দাও-না ছুটি, কেমন করে বুঝিয়ে বলি কোন্খানে। যেখানে ওই শিরীষবনের গন্ধপথে মৌমাছিদের কাঁপছে ডানা সারাবেলা। যেখানেতে মেঘ-ভাসা ওই সুদূরতা, জলের প্রলাপ যেখানে প্রাণ উদাস করে সন্ধ্যাতারা ওঠার মুখে, যেখানে সব প্রশ্ন গেছে থেমে-- শূন্য ঘরে অতীত স্মৃতি গুন্গুনিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে রাখে না আর বাদলরাতে। যেখানে এই মন গোরুচরা মাঠের মধ্যে স্তব্ধ বটের মতো গাঁয়ে-চলা পথের পাশে। কেউ বা এসে প্রহরখানেক বসে তলায়, পা ছড়িয়ে কেউ বা বাজায় বাঁশি, নববধূর পাল্কিখানা নামিয়ে রাখে ক্লান্ত দুই পহরে; কৃষ্ণ-একাদশীর রাতে ছায়ার সঙ্গে ঝিল্লিরবে জড়িয়ে পড়ে চাঁদের শীর্ণ আলো। যাওয়া-আসার স্রোত বহে যায় দিনে রাতে-- ধরে-রাখার নাই কোনো আগ্রহ, দূরে রাখার নাই তো অভিমান। রাতের তারা স্বপ্নপ্রদীপখানি ভোরের আলোয় ভাসিয়ে দিয়ে যায় চলে, তার দেয় না ঠিকানা।
কথা কও, কথা কও। অনাদি অতীত, অনন্ত রাতে কেন বসে চেয়ে রও? কথা কও, কথা কও। যুগযুগান্ত ঢালে তার কথা তোমার সাগরতলে, কত জীবনের কত ধারা এসে মিশায় তোমার জলে। সেথা এসে তার স্রোত নাহি আর, কলকল ভাষ নীরব তাহার-- তরঙ্গহীন ভীষণ মৌন, তুমি তারে কোথা লও! হে অতীত, তুমি হৃদয়ে আমার কথা কও, কথা কও। কথা কও, কথা কও। স্তব্ধ অতীত, হে গোপনচারী, অচেতন তুমি নও-- কথা কেন নাহি কও! তব সঞ্চার শুনেছি আমার মর্মের মাঝখানে, কত দিবসের কত সঞ্চয় রেখে যাও মোর প্রাণে! হে অতীত, তুমি ভুবনে ভুবনে কাজ করে যাও গোপনে গোপনে, মুখর দিনের চপলতা-মাঝে স্থির হয়ে তুমি রও। হে অতীত, তুমি গোপনে হৃদয়ে কথা কও, কথা কও। কথা কও, কথা কও। কোনো কথা কভু হারাও নি তুমি, সব তুমি তুলে লও-- কথা কও, কথা কও। তুমি জীবনের পাতায় পাতায় অদৃশ্য লিপি দিয়া পিতামহদের কাহিনী লিখিছ মজ্জায় মিশাইয়া। যাহাদের কথা ভুলেছে সবাই তুমি তাহাদের কিছু ভোল নাই, বিস্মৃত যত নীরব কাহিনী স্তম্ভিত হয়ে বও। ভাষা দাও তারে হে মুনি অতীত, কথা কও, কথা কও।