আমায় যদি মনটি দেবে দিয়ো, দিয়ো মন-- মনের মধ্যে ভাবনা কিন্তু রেখো সারাক্ষণ। খোলা আমার দুয়ারখানা, ভোলা আমার প্রাণ-- কখন যে কার আনাগোনা নইকো সাবধান। পথের ধারে বাড়ি আমার, থাকি গানের ঝোঁকে-- বিদেশী সব পথিক এসে যেথা-সেথাই ঢোকে। ভাঙে কতক, হারায় কতক যা আছে মোর দামি-- এমনি ক'রে একে একে সর্বস্বান্ত আমি। আমায় যদি মনটি দেবে দিয়ো, দিয়ো মন-- মনের মধ্যে ভাবনা কিন্তু রেখো সারাক্ষণ। আমায় যদি মনটি দেবে নিষেধ তাহে নাই, কিছুর তরে আমায় কিন্তু কোরো না কেউ দায়ী। ভুলে যদি শপথ ক'রে বলি কিছু কবে, সেটা পালন না করি তো মাপ করিতেই হবে। ফাগুন মাসে পূর্ণিমাতে যে নিয়মটা চলে রাগ কোরো না চৈত্র মাসে সেটা ভন্গ হলে। কোনো দিন বা পূজার সাজি কুসুমে হয় ভরা, কোনো দিন বা শূন্য থাকে-- মিথ্যা সে দোষ ধরা। আমায় যদি মনটি দেবে নিষেধ তাহে নাই, কিছুর তরে আমায় কিন্তু কোরো না কেউ দায়ী। আমায় যদি মনটি দেবে রাখিয়া যাও তবে, দিয়েছ যে সেটা কিন্তু ভুলে থাকতে হবে। দুটি চক্ষে বাজবে তোমার নবরাগের বাঁশি, কণ্ঠে তোমার উচ্ছ্বসিয়া উঠবে হাসিরাশি। প্রশ্ন যদি শুধাও কভু মুখটি রাখি বুকে, মিথ্যা কোনো জবাব পেলে হেসো সকৌতুকে। যে দুয়ারটা বন্ধ থাকে বন্ধ থাকতে দিয়ো, আপনি যাহা এসে পড়ে তাহাই হেসে নিয়ো। আমায় যদি মনটি দেবে, রাখিয়া যাও তবে-- দিয়েছ যে সেটা কিন্তু ভুলে থাকতে হবে।
সত্য মোর অবলিপ্ত সংসারের বিচিত্র প্রলেপে, বিবিধের বহু হস্তক্ষেপে, অযত্নে অনবধানে হারালো প্রথম রূপ,দেবতার আপন স্বাক্ষর লুপ্তপ্রায়-- ক্ষয়ক্ষীণ জ্যোতির্ময় আদিমূল্য তার। চতুষ্পথে দাঁড়াল সে ললাটে পণ্যের ছাপ নিয়ে আপনারে বিকাইতে-- অঙ্কিত হতেছে তার স্থান পথে-চলা সহস্রের পরীক্ষাচিহ্নিত তালিকায়। হেনকালে একদিন আলো-আঁধারের সন্ধিস্থলে আরতিশঙ্খের ধ্বনি যে লগ্নে বাজিল সিন্ধুপারে, মনে হল, মুহূর্তেই থেমে গেল সব বেচাকেনা, শান্ত হল আশাপ্রত্যাশার কোলাহল। মনে হল, পরের মুখের মূল্য হতে মুক্ত, সব চিহ্ন-মোছা অসজ্জিত আদিকৌলীন্যের শান্ত পরিচয় বহি যেতে হবে নীরবের ভাষাহীন সংগীতমন্দিরে একাকীর একতারা হাতে। আদিমসৃষ্টির যুগে প্রকাশের যে আনন্দ রূপ নিল আমার সত্তায় আজ ধূলিমগ্ন তাহা, নিদ্রাহারা রুগ্ণ বুভুক্ষার দীপধূমে কলঙ্কিত। তারে ফিরে নিয়ে চলিয়াছি মৃত্যু স্নানতীর্থতটে সেই আদি নির্ঝরতলায়। বুঝি এই যাত্রা মোর স্বপ্নের অরণ্যবীথিপারে পূর্ব ইতিহাস-ধৌত অকলঙ্ক প্রথমের পানে-- যে প্রথম বারে বারে ফিরে আসে বিশ্বের সৃষ্টিতে কখনো বা অগ্নিবর্ষী প্রচণ্ডের প্রলয়হুংকারে, কখনো বা অকস্মাৎ স্বপ্নভাঙা পরম বিস্ময়ে শুকতারানিমন্ত্রিত আলোকের উৎসবপ্রাঙ্গণে।