প্রত্যুষে দেখিনু আজ নির্মল আলোকে নিখিলের শান্তি-অভিষেক, তরুগুলি নম্রশিরে ধরণীর নমস্কার করিল প্রচার। যে শান্তি বিশ্বের মর্মে ধ্রুব প্রতিষ্ঠিত, রক্ষা করিয়াছে তারে যুগ-যুগান্তের যত আঘাতে সংঘাতে। বিক্ষুব্ধ এ মর্তভূমে নিজের জানায় আবির্ভাব দিবসের আরম্ভে ও শেষে। তারি পত্র পেয়েছ তো কবি, মাঙ্গলিক। সে যদি অমান্য করে বিদ্রূপের বাহক সাজিয়া বিকৃতির সভাসদ্রূপে চিরনৈরাশ্যের দূত, ভাঙা যন্ত্রে বেসুর ঝংকারে ব্যঙ্গ করে এ বিশ্বের শাশ্বত সত্যেরে, তবে তার কোন্ আবশ্যক। শস্যক্ষেত্রে কাঁটাগাছ এসে অপমান করে কেন মানুষের অন্নের ক্ষুধারে। রুগ্ন যদি রোগেরে চরম সত্য বলে, তাহা নিয়ে স্পর্ধা করা লজ্জা বলে জানি-- তার চেয়ে বিনা বাক্যে আত্মহত্যা ভালো। মানুষের কবিত্বই হবে শেষে কলঙ্কভাজন অসংস্কৃত যদৃচ্ছের পথে চলি। মুখশ্রীর করিবে কি প্রতিবাদ মুখোশের নির্লজ্জ নকলে।
আমার মনে একটুও নেই বৈকুন্ঠের আশা।-- ওইখানে মোর বাসা যে মাটিতে শিউরে ওঠে ঘাস, যার 'পরে ওই মন্ত্র পড়ে দক্ষিনে বাতাস। চিরদিনের আলোক-জ্বালা নীল আকাশের নীচে যাত্রা আমার নৃত্যপাগল নটরাজের পিছে। ফুল ফোটাবার যে রাগিণী বকুল শাখায় সাধা, নিষ্কারণে ওড়ার আবেগ চিলের পাখায় বাঁধা, সেই দিয়েছে রক্তে আমার ঢেউয়ের দোলাদুলি; স্বপ্নলোকে সেই উড়েছে সুরের পাখনা তুলি। দায়-ভোলা মোর মন মন্দে-ভালোয় সাদায়-কালোয় অঙ্কিত প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে গেছে দূর দিগন্ত-পানে আপন বাঁশির পথ-ভোলানো তানে। দেখা দিল দেহের অতীত কোন্ দেহ এই মোর ছিন্ন করি বস্তুবাঁধন-ডোর। শুধু কেবল বিপুল অনুভূতি, গভীর হতে বিচ্ছুরিত আনন্দময় দ্যুতি, শুধু কেবল গানেই ভাষা যার, পুষ্পিত ফাল্গুনের ছন্দে গন্ধে একাকার; নিমেষহারা চেয়ে-থাকার দূর অপারের মাঝে ইঙ্গিত যার বাজে। যে দেহেতে মিলিয়ে আছে অনেক ভোরের আলো, নাম-না-জানা অপূর্বেরে যার লেগেছে ভালো, যে দেহেতে রূপ নিয়েছে অনির্বচনীয় সকল প্রিয়ের মাঝখানে যে প্রিয়, পেরিয়ে মরণ সে মোর সঙ্গে যাবে-- কেবল রসে, কেবল সুরে, কেবল অনুভাবে।