আমার খোকা করে গো যদি মনে এখনি উড়ে পারে সে যেতে পারিজাতের বনে। যায় না সে কি সাধে। মায়ের বুকে মাথাটি থুয়ে সে ভালোবাসে থাকিতে শুয়ে, মায়ের মুখ না দেখে যদি পরান তার কাঁদে। আমার খোকা সকল কথা জানে। কিন্তু তার এমন ভাষা, কে বোঝে তার মানে। মৌন থাকে সাধে? মায়ের মুখে মায়ের কথা শিখিতে তার কী আকুলতা, তাকায় তাই বোবার মতো মায়ের মুখচাঁদে। খোকার ছিল রতনমণি কত-- তবু সে এল কোলের 'পরে ভিখারীটির মতো। এমন দশা সাধে? দীনের মতো করিয়া ভান কাড়িতে চাহে মায়ের প্রাণ, তাই সে এল বসনহীন সন্ন্যাসীর ছাঁদে। খোকা যে ছিল বাঁধন-বাধা-হারা -- যেখানে জাগে নূতন চাঁদ ঘুমায় শুকতারা। ধরা সে দিল সাধে? অমিয়মাখা কোমল বুকে হারাতে চাহে অসীম সুখে, মুকতি চেয়ে বাঁধন মিঠা মায়ের মায়া-ফাঁদে। আমার খোকা কাঁদিতে জানিত না, হাসির দেশে করিত শুধু সুখের আলোচনা। কাঁদিতে চাহে সাধে? মধুমুখের হাসিটি দিয়া টানে সে বটে মায়ের হিয়া, কান্না দিয়ে ব্যথার ফাঁসে দ্বিগুণ বলে বাঁধে।
ধূমকেতু মাঝে মাঝে হাসির ঝাঁটায় দ্যুলোক ঝাঁটিয়ে নিয়ে কৌতুক পাঠায় বিস্মিত সূর্যের সভা ত্বরিতে পারায়ে-- পরিহাসচ্ছটা ফেলে সুদূরে হারায়ে, সৌর বিদূষক পায় ছুটি। আমার জীবনকক্ষে জানি না কী হেতু, মাঝে মাঝে এসে পড়ে খ্যাপা ধূমকেতু-- তুচ্ছ প্রলাপের পুচ্ছ শূন্যে দেয় মেলি, ক্ষণতরে কৌতুকের ছেলেখেলা খেলি নেড়ে দেয় গম্ভীরের ঝুঁটি। এ জগৎ মাঝে মাঝে কোন্ অবকাশে কখনো বা মৃদুস্মিত কভু উচ্চহাসে হেসে ওঠে, দেখা যায় আলোকে ঝলকে-- তারা কেহ ধ্রুব নয়, পলকে পলকে চিহ্ন তার নিয়ে যায় মুছে। তিমির-আসনে যবে ধ্যানমগ্ন রাতি উল্কাবরিষনকর্তা করে মাতামাতি-- দুই হাতে মুঠা মুঠা কৌতুকের কণা ছড়ায় হরির লুঠ, নাহি যায় গনা, প্রহর-কয়েক যায় ঘুচে। অনেক অদ্ভুত আছে এ বিশ্বসৃষ্টিতে, বিধাতার স্নেহ তাহে সহাস্য দৃষ্টিতে। তেমনি হালকা হাসি দেবতার দানে রয়েছে খচিত হয়ে আমার সম্মানে-- মূল্য তার মনে মনে জানি। এত বুড়ো কোনোকালে হব নাকো আমি হাসি-তামাশারে যবে কব ছ্যাব্লামি। এ নিয়ে প্রবীণ যদি করে রাগারাগি বিধাতার সাথে তারে করি ভাগাভাগি হাসিতে হাসিতে লব মানি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর