কার পানে মা, চেয়ে আছ মেলি দুটি করুণ আঁখি। কে ছিঁড়েছে ফুলের পাতা, কে ধরেছে বনের পাখি। কে কারে কী বলেছে গো, কার প্রাণে বেজেছে ব্যথা-- করুণায় যে ভরে এল দুখানি তোর আঁখির পাতা। খেলতে খেলতে মায়ের আমার আর বুঝি হল না খেলা। ফুলের গুচ্ছ কোলে প'ড়ে-- কেন মা এ হেলাফেলা। অনেক দুঃখ আছে হেথায়, এ জগৎ যে দুঃখে ভরা-- তোমার দুটি আঁখির সুধায় জুড়িয়ে গেল নিখিল ধরা। লক্ষ্মী আমায় বল্ দেখি মা, লুকিয়ে ছিলি কোন্ সাগরে। সহসা আজ কাহার পুণ্যে উদয় হলি মোদের ঘরে। সঙ্গে করে নিয়ে এলি হৃদয়-ভরা স্নেহের সুধা, হৃদয় ঢেলে মিটিয়ে যাবি এ জগতের প্রেমের ক্ষুধা। থামো, থামো, ওর কাছেতে ক'য়ো না কেউ কঠোর কথা, করুণ আঁখির বালাই নিয়ে কেউ কারে দিয়ো না ব্যথা। সইতে যদি না পারে ও, কেঁদে যদি চলে যায়-- এ-ধরণীর পাষাণ-প্রাণে ফুলের মতো ঝরে যায়। ও যে আমার শিশিরকণা, ও যে আমার সাঁঝের তারা-- কবে এল কবে যাবে এই ভয়তে হই রে সারা।
কে তুমি দিয়েছ স্নেহ মানবহৃদয়ে, কে তুমি দিয়েছ প্রিয়জন! বিরহের অন্ধকারে কে তুমি কাঁদাও তারে, তুমি কেন গো সাথে কর না ক্রন্দন! প্রাণ যাহা চায় তাহা দাও বা না দাও, তা বলে কি করুণা পাব না? দুর্লভ ধনের তরে শিশু কাঁদে সকাতরে, তা বলে কি জননীর বাজে না বেদনা? দুর্বল মানব-হিয়া বিদীর্ণ যেথায়, মর্মভেদী যন্ত্রণা বিষম, জীবন নির্ভরহারা ধুলায় লুটায়ে সারা, সেথাও কেন গো তব কঠিন নিয়ম। সেথাও জগৎ তব চিরমৌনী কেন, নাহি দেয় আশ্বাসের সুখ। ছিন্ন করি অন্তরাল অসীম রহস্যজাল কেন না প্রকাশ পায় গুপ্ত স্নেহমুখ! ধরণী জননী কেন বলিয়া উঠে না --করুণমর্মর কণ্ঠস্বর-- "আমি শুধু ধূলি নই, বৎস, আমি প্রাণময়ী জননী, তোদের লাগি অন্তর কাতর। "নহ তুমি পরিত্যক্ত অনাথ সন্তান চরাচর নিখিলের মাঝে; তোমার ব্যাকুল স্বর উঠিছে আকাশ-'পর, তারায় তারায় তার ব্যথা গিয়ে বাজে।" কাল ছিল প্রাণ জুড়ে, আজ কাছে নাই-- নিতান্ত সামান্য এ কি নাথ? তোমার বিচিত্র ভবে কত আছে কত হবে, কোথাও কি আছে প্রভু, হেন বজ্রপাত? আছে সেই সূর্যালোক, নাই সেই হাসি-- আছে চাঁদ, নাই চাঁদমুখ। শূন্য পড়ে আছে গেহ, নাই কেহ, নাই কেহ-- রয়েছে জীবন, নেই জীবনের সুখ। সেইটুকু মুখখানি, সেই দুটি হাত, সেই হাসি অধরের ধারে, সে নহিলে এ জগৎ শুষ্ক মরুভূমিবৎ-- নিতান্ত সামান্য এ কি এ বিশ্বব্যাপারে? এ আর্তস্বরের কাছে রহিবে অটুট চৌদিকের চিরনীরবতা? সমস্ত মানবপ্রাণ বেদনায় কম্পমান নিয়মের লৌহবক্ষে বাজিবে না ব্যথা!