এ প্রাণ, রাতের রেলগাড়ি, দিল পাড়ি-- কামরায় গাড়িভরা ঘুম, রজনী নিঝুম। অসীম আঁধারে কালি-লেপা কিছুনয় মনে হয় যারে নিদ্রার পারে রয়েছে সে পরিচয়হারা দেশে। ক্ষণ-আলো ইঙ্গিতে উঠে ঝলি, পার হয়ে যায় চলি অজানার পরে অজানায়, অদৃশ্য ঠিকানায়। অতিদূর-তীর্থের যাত্রী, ভাষাহীন রাত্রি, দূরের কোথা যে শেষ ভাবিয়া না পাই উদ্দেশ। চালায় যে নাম নাহি কয়; কেউ বলে, যন্ত্র সে, আর কিছু নয়। মনোহীন বলে তারে, তবু অন্ধের হাতে প্রাণমন সঁপি দিয়া বিছানা সে পাতে। বলে, সে অনিশ্চিত, তবু জানে অতি নিশ্চিত তার গতি। নামহীন যে অচেনা বার বার পার হয়ে যায় অগোচরে যারা সবে রয়েছে সেথায়, তারি যেন বহে নিশ্বাস, সন্দেহ-আড়ালেতে মুখ-ঢাকা জাগে বিশ্বাস। গাড়ি চলে, নিমেষ বিরাম নাই আকাশের তলে। ঘুমের ভিতরে থাকে অচেতনে কোন্ দূর প্রভাতের প্রত্যাশা নিদ্রিত মনে।
দেখিলাম খানকয়েক পুরাতন চিঠি-- স্নেহমুগ্ধ জীবনের চিহ্ন দু-চারিটি স্মৃতির খেলনা-ক'টি বহু যত্নভরে গোপনে সঞ্চয় করি রেখেছিলে ঘরে। যে প্রবল কালস্রোতে প্রলয়ের ধারা ভাসাইয়া যায় কত রবিচন্দ্রতারা, তারি কাছ হতে তুমি বহু ভয়ে ভয়ে এই ক'টি তুচ্ছ বস্তু চুরি করে লয়ে লুকায়ে রাখিয়াছিলে, বলেছিলে মনে, "অধিকার নাই কারো আমার এ ধনে'। আশ্রয় আজিকে তারা পাবে কার কাছে? জগতের কারো নয়, তবু তারা আছে। তাদের যেমন তব রেখেছিল স্নেহ, তোমারে তেমনি আজ রাখে নি কি কেহ?