ঠাকুরদা
Stories
নয়নজোড়ের জমিদারেরা এককালে বাবু বলিয়া বিশেষ বিখ্যাত ছিলেন। তখনকার কালের বাবুয়ানার আদর্শ বড়ো সহজ ছিল না। এখন যেমন রাজা-রায়বাহাদুর খেতাব অর্জন করিতে অনেক খানা নাচ ঘোড়দৌড় এবং সেলাম-সুপারিশের শ্রাদ্ধ করিতে হয়, তখনো সাধারণের নিকট হইতে বাবু উপাধি লাভ করিতে বিস্তর দুঃসাধ্য তপশ্চরণ করিতে হইত।
আমাদের নয়নজোড়ের বাবুরা পাড় ছিঁড়িয়া ফেলিয়া ঢাকাই কাপড় পরিতেন, কারণ পাড়ের কর্কশতায় তাঁহাদের সুকোমল বাবুয়ানা ব্যথিত হইত। তাঁহারা লক্ষ টাকা দিয়া বিড়ালশাবকের বিবাহ দিতেন এবং কথিত আছে, একবার কোনো উৎসব উপলক্ষে রাত্রিকে দিন করিবার প্রতিজ্ঞা করিয়া অসংখ্য দীপ জ্বলাইয়া সূর্যকিরণের অনুকরণে তাঁহারা সাচ্চা রুপার জরি উপর হইতে বর্ষণ করিয়াছিলেন।
আরো দেখুন
সম্পাদক
Stories
আমার স্ত্রী-বর্তমানে প্রভা সম্বন্ধে আমার কোনো চিন্তা ছিল না। তখন প্রভা অপেক্ষা প্রভার মাতাকে লইয়া কিছু অধিক ব্যস্ত ছিলাম।
তখন কেবল প্রভার খেলাটুকু হাসিটুকু দেখিয়া, তাহার আধো আধো কথা শুনিয়া এবং আদরটুকু লইয়াই তৃপ্ত থাকিতাম; যতক্ষণ ভালো লাগিত নাড়াচাড়া করিতাম, কান্না আরম্ভ করিলেই তাহার মার কোলে সমর্পণ করিয়া সত্বর অব্যাহতি লইতাম। তাহাকে যে বহু চিন্তা ও চেষ্টায় মানুষ করিয়া তুলিতে হইবে, এ-কথা আমার মনে আসে নাই।
আরো দেখুন
পুত্রযজ্ঞ
Stories
বৈদ্যনাথ গ্রামের মধ্যে বিজ্ঞ ছিলেন সেইজন্য তিনি ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া বর্তমানের সমস্ত কাজ করিতেন। যখন বিবাহ করিলেন তখন তিনি বর্তমান নববধূর অপেক্ষা ভাবী নবকুমারের মুখ স্পষ্টতররূপে দেখিতে পাইয়াছিলেন। শুভদৃষ্টির সময় এতটা দূরদৃষ্টি প্রায় দেখা যায় না। তিনি পাকা লোক ছিলেন সেইজন্য প্রেমের চেয়ে পিণ্ডটাকেই অধিক বুঝিতেন এবং পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা এই মর্মেই তিনি বিনোদিনীকে বিবাহ করিয়াছিলেন।
কিন্তু এ সংসারে বিজ্ঞ লোকও ঠকে। যৌবনপ্রাপ্ত হইয়াও যখন বিনোদিনী তাহার সর্বপ্রধান কর্তব্যটি পালন করিল না তখন পুন্নাম নরকের দ্বারা খোলা দেখিয়া বৈদ্যনাথ বড়ো চিন্তিত হইলেন। মৃত্যুর পরে তাঁহার বিপুল ঐশ্বর্যই বা কে ভোগ করিবে এই ভাবনায় মৃত্যুর পূর্বে তিনি সেই ঐশ্বর্য ভোগ করিতে বিমুখ হইলেন। পূর্বেই বলিয়াছি, বর্তমানের অপেক্ষা ভবিষ্যৎটাকেই তিনি সত্য বলিয়া জানিতেন।
আরো দেখুন
দিন যায় রে
Songs
দিন যায় রে দিন যায় বিষাদে--
স্বার্থকোলাহলে, ছলনায়, বিফলা বাসনায় ॥
এসেছ ক্ষণতরে, ক্ষণপরে যাইবে চলে,
জনম কাটে বৃথায় বাদবিবাদে কুমন্ত্রণায় ॥
আরো দেখুন
নামঞ্জুর গল্প
Stories
আমাদের আসর জমেছিল পোলিটিক্যাল লঙ্কাকাণ্ডের পালায়। হাল আমলের উত্তরকাণ্ডে আমরা সম্পূর্ণ ছুটি পাই নি বটে, কিন্তু গলা ভেঙেছে; তা ছাড়া সেই অগ্নিদাহের খেলা বন্ধ।
বঙ্গভঙ্গের রঙ্গভূমিতে বিদ্রোহীর অভিনয় শুরু হল। সবাই জানেন, এই নাট্যের পঞ্চম অঙ্কের দৃশ্য আলিপুর পেরিয়ে পৌঁছল আণ্ডামানের সমুদ্রকূলে। পারানির পাথেয় আমার যথেষ্ট ছিল, তবু গ্রহের গুণে এপারের হাজতেই আমার ভোগসমাপ্তি। সহযোগীদের মধ্যে ফাঁসিকাঠ পর্যন্ত যাদের সর্বোচ্চ প্রোমোশন হয়েছিল, তাদের প্রণাম করে আমি পশ্চিমের এক শহরের কোণে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় পসার জমিয়ে তুললেম।
আরো দেখুন
মুনশি
Stories
আচ্ছা দাদামশায়, তোমাদের সেই মুনশিজি এখন কোথায় আছেন।
এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারব তার সময়টা বুঝি কাছে এসেছে, তবু হয়তো কিছুদিন সবুর করতে হবে।
আরো দেখুন
সদর ও অন্দর
Stories
বিপিনকিশোর ধনীগৃহে জন্মিয়াছিলেন, সেইজন্যে ধন যে পরিমাণে ব্যয় করিতে জানিতেন তাহার অর্ধেক পরিমাণেও উপার্জন করিতে শেখেন নাই। সুতরাং যে গৃহে জন্ম সে গৃহে দীর্ঘকাল বাস করা ঘটিল না।
সুন্দর সুকুমারমূর্তি তরুণ যুবক, গানবাজনায় সিদ্ধহস্ত, কাজকর্মে নিরতিশয় অপটু; সংসারের পক্ষে সম্পূর্ণ অনাবশ্যক। জীবনযাত্রার পক্ষে জগন্নাথদেবের রথের মতো অচল; যেরূপ বিপুল আয়োজনে চলিতে পারেন সেরূপ আয়োজন সম্প্রতি বিপিনকিশোরের আয়ত্তাতীত।
আরো দেখুন
উনিশ
Verses
তখন বয়স ছিল কাঁচা;
কতদিন মনে মনে এঁকেছি নিজের ছবি,
বুনো ঘোড়ার পিঠে সওয়ার,
জিন নেই, লাগাম নেই,
ছুটেছি ডাকাত-হানা মাঠের মাঝখান দিয়ে
ভরসন্ধ্যেবেলায়;
ঘোড়ার খুরে উড়ছে ধুলো
ধরণী যেন পিছু ডাকছে আঁচল দুলিয়ে।
আকাশে সন্ধ্যার প্রথম তারা
দূরে মাঠের সীমানায় দেখা যায়
একটিমাত্র ব্যগ্র বিরহী আলো একটি কোন্‌ ঘরে
নিদ্রাহীন প্রতীক্ষায়।
যে ছিল ভাবীকালে
আগে হতে মনের মধ্যে
ফিরছিল তারি আবছায়া,
যেমন ভাবী আলোর আভাস আসে
ভোরের প্রথম কোকিল-ডাকা অন্ধকারে।
তখন অনেকখানি সংসার ছিল অজানা,
আধ্‌জানা।
তাই অপরূপের রাঙা রঙটা
মনের দিগন্ত রেখেছিলে রাঙিয়ে;
আসন্ন ভালোবাসা
এনেছিল অঘটন-ঘটনার স্বপ্ন।
তখন ভালোবাসার যে কল্পরূপ ছিল মনে
তার সঙ্গে মহাকাব্যযুগের
দুঃসাহসের আনন্দ ছিল মিলিত।
এখন অনেক খবর পেয়েছি জগতের,
মনে ঠাওরেছি
সংসারের অনেকটাই মার্কামারা খবরের
মালখানা।
মনের রসনা থেকে
অজানার স্বাদ গেছে মরে,
অনুভবে পাইনে
ভালোবাসায় সম্ভবের মধ্যে
নিয়তই অসম্ভব,
জানার মধ্যে অজানা,
কথার মধ্যে রূপকথা।
ভুলেছি প্রিয়ার মধ্যে আছে সেই নারী,
যে থাকে সাত সমুদ্রের পারে,
সেই নারী আছে বুঝি মায়ার ঘুমে,
যার জন্যে খুঁজতে হবে সোনার কাঠি।
আরো দেখুন
হার-জিত
Verses
ভিমরুলে মৌমাছিতে হল রেষারেষি,
দুজনায় মহাতর্ক শক্তি কার বেশি।
ভিমরুল কহে, আছে সহস্র প্রমাণ
তোমার দংশন নহে আমার সমান।
মধুকর নিরুত্তর ছলছল-আঁখি--
বনদেবী কহে তারে কানে কানে ডাকি,
কেন বাছা, নতশির! এ কথা নিশ্চিত
বিষে তুমি হার মানো, মধুতে যে জিত।
আরো দেখুন
দেশ দেশ নন্দিত করি
Songs
          দেশ দেশ নন্দিত করি মন্দ্রিত তব ভেরী
          আসিল যত বীরবৃন্দ আসন তব ঘেরি।
          দিন আগত ওই,   ভারত তবু কই?
          সে কি রহিল লুপ্ত আজি সব-জন পশ্চাতে?
          লউক বিশ্বকর্মভার মিলি সবার সাথে।
প্রেরণ কর' ভৈরব তব দুর্জয় আহ্বান হে,   জাগ্রত ভগবান হে ॥
          বিঘ্নবিপদ দুঃখদহন তুচ্ছ করিল যারা
          মৃত্যুগহন পার হইল, টুটিল মোহকারা।
          দিন আগত ওই,   ভারত তবু কই?
          নিশ্চল নিবীর্যবাহু কর্মকীর্তিহীনে
          ব্যর্থশক্তি নিরানন্দ জীবনধনদীনে
প্রাণ দাও, প্রাণ দাও, দাও দাও প্রাণ হে,   জাগ্রত ভগবান হে ॥
          নূতনযুগসূর্য উঠিল, ছুটিল তিমিররাত্রি,
          তব মন্দির-অঙ্গন ভরি মিলিল সকল যাত্রী।
          দিন আগত ওই,   ভারত তবু কই?
          গতগৌরব, হৃত-আসন, নতমস্তক লাজে--
          গ্লানি তার মোচন কর' নরসমাজমাঝে।
স্থান দাও, স্থান দাও, দাও দাও স্থান হে,   জাগ্রত ভগবান হে ॥
          জনগণপথ তব জয়রথচক্রমুখর আজি,
          স্পন্দিত করি দিগ্‌দিগন্ত উঠিল শঙ্খ বাজি।
          দিন আগত ওই,   ভারত তবু কই?
          দৈন্যজীর্ণ কক্ষ তার, মলিন শীর্ণ আশা,
          ত্রাসরুদ্ধ চিত্ত তার, নাহি নাহি ভাষা।
কোটিমৌনকণ্ঠপূর্ণ বাণী কর' দান হে,   জাগ্রত ভগবান হে ॥
          যারা তব শক্তি লভিল নিজ অন্তরমাঝে
          বর্জিল ভয়, অর্জিল জয়, সার্থক হল কাজে।
          দিন আগত ওই,   ভারত তবু কই?
          আত্ম-অবিশ্বাস তার নাশ' কঠিন ঘাতে,
          পুঞ্জিত অবসাদভার হান' অশনিপাতে।
ছায়াভয়চকিতমূঢ় করহ পরিত্রাণ হে,   জাগ্রত ভগবান হে ॥
আরো দেখুন
তরুতলে ছিন্নবৃন্ত মালতীর ফুল
Songs
                  তরুতলে ছিন্নবৃন্ত মালতীর ফুল—
            মুদিয়া আসিছে আঁখি তার,  চাহিয়া দেখিল চারি ধার ।।
                  শুষ্ক তৃণরাশি-মাঝে একেলা পড়িয়া,
            চারি দিকে কেহ নাই আর— নিরদয় অসীম সংসার ।।
                  কে আছে গো দিবে তার তৃষিত অধরে
            একবিন্দু শিশিরের কণা— কেহ না, কেহ না ।।
            মধুকর কাছে এসে বলে,  ‘মধু কই। মধু চাই, চাই ।’
            ধীরে ধীরে নিশ্বাস ফেলিয়া  ফুল বলে, ‘কিছু নাই, নাই।’
            ‘ফুলবালা, পরিমল দাও’ বায়ু আসি কহিতেছে কাছে ।
            মলিন বদন ফিরাইয়া  ফুল বলে, ‘আর কী বা আছে।’
            মধ্যাহ্নকিরণ চারি দিকে  খরদৃষ্টে চেয়ে অনিমিখে—
                   ফুলটির মৃদু প্রাণ হায়,
                          ধীরে ধীরে শুকাইয়া যায় ।।
আরো দেখুন
14
Verses
                        ওঁ
                                      শান্তিনিকেতন
রানী ও প্রশান্ত
          বর্ষ পরে বর্ষ গেছে চ'লে
      ছন্দ গাঁথিয়াছি আমি তোমাদের মিলনমঙ্গলে।
      এবার দিনের অন্তে বিরল ভাষার আশীর্বাণী
          রবির স্নেহের স্পর্শ আনি
          পশ্চিমের ক্লান্ত রশ্মি হতে
যোগ দিল তোমাদের আনন্দিত গৃহের আলোতে।
                                                         কবি
আরো দেখুন
মুসলমানীর গল্প
Stories
তখন অরাজকতার চরগুলো কণ্টকিত করে রেখেছিল রাষ্ট্রশাসন, অপ্রত্যাশিত অত্যাচারের অভিঘাতে দোলায়িত হত দিন রাত্রি। দুঃস্বপ্নের জাল জড়িয়েছিল জীবনযাত্রার সমস্ত ক্রিয়াকর্মে, গৃহস্থ কেবলই দেবতার মুখ তাকিয়ে থাকত, অপদেবতার কাল্পনিক আশঙ্কায় মানুষের মন থাকত আতঙ্কিত। মানুষ হোক আর দেবতাই হোক কাউকে বিশ্বাস করা কঠিন ছিল, কেবলই চোখের জলের দোহাই পাড়তে হত। শুভ কর্ম এবং অশুভ কর্মের পরিণামের সীমারেখা ছিল ক্ষীণ। চলতে চলতে পদে পদে মানুষ হোঁচট খেয়ে খেয়ে পড়ত দুর্গতির মধ্যে।
এমন অবস্থায় বাড়িতে রূপসী কন্যার অভ্যাগম ছিল যেন ভাগ্যবিধাতার অভিসম্পাত। এমন মেয়ে ঘরে এলে পরিজনরা সবাই বলত 'পোড়ারমুখী বিদায় হলেই বাঁচি'। সেই রকমেরই একটা আপদ এসে জুটেছিল তিন-মহলার তালুকদার বংশীবদনের ঘরে।
আরো দেখুন
উৎসর্গ
Stories
শেষ পারানির খেয়ায় তুমি
    দিনশেষের নেয়ে
আরো দেখুন