সংস্কার
Stories
চিত্রগুপ্ত এমন অনেক পাপের হিসাব বড়ো অক্ষরে তাঁর খাতায় জমা করেন যা থাকে পাপীর নিজের অগোচরে। তেমনি এমন পাপও ঘটে যাকে আমিই চিনি পাপ বলে, আর-কেউ না। যেটার কথা লিখতে বসেছি সেটা সেই জাতের। চিত্রগুপ্তের কাছে জবাবদিহি করবার পূর্বে আগে-ভাগে কবুল করলে অপরাধের মাত্রাটা হাল্‌কা হবে।
ব্যাপারটা ঘটেছিল কাল শনিবার দিনে। সেদিন আমাদের পাড়ায় জৈনদের মহলে কী একটা পরব ছিল। আমার স্ত্রী কলিকাকে নিয়ে মোটরে করে বেরিয়েছিলুম-- চায়ের নিমন্ত্রণ ছিল বন্ধু নয়নমোহনের বাড়িতে।
আরো দেখুন
বাচস্পতি
Stories
দাদামশায়, তুমি তোমার চার দিকে যেসব পাগলের দল জমিয়েছিলে, গুণ হিসেব ক'রে তাদের বুঝি সব নম্বর দিয়ে রেখেছিলে?
হ্যাঁ, তা করতে হয়েছে বই-কি। কম তো জমে নি।
আরো দেখুন
শুচি
Verses
রামানন্দ পেলেন গুরুর পদ--
    সারাদিন তার কাটে জপে তপে,
        সন্ধ্যাবেলায় ঠাকুরকে ভোজ্য করেন নিবেদন,
           তার পরে ভাঙে তাঁর উপবাস
               যখন অন্তরে পান ঠাকুরের প্রসাদ।
সেদিন মন্দিরে উৎসব--
    রাজা এলেন, রানী এলেন,
        এলেন পণ্ডিতেরা দূর দূর থেকে,
এলেন নানাচিহ্নধারী নানা সম্প্রদায়ের ভক্তদল।
    সন্ধ্যাবেলায় স্নান শেষ করে।
        রামানন্দ নৈবেদ্য দিলেন ঠাকুরের পায়ে--
           প্রসাদ নামল না তাঁর অন্তরে,
               আহার হল না সেদিন।
এমনি যখন দুই সন্ধ্যা গেল কেটে,
        হৃদয় রইল শুষ্ক হয়ে,
গুরু বললেন মাটিতে ঠেকিয়ে মাথা,
        "ঠাকুর, কী অপরাধ করেছি।'
ঠাকুর বললেন, "আমার বাস কি কেবল বৈকুণ্ঠে।
    সেদিন আমার মন্দিরে যারা প্রবেশ পায় নি
        আমার স্পর্শ যে তাদের সর্বাঙ্গে,
           আমারই পাদোদক নিয়ে
প্রাণপ্রবাহিণী বইছে তাদের শিরায়।
    তাদের অপমান আমাকে বেজেছে;
           আজ তোমার হাতের নৈবেদ্য অশুচি।'
"লোকস্থিতি রক্ষা করতে হবে যে প্রভু'
           ব'লে গুরু চেয়ে রইলেন ঠাকুরের মুখের দিকে।
ঠাকুরের চক্ষু দীপ্ত হয়ে উঠল; বললেন,
           "যে লোকসৃষ্টি স্বয়ং আমার,
    যার প্রাঙ্গণে সকল মানুষের নিমন্ত্রণ,
তার মধ্যে তোমার লোকস্থিতির বেড়া তুলে
    আমার অধিকারে সীমা দিতে চাও
                   এতবড়ো স্পর্ধা!'
রামানন্দ বললেন, "প্রভাতেই যাব এই সীমা ছেড়ে,
        দেব আমার অহংকার দূর করে তোমার বিশ্বলোকে।'
        তখন রাত্রি তিন-প্রহর,
    আকাশের তারাগুলি যেন ধ্যানমগ্ন।
        গুরুর নিদ্রা গেল ভেঙে; শুনতে পেলেন,
           "সময় হয়েছে, ওঠো, প্রতিজ্ঞা পালন করো।'
রামানন্দ হাতজোড় করে বললেন, "এখনো রাত্রি গভীর,
    পথ অন্ধকার, পাখিরা নীরব।
        প্রভাতের অপেক্ষায় আছি।'
ঠাকুর বললেন, "প্রভাত কি রাত্রির অবসানে।
    যখনি চিত্ত জেগেছে, শুনেছ বাণী,
        তখনি এসেছে প্রভাত।
           যাও তোমার ব্রতপালনে।'
রামানন্দ বাহির হলেন পথে একাকী,
    মাথার উপরে জাগে ধ্রুবতারা।
পার হয়ে গেলেন নগর, পার হয়ে গেলেন গ্রাম।
    নদীতীরে শ্মশান, চণ্ডাল শবদাহে ব্যাপৃত।
        রামানন্দ দুই হাত বাড়িয়ে তাকে নিলেন বক্ষে।
সে ভীত হয়ে বললে, "প্রভু, আমি চণ্ডাল, নাভা আমার নাম,
               হেয় আমার বৃত্তি,
        অপরাধী করবেন না আমাকে।'
গুরু বললেন, "অন্তরে আমি মৃত, অচেতন আমি,
    তাই তোমাকে দেখতে পাই নি এতকাল,
        তাই তোমাকেই আমার প্রয়োজন--
           নইলে হবে না মৃতের সৎকার।'
চললেন গুরু আগিয়ে।
        ভোরের পাখি উঠল ডেকে,
    অরুণ-আলোয় শুকতারা গেল মিলিয়ে।
           কবীর বসেছেন তাঁর প্রাঙ্গণে,
        কাপড় বুনছেন আর গান গাইছেন গুন্‌ গুন্‌ স্বরে।
রামানন্দ বসলেন পাশে,
        কণ্ঠ তাঁর ধরলেন জড়িয়ে।
কবীর ব্যস্ত হয়ে বললেন,
    "প্রভু, জাতিতে আমি মুসলমান,
        আমি জোলা, নীচ আমার বৃত্তি।'
রামানন্দ বললেন, "এতদিন তোমার সঙ্গ পাই নি বন্ধু,
    তাই অন্তরে আমি নগ্ন,
        চিত্ত আমার ধুলায় মলিন,
আজ আমি পরব শুচিবস্ত্র তোমার হাতে--
        আমার লজ্জা যাবে দূর হয়ে।'
        শিষ্যেরা খুঁজতে খুঁজতে এল সেখানে,
    ধিক্‌কার দিয়ে বললে, "এ কী করলেন প্রভু!'
রামানন্দ বললেন, "আমার ঠাকুরকে এতদিন যেখানে হারিয়েছিলুম
    আজ তাঁকে সেখানে পেয়েছি খুঁজে।'
           সূর্য উঠল আকাশে
               আলো এসে পড়ল গুরুর আনন্দিত মুখে।
আরো দেখুন
অমৃতের সাগরে
Songs
অমৃতের সাগরে                আমি যাব যাব রে,
              তৃষ্ণা জ্বলিছে মোর প্রাণে ॥
কোথা পথ বলো হে          বলো, ব্যথার ব্যথী হে--
          কোথা হতে কলধ্বনি আসিছে কানে ॥
আরো দেখুন
রবিবার
Stories
আমার গল্পের প্রধান মানুষটি প্রাচীন ব্রাহ্মণপণ্ডিত-বংশের ছেলে। বিষয়ব্যাপারে বাপ ওকালতি ব্যবসায়ে আঁটি পর্যন্ত পাকা, ধর্মকর্মে শাক্ত আচারের তীব্র জারক রসে জারিত। এখন আদালতে আর প্র্যাকটিস করতে হয় না। এক দিকে পূজা-অর্চনা আর-এক দিকে ঘরে বসে আইনের পরামর্শ দেওয়া, এই দুটোকে পাশাপাশি রেখে তিনি ইহকাল পরকালের জোড় মিলিয়ে অতি সাবধানে চলেছেন। কোনো দিকেই একটু পা ফসকায় না।
এইরকম নিরেট আচারবাঁধা সনাতনী ঘরের ফাটল ফুঁড়ে যদি দৈবাৎ কাঁটাওয়ালা নাস্তিক ওঠে গজিয়ে, তা হলে তার ভিত-দেয়াল-ভাঙা মন সাংঘাতিক ঠেলা মারতে থাকে ইঁটকাঠের প্রাচীন গাঁথুনির উপরে। এই আচারনিষ্ঠ বৈদিক ব্রাহ্মণের বংশে দুর্দান্ত কালাপাহাড়ের অভ্যুদয় হল আমাদের নায়কটিকে নিয়ে।
আরো দেখুন
দুর্বুদ্ধি
Stories
ভিটা ছাড়িতে হইল। কেমন করিয়া, তাহা খোলসা করিয়া বলিব না, আভাস দিব মাত্র।
আমি পাড়াগেঁয়ে নেটিভ ডাক্তার, পুলিসের থানার সম্মুখে আমার বাড়ি। যমরাজের সহিত আমার যে পরিমাণ আনুগত্য ছিল দারোগাবাবুদের সহিত অপেক্ষা কম ছিল না, সুতরাং নর ও নারায়ণের দ্বারা মানুষের যত বিবিধ রকমের পীড়া ঘটিতে পারে তাহা আমার সুগোচর ছিল। যেমন মণির দ্বারা বলয়ের এবং বলয়ের দ্বারা মণির শোভা বৃদ্ধি হয় তেমনি আমার মধ্যস্থতায় দারোগার এবং দারোগার মধ্যস্থতায় আমার উত্তরোত্তর আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটিতেছিল।
আরো দেখুন
ঝোড়ো রাত
Verses
ঢেউ উঠেছে জলে,
           হাওয়ায় বাড়ে বেগ।
ওই-যে ছুটে চলে
           গগন-তলে মেঘ।
মাঠের গোরুগুলো
উড়িয়ে চলে ধুলো,
আকাশে চায় মাঝি
           মনেতে উদ্‌বেগ।
           নামল ঝোড়ো রাতি,
                   দৌড়ে চলে ভুতো।
           মাথায় ভাঙা ছাতি,
                   বগলে তার জুতো।
           ঘাটের গলি-'পরে
           শুক্‌নো পাতা ঝরে,
           কল্‌সি কাঁখে নিয়ে
                   মেয়েরা যায় দ্রুত।
ঘণ্টা গোরুর গলে
           বাজিছে ঠন্‌ ঠন্‌।
নীচে গাড়ির তলে
           ঝুলিছে লণ্ঠন।
যাবে অনেক দূরে
বেণীমাধব-পুরে--
ডাইনে চাষের মাঠ,
           বাঁয়ে বাঁশের বন।
           পশ্চিমে মেঘ ডাকে,
                   ঝাউয়ের মাথা দোলে।
           কোথায় ঝাঁকে ঝাঁকে
                   বক উড়ে যায় চ'লে।
           বিদ্যুৎকম্পনে
           দেখছি ক্ষণে ক্ষণে
           মন্দিরের ওই চূড়া
                   অন্ধকারের কোলে।
গৃহস্থ কে ঘরে,
           খোলো দুয়ারখানা।
পান্থ পথের 'পরে,
           পথ নাহি তার জানা।
নামে বাদল-ধারা,
লুপ্ত চন্দ্র তারা,
বাতাস থেকে থেকে
      আকাশকে দেয় হানা।
আরো দেখুন
সে জন কে, সখী, বোঝা গেছে
Songs
সে জন কে, সখী, বোঝা গেছে,
আমাদের সখী যারে মনপ্রাণ সঁপেছে।
ও সে কে, কে, কে।
ওই যে তরুতলে, বিনোদ-মালা গলে,
না জানি কোন্‌ ছলে বসে রয়েছে।
সখী কী হবে,
ও কি কাছে আসিবে কভু, কথা কবে।
ও কি প্রেম জানে, ও কি বাঁধন মানে।
ও কী মায়াগুণে মন লয়েছে।
বিভল আঁখি তুলে আঁখি পানে চায়,
যেন কী পথ ভুলে এল কোথায়। (ওগো)
যেন কী গানের স্বরে, শ্রবণ আছে ভরে,
যেন কোন্‌ চাঁদের আলোয় মগ্ন হয়েছে।
আরো দেখুন
যা পেয়েছি প্রথম
Songs
যা পেয়েছি প্রথম দিনে সেই যেন পাই শেষে,
দু হাত দিয়ে বিশ্বেরে ছুঁই শিশুর মতো হেসে ॥
     যাবার বেলা সহজেরে
          যাই যেন মোর প্রণাম সেরে,
              সকল পন্থা যেথায় মেলে সেথা দাঁড়াই এসে ॥
খুঁজতে যারে হয় না কোথাও চোখ যেন তায় দেখে,
সদাই যে রয় কাছে তারি পরশ যেন ঠেকে।
          নিত্য যাহার থাকি কোলে
              তারেই যেন যাই গো ব'লে--
                    এই জীবনে ধন্য হলেম তোমায় ভালোবেসে ॥
আরো দেখুন
উলুখড়ের বিপদ
Stories
বাবুদের নায়েব গিরিশ বসুর অন্তঃপুরে প্যারী বলিয়া একটি নূতন দাসী নিযুক্ত হইয়াছিল। তাহার বয়স অল্প; চরিত্র ভালো। দূর বিদেশ হইতে আসিয়া কিছুদিন  কাজ করার পরেই একদিন সে বৃদ্ধ নায়েবের অনুরাগদৃষ্টি হইতে আত্মরক্ষার জন্য গৃহিণীর নিকট কাঁদিয়া গিয়া পড়িল। গৃহিণী কহিলেন, "বাছা, তুমি অন্য কোথাও যাও; তুমি ভালোমানুষের মেয়ে, এখানে থাকিলে তোমার সুবিধা হইবে না।" বলিয়া গোপনে কিছু অর্থ দিয়া বিদায় করিয়া দিলেন।
কিন্তু পালানো সহজ ব্যাপার নহে, হাতে পথ-খরচও সামান্য, সেইজন্য প্যারী গ্রামে হরিহর ভট্টাচার্য মহাশয়ের নিকটে গিয়া আশ্রয় লইল। বিবেচক ছেলেরা কহিল, "বাবা, কেন বিপদ ঘরে আনিতেছেন।" হরিহর কহিলেন, "বিপদ স্বয়ং আসিয়া আশ্রয় প্রার্থনা করিলে তাহাকে ফিরাইতে পারি না।"
গিরিশ বসু সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া কহিল, "ভট্টাচার্যমহাশয়, আপনি আমার ঝি ভাঙাইয়া আনিলেন কেন। ঘরে কাজের ভারি অসুবিধা হইতেছে।" ইহার উত্তরে হরিহর    দু-চারটে সত্য কথা খুব শক্ত করিয়াই বলিলেন। তিনি মানী লোক ছিলেন, কাহারো খাতিরে কোনো কথা ঘুরাইয়া বলিতে জানিতেন না। নায়েব মনে মনে উদ্‌গতপক্ষ পিপীলিকার সহিত তাঁহার তুলনা করিয়া চলিয়া গেল। যাইবার সময় খুব ঘটা করিয়া পায়ের ধুলা লইল। দুই-চারি দিনের মধ্যেই ভট্টাচার্যের বাড়িতে পুলিসের সমাগম হইল। গৃহিণীঠাকুরানীর বালিশের নীচে হইতে নায়েবের স্ত্রীর একজোড়া ইয়ারিং বাহির হইল। ঝি প্যারী চোর সাব্যস্ত হইয়া জেলে গেল। ভট্টাচার্যমহাশয় দেশবিখ্যাত প্রতিপত্তির জোরে চোরাই-মাল রক্ষার অভিযোগ হইতে নিষ্কৃতি পাইলেন। নায়েব পুনশ্চ ব্রাহ্মণের পদধূলি লইয়া গেল। ব্রাহ্মণ বুঝিলেন, হতভাগিনীকে তিনি আশ্রয় দেওয়াতেই প্যারীর সর্বনাশ ঘটিল। তাঁহার মনে শেল বিঁধিয়া রহিল। ছেলেরা কহিল, "জমিজমা বেচিয়া কলিকাতায় যাওয়া যাক, এখানে বড়ো মুশকিল দেখিতেছি।" হরিহর কহিলেন, "পৈতৃক ভিটা ছাড়িতে পারিব না, অদৃষ্টে থাকিলে বিপদ কোথায় না ঘটে।"ইতিমধ্যে নায়েব গ্রামে অতিমাত্রায় খাজনা বৃদ্ধির চেষ্টা করায় প্রজারা বিদ্রোহী হইল। হরিহরের সমস্ত ব্রহ্মোত্তর জমা, জমিদারের সঙ্গে কোনো সম্বন্ধ নাই। নায়েব তাহার প্রভুকে জানাইল, হরিহরই প্রজাদিগকে প্রশ্রয় দিয়া বিদ্রোহী করিয়া তুলিয়াছে। জমিদার কহিলেন, "যেমন করিয়া পার ভট্টাচার্যকে শাসন করো।" নায়েব ভট্টাচার্যের পদধূলি লইয়া কহিল,  "সামনের ঐ জমিটা পরগনার ভিটার মধ্যে পড়িতেছে; ওটা তো ছাড়িয়া দিতে হয়।" হরিহর কহিলেন, "সে কী কথা। ও যে আমার বহুকালের ব্রহ্মত্র।" হরিহরের গৃহপ্রাঙ্গণের সংলগ্ন পৈতৃক জমি জমিদারের পরগনার অন্তর্গত বলিয়া নালিশ রুজু হইল। হরিহর বলিলেন,"এ জমিটা তো তবে ছাড়িয়া দিতে হয়, আমি তো  বৃদ্ধ বয়সে আদালতে সাক্ষী দিতে পারিব না।" ছেলেরা বলিল, "বাড়ির সংলগ্ন জমিটাই যদি ছাড়িয়া দিতে হয় তবে ভিটায় টিঁকিব কী করিয়া।"
প্রাণাধিক পৈতৃক ভিটার মায়ায় বৃদ্ধ কম্পিতপদে আদালতের সাক্ষ্যমঞ্চে গিয়া দাঁড়াইলেন। মুন্সেফ নবগোপালবাবু তাঁহার সাক্ষ্যই প্রামাণ্য করিয়া মকদ্দমা ডিস্‌মিস্‌ করিয়া দিলেন। ভট্টাচার্যের খাস প্রজারা ইহা লইয়া গ্রামে ভারি উৎসবসমারোহ আরম্ভ করিয়া দিল। হরিহর তাড়াতাড়ি তাহাদিগকে থামাইয়া দিলেন। নায়েব আসিয়া পরম আড়ম্বরে ভট্টাচার্যের পদধূলি লইয়া গায়ে মাথায় মাখিল এবং আপিল রুজু করিল। উকিলরা হরিহরের নিকট হইতে টাকা লন না। তাঁহারা ব্রাহ্মণকে বারম্বার আশ্বাস দিলেন, এ মকদ্দমায় হারিবার কোনো সম্ভাবনা নাই। দিন কি কখনো রাত হইতে পারে। শুনিয়া হরিহর নিশ্চিন্ত হইয়া ঘরে বসিয়া রহিলেন।
একদিন জমিদারি কাছারিতে ঢাকঢোল বাজিয়া উঠিল, পাঁঠা কাটিয়া নায়েবের বাসায় কালীপূজা হইবে। ব্যাপারখানা কী। ভট্টাচার্য খবর পাইলেন, আপিলে তাঁহার হার হইয়াছে।
ভট্টাচার্য মাথা চাপড়াইয়া উকিলকে জিজ্ঞাসা করিলেন, বসন্তবাবু, করিলেন কী। আমার কী দশা হইবে।"
দিন যে কেমন করিয়া রাত হইল, বসন্তবাবু তাহার নিগূঢ় বৃত্তান্ত বলিলেন, "সম্প্রতি যিনি নূতন অ৻াডিশনাল জজ হইয়া আসিয়াছেন তিনি মুন্সেফ থাকা কালে মুন্সেফ নবগোপালবাবুর সহিত তাঁহার ভারি খিটিমিটি বাধিয়াছিল। তখন কিছু করিয়া উঠিতে পারেন নাই; আজ জজের আসনে বসিয়া নবগোপালবাবুর রায় পাইবামাত্র উলটাইয়া দিতেছেন; আপনি হারিলেন সেইজন্য।"  ব্যাকুল হরিহর কহিলেন, "হাইকোর্টে ইহার কোনো আপিল নাই?" বসন্ত কহিলেন, জজবাবু আপিলেফল পাইবার সম্ভাবনা মাত্র রাখেন নাই। তিনি আপনাদের সাক্ষীকে সন্দেহ করিয়া বিরুদ্ধ পক্ষের সাক্ষীকেই বিশ্বাস করিয়া গিয়াছেন। হাইকোর্টে তো সাক্ষীর বিচার হইবে না।"
বৃদ্ধ সাশ্রুনেত্রে কহিলেন, "তবে আমার উপায়?"
উকিল কহিলেন, "উপায় কিছুই দেখি না।"
গিরিশ বসু পরদিন লোকজন সঙ্গে লইয়া ঘটা করিয়া ব্রাহ্মণের পদধূলি লইয়া গেল এবং বিদায়কালে উচ্ছ্বসিত দীর্ঘনিশ্বাসে কহিল, "প্রভু, তোমারই ইচ্ছা।"
আরো দেখুন