তোমায় আমি দেখি নাকো, শুধু তোমার স্বপ্ন দেখি -- তুমি আমায় বারে বারে শুধাও, "ওগো, সত্য সে কি?' কী জানি গো, হয়তো বুঝি তোমার মাঝে কেবল খুঁজি এই জনমের রূপের তলে আর-জনমের ভাবের স্মৃতি। হয়তো হেরি তোমার চোখে আদিযুগের ইন্দ্রলোকে শিশুচাঁদের পথ-ভোলানো পারিজাতের ছায়াবীথি। এই কূলেতে ডাকি যখন সাড়া যে দাও সেই ওপারে, পরশ তোমার ছাড়িয়ে কায়া বাজে মায়ার বীণার তারে। হয়তো হবে সত্য তাই, হয়তো তোমার স্বপন, আমার আপন মনের মত্ততাই। আমি বলি স্বপ্ন যাহা তার চেয়ে কি সত্য আছে। যে তুমি মোর দূরের মানুষ সেই তুমি মোর কাছের কাছে। সেই তুমি আর নও তো বাঁধন, স্বপ্নরূপে মুক্তিসাধন, ফুলের সাথে তারার সাথে তোমার সাথে সেথায় মেলা। নিত্যকালের বিদেশিনী, তোমায় চিনি, নাই বা চিনি, তোমার লীলায় ঢেউ তুলে যায় কভু সোহাগ, কভু হেলা। চিত্তে তোমার মূর্তি নিয়ে ভাবসাগরের খেয়ায় চড়ি। বিধির মনের কল্পনারে আপন মনে নতুন গড়ি। আমার কাছে সত্য তাই, মন-ভরানো পাওয়ায় ভরা বাইরে-পাওয়ার ব্যর্থতাই। আপনি তুমি দেখেছ কি আপন-মাঝে সত্য কী যে। দিতে যদি চাও তা কারে, দিতে কি তাই পারো নিজে। হয়তো তারে দুঃখদিনে অগ্নি-আলোয় পাবে চিনে, তখন তোমার নিবিড় বেদন নিবেদনের জ্বালবে শিখা। অমৃত যে হয় নি মথন, তাই তোমাতে এই অযতন; তাই তোমারে ঘিরে আছে ছলন-ছায়ার কুহেলিকা। নিত্যকালের আপন তোমায় লুকিয়ে বেড়ায় মিথ্যা সাজে, ক্ষণে ক্ষণে ধরা পড়ে শুধু আমার স্বপন-মাঝে। আমি জানি সত্য তাই -- মরণ-দুঃখে অমর জাগে, অমৃতেরই তত্ত্ব তাই। পুষ্পমালার গ্রন্থিখানা অনাদরে পড়ুক ছিঁড়ে, ফুরাক বেলা, জীর্ণ খেলা হারাক হেলাফেলার ভিড়ে। ছল করে যা পিছু ডাকে পিছন ফিরে চাস নে তাকে, ডাকে না যে যাবার বেলায় যাস নে তাহার পিছে পিছে। যাওয়া- আসা-পথের ধুলায় চপল পায়ের চিহ্নগুলায় গ'নে গ'নে আপন মনে কাটাস নে দিন মিছে মিছে। কী হবে তোর বোঝাই করে ব্যর্থ দিনের আবর্জনা; স্বপ্ন শুধুই মর্তে অমর, আর সকলই বিড়ম্বনা। নিত্য প্রাণের সত্য তাই -- প্রাণ দিয়ে তুই রচিস যারে, অসীম পথের পথ্য তাই।
রাজার মতো বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে পরাও যারে মণিরতন-হার-- খেলাধুলা আনন্দ তার সকলি যায় ঘুরে, বসন-ভুষণ হয় যে বিষম ভার। ছেঁড়ে পাছে আঘাত লাগি, পাছে ধুলায় হয় সে দাগি, আপনাকে তাই সরিয়ে রাখে সবার হতে দূরে, চলতে গেলে ভাবনা ধরে তার-- রাজার মতো বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে, পরাও যারে মণিরতন-হার। কী হবে মা অমনতরো রাজার মতো সাজে, কী হবে ওই মণিরতন-হারে। দুয়ার খুলে দাও যদি তো ছুটি পথের মাঝে রৌদ্রবায়ু-ধুলাকাদার পাড়ে। যেথায় বিশ্বজনের মেলা সমস্ত দিন নানান খেলা, চারি দিকে বিরাট গাথা বাজে হাজার সুরে, সেথায় সে যে পায় না অধিকার, রাজার মতো বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে, পরাও যারে মণিরতন-হার।
মনে পড়ে, ছেলেবেলায় যে বই পেতুম হাতে ঝুঁকে পড়ে যেতুম পড়ে তাহার পাতে পাতে। কিছু বুঝি, নাই বা কিছু বুঝি, কিছু না হোক পুঁজি, হিসাব কিছু না থাক্ নিয়ে লাভ অথবা ক্ষতি, অল্প তাহার অর্থ ছিল, বাকি তাহার গতি। মনের উপর ঝরনা যেন চলেছে পথ খুঁড়ি, কতক জলের ধারা আবার কতক পাথর নুড়ি। সব জড়িয়ে ক্রমে ক্রমে আপন চলার বেগে পূর্ণ হয়ে নদী ওঠে জেগে। শক্ত সহজ এ সংসারটা যাহার লেখা বই হালকা ক'রে বুঝিয়ে সে দেয় কই। বুঝছি যত খুজছি তত, বুঝছি নে আর ততই-- কিছু বা হাঁ, কিছু বা না, চলছে জীবন স্বতই। কৃত্তিবাসী রামায়ণ সে বটতলাতে ছাপা, দিদিমায়ের বালিশ-তলায় চাপা। আলগা মলিন পাতাগুলি, দাগি তাহার মলাট দিদিমায়ের মতোই যেন বলি-পড়া ললাট। মায়ের ঘরের চৌকাঠেতে বারান্দার এক কোণে দিন-ফুরানো ক্ষীণ আলোতে পড়েছি একমনে। অনেক কথা হয় নি তখন বোঝা, যেটুকু তার বুঝেছিলাম মোট কথাটা সোজা-- ভালোমন্দে লড়াই অনিঃশেষ, প্রকাণ্ড তার ভালোবাসা, প্রচণ্ড তার দ্বেষ। বিপরীতের মল্লযুদ্ধ ইতিহাসের রূপ সামনে এল, রইনু বসে চুপ। শুরু হতে এইটে গেল বোঝা, হয়তো বা এক বাঁধা রাস্তা কোথাও আছে সোজা, যখন-তখন হঠাৎ সে যায় ঠেকে, আন্দাজে যায় ঠিকানাটা বিষম এঁকেবেঁকে। সব-জানা দেশ এ নয় কভু, তাই তো তেপান্তরে রাজপুত্তুর ছোটায় ঘোড়া না-জানা কার তরে। সদাগরের পুত্র সেও যায় অজানার পার খোঁজ নিতে কোন্ সাত-রাজা-ধন গোপন মানিকটার। কোটালপুত্র খোঁজে এমন গুহায়-থাকা চোর যাকে ধরলে সকল চুরির কাটবে বাঁধন-ডোর।