আমি একাকিনী যবে চলি রাজপথে নব অভিসারসাজে, নিশীথে নীরব নিখিল ভুবন, না গাহে বিহগ, না চলে পবন, মৌন সকল পৌর ভবন সুপ্তনগরমাঝে-- শুধু আমার নূপুর আমারি চরণে বিমরি বিমরি বাজে। অধীর মুখর শুনিয়া সে স্বর পদে পদে মরি লাজে। আমি চরণশব্দ শুনিব বলিয়া বসি বাতায়নকাছে-- অনিমেষ তারা নিবিড় নিশায়, লহরীর লেশ নাহি যমুনায়, জনহীন পথ আঁধারে মিশায়, পাতাটি কাঁপে না গাছে-- শুধু আমারি উরসে আমারি হৃদয় উলসি বিলসি নাচে। উতলা পাগল করে কলরোল, বাঁধন টুটিলে বাঁচে। আমি কুসুমশয়নে মিলাই শরমে, মধুর মিলনরাতি-- স্তব্ধ যামিনী ঢাকে চারিধার, নির্বাণ দীপ, রুদ্ধ দুয়ার, শ্রাবণগগন করে হাহাকার তিমিরশয়ন পাতি-- শুধু আমার মানিক আমারি বক্ষে জ্বালায়ে রেখেছে বাতি। কোথায় লুকাই, কেমনে নিবাই নিলাজ ভূষণভাতি। আমি আমার গোপন মরমের কথা রেখেছি মরমতলে। মলয় কহিছে আপন কাহিনী, কোকিল গাহিছে আপন রাগিণী, নদী বহি চলে কাঁদি একাকিনী আপনার কলকলে-- শুধু আমার কোলের আমারি বীণাটি গীতঝংকারছলে যে কথা যখন করিব গোপন সে কথা তখনি বলে।
বহুকাল আগে তুমি দিয়েছিলে একগুচ্ছ ধূপ, আজি তার ধোঁয়া হতে বাহিরিল অপরূপ রূপ; যেন কোন্ পুরানী আখ্যানে স্তব্ধ মোর ধ্যানে ধীরপদে এল কোন্ মালবিকা লয়ে দীপশিখা মহাকালমন্দিরের দ্বারে যুগান্তের কোন্ পারে। সদ্যস্নান-পরে সিক্ত বেণী গ্রীবা তার জড়াইয়া ধরে, চন্দনের মৃদু গন্ধ আসে অঙ্গের বাতাসে। মনে হয়, এই পূজারিনী-- এরে আমি বার বার চিনি, আসে মৃদুমন্দ পদে চিরদিবসের বেদিতলে তুলি ফুল শুচিশুভ্র বসন-অঞ্চলে। শান্ত স্নিগ্ধ চোখের দৃষ্টিতে সেই বাণী নিয়ে আসে এ যুগের ভাষার সৃষ্টিতে। সুললিত বাহুর কঙ্কণে প্রিয়জন-কল্যাণের কামনা বহিছে সযতনে। প্রীতি আত্মহারা আদি সূর্যোদয় হতে বহি আনে আলোকের ধারা। দূর কাল হতে তারি হস্ত দুটি লয়ে সেবারস আতপ্ত ললাট মোর আজও ধীরে করিছে পরশ।