এই লেখনগুলি সুরু হয়েছিল চীনে জাপানে। পাখায় কাগজে রুমালে কিছু লিখে দেবার জন্যে লোকের অনুরোধে এর উৎপত্তি। তারপরে স্বদেশে ও অন্য দেশেও তাগিদ পেয়েছি। এমনি ক'রে এই টুকরো লেখাগুলি জমে উঠ্ল। এর প্রধান মূল্য হাতের অক্ষরে ব্যক্তিগত পরিচয়ের । সে পরিচয় কেবল অক্ষরে কেন, দ্রুতলিখিত ভাবের মধ্যেও ধরা পড়ে। ছাপার অক্ষরে সেই ব্যক্তিগত সংস্রবটি নষ্ট হয়-- সে অবস্থায় এই সব লেখা বাতি-নেবা চীন লণ্ঠনের মতো হাল্কা ও ব্যর্থ হতে পারে। তাই জর্ম্মনিতে হাতের অক্ষর ছাপবার উপায় আছে খবর পেয়ে লেখনগুলি ছাপিয়ে নেওয়া গেল। অন্যমনস্কতায় কাটাকুটি ভুলচুক ঘটেছে। সে সব ত্রুটিতেও ব্যক্তিগত পরিচয়েরই আভাস রয়ে গেল॥ শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একদিন তরীখানা থেমেছিল এই ঘাটে লেগে, বসন্তের নূতন হাওয়ার বেগে। তোমরা শুধায়েছিলে মোরে ডাকি পরিচয় কোনো আছে নাকি, যাবে কোন্খানে। আমি শুধু বলেছি, কে জানে। নদীতে লাগিল দোলা, বাঁধনে পড়িল টান, একা বসে গাহিলাম যৌবনের বেদনার গান। সেই গান শুনি কুসুমিত তরুতলে তরুণতরুণী তুলিল অশোক, মোর হাতে দিয়ে তারা কহিল, "এ আমাদেরই লোক।' আর কিছু নয়, সে মোর প্রথম পরিচয়।
তার পরে জোয়ারের বেলা সাঙ্গ হল, সাঙ্গ হল তরঙ্গের খেলা; কোকিলের ক্লান্ত গানে বিস্মৃত দিনের কথা অকস্মাৎ যেন মনে আনে; কনকচাঁপার দল পড়ে ঝুরে, ভেসে যায় দূরে-- ফাল্গুনের উৎসবরাতির নিমন্ত্রণলিখন-পাঁতির ছিন্ন অংশ তারা অর্থহারা। ভাঁটার গভীর টানে তরীখানা ভেসে যায় সমুদ্রের পানে। নূতন কালের নব যাত্রী ছেলেমেয়ে শুধাইছে দূর হতে চেয়ে, "সন্ধ্যার তারার দিকে বহিয়া চলেছে তরণী কে।' সেতারেতে বাঁধিলাম তার, গাহিলাম আরবার-- মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক আর কিছু নয়, এই হোক শেষ পরিচয়।