কে আমার ভাষাহীন অন্তরে চিত্তের মেঘলোকে সন্তরে, বক্ষের কাছে থাকে তবুও সে রয় দূরে, থাকে অশ্রুত সুরে। ভাবি বসে, গাব আমি তারই গান-- চুপ করে থাকি সারা দিনমান, অকথিত আবেগের ব্যথা সই। মন বলে, কথা কই কথা কই! চঞ্চল শোণিতে যে সত্তার ক্রন্দন ধ্বনিতেছে অর্থ কী জানি তাহা, আদিতম আদিমের বাণী তাহা। ভেদ করি ঝঞ্ঝার আলোড়ন ছেদ করি বাষ্পের আবরণ চুম্বিল ধরাতল যে আলোক, স্বর্গের সে বালক কানে তার বলে গেছে যে কথাটি তারই স্মৃতি আজো ধরণীর মাটি দিকে দিকে বিকাশিছে ঘাসে ঘাসে-- তারই পানে চেয়ে চেয়ে সেই সুর কানে আসে। প্রাণের প্রথমতম কম্পন অশথের মজ্জায় করিতেছে বিচরণ, তারই সেই ঝংকার ধ্বনিহীন-- আকাশের বক্ষেতে কেঁপে ওঠে নিশিদিন; মোর শিরাতন্তুতে বাজে তাই; সুগভীর চেতনার মাঝে তাই নর্তন জেগে ওঠে অদৃশ্য ভঙ্গিতে অরণ্যমর্মর-সংগীতে। ওই তরু ওই লতা ওরা সবে মুখরিত কুসুমে ও পল্লবে-- সেই মহাবাণীময় গহনমৌনতলে নির্বাক স্থলে জলে শুনি আদি-ওংকার, শুনি মূক গুঞ্জন অগোচর চেতনার। ধরণীর ধূলি হতে তারার সীমার কাছে কথাহারা যে ভুবন ব্যাপিয়াছে তার মাঝে নিই স্থান, চেয়ে-থাকা দুই চোখে বাজে ধ্বনিহীন গান।
ঐ যেখানে শিরীষ গাছে ঝুরু-ঝুরু কচি পাতার নাচে ঘাসের 'পরে ছায়াখানি কাঁপায় থরথর ঝরা ফুলের গন্ধে ভরভর-- ঐখানে মোর পোষা হরিণ চরত আপন মনে হেনা-বেড়ার কোণে শীতের রোদে সারা সকালবেলা। তারি সঙ্গে করত খেলা পাহাড়-থেকে-আনা ঘন রাঙা রোঁয়ায় ঢাকা একটি কুকুরছানা। যেন তারা দুই বিদেশের দুটি ছেলে মিলেছে এক পাঠশালাতে, একসাথে তাই বেড়ায় হেসে খেলে। হাটের দিনে পথের কত লোকে বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে যেত, দেখত অবাক-চোখে। ফাগুন মাসে জাগল পাগল দখিন হাওয়া, শিউরে ওঠে আকাশ যেন কোন্ প্রেমিকের রঙিন-চিঠি-পাওয়া শালের বনে ফুলের মাতন হল শুরু, পাতায় পাতায় ঘাসে ঘাসে লাগল কাঁপন দুরুদুরু। হরিণ যে কার উদাস-করা বাণী হঠাৎ কখন শুনতে পেলে আমরা তা কি জানি। তাই যে কালো চোখের কোণে চাউনি তাহার উতল হল অকারণে; তাই সে থেকে থেকে হঠাৎ আপন ছায়া দেখে চমকে দাঁড়ায় বেঁকে। একদা এক বিকালবেলায় আমলকীবন অধীর যখন ঝিকিমিকি আলোর খেলায়, তপ্ত হাওয়া ব্যথিয়ে ওঠে আমের বোলের বাসে, মাঠের পরে মাঠ হয়ে পার ছুটল হরিণ নিরুদ্দেশের আশে। সম্মুখে তার জীবনমরণ সকল একাকার, অজানিতের ভয় কিছু নেই আর। ভেবেছিলেম আঁধার হলে পরে ফিরবে ঘরে চেনা হাতের আদর পাবার তরে। কুকুরছানা বারে বারে এসে কাছে ঘেঁষে ঘেঁষে কেঁদে-কেঁদে চোখের চাওয়ায় শুধায় জনে জনে, "কোথায় গেল, কোথায় গেল, কেন তারে না দেখি অঙ্গনে।" আহার ত্যেজে বেড়ায় সে যে, এল না তার সাথি। আঁধার হল, জ্বলল ঘরে বাতি; উঠল তারা; মাঠে-মাঠে নামল নীরব রাতি। আতুর চোখের প্রশ্ন নিয়ে ফেরে কুকুর বাইরে ঘরে, "নাই সে কেন, যায় কেন সে কাহার তরে।" কেন যে তা সে-ই কি জানে। গেছে সে যার ডাকে কোনো কালে দেখে নাই যে তাকে আকাশ হতে, আলোক হতে, নতুন পাতার কাঁচা সবুজ হতে দিশাহারা দখিন হাওয়ার স্রোতে রক্তে তাহার কেমন এলোমেলো কিসের খবর এল। বুকে যে তার বাজল বাঁশি বহুযুগের ফাগুন-দিনের সুরে-- কোথায় অনেক দূরে রয়েছে তার আপন চেয়ে আরো আপন জন। তারেই অন্বেষণ। জন্ম হতে আছে যেন মর্মে তারি লেগে, আছে যেন ছুটে চলার বেগে, আছে যেন চল-চপল চোখের কোণে জেগে। কোনো কালে চেনে নাই সে যারে সেই তো তাহার চেনাশোনার খেলাধুলা ঘোচায় একেবারে। আঁধার তারে ডাক দিয়েছে কেঁদে, আলোক তারে রাখল না আর বেঁধে।