মিছে ডাকো--মন বলে, আজ না-- গেল উৎসবরাতি, ম্লান হয়ে এল বাতি, বাজিল বিসর্জন-বাজনা। সংসারে যা দেবার মিটিয়ে দিনু এবার, চুকিয়ে দিয়েছি তার খাজনা। শেষ আলো, শেষ গান, জগতের শেষ দান নিয়ে যাব--আজ কোনো কাজ না। বাজিল বিসর্জন-বাজনা।
ফুল ছিঁড়ে লয় হাওয়া, সে পাওয়া মিথ্যে পাওয়া-- আনমনে তার পুষ্পের ভার ধুলায় ছড়িয়ে যাওয়া। যে সেই ধুলার ফুলে হার গেঁথে লয় তুলে হেলায় সে ধন হয় যে ভূষণ তাহারি মাথার চুলে। শুধায়ো না মোর গান কারে করেছিনু দান-- পথধুলা-'পরে আছে তারি তরে যার কাছে পাবে মান।
আমার ঘরের আশেপাশে যে-সব আমার বোবা-বন্ধু আলোর প্রেমে মত্ত হয়ে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে তাদের ডাক আমার মনের মধ্যে পৌঁছল। তাদের ভাষা হচ্ছে জীবজগতের আদিভাষা, তার ইশারা গিয়ে পোঁছয় প্রাণের প্রথমতম স্তরে; হাজার হাজার বৎসরের ভুলে-যাওয়া ইতিহাসকে নাড়া দেয়; মনের মধ্যে যে-সাড়া ওঠে সেও ঐ গাছের ভাষায়-- তার কোনো স্পষ্ট মানে নেই, অথচ তার মধ্যে বহু যুগযুগান্তর গুনগুনিয়ে ওঠে। ঐ গাছগুলো বিশ্ববাউলের একতারা, ওদের মজ্জায় মজ্জায় সরল সুরের কাঁপন, ওদের ডালে ডালে পাতায় পাতায় একতালা ছন্দের নাচন। যদি নিস্তব্ধ হয়ে প্রাণ দিয়ে শুনি তা হলে অন্তরের মধ্যে মুক্তির বাণী এসে লাগে। মুক্তি সেই বিরাট প্রাণসমুদ্রের কূলে, যে-সমুদ্রের উপরের তলায় সুন্দরের লীলা রঙে রঙে তরঙ্গিত, আর গভীরতলে "শান্তম্ শিবম্ অদ্বৈতম্'। সেই সুন্দরের লীলায় লালসা নেই, আবেশ নেই, জড়তা নেই, কেবল পরমা শক্তির নিঃশেষ আনন্দের আন্দোলন। "এতস্যৈবানন্দস্য মাত্রাণি' দেখি ফুলে ফলে পল্লবে; তাতেই মুক্তির স্বাদ পাই, বিশ্বব্যাপী প্রাণের সঙ্গে প্রাণের নির্মল অবাধ মিলনের বাণী শুনি।