পরিশিষ্ট
Stories
(ছোটো গল্প)
সাহিত্যে বড়ো গল্প ব'লে যে-সব প্রগল্‌ভ বাণীবাহন দেখা যায় তারা প্রাক্‌ভূতাত্ত্বিক যুগের প্রাণীদের মতো-- তাদের প্রাণের পরিমাণ যত দেহের পরিমাণ তার চার গুণ, তাদের লেজটা কলেবরের অত্যুক্তি।
আরো দেখুন
পোস্টমাস্টার
Stories
প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্টমাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্টআপিস স্থাপন করাইয়াছে।
আমাদের পোস্টমাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যে-রকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্টমাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহার ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে।
আরো দেখুন
সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে
Songs
          সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে,   শোনো শোনো পিতা।
          কহো কানে কানে, শুনাও প্রাণে প্রাণে   মঙ্গলবারতা।।
          ক্ষুদ্র আশা নিয়ে রয়েছে বাঁচিয়ে,  সদাই ভাবনা।
          যা-কিছু পায় হারায়ে যায়,   না মানে সান্ত্বনা।।
          সুখ-আশে দিশে দিশে  বেড়ায় কাতরে–
          মরীচিকা ধরিতে চায়   এ মরুপ্রান্তরে।। 
          ফুরায় বেলা, ফুরায় খেলা,   সন্ধ্যা হয়ে আসে–
          কাঁদে তখন আকুল-মন,  কাঁপে তরাসে।।
          কী হবে গতি, বিশ্বপতি,   শান্তি কোথা আছে–
          তোমারে দাও, আশা পূরাও,   তুমি এসো কাছে।।
আরো দেখুন
তপস্বিনী
Stories
বৈশাখ প্রায় শেষ হইয়া আসিল। প্রথমরাত্রে গুমট গেছে, বাঁশগাছের পাতাটা পর্যন্ত নড়ে না, আকাশের তারাগুলো যেন মাথা-ধরার বেদনার মতো দব্‌ দব্‌ করিতেছে। রাত্রি তিনটের সময় ঝির্‌ঝির্‌ করিয়া একটুখানি বাতাস উঠিল। ষোড়শী শূন্য মেঝের উপর খোলা জানলার নীচে শুইয়া আছে, একটা কাপড়ে-মোড়া টিনের বাক্স তার মাথার বালিশ। বেশ বোঝা যায়, খুব উৎসাহের সঙ্গে সে কৃচ্ছসাধন করিতেছে।
প্রতিদিন ভোর চারটের সময় উঠিয়া স্নান সারিয়া ষোড়শী ঠাকুরঘরে গিয়া বসে। আহ্নিক করিতে বেলা হইয়া যায়। তার পরে বিদ্যারত্নমশায় আসেন; সেই ঘরে বসিয়াই তাঁর কাছে সে গীতা পড়ে। সংস্কৃত সে কিছু কিছু শিখিয়াছে। শঙ্করের বেদান্তভাষ্য এবং পাতঞ্জলদর্শন মূল গ্রন্থ হইতে পড়িবে, এই তার পণ। বয়স তার তেইশ হইবে।
আরো দেখুন
প্রতিবেশিনী
Stories
আমার প্রতিবেশিনী বালবিধবা। যেন শরতের শিশিরাশ্রুপ্লুত শেফালির মতো বৃন্তচ্যুত; কোনো বাসরগৃহের ফুলশয্যার জন্য সে নহে, সে কেবল দেবপূজার জন্যই উৎসর্গ-করা।
তাহাকে আমি মনে মনে পূজা করিতাম। তাহার প্রতি আমার মনের ভাবটা যে কী ছিল পূজা ছাড়া তাহা অন্য কোনো সহজ ভাষায় প্রকাশ করিতে ইচ্ছা করি না -- পরের কাছে তো নয়ই, নিজের কাছেও না।
আরো দেখুন
তারাপ্রসন্নের কীর্তি
Stories
লেখকজাতির প্রকৃতি অনুসারে তারাপ্রসন্ন কিছু লাজুক এবং মুখচোরা ছিলেন। লোকের কাছে বাহির হইতে গেলে তাঁহার সর্বনাশ উপস্থিত হইত। ঘরে বসিয়া কলম চালাইয়া তাঁহার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ, পিঠ একটু কুঁজা, সংসারের অভিজ্ঞতা অতি অল্প। লৌকিকতার বাঁধি বোলসকল সহজে তাঁহার মুখে আসিত না, এইজন্য গৃহদুর্গের বাহিরে তিনি আপনাকে কিছুতেই নিরাপদ মনে করিতেন না।
লোকেও তাঁহাকে একটা উজবুক রকমের মনে করিত এবং লোকেরও দোষ দেওয়া যায় না। মনে করো, প্রথম পরিচয়ে একটি পরম ভদ্রলোক উচ্ছ্বসিত কন্ঠে তারাপ্রসন্নকে বলিলেন, "মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ হয়ে যে কী পর্যন্ত আনন্দ লাভ করা গেল, তা একমুখে বলতে পারি নে"-- তারাপ্রসন্ন নিরুত্তর হইয়া নিজের দক্ষিণ করতল বিশেষ মনোযোগপূর্বক নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। হঠাৎ সে নীরবতার অর্থ এইরূপ মনে হয়, "তা, তোমার আনন্দ হয়েছে সেটা খুব সম্ভব বটে, কিন্তু আমার-যে আনন্দ হয়েছে এমন মিথ্যা কথাটা কী করে মুখে উচ্চারণ করব তাই ভাবছি।"
আরো দেখুন
পত্রোত্তর
Verses
           ডাক্তার শ্রীসুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্তকে লিখিত
বন্ধু,
          চিরপ্রশ্নের বেদীসম্মুখে চিরনির্বাক রহে
                   বিরাট নিরুত্তর,
          তাহারি পরশ পায় যবে মন নম্রললাটে বহে
                   আপন শ্রেষ্ঠ বর।
                             খনে খনে তারি বহিরঙ্গণদ্বারে
                             পুলকে দাঁড়াই, কত কী যে হয়  বলা;
                             শুধু মনে জানি বাজিল না বীণাতারে
                             পরমের সুরে চরমের গীতিকলা।
চকিত আলোকে কখনো সহসা দেখা দেয় সুন্দর,
                   দেয় না তবুও ধরা--
মাটির দুয়ার ক্ষণেক খুলিয়া আপন গোপন ঘর
          দেখায় বসুন্ধরা।
                   আলোকধামের আভাস সেথায় আছে
                   মর্তের বুকে অমৃত পাত্রে ঢাকা;
                   ফাগুন সেথায় মন্ত্র লাগায় গাছে,
                   অরূপের রূপ পল্লবে পড়ে আঁকা।
তারি আহ্বানে সাড়া দেয় প্রাণ, জাগে বিস্মিত সুর,
          নিজ অর্থ না জানে;
ধুলিময় বাধা-বন্ধ এড়ায়ে চলে যাই বহুদূর
          আপনারি গানে গানে।
                   "দেখেছি দেখেছি' এই কথা বলিবারে
                   সুর বেধে যায়, কথা না জোগায় মুখে;
                   ধন্য যে আমি, সে কথা জানাই কারে--
                   পরশাতীতের হরষ জাগে যে বুকে।
দুঃখ পেয়েছি, দৈন্য ঘিরেছে, অশ্লীল দিনে রাতে
          দেখেছি কুশ্রীতারে,
মানুষের প্রাণে বিষ মিশায়েছে মানুষ আপন হাতে,
          ঘটেছে তা বারে বারে।
                   তবু তো বধির করে নি শ্রবণ কভু,
                   বেসুর ছাপায়ে কে দিয়েছে সুর আনি;
                   পুরুষকলুষ ঝঞ্ঝায় শুনি তবু
                   চিরদিবসের শান্ত শিবের বাণী।
যাহা জানিবার কোনোকালে তার জেনেছি যে কোনোকিছু
          কে তাহা বলিতে পারে--
সকল পাওয়ার মাঝে না-পাওয়ার চলিয়াছি পিছু পিছু
          অচেনার অভিসারে।
                   অবুও চিত্ত অহেতু আনন্দেতে
                   বিশ্বনৃত্যলীলায় উঠেছে মেতে;
                   সেই ছন্দেই মুক্তি আমার পাব,
                   মৃত্যুর পথে মৃত্যু এড়ায়ে যাব।
ওই শুনি আমি চলেছে আকাশে বাঁধন-ছেঁড়ার রবে
          নিখিল আত্মহারা;
ওই দেখি আমি অন্তবিহীন সত্তার উৎসবে
          ছুটেছে প্রাণের ধারা।
                   সে ধারার বেগ লেগেছে আমার মনে
                   এ ধরণী হতে বিদায় নেবার ক্ষণে;
                   নিবায়ে ফেলিব ঘরের কোণের বাতি,
                   যাব অলক্ষ্যে সূর্যতারার সাথি।
কী আছে জানি না দিন-অবসানে মৃত্যুর অবশেষে;
                   এ প্রাণের কোনো ছায়া
শেষ আলো দিয়ে ফেলিবে কি রঙ অন্তরবির দেশে,
                   রচিবে কি কোনো মায়া।
                             জীবনেরে যাহা জেনেছি অনেক তাই;
                             সীমা থাকে থাক্‌, তবু তার সীমা নাই।
                             নিবিড় তাহার সত্য আমার প্রাণে
                             নিখিল ভুবন ব্যাপিয়া নিজেরে জানে।
আরো দেখুন
কৃতঘ্ন শোক
Stories
ভোরবেলায় সে বিদায় নিলে।
আমার মন আমাকে বোঝাতে বসল, 'সবই মায়া।'
আরো দেখুন
ত্যাগ
Stories
ফাল্গুনের প্রথম পূর্ণিমায় আম্রমুকুলের গন্ধ লইয়া নব বসন্তের বাতাস বহিতেছে। পুষ্করিণীতীরের একটি পুরাতন লিচুগাছের ঘন পল্লবের মধ্য হইতে একটি নিদ্রাহীন অশ্রান্ত পাপিয়ার গান মুখুজ্যেদের বাড়ির একটি নিদ্রাহীন শয়নগৃহের মধ্যে গিয়া প্রবেশ করিতেছে। হেমন্ত কিছু চঞ্চলভাবে কখনো তার স্ত্রীর একগুচ্ছ চুল খোঁপা হইতে বিশ্লিষ্ট করিয়া লইয়া আঙুলে জড়াইতেছে, কখনো তাহার বালাতে চুড়িতে সংঘাত করিয়া ঠুং ঠুং শব্দ করিতেছে, কখনো তাহার মাথার ফুলের মালাটা টানিয়া স্বস্থানচ্যুত করিয়া তাহার মুখের উপর আনিয়া ফেলিতেছে। সন্ধ্যাবেলাকার নিস্তব্ধ ফুলের গাছটিকে সচেতন করিয়া তুলিবার জন্য বাতাস যেমন একবার এপাশ হইতে একবার ওপাশ হইতে একটু-আধটু নাড়াচাড়া করিতে থাকে, হেমন্তের কতকটা সেই ভাব।
কিন্তু কুসুম সম্মুখের চন্দ্রালোকপ্লাবিত অসীম শূন্যের মধ্যে দুই নেত্রকে নিমগ্ন করিয়া দিয়া স্থির হইয়া বসিয়া আছে। স্বামীর চাঞ্চল্য তাহাকে স্পর্শ করিয়া প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া যাইতেছে। অবশেষে হেমন্ত কিছু অধীরভাবে কুসুমের দুই হাত নাড়া দিয়া বলিল, 'কুসুম, তুমি আছ কোথায়? তোমাকে যেন একটা মস্ত দুরবীন কষিয়া বিস্তর ঠাহর করিয়া বিন্দুমাত্র দেখা যাইবে এমনি দূরে গিয়া পড়িয়াছ। আমার ইচ্ছা, তুমি আজ একটু কাছাকাছি এসো। দেখো দেখি কেমন চমৎকার রাত্রি।'
আরো দেখুন
চিত্রকর
Stories
ময়মনসিংহ ইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে আমাদের গোবিন্দ এল কলকাতায়। বিধবা মায়ের অল্প কিছু সম্বল ছিল। কিন্তু, সব-চেয়ে তার বড়ো সম্বল ছিল নিজের অবিচলিত সংকল্পের মধ্যে। সে ঠিক করেছিল, 'পয়সা' করবই, সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে দিয়ে।' সর্বদাই তার ভাষায় ধনকে সে উল্লেখ করত 'পয়সা' বলে। অর্থাৎ, তার মনে খুব একটা দর্শন স্পর্শন ঘ্রাণের যোগ্য প্রত্যক্ষ পদার্থ ছিল; তার মধ্যে বড়ো নামের মোহ ছিল না; অত্যন্ত সাধারণ পয়সা, হাটে হাটে হাতে হাতে ঘুরে ঘুরে ক্ষয়ে যাওয়া, মলিন হয়ে যাওয়া পয়সা, তাম্রগন্ধী পয়সা, কুবেরের আদিম স্বরূপ, যা রুপোয় সোনায় কাগজে দলিলে নানা মূর্তি পরিগ্রহ করে মানুষের মনকে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
নানা বাঁকা পথের ভিতর দিয়ে নানা পঙ্কে আবিল হতে হতে আজ গোবিন্দ তার পয়সাপ্রবাহিণীর প্রশস্তধারার পাকা বাঁধানো ঘাটে এসে পৌঁচেছে। গানিব্যাগ্‌ওয়ালা বড়োসাহেব ম্যাক্‌ডুগালের বড়োবাবুর আসনে তার ধ্রুব প্রতিষ্ঠা। সবাই তাকে নাম দিয়েছিল ম্যাক্‌দুলাল।
আরো দেখুন