আগমনী
Stories
আয়োজন চলেইছে। তার মাঝে একটুও ফাঁক পাওয়া যায় না যে ভেবে দেখি, কিসের আয়োজন।
তবুও কাজের ভিড়ের মধ্যে মনকে এক-একবার ঠেলা দিয়ে জিজ্ঞাসা করি, 'কেউ আসবে বুঝি?'
আরো দেখুন
কাবুলিওয়ালা
Stories
আমার পাঁচ বছর বয়সের ছোটো মেয়ে মিনি এক দণ্ড কথা না কহিয়া থাকিতে পারে না। পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া ভাষা শিক্ষা করিতে সে কেবল একটি বৎসর কাল ব্যয় করিয়াছিল, তাহার পর হইতে যতক্ষণ সে জাগিয়া থাকে এক মুহূর্ত মৌনভাবে নষ্ট করে না। তাহার মা অনেকসময় ধমক দিয়া তাহার মুখ বন্ধ করিয়া দেয়, কিন্তু আমি তাহা পারি না। মিনি চুপ করিয়া থাকিলে এমনি অস্বাভাবিক দেখিতে হয় যে, সে আমার বেশিক্ষণ সহ্য হয় না। এইজন্য আমার সঙ্গে তাহার কথোপকথনটা কিছু উৎসাহের সহিত চলে।
সকালবেলায় আমার নভেলের সপ্তদশ পরিচ্ছেদে হাত দিয়াছি এমনসময় মিনি আসিয়াই আরম্ভ করিয়া দিল, 'বাবা, রামদয়াল দরোয়ান কাককে কৌয়া বলছিল, সে কিচ্ছু জানে না। না?'
আরো দেখুন
শেষ পুরস্কার
Stories
সেদিন আই.এ. এবং ম্যাট্রিক ক্লাসের পুরস্কারবিতরণের উৎসব। বিমলা ব'লে এক ছাত্রী ছিল, সুন্দরী ব'লে তার খ্যাতি। তারই হাতে পুরস্কারের ভার। চার দিকে তার ভিড় জমেছে আর তার মনে অহংকার জমে উঠেছে খুব প্রচুর পরিমাণে। একটি মুখচোরা ভালোমানুষ ছেলে কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। সাহস করে একটু কাছে এল যেই, দেখা গেল তার পায়ে হয়েছে ঘা, ময়লা কাপড়ের ব্যাণ্ডেজ জড়ানো। তাকে দেখে বিমলা নাক তুলে বললে, 'ও এখানে কেন বাপু, ওর যাওয়া উচিত হাসপাতালে।'
ছেলেটি মন-মরা হয়ে আস্তে আস্তে চলে গেল। বাড়িতে গিয়ে তার স্কুলঘরের কোণে বসে কাঁদছে, জলখাবারের থালা হাতে তার দিদি এসে বললে, 'ও কী হচ্ছে জগদীশ, কাঁদছিস কেন।'
আরো দেখুন
সার্থক নৈরাশ্য
Verses
  তখন ছিল যে গভীর রাত্রিবেলা,
              নিদ্রা    ছিল না চোখের কোণে;
  আষাঢ়-আঁধারে আকাশে মেঘের মেলা,
              কোথাও   বাতাস ছিল না বনে।
  বিরাম ছিল না তপ্ত শয়নতলে,
              কাঙাল  ছিল বসে মোর প্রাণে;
  দু হাত বাড়ায়ে কী জানি কী কথা বলে,
              কাঙাল  চায় যে কারে কে জানে।
  দিল আঁধারের সকল র#ধ্র ভরি
              তাহার  ক্ষুব্ধ ক্ষুধিত ভাষা;
  মনে হল যেন বর্ষার বিভাবরী
              আজি   হারালো রে সব আশা।
  অনাথ জগতে যেন এক সুখ আছে,
              তাও    জগৎ খুঁজে না মেলে;
  আঁধারে কখন সে এসে যায় গো পাছে
              বুকে    রেখেছে আগুন জ্বেলে।
  'দাও দাও' বলে হাঁকিনু সুদূরে চেয়ে,
              আমি    ফুকারি ডাকিনু কারে।
  এমন সময়ে অরুণতরণী বেয়ে
              প্রভাত  নামিল গগনপারে।
পেয়েছি পেয়েছি, নিবাও নিশার বাতি,
              আমি    কিছুই চাহি নে আর।
  ওগো নিষ্ঠুর শূন্য নীরব রাতি,
              তোমায়    করি গো নমস্কার।
  বাঁচালে বাঁচালে-- বধির আঁধার তব
              আমায়  পৌঁছিয়া দিল কূলে।
  বঞ্চিত করি যা দিয়েছ কারে কব,
              আমায়  জগতে দিয়েছ তুলে।
              ধন্য প্রভাতরবি,
         আমার    লহো গো নম#কার।
              ধন্য মধুর বায়ু,
         তোমায়   নমি হে বারম্বার।
              ওগো প্রভাতের পাখি,
         তোমার   কলনির্মল স্বরে
              আমার প্রণাম লয়ে
         বিছাও     দূর গগনের 'পরে।
              ধন্য ধরার মাটি,
         জগতে    ধন্য জীবের মেলা।
              ধুলায় নমিয়া মাথা
         ধন্য          আমি এ প্রভাতবেলা।
আরো দেখুন
যাবার বেলা শেষ
Songs
যাবার বেলা শেষ কথাটি যাও বলে,
কোন্‌খানে যে মন লুকানো দাও বলে॥
     চপল লীলা ছলনাভরে    বেদনখানি আড়াল করে,
          যে বাণী তব হয় নি বলা নাও বলে॥
হাসির বাণে হেনেছ কত শ্লেষকথা,
নয়নজলে ভরো গো আজি শেষ কথা।
     হায় রে অভিমানিনী নারী,    বিরহ হল দ্বিগুণ ভারী
          দানের ডালি ফিরায়ে নিতে চাও ব'লে॥
আরো দেখুন
শেষ কথা
Stories
জীবনের প্রবহমান ঘোলা রঙের হ-য-ব-র-লর মধ্যে হঠাৎ যেখানে গল্পটা আপন রূপ ধ'রে সদ্য দেখা দেয়, তার অনেক পূর্ব থেকেই নায়কনায়িকারা আপন পরিচয়ের সূত্র গেঁথে আনে। পিছন থেকে সেই প্রাক্‌গাল্পিক ইতিহাসের ধারা অনুসরণ করতেই হয়। তাই কিছু সময় নেব, আমি যে কে সেই কথাটাকে পরিষ্কার করবার জন্যে। কিন্তু নামধান ভাঁড়াতে হবে। নইলে জানাশোনা মহলের জবাবদিহী সামলাতে পারব না। কী নাম নেব তাই ভাবছি, রোম্যাণ্টিক নামকরণের দ্বারা গোড়া থেকেই গল্পটাকে বসন্তরাগে পঞ্চমসুরে বাঁধতে চাই নে। নবীনমাধব নামটা বোধ হয় চলে যেতে পারবে, ওর বাস্তবের শাম্‌লা রঙটা ধুয়ে ফেলে করা যেতে পারত নবারুণ সেনগুপ্ত; কিন্তু তা হলে খাঁটি শোনাত না, গল্পটা নামের বড়াই ক'রে লোকের বিশ্বাস হারাত, লোকে মনে করত ধার-করা জামিয়ার প'রে সাহিত্যসভায় বাবুয়ানা করতে এসেছে।
আমি বাংলাদেশের বিপ্লবীদলের একজন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহাকর্ষশক্তি আণ্ডামানতীরের খুব কাছাকাছি টান মেরেছিল। নানা বাঁকা পথে সি.আই.ডি.-র ফাঁস এড়িয়ে এড়িয়ে গিয়েছিলুম আফগানিস্থান পর্যন্ত। অবশেষে পৌঁচেছি আমেরিকায় খালাসির কাজ নিয়ে। পূর্ববঙ্গীয় জেদ ছিল মজ্জায়, একদিনও ভুলি নি যে, ভারতবর্ষের হাতপায়ের শিকলে উখো ঘষতে হবে দিনরাত যতদিন বেঁচে থাকি। কিন্তু বিদেশে কিছুদিন থাকতেই একটা কথা নিশ্চিত বুঝেছিলুম, আমরা যে প্রণালীতে বিপ্লবের পালা শুরু করেছিলুম, সে যেন আতশবাজিতে পটকা ছোঁড়ার মতো, তাতে নিজের পোড়াকপাল পুড়িয়েছি অনেকবার, দাগ পড়ে নি ব্রিটিশ রাজতক্তে। আগুনের উপর পতঙ্গের অন্ধ আসক্তি। যখন সদর্পে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছিলুম তখন বুঝতে পারি নি, সেটাতে ইতিহাসের যজ্ঞানল জ্বালানো হচ্ছে না, জ্বালাচ্ছি নিজেদের খুব ছোটো ছোটো চিতানল। ইতিমধ্যে য়ুরোপীয় মহাসমরের ভীষণ প্রলয়রূপ তার অতি বিপুল আয়োজন সমেত চোখের সামনে দেখা দিয়েছিল-- এই যুগান্তরসাধিনী সর্বনাশাকে আমাদের খোড়োঘরের চণ্ডীমণ্ডপে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে সে দুরাশা মন থেকে লুপ্ত হয়ে গেল; সমারোহ ক'রে আত্মহত্যা করবার মতোও আয়োজন ঘরে নেই। তখন ঠিক করলুম, ন্যাশনাল দুর্গের গোড়া পাকা করতে হবে। স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলুম, বাঁচতে যদি চাই আদিম যুগের হাত দুখানায় যে কটা নখ আছে তা দিয়ে লড়াই করা চলবে না। এ যুগে যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের দিতে হবে পাল্লা; যেমন-তেমন করে মরা সহজ, কিন্তু বিশ্বকর্মার চেলাগিরি করা সহজ নয়। অধীর হয়ে ফল নেই, গোড়া থেকেই কাজ শুরু করতে হবে-- পথ দীর্ঘ, সাধনা কঠিন।
আরো দেখুন
শাস্তি
Stories
দুখিরাম রুই এবং ছিদাম রুই দুই ভাই সকালে যখন দা হাতে লইয়া জন খাটিতে বাহির হইল তখন তাহাদের দুই স্ত্রীর মধ্যে বকাবকি চেঁচামেচি চলিতেছে। কিন্তু প্রকৃতির অন্যান্য নানাবিধ নিত্য কলরবের ন্যায় এই কলহ-কোলাহলও পাড়াসুদ্ধ লোকের অভ্যাস হইয়া গেছে। তীব্র কণ্ঠস্বর শুনিবামাত্র লোকে পরস্পরকে বলে--'ওই রে বাধিয়া গিয়াছে,' অর্থাৎ যেমনটি আশা করা যায় ঠিক তেমনিটি ঘটিয়াছে, আজও স্বভাবের নিয়মের কোনোরূপ ব্যত্যয় হয় নাই। প্রভাতে পূর্বদিকে সূর্য উঠিলে যেমন কেহ তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করে না, তেমনি এই কুরিদের বাড়িতে দুই জায়ের মধ্যে যখন একটা হৈ-হৈ পড়িয়া যায় তখন তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করে না, তেমনি এই কুরিদের বাড়িতে দুই জায়ের মধ্যে যখন একটা হৈ-হৈ পড়িয়া যায় তখন তাহার কারণ নির্ণয়ের জন্য কাহারও কোনোরূপ কৌতূহলের উদ্রেক হয় না।
অবশ্য এই কোন্দল আন্দোলন প্রতিবেশীদের অপেক্ষা দুই স্বামীকে বেশি স্পর্শ করিত সন্দেহ নাই, কিন্তু সেটা তাহারা কোনোরূপ অসুবিধার মধ্যে গণ্য করিত না। তাহারা দুই ভাই যেন দীর্ঘ সংসারপথ একটা এক্কাগাড়িতে করিয়া চলিয়াছে, দুই দিকের দুই স্প্রিংবিহীন চাকার অবিশ্রাম ছড়ছড় খড়খড় শব্দটাকে জীবনরথযাত্রার একটা বিধিবিহিত নিয়মের মধ্যেই ধরিয়া লইয়াছে।
আরো দেখুন
শুন নলিনী, খোলো গো
Songs
       শুন     নলিনী, খোলো গো আঁখি--
       ঘুম      এখনো ভাঙিল না কি!
       দেখো, তোমারি দুয়ার-'পরে
       সখী,    এসেছে তোমারি রবি॥
       শুনি    প্রভাতের গাথা মোর
       দেখো ভেঙেছে ঘুমের ঘোর,
    জগত উঠেছে নয়ন মেলিয়া নূতন জীবন লভি।
তবে    তুমি কি সজনী জাগিবে নাকো,
           আমি যে তোমারি কবি॥
       প্রতিদিন আসি, প্রতিদিন হাসি,
           প্রতিদিন গান গাহি--
       প্রতিদিন প্রাতে শুনিয়া সে গান
           ধীরে ধীরে উঠ চাহি।
       আজিও এসেছি, চেয়ে দেখো দেখি
           আর তো রজনী নাহি।
       আজিও এসেছি, উঠ উঠ সখী,
           আর তো রজনী নাহি।
       সখী,    শিশিরে মুখানি মাজি
       সখী,    লোহিত বসনে সাজি
দেখো   বিমল সরসীর-আরশির 'পরে অপরূপ রূপরাশি।
       থেকে থেকে ধীরে হেলিয়া পড়িয়া
       নিজ মুখছায়া আধেক হেরিয়া
ললিত অধরে উঠিবে ফুটিয়া শরমের মৃদু হাসি॥
আরো দেখুন
লুকিয়ে আস আঁধার রাতে
Songs
লুকিয়ে আস আঁধার রাতে
            তুমিই আমার বন্ধু,
লও যে টেনে কঠিন হাতে
            তুমি আমার আনন্দ।
দুঃখরথের তুমিই রথী
            তুমিই আমার বন্ধু,
তুমি সংকট তুমিই ক্ষতি
            তুমি আমার আনন্দ।
শত্রু আমারে কর গো জয়
            তুমিই আমার বন্ধু,
রুদ্র তুমি হে ভয়ের ভয়
            তুমি আমার আনন্দ।
বজ্র এসো হে বক্ষ চিরে    
            তুমিই আমার বন্ধু,
মৃত্যু লও হে বাঁধন ছিঁড়ে
            তুমি আমার আনন্দ।
আরো দেখুন