একলা হোথায় বসে আছে, কেই বা জানে ওকে-- আপন-ভোলা সহজ তৃপ্তি রয়েছে ওর চোখে। খাটুলিটা বাইরে এনে আঙিনাটার কোণে টানছে তামাক বসে আপন-মনে। মাথার উপর বটের ছায়া, পিছন দিকে নদী বইছে নিরবধি। আয়োজনের বালাই নেইকো ঘরে, আমের কাঠের নড়্নড়ে এক তক্তপোষের 'পরে মাঝখানেতে আছে কেবল পাতা বিধবা তার মেয়ের হাতের সেলাই করা কাঁথা। নাতনি গেছে, রাখে তারি পোষা ময়নাটাকে, ছেলের গাঁথা ঘরের দেয়াল, চিহ্ন আছে তারি রঙিন মাটি দিয়ে আঁকা সিপাই সারি সারি। সেই ছেলেটাই তালুকদারের সর্দারি পদ পেয়ে জেলখানাতে মরছে পচে দাঙ্গা করতে যেয়ে। দুঃখ অনেক পেয়েছে ও, হয়তো ডুবছে দেনায়, হয়তো ক্ষতি হয়ে গেছে তিসির বেচাকেনায়। বাইরে দারিদ্র৻ের কাটা-ছেঁড়ার আঁচড় লাগে ঢের, তবুও তার ভিতর-মনে দাগ পড়ে না বেশি, প্রাণটা যেমন কঠিন তেমনি কঠিন মাংসপেশী। হয়তো গোরু বেচতে হবে মেয়ের বিয়ের দায়ে, মাসে দুবার ম্যালেরিয়া কাঁপন লাগায় গায়ে, ডাগর ছেলে চাকরি করতে গঙ্গাপারের-দেশে হয়তো হঠাৎ মারা গেছে ঐ বছরের শেষে-- শুকনো করুণ চক্ষু দুটো তুলে উপর-পানে কার খেলা এই দুঃখসুখের, কী ভাবলে সেই জানে। বিচ্ছেদ নেই খাটুনিতে, শোকের পায় না ফাঁক, ভাবতে পারে স্পষ্ট ক'রে নেইকো এমন বাক্। জমিদারের কাছারিতে নালিশ করতে এসে কী বলবে যে কেমন ক'রে পায় না ভেবে শেষে। খাটুলিতে এসে বসে যখনি পায় ছুটি, ভাব্নাগুলো ধোঁয়ায় মেলায়, ধোঁয়ায় ওঠে ফুটি। ওর যে আছে খোলা আকাশ, ওর যে মাথার কাছে শিষ দিয়ে যায় বুলবুলিরা আলোছায়ার নাচে, নদীর ধারে মেঠো পথে টাট্টু চলে ছুটে, চক্ষু ভোলায় খেতের ফসল রঙের হরির-লুটে-- জন্মমরণ ব্যেপে আছে এরা প্রাণের ধন অতি সহজ ব'লেই তাহা জানে না ওর মন।
সহজ কথায় লিখতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না লেখা সহজে। লেখার কথা মাথায় যদি জোটে তখন আমি লিখতে পারি হয়তো। কঠিন লেখা নয়কো কঠিন মোটে, যা-তা লেখা তেমন সহজ নয় তো। যদি দেখ খোলসটা খসিয়াছে বৃদ্ধের, যদি দেখ চপলতা প্রলাপেতে সফলতা ফলেছে জীবনে সেই ছেলেমিতে-সিদ্ধের, যদি ধরা পড়ে সে যে নয় ঐকান্তিক ঘোর বৈদান্তিক, দেখ গম্ভীরতায় নয় অতলান্তিক, যদি দেখ কথা তার কোনো মানে-মোদ্দার হয়তো ধারে না ধার, মাথা উদ্ভ্রান্তিক, মনখানা পৌঁছয় খ্যাপামির প্রান্তিক, তবে তার শিক্ষার দাও যদি ধিক্কার-- সুধাব, বিধির মুখ চারিটা কী কারণে। একটাতে দর্শন করে বাণী বর্ষণ, একটা ধ্বনিত হয় বেদ-উচ্চারণে। একটাতে কবিতা রসে হয় দ্রবিতা, কাজে লাগে মনটারে উচাটনে মারণে। নিশ্চিত জেনো তবে, একটাতে হো হো রবে পাগলামি বেড়া ভেঙে উঠে উচ্ছ্বাসিয়া। তাই তারি ধাক্কায় বাজে কথা পাক খায়, আওড় পাকাতে থাকে মগজেতে আসিয়া। চতুর্মুখের চেলা কবিটিরে বলিলে তোমরা যতই হাস, রবে সেটা দলিলে। দেখাবে সৃষ্টি নিয়ে খেলে বটে কল্পনা, অনাসৃষ্টিতে তবু ঝোঁকটাও অল্প না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাড়াতে এসেছে এক নাড়িটেপা ডাক্তার, দূর থেকে দেখা যায় অতি উঁচু নাক তার। নাম লেখে ওষুধের, এ দেশের পশুদের সাধ্য কী পড়ে তাহা এই বড়ো জাঁক তার। যেথা যায় বাড়ি বাড়ি দেখে যে ছেড়েছে নাড়ী, পাওনাটা আদায়ের মেলে না যে ফাঁক তার। গেছে নির্বাকপুরে ভক্তের ঝাঁক তার।