঞ্ঝনিয়া আমার পঞ্জরে হানো।
                                   মৃত্যুরে মারুক মৃত্যু, অক্ষয় এ প্রাণ
                                            করি যাব দান।
                                          শৃঙ্খল জড়াও তবে,
                                   বাঁধো মোরে, খণ্ড খণ্ড হবে,
                                          মুহূর্তে চকিতে,
                                   মুক্তি তব আমারি মুক্তিতে।
                                            শাস্ত্র আনো।
                                        হানো মোরে, হানো।
                                            পণ্ডিতে পণ্ডিতে
                         ঊর্ধ্বস্বরে চাহিব খণ্ডিতে
                                            দিব্য বাণী।
                                            জানি জানি
                                            তর্কবাণ
                                   হয়ে যাবে খান খান।
                         মুক্ত হবে জীর্ণ বাক্যে আচ্ছন্ন দু চোখ--
                                   হেরিবে আলোক।
                                            অগ্নি জ্বালো।
                         আজিকার যাহা ভালো
                                   কল্য যদি হয় তাহা কালো,
                                    যদি তাহা ভস্ম হয়
                                           বিশ্বময়,
                                   ভস্ম হোক।
                                 দূর করো শোক।
                               মোর অগ্নিপরীক্ষায়
                         ধন্য হোক বিশ্বলোক অপূর্ব দীক্ষায়।
                                   আমার দুর্বোধ বাণী
                                 বিরুদ্ধ বুদ্ধির 'পরে মুষ্টি হানি
                                   করিবে তাহারে উচ্চকিত,
                                            আতঙ্কিত।
                                   উন্মাদ আমার ছন্দ
                                             দিবে ধন্দ
                                   শান্তিলুব্ধ মুমুক্ষুরে,
                                   ভিক্ষাজীর্ণ বুভুক্ষুরে।
                                      শিরে হস্ত হেনে
                                   একে একে নিবে মেনে
                                            ক্রোধে ক্ষোভে ভয়ে
                                                      লোকালয়ে
                                            অপরিচিতের জয়,
                                            অপরিচিতের পরিচয়--
                                                যে অপরিচিত
                                বৈশাখের রুদ্র ঝড়ে বসুন্ধরা করে আন্দোলিত,
                                              হানি বজ্রমুঠি
                                            মেঘের কার্পণ্য টুটি
                                            সংগোপন বর্ষণসঞ্চয়
                                   ছিন্ন ক'রে মুক্ত করে সর্বজগন্ময়॥
               পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি,
               আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী।
                         রঙিন নিমেষ ধুলার দুলাল
                         পরানে ছড়ায় আবীর গুলাল,
                                   ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে
                                       দিগঙ্গনার নৃত্য;
                         হঠাৎ-আলোর ঝলকানি লেগে
                                ঝলমল করে চিত্ত।
               নাই আমাদের কনক-চাঁপার কুঞ্জ,
               বনবীথিকায় কীর্ণ বকুলপুঞ্জ।
                         হঠাৎ কখন সন্ধেবেলায়
                         নামহারা ফুল গন্ধ এলায়,
                         প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে
                                   অরুণ মেঘেরে তুচ্ছ
                   উদ্ধত যত শাখার শিখরে
                         রডোডেনড্রনগুচ্ছ।
               নাই আমাদের সঞ্চিত ধনরত্ন,
               নাই রে ঘরের লালন ললিত যত্ন।
                         পথপাশে পাখি পুচ্ছ নাচায়,
                         বন্ধন তারে করি না খাঁচায়,
                                   ডানা-মেলে-দেওয়া মুক্তিপ্রিয়ের
                                           কূজনে দুজনে তৃপ্ত।
                             আমরা চকিত অভাবনীয়ের
                                   ক্কচিৎ-কিরণে দীপ্ত।
"For Gods sake, hold your tongue
        and let me love! "
                         দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর্‌।
                         ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।"
               রে অচেনা, মোর মুষ্টি ছাড়াবি কী করে,
                         যতক্ষণ চিনি নাই তোরে?
                                   কোন্‌ অন্ধক্ষণে
                                বিজড়িত তন্দ্রা-জাগরণে
                           রাত্রি যবে সবে হয় ভোর,
                                   মুখ দেখিলাম তোর।
               চক্ষু'পরে চক্ষু রাখি শুধালেম, কোথা সংগোপনে
                           আছ আত্মবিস্মৃতির কোণে।
                                   তোর সাথে চেনা
                                   সহজে হবে না--
                              কানে কানে মৃদুকণ্ঠে নয়।
                                   করে নেব জয়
                              সংশয়কুণ্ঠিত তোর বাণী--
                                   দৃপ্ত বলে লব টানি
                              শঙ্কা হতে, লজ্জা হতে, দ্বিধা দ্বন্দ্ব হতে
                                   নির্দয় আলোতে।
                              জাগিয়া উঠিবি অশ্রুধারে,
                              মুহূর্তে চিনিবি আপনারে,
                                   ছিন্ন হবে ডোর--
                               তোর মুক্তি দিয়ে তবে মুক্তি হবে মোর।
                                   "হে অচেনা,
                             দিন যায়, সন্ধ্যা হয়, সময় রবে না,
                                   তীব্র আকস্মিক
                                বাধা বন্ধ ছিন্ন করি দিক,
                         তোমারে চেনার অগ্নি দীপ্তশিখা উঠুক উজ্জ্বলি,
                                  দিব তাহে জীবন অঞ্জলি।"
                         হে মোর বন্যা, তুমি অনন্যা,
                         আপন স্বরূপে আপনি ধন্যা।"
"For Gods sake, hold your tongue
        and let me love! "
                         "ঝরনা, তোমার স্ফটিক জলের
                                   স্বচ্ছ ধারা--
                         তাহারি মাঝারে দেখে আপনারে
                                   সূর্য তারা।
               "আজি মাঝে মাঝে আমার ছায়ারে
               দুলায়ে খেলায়ো তারি এক ধারে,
               সে ছায়ারি সাথে হাসিয়া মিলায়ো
                         কলধ্বনি--
               দিয়ো তারে বাণী যে বাণী তোমার
                         চিরন্তনী।
               "আমার ছায়াতে তোমার হাসিতে
                         মিলিত ছবি,
               তাই নিয়ে আজি পরানে আমার
                         মেতেছে কবি।
               পদে পদে তব আলোর ঝলকে
               ভাষা আনে প্রাণে পলকে পলকে,
               মোর বাণীরূপ দেখিলাম আজি,
                         নির্ঝরিণী।
               তোমার প্রবাহে মনেরে জাগায়,
                         নিজেরে চিনি।"
                         পূর্ণপ্রাণে চাবার যাহা
                         রিক্ত হাতে চাস নে তারে;
                         সিক্ত চোখে যাস নে দ্বারে।
                         রত্নমালা আনবি যবে
                         মাল্যবদল তখন হবে,
                         পাতবি কি তোর দেবীর আসন
                         শূন্য ধুলায় পথের ধারে।
                         পুষ্প-উদার চৈত্রবনে
                         বক্ষে ধরিস নিত্যধনে
                         লক্ষ শিখায় জ্বলবে যখন
                         দীপ্ত প্রদীপ অন্ধকারে।
For we are bound where mariner has not yet dared to go,
And we will risk the ship, ourselves and all।
            আমরা যাব যেখানে কোনো
                যায় নি নেয়ে সাহস করি,
            ডুবি যদি তো ডুবি-না কেন--
                ডুবুক সবই, ডুবুক তরী।
                        O, what is this?
               Mysterious and uncapturable bliss
               That I have known, yet seems to be
               Simple as breath and easy as a smile,
                      And older than the earth।
                  একি রহস্য, একি আনন্দরাশি!
               জেনেছি তাহারে, পাই নি তবুও পেয়ে।
                    তবু সে সহজে প্রাণে উঠে নিশ্বাসি,
                    তবু সে সরল যেন রে সরল হাসি,
                         পুরানো সে যেন এই ধরণীর চেয়ে।
                    বিদ্যাপতি কহে, কৈসে গোঙায়বি
                        হরি বিনে দিন রাতিয়া।
                         চলি যবে গেলা যমপুরে
                         অকালে!
           "Blow gently over my garden
                     Wind of the southern sea
           In the hour my love cometh
                     And calleth me।
           চুমিয়া যেও তুমি
           আমার বনভূমি
                 দখিন-সাগরের সমীরণ,
           যে শুভখনে মম
           আসিবে প্রিয়তম,
                 ডাকিবে নাম ধরে অকারণ।"
         "মিতা, ত্বমসি মম জীবনং, ত্বমসি মম ভূষণং,
                   ত্বমসি মম ভবজলধিরত্নম্‌।"
               ছাদের উপরে বহিয়ো নীরবে
               ওগো দক্ষিণ-হাওয়া
               প্রেয়সীর সাথে যে নিমেষে হবে
               চারি চক্ষুতে চাওয়া।
                 "তোমারে দিই নি সুখ, মুক্তির নৈবেদ্য গেনু রাখি
                 রজনীর শুভ্র অবসানে। কিছু আর নাই বাকি,
                 নাইকো প্রার্থনা, নাই প্রতি মুহূর্তের দৈন্যরাশি,
                 নাই অভিমান, নাই দীন কান্না, নাই গর্ব-হাসি,
                 নাই পিছু ফিরে দেখা। শুধু সে মুক্তির ডালিখানি
                 ভরিয়া দিলাম আজি আমার মহৎ মৃত্যু আনি।"
                 সুন্দর, তুমি চক্ষু ভরিয়া
                           এনেছ  অশ্রুজল।
                 এনেছ তোমার বক্ষে ধরিয়া
                          দুঃসহ হোমানল।
                 দুঃখ যে তার উজ্জ্বল হয়ে উঠে,
                 মুগ্ধ প্রাণের আবেশ-বন্ধ টুটে।
                 এ তাপে শ্বসিয়া উঠে বিকশিয়া
                            বিচ্ছেদশতদল।"
                 "সুন্দরী তুমি শুকতারা
                       সুদূর শৈলশিখরান্তে,
                 শর্বরী যবে হবে সারা
                       দর্শন দিয়ো দিক্‌ভ্রান্তে।
                     ধরা যেথা অম্বরে মেশে
                          আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র।
                     আঁধারের বক্ষের 'পরে
                          আধেক আলোক-রেখা-রন্ধ্র।
                     আমার আসন রাখে পেতে
                          নিদ্রাগহন মহাশূন্য।
                     তন্ত্রী বাজাই স্বপনেতে
                          তন্দ্রা ঈষৎ করি ক্ষুণ্ণ।
                     মন্দচরণে চলি পারে,
                          যাত্রা হয়েছে মোর সাঙ্গ।
                     সুর থেমে আসে বারে বারে,
                          ক্লান্তিতে আমি অবশাঙ্গ।
                     সুন্দরী ওগো শুকতারা,
                          রাত্রি না যেতে এসো তূর্ণ
                     স্বপ্নে যে বাণী হল হারা
                          জাগরণে করো তারে পূর্ণ।
                     নিশীথের তল হতে তুলি
                          লহো তারে প্রভাতের জন্য।
                     আঁধারে নিজেরে ছিল ভুলি,
                          আলোকে তাহারে করো ধন্য।
                     যেখানে সুপ্তি হল লীনা,
                          যেথা বিশ্বের মহামন্দ্র,
                     অর্পিনু সেথা মোর বীণা
                          আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র।
                     "কত ধৈর্য ধরি
                 ছিলে কাছে দিবসশর্বরী।
                     তব পদ-অঙ্কনগুলিরে
                 কতবার দিয়ে গেছ মোর ভাগ্যপথের ধূলিরে।
                       আজ যবে
                 দূরে যেতে হবে
                     তোমারে করিয়া যাব দান
                       তব জয়গান।
                 কতবার ব্যর্থ আয়োজনে
                     এ জীবনে
                 হোমাগ্নি উঠে নি জ্বলি,
                     শূন্যে গেছে চলি
                 হতাশ্বাস ধূমের কুণ্ডলী।
                 কতবার ক্ষণিকের শিখা
                       আঁকিয়াছে ক্ষীণ টিকা
                     নিশ্চেতন নিশীথের ভালে।
                 লুপ্ত হয়ে গেছে তাহা চিহ্নহীন কালে।
                     এবার তোমার আগমন
                          হোমহুতাশন
                              জ্বেলেছে গৌরবে।
                          যজ্ঞ মোর ধন্য হবে।
                     আমার আহুতি দিনশেষে
                 করিলাম সমর্পণ তোমার উদ্দেশে।
                          লহো এ প্রণাম
                     জীবনের পূর্ণপরিণাম।
                              এ প্রণতি'পরে
                          স্পর্শ রাখো স্নেহভরে,
                     তোমার ঐশ্বর্য-মাঝে
                       সিংহাসন যেথায় বিরাজে
                          করিয়ো আহ্বান,
                       সেথা এ প্রণতি মোর পায় যেন স্থান।"
       তোমারে ছাড়িয়া যেতে হবে
          রাত্রি যবে
     উঠিবে উন্মনা হয়ে প্রভাতের রথচক্ররবে।
          হায় রে বাসরঘর,
    বিরাট বাহির সে যে বিচ্ছেদের দস্যু ভয়ংকর।
        তবু সে যতই ভাঙে-চোরে,
     মালাবদলের হার যত দেয় ছিন্ন ছিন্ন করে,
         তুমি আছ ক্ষয়হীন
           অনুদিন;
          তোমার উৎসব
      বিচ্ছিন্ন না হয় কভু, না হয় নীরব।
      কে বলে তোমারে ছেড়ে গিয়েছে যুগল
         শূন্য করি তব শয্যাতল।
         যায় নাই, যায় নাই,
     নব নব যাত্রী-মাঝে ফিরে ফিরে আসিছে তারাই
          তোমার আহ্বানে
        উদার তোমার দ্বার-পানে।
           হে বাসরঘর,
       বিশ্বে প্রেম মৃত্যুহীন, তুমিও অমর।
              Tender is the night
And haply the queen moon is on her throne।
           তব অন্তর্ধানপটে হেরি তব রূপ চিরন্তন।
           অন্তরে অলক্ষ্যলোকে তোমার অন্তিম আগমন।
               লভিয়াছি চিরস্পর্শমণি;
           আমার শূন্যতা তুমি পূর্ণ করি গিয়েছ আপনি।
           জীবন আঁধার হল, সেই ক্ষণে পাইনু সন্ধান
           সন্ধ্যার দেউলদীপ চিত্তের মন্দিরে তব দান।
               বিচ্ছেদের হোমবহ্নি হতে
           পূজামূর্তি ধরি প্রেম দেখা দিল দুঃখের আলোতে।
                                                            মিতা।
      কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
             তারি রথ নিত্যই উধাও
         জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
      চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন।
                 ওগো বন্ধু,
             সেই ধাবমান কাল
      জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেরি তার জাল--
             তুলে নিল দ্রুতরথে
      দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
         তোমা হতে বহু দূরে।
             মনে হয়, অজস্র মৃত্যুরে
         পার হয়ে আসিলাম
      আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়--
         রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
             আমার পুরানো নাম।
         ফিরিবার পথ নাহি;
             দূর হতে যদি দেখ চাহি
                 পারিবে না চিনিতে আমায়।
                         হে বন্ধু, বিদায়।
      কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে
             বসন্তবাতাসে
      অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
             ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
      সেই ক্ষণে খুঁজে দেখো--কিছু মোর পিছে রহিল সে
             তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতিপ্রদোষে
                 হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
      হয়তো ধরিবে কভু নাম-হারা স্বপ্নের মুরতি।
                 তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
      সব-চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
                 সে আমার প্রেম।
         তারে আমি রাখিয়া এলেম
      অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।
         পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
             কালের যাত্রায়।
                 হে বন্ধু, বিদায়।
                  তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি
   মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃতমুরতি
           যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
             হোক তব সন্ধ্যাবেলা,
                 পূজার সে খেলা
      ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে;
             তৃষার্ত আবেগ-বেগে
      ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।
             তোমার মানস-ভোজে সযত্নে সাজালে
      যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
             তার সাথে দিব না মিশায়ে
      যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
             আজো তুমি নিজে
             হয়তো-বা করিবে রচন
      মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন।
      ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
             হে বন্ধু, বিদায়।
             মোর লাগি করিয়ো না শোক,
      আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
             মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই--
      শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
      উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
             সেই ধন্য করিবে আমাকে।
             শুক্লপক্ষ হতে আনি
             রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
                      যে পারে সাজাতে
             অর্ঘ্যথালা  কৃষ্ণপক্ষ রাতে,
             যে আমারে দেখিবারে পায়
                 অসীম ক্ষমায়
             ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি,
      এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
                 তোমারে যা দিয়েছিনু তার
                 পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
                 হেথা মোর তিলে তিলে দান,
      করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান
             হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।
                 ওগো তুমি নিরুপম,
                       হে ঐশ্বর্যবান,
             তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান--
                 গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
                       হে বন্ধু, বিদায়।
                                          বন্যা
আরো দেখুন
রাজপুত্তুর
Stories
রাজপুত্তুর চলেছে নিজের রাজ্য ছেড়ে, সাত রাজার রাজ্য পেরিয়ে, যে দেশে কোনো রাজার রাজ্য নেই সেই দেশে।
সে হল যে কালের কথা সে কালের আরম্ভও নেই, শেষও নেই।
আরো দেখুন