ছেঁড়াখোঁড়া মোর পুরোনো খাতায় ছবি আঁকি আমি যা আসে মাথায় যক্ষনি ছুটি পাই। বঙ্কিম মামা বুঝিতে পারে না-- বলে যে, কিছুই যায় না তো চেনা; বলে, কী হয়েছে, ছাই! আমি বলি তারে, এই তো ভালুক, এই দেখো কালো বাঁদরের মুখ, এই দেখো লাল ঘোড়া-- রাজপুত্তুর কাল ভোর হলে দণ্ডক বনে যাবেন যে চ'লে-- রথে হবে ওরে জোড়া। উঁচু হয়ে আছে এই-যে পাহাড়, খোঁচা খোঁচা গায়ে ওঠে বাঁশ-ঝাড়, হেথা সিংহের বাসা। এঁকে বেঁকে দেখো এই নদী চলে, নৌকো এঁকেছি ভেসে যায় জলে, ডাঙা দিয়ে যায় চাষা। ঘাট থেকে জল এনেছে ঘড়ায়-- শিবুঠাকুরের রান্না চড়ায় তিন কন্যা যে এই। সাদা কাগজের চর করে ধূ ধূ, সাদা হাঁস দুটো ব'সে আছে শুধু, কেউ কোত্থাও নেই। গোল ক'রে আঁকা এই দেখো দিখি, সূর্যের ছবি ঠিক হয় নি কি, মেঘ এই দাগ যত। শুধু কালি লেপা দেখিছ এ পাতে-- আঁধার হয়েছে এইখানটাতে, ঠিক সন্ধ্যার মতো। আমি তো পষ্ট দেখি সব-কিছু-- শালবন দেখো এই উঁচুনিচু, মাছগুলো দেখো জলে। "ছবি দেখিতে কি পায় সব লোকে-- দোষ আছে তোর মামারই দু চোখে' বাবা এই কথা বলে।
শিলঙে এক গিরির খোপে পাথর আছে খসে-- তারি উপর লুকিয়ে ব'সে রোজ সকালে গেঁথেছিলেম ভোরের সুরে গানের মালা। প্রথম সূর্যোদয়ের সঙ্গে ছিল আমার মুখোমুখির পালা। ডানদিকেতে অফলা এক পিচের শাখা ভরে ফুল ফোটে আর ফুল প'ড়ে যায় ঝরে। কালো ডানায় হলদে আভাস, কোন্ পাখি সেই অকারণের গানে ক্লান্তি নাহি জানে,-- তেমনিতরো গোলাপলতা লতাবিতান ঢেকে অজস্র তার ফুলের ভাষায় অন্ত না পায় উদ্দেশহীন ডেকে। পাইনবনের প্রাচীন তরু তাকায় মেঘের মুখে, ডালগুলি তার সবুজ ঝরনা ধরার পানে ঝুঁকে মন্ত্রে যেন থমক-লেগে আছে। দুটি দালিম গাছে ঘনসবুজ পাতার কোলে কোলে ঘনরাঙা ফুলের গুচ্ছ দোলে। পায়ের কাছে একটি কণ্টিকারি-- অন্তরঙ্গ কাছের সঙ্গ তারি, দূরের শূন্যে আপনাকে সে প্রচার নাহি করে। মাটির কাছে নত হলে পরে স্নিগ্ধ সাড়া দেয় সে ধীরে ধূলিশয়ন থেকে নীলবরনের ফুলের বুকে একটুখানি সোনার বিন্দু এঁকে। সেদিন যত রচেছিলাম গান কন্টিকারির দান তাদের সুরে স্বীকার করা আছে। আজকে যখন হৃদয় আমার ক্ষণিক শান্তি যাচে দুঃখদিনের দুর্ভাবনার প্রচণ্ড পীড়নে, হঠাৎ কেন জাগল আমার মনে, সেই সকালের টুকরো একটুখানি-- মাটির কাছে কণ্টিকারির নীল-সোনালির বাণী।