নীহারিকা
Verses
বাদল-শেষের আবেশ আছে ছুঁয়ে
                   তমালছায়াতলে,
সজনে গাছের ডাল পড়েছে নুয়ে
                   দিঘির প্রান্তজলে।
        অস্তরবির-পথ-তাকানো মেঘে
        কালোর বুকে আলোর বেদন লেগে--
                   কেন এমন খনে
        কে যেন সে উঠল হঠাৎ জেগে
                   আমার শূন্য মনে।
"কে গো তুমি, ওগো ছায়ায় লীন"
                   প্রশ্ন পুছিলাম।
সে কহিল, "ছিল এমন দিন
                   জেনেছ মোর নাম।
        নীরব রাতে নিসুত দ্বিপ্রহরে
        প্রদীপ তোমার জ্বেলে দিলেম ঘরে,
                   চোখে দিলেম চুমো;
        সেদিন আমায় দেখলে আলস-ভরে
                   আধ-জাগা আধ-ঘুমো।
আমি তোমার খেয়ালস্রোতে তরী,
                   প্রথম-দেওয়া খেয়া--
মাতিয়েছিলেম শ্রাবণশর্বরী
                   লুকিয়ে-ফোটা কেয়া।
        সেদিন তুমি নাও নি আমায় বুঝে,
        জেগে উঠে পাও নি ভাষা খুঁজে,
                   দাও নি আসন পাতি--
সংশয়িত স্বপন-সাথে যুঝে
                   কাটল তোমার রাতি।
তার পরে কোন্‌ সব-ভুলিবার দিনে
                   নাম হল মোর হারা!
আমি যেন অকালে আশ্বিনে
                   এক-পসলার ধারা।
        তার পরে তো হল আমার জয়--
        সেই প্রদোষের ঝাপসা পরিচয়
                   ভরল তোমার ভাষা,
        তার পরে তো তোমার ছন্দোময়
                   বেঁধেছি মোর বাসা।
চেনো কিম্বা নাই বা আমায় চেনো
                   তবু তোমার আমি।
সেই সেদিনের পায়ের ধ্বনি জেনো
                   আর যাবে না থামি।
        যে-আমারে হারালে সেই কবে
        তারই সাধন করে গানের রবে
                   তোমার বীণাখানি।
        তোমার বনে প্রোল্লোল পল্লবে
                   তাহার কানাকানি।
সেদিন আমি এসেছিলেম একা
                   তোমার আঙিনাতে।
দুয়ার ছিল পাথর দিয়ে ঠেকা
                   নিদ্রাঘেরা রাতে।
        যাবার বেলা সে-দ্বার গেছি খুলে
        গন্ধ-বিভোল পবন-বিলোল ফুলে,
                        রঙ-ছড়ানো বনে--
        চঞ্চলিত কত শিথিল চুলে,
                        কত চোখের কোণে।
রইল তোমার সকল গানের সাথে
                   ভোলা নামের ধুয়া।
রেখে গেলেম সকল প্রিয়হাতে
                   এক নিমেষের ছুঁয়া।
        মোর বিরহ সব মিলনের তলে
        রইল গোপন স্বপন-অশ্রুজলে--
                   মোর আঁচলের হাওয়া
        আজ রাতে ওই কাহার নীলাঞ্চলে
                   উদাস হয়ে ধাওয়া।"
আরো দেখুন
পায়ে চলার পথ
Stories
এই তো পায়ে চলার পথ।
এসেছে বনের মধ্যে দিয়ে মাঠে, মাঠের মধ্যে দিয়ে নদীর ধারে, খেয়াঘাটের পাশে বটগাছেরতলায়। তার পরে ও পারের ভাঙা ঘাট থেকে বেঁকে চলে গেছে গ্রামের মধ্যে; তার পরে তিসির খেতের ধার দিয়ে, আমবাগানের ছায়া দিয়ে, পদ্মদিঘির পাড় দিয়ে, রথতলার পাশ দিয়ে কোন্‌ গাঁয়ে গিয়ে পৌঁচেছে জানি নে।
আরো দেখুন
মহামায়া
Stories
মহামায়া এবং রাজীবলোচন উভয়ে নদীর ধারে একটা ভাঙা মন্দিরে সাক্ষাৎ করিল।
মহামায়া কোনো কথা না বলিয়া তাহার স্বাভাবিক গম্ভীর দৃষ্টি ঈষৎ ভর্ৎসনার ভাবে রাজীবের প্রতি নিক্ষেপ করিল। তাহার মর্ম এই, তুমি কী সাহসে আজ অসময়ে আমাকে এখানে আহ্বান করিয়া আনিয়াছ। আমি এ পর্যন্ত তোমার সকল কথা শুনিয়া আসিতেছি বলিয়াই তোমার এতদূর স্পর্ধা বাড়িয়া উঠিয়াছে?
আরো দেখুন
34
Verses
আমার মনের জানলাটি আজ হঠাৎ গেল খুলে
          তোমার মনের দিকে।
সকালবেলার আলোয় আমি সকল কর্ম ভুলে
          রইনু অনিমিখে।
          দেখতে পেলেম তুমি মোরে
          সদাই ডাক যে-নাম ধ'রে
     সে-নামটি এই চৈত্রমাসের পাতায় পাতায় ফুলে
              আপনি দিলে লিখে।
     সকালবেলার আলোতে তাই সকল কর্ম ভুলে
               রইনু অনিমিখে।
     আমার সুরের পর্দাটি আজ হঠাৎ গেল উড়ে
              তোমার গানের পানে।
     সকালবেলার আলো দেখি তোমার সুরে সুরে
              ভরা আমার গানে।
              মনে হল আমারি প্রাণ
          তোমার বিশ্বে তুলেছে তান,
     আপন গানের সুরগুলি সেই তোমার চরণমূলে
              নেব আমি শিখে।
     সকালবেলার আলোতে তাই সকল কর্ম ভুলে
              রইনু অনিমিখে।
আরো দেখুন
নিশীথে
Stories
'ডাক্তার! ডাক্তার!'
জ্বালাতন করিল! এই অর্ধেক রাত্রে--
আরো দেখুন
কৃতঘ্ন শোক
Stories
ভোরবেলায় সে বিদায় নিলে।
আমার মন আমাকে বোঝাতে বসল, 'সবই মায়া।'
আরো দেখুন
মধ্যবর্তিনী
Stories
নিবারণের সংসার নিতান্তই সচরাচর রকমের, তাহাতে কাব্যরসের কোনো নামগন্ধ ছিল না। জীবনে উক্ত রসের যে কোনো আবশ্যক আছে, এমন কথা তাহার মনে কখনো উদয় হয় নাই। যেমন পরিচিত পুরাতন চটি-জোড়াটার মধ্যে পা দুটো দিব্য নিশ্চিন্তভাবে প্রবেশ করে, এই পুরাতন পৃথিবীটার মধ্যে নিবারণ সেইরূপ আপনার চিরাভ্যস্ত স্থানটি অধিকার করিয়া থাকে, সে সম্বন্ধে ভ্রমেও কোনোরূপ চিন্তা তর্ক বা তত্ত্বালোচনা করে না।
নিবারণ প্রাতঃকালে উঠিয়া গলির ধারে গৃহদ্বারে খোলাগায়ে বসিয়া অত্যন্ত নিরুদ্বিগ্নভাবে হুঁকাটি লইয়া তামাক খাইতে থাকে। পথ দিয়া লোকজন যাতায়াত করে, গাড়ি ঘোড়া চলে, বৈষ্ণব-ভিখারি গান গাহে, পুরাতন বোতল সংগ্রহকারী হাঁকিয়া চলিয়া যায়; এই সমস্ত চঞ্চল দৃশ্য মনকে লঘুভাবে ব্যাপৃত রাখে এবং যেদিন কাঁচা আম অথবা তপসি-মাছওয়ালা আসে, সেদিন অনেক দরদাম করিয়া কিঞ্চিৎ বিশেষরূপে রন্ধনের আয়োজন হয়। তাহার পর যথাসময়ে তেল মাখিয়া স্নান করিয়া আহারান্তে দড়িতে ঝুলানো চাপকানটি পরিয়া এক ছিলিম তামাক পানের সহিত নিঃশেষপূর্বক আর একটি পান মুখে পুরিয়া, আপিসে যাত্রা করে। আপিস হইতে ফিরিয়া আসিয়া সন্ধ্যেবেলাটা প্রতিবেশী রামলোচন ঘোষের বাড়িতে প্রশান্ত গম্ভীর ভাবে সন্ধ্যাযাপন করিয়া আহারান্তে রাত্রে শয়নগৃহে স্ত্রী হরসুন্দরীর সহিত সাক্ষাৎ হয়।
আরো দেখুন
তপস্বিনী
Stories
বৈশাখ প্রায় শেষ হইয়া আসিল। প্রথমরাত্রে গুমট গেছে, বাঁশগাছের পাতাটা পর্যন্ত নড়ে না, আকাশের তারাগুলো যেন মাথা-ধরার বেদনার মতো দব্‌ দব্‌ করিতেছে। রাত্রি তিনটের সময় ঝির্‌ঝির্‌ করিয়া একটুখানি বাতাস উঠিল। ষোড়শী শূন্য মেঝের উপর খোলা জানলার নীচে শুইয়া আছে, একটা কাপড়ে-মোড়া টিনের বাক্স তার মাথার বালিশ। বেশ বোঝা যায়, খুব উৎসাহের সঙ্গে সে কৃচ্ছসাধন করিতেছে।
প্রতিদিন ভোর চারটের সময় উঠিয়া স্নান সারিয়া ষোড়শী ঠাকুরঘরে গিয়া বসে। আহ্নিক করিতে বেলা হইয়া যায়। তার পরে বিদ্যারত্নমশায় আসেন; সেই ঘরে বসিয়াই তাঁর কাছে সে গীতা পড়ে। সংস্কৃত সে কিছু কিছু শিখিয়াছে। শঙ্করের বেদান্তভাষ্য এবং পাতঞ্জলদর্শন মূল গ্রন্থ হইতে পড়িবে, এই তার পণ। বয়স তার তেইশ হইবে।
আরো দেখুন
অধ্যাপক
Stories
কলেজে আমার সহপাঠীসম্প্রদায়ের মধ্যে আমার একটু বিশেষ প্রতিপত্তি ছিল। সকলেই আমাকে সকল বিষয়েই সমজদার বলিয়া মনে করিত।
ইহার প্রধান কারণ, ভুল হউক আর ঠিক হউক, সকল বিষয়েই আমার একটা মতামত ছিল। অধিকাংশ লোকেই হাঁ এবং না জোর করিয়া বলিতে পারে না, আমি সেটা খুব বলিতাম।
আরো দেখুন
সিদ্ধি
Stories
স্বর্গের অধিকারে মানুষ বাধা পাবে না, এই তার পণ। তাই, কঠিন সন্ধানে অমর হবার মন্ত্র সে শিখে নিয়েছে। এখন একলা বনের মধ্যে সেই মন্ত্র সে সাধনা করে।
বনের ধারে ছিল এক কাঠকুড়নি মেয়ে। সে মাঝে মাঝে আঁচলে ক'রে তার জন্যে ফল নিয়ে আসে, আর পাতার পাত্রে আনে ঝরনার জল।
আরো দেখুন