এই করেছ ভালো, নিঠুর, এই করেছ ভালো। এমনি করে হৃদয়ে মোর তীব্র দহন জ্বালো। আমার এ ধূপ না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে, আমার এ দীপ না জ্বালালে দেয় না কিছুই আলো। যখন থাকে অচেতনে এ চিত্ত আমার আঘাত সে যে পরশ তব সেই তো পুরস্কার। অন্ধকারে মোহে লাজে চোখে তোমায় দেখি না যে, বজ্রে তোলো আগুন করে আমার যত কালো।
করিয়াছি বাণীর সাধনা দীর্ঘকাল ধরি, আজ তারে ক্ষণে ক্ষণে উপহাস পরিহাস করি। বহু ব্যবহার আর দীর্ঘ পরিচয় তেজ তার করিতেছে ক্ষয়। নিজেরে করিয়া অবহেলা নিজেরে নিয়ে সে করে খেলা। তবু জানি, অজানার পরিচয় আছিল নিহিত বাক্যে তার বাক্যের অতীত। সেই অজানার দূত আজি মোরে নিয়ে যায় দূরে, অকূল সিন্ধুরে নিবেদন করিতে প্রণাম, মন তাই বলিতেছে, আমি চলিলাম। সেই সিন্ধু-মাঝে সূর্য দিনযাত্রা করি দেয় সারা, সেথা হতে সন্ধ্যাতারা রাত্রিরে দেখায়ে আনে পথ যেথা তার রথ চলেছে সন্ধান করিবারে নূতন প্রভাত-আলো তমিস্রার পারে। আজ সব কথা, মনে হয়, শুধু মুখরতা। তারা এসে থামিয়াছে পুরাতন সে মন্ত্রের কাছে ধ্বনিতেছে যাহা সেই নৈঃশব্দ্যচূড়ায় সকল সংশয় তর্ক যে মৌনের গভীরে ফুরায়। লোকখ্যাতি যাহার বাতাসে ক্ষীণ হয়ে তুচ্ছ হয়ে আসে। দিনশেষে কর্মশালা ভাষা রচনার নিরুদ্ধ করিয়া দিক দ্বার। পড়ে থাক্ পিছে বহু আবর্জনা, বহু মিছে। বারবার মনে মনে বলিতেছি, আমি চলিলাম-- যেথা নাই নাম, যেখানে পেয়েছে লয় সকল বিশেষ পরিচয়, নাই আর আছে এক হয়ে যেথা মিশিয়াছে, যেখানে অখন্ড দিন আলোহীন অন্ধকারহীন, আমার আমির ধারা মিলে যেথা যাবে ক্রমে ক্রমে পরিপূর্ণ চৈতন্যের সাগরসংগমে। এই বাহ্য আবরণ, জানি না তো, শেষে নানা রূপে রূপান্তরে কালস্রোতে বেড়াবে কি ভেসে। আপন স্বাতন্ত্র৻ হতে নিঃসক্ত দেখিব তারে আমি বাহিরে বহুর সাথে জড়িত অজানা তীর্থগামী। আসন্ন বর্ষের শেষ। পুরাতন আমার আপন শ্লথবৃন্ত ফলের মতন ছিন্ন হয়ে আসিতেছে। অনুভব তারি আপনারে দিতেছে বিস্তারি আমার সকল-কিছু-মাঝে প্রচ্ছন্ন বিরাজে নিগূঢ় অন্তরে যেই একা, চেয়ে আছি পাই যদি দেখা। পশ্চাতের কবি মুছিয়া করিছে ক্ষীণ আপন হাতের আঁকা ছবি। সুদূর সম্মুখে সিন্ধু, নিঃশব্দ রজনী, তারি তীর হতে আমি আপনারি শুনি পদধ্বনি। অসীম পথের পান্থ, এবার এসেছি ধরা-মাঝে মর্তজীবনের কাজে। সে পথের 'পরে ক্ষণে ক্ষণে অগোচরে সকল পাওয়ার মধ্যে পেয়েছি অমূল্য উপাদেয় এমন সম্পদ যাহা হবে মোর অক্ষয় পাথেয়। মন বলে, আমি চলিলাম, রেখে যাই আমার প্রণাম তাঁদের উদ্দেশে যাঁরা জীবনের আলো ফেলেছেন পথে যাহা বারে বারে সংশয় ঘুচালো।
ধূমকেতু মাঝে মাঝে হাসির ঝাঁটায় দ্যুলোক ঝাঁটিয়ে নিয়ে কৌতুক পাঠায় বিস্মিত সূর্যের সভা ত্বরিতে পারায়ে-- পরিহাসচ্ছটা ফেলে সুদূরে হারায়ে, সৌর বিদূষক পায় ছুটি। আমার জীবনকক্ষে জানি না কী হেতু, মাঝে মাঝে এসে পড়ে খ্যাপা ধূমকেতু-- তুচ্ছ প্রলাপের পুচ্ছ শূন্যে দেয় মেলি, ক্ষণতরে কৌতুকের ছেলেখেলা খেলি নেড়ে দেয় গম্ভীরের ঝুঁটি। এ জগৎ মাঝে মাঝে কোন্ অবকাশে কখনো বা মৃদুস্মিত কভু উচ্চহাসে হেসে ওঠে, দেখা যায় আলোকে ঝলকে-- তারা কেহ ধ্রুব নয়, পলকে পলকে চিহ্ন তার নিয়ে যায় মুছে। তিমির-আসনে যবে ধ্যানমগ্ন রাতি উল্কাবরিষনকর্তা করে মাতামাতি-- দুই হাতে মুঠা মুঠা কৌতুকের কণা ছড়ায় হরির লুঠ, নাহি যায় গনা, প্রহর-কয়েক যায় ঘুচে। অনেক অদ্ভুত আছে এ বিশ্বসৃষ্টিতে, বিধাতার স্নেহ তাহে সহাস্য দৃষ্টিতে। তেমনি হালকা হাসি দেবতার দানে রয়েছে খচিত হয়ে আমার সম্মানে-- মূল্য তার মনে মনে জানি। এত বুড়ো কোনোকালে হব নাকো আমি হাসি-তামাশারে যবে কব ছ্যাব্লামি। এ নিয়ে প্রবীণ যদি করে রাগারাগি বিধাতার সাথে তারে করি ভাগাভাগি হাসিতে হাসিতে লব মানি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর