দিন পরে যায় দিন, স্তব্ধ বসে থাকি; ভাবি মনে, জীবনের দান যত কত তার বাকি চুকায়ে সঞ্চয় অপচয়। অযত্নে কী হয়ে গেছে ক্ষয়, কী পেয়েছি প্রাপ্য যাহা, কী দিয়েছি যাহা ছিল দেয়, কী রয়েছে শেষের পাথেয়। যারা কাছে এসেছিল, যারা চলে গিয়েছিল দূরে, তাদের পরশখানি রয়ে গেছে মোর কোন্ সুরে। অন্যমনে কারে চিনি নাই, বিদায়ের পদধ্বনি প্রাণে আজি বাজিছে বৃথাই। হয়তো হয় নি জানা ক্ষমা করে কে গিয়েছে চলে কথাটি না ব'লে। যদি ভুল করে থাকি তাহার বিচার ক্ষোভ কি রাখিবে তবু যখন রব না আমি আর। কত সূত্র ছিন্ন হল জীবনের আস্তরণময়, জোড়া লাগাবারে আর রবে না সময়। জীবনের শেষপ্রান্তে যে প্রেম রয়েছে নিরবধি মোর কোনো অসম্মান তাহে ক্ষতচিহ্ন দেয় যদি, আমার মৃত্যুর হস্ত আরোগ্য আনিয়া দিক তারে, এ কথাই ভাবি বারে বারে।
আমার এ গান শুনবে তুমি যদি শোনাই কখন বলো। ভরা চোখের মতো যখন নদী করবে ছলছল, ঘনিয়ে যখন আসবে মেঘের ভার বহু কালের পরে, না যেতে দিন সজল অন্ধকার নামবে তোমার ঘরে, যখন তোমার কাজ কিছু নেই হাতে, তবুও বেলা আছে, সাথি তোমার আসত যারা রাতে আসে নি কেউ কাছে, তখন আমায় মনে পড়ে যদি গাইতে যদি বল-- নবমেঘের ছায়ায় যখন নদী করবে ছলছল। ম্লান আলোয় দখিন-বাতায়নে বসবে তুমি একা-- আমি গাব বসে ঘরের কোণে, যাবে না মুখ দেখা। ফুরাবে দিন, আঁধার ঘন হবে, বৃষ্টি হবে শুরু-- উঠবে বেজে মৃদুগভীর রবে মেঘের গুরুগুরু। ভিজে পাতার গন্ধ আসবে ঘরে, ভিজে মাটির বাস-- মিলিয়ে যাবে বৃষ্টির ঝর্ঝরে বনের নিশ্বাস। বাদল-সাঁঝে আঁধার বাতায়নে বসবে তুমি একা-- আমি গেয়ে যাব আপন-মনে, যাবে না মুখ দেখা। জলের ধারা ঝরবে দ্বিগুণ বেগে, বাড়বে অন্ধকার-- নদীর ধারে বনের সঙ্গে মেঘে ভেদ রবে না আর। কাঁসর ঘণ্টা দূরে দেউল হতে জলের শব্দে মিশে আঁধার পথে ঝোড়ো হাওয়ার স্রোতে ফিরবে দিশে দিশে। শিরীষফুলের গন্ধ থেকে থেকে আসবে জলের ছাঁটে, উচ্চরবে পাইক যাবে হেঁকে গ্রামের শূন্য বাটে। জলের ধারা ঝরবে বাঁশের বনে, বাড়বে অন্ধকার-- গানের সাথে বাদলা রাতের সনে ভেদ রবে না আর। ও ঘর হতে যবে প্রদীপ জ্বেলে আনবে আচম্বিত সেতারখানি মাটির 'পরে ফেলে থামাব মোর গীত। হঠাৎ যদি মুখ ফিরিয়ে তবে চাহ আমার পানে এক নিমিষে হয়তো বুঝে লবে কী আছে মোর গানে। নামায়ে মুখ নয়ন করে নিচু বাহির হয়ে যাব, একলা ঘরে যদি কোনো-কিছু আপন-মনে ভাব। থামিয়ে গান আমি চলে গেলে যদি আচম্বিত বাদল-রাতে আঁধারে চোখ মেলে শোন আমার গীত।