আজকাল প্রায় এমন দেখা যায় অনেক বিষয়ে অনেক রকম মত উঠিয়াছে, কিন্তু কাজের সঙ্গে তাহার মিল হয় না। এমনও দেখা যায় অল্প বয়সে যাঁহারা পরমোৎসাহে সম্পূর্ণ নূতন করিয়া সমাজের পরিবর্ত্তন-সাধনে উদ্যোগী হইয়াছিলেন কিঞ্চিৎ অধিক বয়সে তাঁহারাই পুরাতন প্রথা অবলম্বন করিয়া শান্তভাবে সংসারযাত্রা নির্ব্বাহ করিতেছেন। অনেকে ইহার কারণ এমন বলেন যে, বাঙ্গালীদের কোন মতের বা কাজের উপর যথার্থ অকৃত্রিম সুগভীর অনুরাগ নাই-- মতগুলি কার্য্যে পরিণত করিবার জন্য হৃদয়ের যতটা বলের আবশ্যক তাহা নাই। এ কথা যে সম্পূর্ণ অমূলক তাহা নহে, কিন্তু ইহা ছাড়া আরও কতকগুলি কারণ জুটিয়াছে। সমাজ যখন সমস্যা হইয়া দাঁড়ায় তখন মানুষ সবলে কাজ করিতে পারে না, যখন ডান পা একটি গর্ত্তের মধ্যে নিবিষ্ট করিয়া বাঁ পা কোথায় রাখিব ভাবিয়া পাওয়া যায় না, তখন দ্রুতবেগে চলা অসম্ভব। কিম্বা যখন মাথা টলমল করিতেছে কিন্তু পা শক্ত আছে, অথবা মাথার ঠিক আছে কিন্তু পায়ের ঠিকানা নাই-- তখন যদি চলিবার বিশেষ ব্যাঘাত হয় তবে জমির দোষ দেওয়া যায় না। আমরা বঙ্গসমাজ-নামক যে মকড়ষার জালে মাছির ন্যায় বাস করিতেছি, এখানে মতামত-নামক আস্মানগামী ডানা দুটো খোলসা আছে বটে কিন্তু ছটা পা জড়াইয়া গেছে। ডানা আস্ফালন যথেষ্ট হইতেছে কিন্তু উড়িবার কোন সুবিধা হইতেছে না। এখানে ডানা-দুটো কেবল কষ্টেরই কারণ হইয়াছে।
শব্দগুলি বোর্ডের উপর লিখিতে থাকিবে। এই শব্দযোগে ছোট ছোট বাক্য রচনা করিতে হইবে। শিক্ষক মহাশয় দেখিবেন যে বাক্যগুলির মধ্যে একটি সংলগ্ন চিন্তার ধারা রক্ষিত হয় ওরে তোরা কি জানিস্ কেউ লেজ কেন ওঠে এত ঢেউ! ওরা দিবস রজনী নাচে । তাহা শিখেছে কাহার কাছে ? ওরা কারে ডাকে বাহু তুলে , ওরা কার কোলে ব'সে দুলে ? আমি ব'সে ব'সে তাই ভাবি – নদী কোথা হতে এল নাবি ? কোথায় পাহাড়-সে কোন্খানে , তাহার নাম কি কেহই জানে ? কেহ যেতে পারে তার কাছে ? সেথায় মানুষ কি কেউ আছে ? সেথা নাহি তরু নাহি ঘাস , নাহি পশু-পাখীদের বাস । সেথা রাশি রাশি মেঘ যত থাকে ঘরের ছেলের ( children of the house ) মতো । সেথায় বাস করে শিং-তোলা ( upraised horns ) যত বুনো ছাগ দাড়িঝোলা ( with hanging beard ) । সেথায় মানুষ নূতনতরো – তাদের শরীর ( limbs ) কঠিন বড়ো , তাদের চোখ দুটো নয় সোজা , তাদের কথা নাহি যায় বোঝা , তারা পাহাড়ের ছেলেমেয়ে সদাই কাজ করে গান গেয়ে , তারা সারা দিনমান খেটে আনে বোঝাভরা কাঠ কেটে , তারা চড়িয়া শিখর ( mountaintop )- 'পরে বনের ( wild ) হরিণ শিকার করে । শেষে পাহাড় ছাড়িয়া এসে নদী পড়ে বাহিরের দেশে । কোথাও চাষীরা করিতে চাষ ( till ) , কোথাও গরুতে খেতেছে ঘাস । কোথাও বৃহৎ অশথ গাছে পাখি শিস দিয়ে দিয়ে নাচে । কোথাও রাখাল ছেলের দলে খেলা করিছে গাছের তলে । সেথা মহিষের দল থাকে তারা লুটায় (wallow ) নদীর পাঁকে । যত বুনো বরা সেথা ফেরে , তারা দাঁত ( tusk ) দিয়ে মাটি চেরে । সেথা শেয়াল লুকায়ে থাকে রাতে হুয়া হুয়া ক'রে ডাকে । যেদিন পূরণিমা রাত আসে চাঁদ আকাশ জুড়িয়া হাসে – সবাই ঘুমায় কুটীরতলে , তরী একটিও নাহি চলে , গাছে পাতাটিও নাহি নড়ে জলে নাহি ঢেউ ওঠে পড়ে । হোথায় গহন গভীর বন তাহে নাহি লোক নাহি জন , শুধু কুমীর নদীর ধারে সুখে রোদ পোহাইছে পাড়ে । বাঘ ফিরিতেছে ঝোপে ঝাপে , ঘাড়ে পড়ে আসি এক লাফে । কোথায় দেখা যায় চিতা বাঘ , তাহার গায়ে চাকা চাকা দাগ ।
এই গ্রন্থে আমার তেরো হইতে আঠারো বৎসর বয়সের কবিতাগুলি প্রকাশ করিলাম, সুতরাং ইহাকে ঠিক শৈশবসঙ্গীত বলা যায় কিনা সন্দেহ। কিন্তু নামের জন্য বেশী কিছু আসে যায় না। কবিতাগুলির স্থানে স্থানে অনেকটা পরিত্যাগ করিয়াছি, সাধারণের পাঠ্য হইবে না বিবেচনায় ছাপাই নাই। হয়ত বা এই গ্রন্থে এমন অনেক কবিতা ছাপা হইয়া থাকিবে যাহা ঠিক প্রকাশের যোগ্য নহে, কিন্তু লেখকের পক্ষে নিজের লেখা ঠিকটি বুঝিয়া উঠা অসম্ভব ব্যাপার-- বিশেষতঃ বাল্যকালের লেখার উপর কেমন-একটু বিশেষ মায়া থাকে যাহাতে কতকটা অন্ধ করিয়া রাখে। এই পর্য্যন্ত বলিতে পারি আমি যাহার বিশেষ কিছু-না-কিছু গুণ না দেখিতে পাইয়াছি তাহা ছাপাই নাই। গ্রন্থকার