লিখি কিছু সাধ্য কী! যে দশা এ অভাগার লিখিতে সে বাধ্য কি। মশা-বুড়ি মরেছিল চাপড়ের যুদ্ধে সে-- পরলোকগত তার আত্মার উদ্দেশে আমারি লেখার ঘরে আজি তার শ্রাদ্ধ কি! যেখানে যে কেহ ছিল আত্মীয় পরিজন অভিজাতবংশীয় কেহ, কেহ হরিজন-- আমারি চরণজাত তাহাদের খাদ্য কি! বাঁশি নেই, কাঁসি নেই, নাহি দেয় হাঁক সে, পিঠেতে কাঁপাতে থাকে এক-জোড়া পাখ সে-- দেখিতে যেমনি হোক তুচ্ছ সে বাদ্য কি। আশ্রয় নিতে চাই মেলে যদি ড়বনরঢ়নক্ষ, এক ফোঁটা বাকি নেই নেবুঘাস-তেলটার-- মশারি দিনের বেলা কভু আচ্ছাদ্য কি! গাল তারে মিছে দিই অতি অশ্রাব্য, হাতে পিঠ চাপড়াব সেটা যে অভাব্য-- এ কাজে লাগাব শেষে চটি-জোড়া পাদ্য কি। পুজোর বাজারে আজি যদি লেখা না জোটাই, দুটো লাইনেরো মতো কলমটা না ছোটাই-- সম্পাদকের সাথে রবে সৌহার্দ্য কি।
বশীরহাটেতে বাড়ি বশ-মানা ধাত তার, ছেলে বুড়ো যে যা বলে কথা শোনে যার-তার। দিনরাত সর্বথা সাধে নিজ খর্বতা, মাথা আছে হেঁট-করা, সদা জোড়-হাত তার, সেই ফাঁকে কুকুরটা চেটে যায় পাত তার।
আমি যারে ভালোবাসি সে ছিল এই গাঁয়ে, বাঁকা পথের ডাহিন পাশে, ভাঙা ঘাটের বাঁয়ে। কে জানে এই গ্রাম, কে জানে এর নাম, খেতের ধারে মাঠের পারে বনের ঘন ছায়ে-- শুধু আমার হৃদয় জানে সে ছিল এই গাঁয়ে। বেণুশাখারা আড়াল দিয়ে চেয়ে আকাশ-পানে কত সাঁঝের চাঁদ-ওঠা সে দেখেছে এইখানে। কত আষাঢ় মাসে ভিজে মাটির বাসে বাদলা হাওয়া বয়ে গেছে তাদের কাঁচা ধানে। সে-সব ঘনঘটার দিনে সে ছিল এইখানে। এই দিঘি, ওই আমের বাগান, ওই-যে শিবালয়, এই আঙিনা ডাক-নামে তার জানে পরিচয়। এই পুকুরে তারি, সাঁতার-কাটা বারি, ঘাটের পথরেখা তারি চরণ-লেখা-ময়। এই গাঁয়ে সে ছিল কে সেই জানে পরিচয়। এই যাহারা কলস নিয়ে দাঁড়ায় ঘাটে আসি এরা সবাই দেখেছিল তারি মুখের হাসি। কুশল পুছি তারে দাঁড়াত তার দ্বারে লাঙল কাঁধে চলছে মাঠে ওই-যে প্রাচীন চাষি। সে ছিল এই গাঁয়ে আমি যারে ভালোবাসি। পালের তরী কত-যে যায় বহি দখিনবায়ে, দূর প্রবাসের পথিক এসে বসে বকুলছায়ে। পারের যাত্রিদলে খেয়ার ঘাটে চলে, কেউ গো চেয়ে দেখে না ওই ভাঙা ঘাটের বাঁয়ে। আমি যারে ভালোবাসি সে ছিল এই গাঁয়ে।