মনে মনে দেখলুম সেই দূর অতীত যুগের নিঃশব্দ সাধনা যা মুখর ইতিহাসকে নিষিদ্ধ রেখেছে আপন তপস্যার আসন থেকে। দেখলেম দুর্গম গিরিব্রজে কোলাহলী কৌতূহলী দৃষ্টির অন্তরালে অসূর্যম্পশ্য নিভৃতে ছবি আঁকছে গুণী গুহাভিত্তির 'পরে, যেমন অন্ধকার পটে সৃষ্টিকার আঁকছেন বিশ্বছবি। সেই ছবিতে ওরা আপন আনন্দকেই করেছে সত্য, আপন পরিচয়কে করেছে উপেক্ষা, দাম চায়নি বাইরের দিকে হাত পেতে, নামকে দিয়েছে মুছে। হে অনামা, হে রূপের তাপস, প্রণাম করি তোমাদের। নামের মায়াবন্ধন থেকে মুক্তির স্বাদ পেয়েছি তোমাদের এই যুগান্তরের কীর্তিতে। নাম-ক্ষালন যে পবিত্র অন্ধকারে ডুব দিয়ে তোমাদের সাধনাকে করেছিলে নির্মল, সেই অন্ধকারের মহিমাকে আমি আজ বন্দনা করি। তোমাদের নিঃশব্দ বাণী রয়েছে এই গুহায়, বলছে--নামের পূজার অর্ঘ্য, ভাবীকালের খ্যাতি, সে তো প্রেতের অন্ন; ভোগশক্তিহীন নিরর্থকের কাছে উৎসর্গ-করা। তার পিছনে ছুটে সদ্য বর্তমানের অন্নপূর্ণার পরিবেষণ এড়িয়ে যেয়ো না, মোহান্ধ। আজ আমার দ্বারের কাছে শজনে গাছের পাতা গেল ঝ'রে, ডালে ডালে দেখা দিয়েছে কচি পাতার রোমাঞ্চ; এখন প্রৌঢ় বসন্তের পারের খেয়া চৈত্রমাসের মধ্যস্রোতে; মধ্যাহ্নের তপ্ত হাওয়ায় গাছে গাছে দোলাদুলি; উড়তি ধুলোয় আকাশের নীলিমাতে ধূসরের আভাস, নানা পাখির কলকাকলিতে বাতাসে আঁকছে শব্দের অস্ফুট আলপনা। এই নিত্য-বহমান অনিত্যের স্রোতে আত্মবিস্মৃত চলতি প্রাণের হিল্লোল; তার কাঁপনে আমার মন ঝলমল করছে কৃষ্ণচূড়ার পাতার মতো। অঞ্জলি ভরে এই তো পাচ্ছি সদ্য মুহূর্তের দান, এর সত্যে নেই কোনো সংশয়, কোনো বিরোধ। যখন কোনোদিন গান করেছি রচনা, সেও তো আপন অন্তরে এইরকম পাতার হিল্লোল, হাওয়ার চাঞ্চল্য, রৌদ্রের ঝলক, প্রকাশের হর্ষবেদনা। সেও তো এসেছে বিনা নামের অতিথি, গর-ঠিকানার পথিক। তার যেটুকু সত্য তা সেই মুহূর্তেই পূর্ণ হয়েছে, তার বেশি আর বাড়বে না একটুও, নামের পিঠে চড়ে। বর্তমানের দিগন্তপারে যে-কাল আমার লক্ষ্যের অতীত সেখানে অজানা অনাত্মীয় অসংখ্যের মাঝখানে যখন ঠেলাঠেলি চলবে লক্ষ লক্ষ নামে নামে, তখন তারি সঙ্গে দৈবক্রমে চলতে থাকবে বেদনাহীন চেতনাহীন ছায়ামাত্রসার আমারো নামটা, ধিক থাক্ সেই কাঙাল কল্পনার মরীচিকায়। জীবনের অল্প কয়দিনে বিশ্বব্যাপী নামহীন আনন্দ দিক আমাকে নিরহংকার মুক্তি। সেই অন্ধকারকে সাধনা করি যার মধ্যে স্তব্ধ বসে আছেন বিশ্বচিত্রের রূপকার, যিনি নামের অতীত, প্রকাশিত যিনি আনন্দে।
তোমায় আমি দেখি নাকো, শুধু তোমার স্বপ্ন দেখি -- তুমি আমায় বারে বারে শুধাও, "ওগো, সত্য সে কি?' কী জানি গো, হয়তো বুঝি তোমার মাঝে কেবল খুঁজি এই জনমের রূপের তলে আর-জনমের ভাবের স্মৃতি। হয়তো হেরি তোমার চোখে আদিযুগের ইন্দ্রলোকে শিশুচাঁদের পথ-ভোলানো পারিজাতের ছায়াবীথি। এই কূলেতে ডাকি যখন সাড়া যে দাও সেই ওপারে, পরশ তোমার ছাড়িয়ে কায়া বাজে মায়ার বীণার তারে। হয়তো হবে সত্য তাই, হয়তো তোমার স্বপন, আমার আপন মনের মত্ততাই। আমি বলি স্বপ্ন যাহা তার চেয়ে কি সত্য আছে। যে তুমি মোর দূরের মানুষ সেই তুমি মোর কাছের কাছে। সেই তুমি আর নও তো বাঁধন, স্বপ্নরূপে মুক্তিসাধন, ফুলের সাথে তারার সাথে তোমার সাথে সেথায় মেলা। নিত্যকালের বিদেশিনী, তোমায় চিনি, নাই বা চিনি, তোমার লীলায় ঢেউ তুলে যায় কভু সোহাগ, কভু হেলা। চিত্তে তোমার মূর্তি নিয়ে ভাবসাগরের খেয়ায় চড়ি। বিধির মনের কল্পনারে আপন মনে নতুন গড়ি। আমার কাছে সত্য তাই, মন-ভরানো পাওয়ায় ভরা বাইরে-পাওয়ার ব্যর্থতাই। আপনি তুমি দেখেছ কি আপন-মাঝে সত্য কী যে। দিতে যদি চাও তা কারে, দিতে কি তাই পারো নিজে। হয়তো তারে দুঃখদিনে অগ্নি-আলোয় পাবে চিনে, তখন তোমার নিবিড় বেদন নিবেদনের জ্বালবে শিখা। অমৃত যে হয় নি মথন, তাই তোমাতে এই অযতন; তাই তোমারে ঘিরে আছে ছলন-ছায়ার কুহেলিকা। নিত্যকালের আপন তোমায় লুকিয়ে বেড়ায় মিথ্যা সাজে, ক্ষণে ক্ষণে ধরা পড়ে শুধু আমার স্বপন-মাঝে। আমি জানি সত্য তাই -- মরণ-দুঃখে অমর জাগে, অমৃতেরই তত্ত্ব তাই। পুষ্পমালার গ্রন্থিখানা অনাদরে পড়ুক ছিঁড়ে, ফুরাক বেলা, জীর্ণ খেলা হারাক হেলাফেলার ভিড়ে। ছল করে যা পিছু ডাকে পিছন ফিরে চাস নে তাকে, ডাকে না যে যাবার বেলায় যাস নে তাহার পিছে পিছে। যাওয়া- আসা-পথের ধুলায় চপল পায়ের চিহ্নগুলায় গ'নে গ'নে আপন মনে কাটাস নে দিন মিছে মিছে। কী হবে তোর বোঝাই করে ব্যর্থ দিনের আবর্জনা; স্বপ্ন শুধুই মর্তে অমর, আর সকলই বিড়ম্বনা। নিত্য প্রাণের সত্য তাই -- প্রাণ দিয়ে তুই রচিস যারে, অসীম পথের পথ্য তাই।