এসেছিল বহু আগে যারা মোর দ্বারে, যারা চলে গেছে একেবারে, ফাগুন-মধ্যাহ্নবেলা শিরীষছায়ায় চুপে চুপে তারা ছায়ারূপে আসে যায় হিল্লোলিত শ্যাম দুর্বাদলে। ঘন কালো দিঘিজলে পিছনে-ফিরিয়া-চাওয়া আঁখি জ্বলো জ্বলো করে ছলোছলো। মরণের অমরতালোকে ধূসর আঁচল মেলি ফিরে তারা গেরুয়া আলোকে। যে এখনো আসে নাই মোর পথে, কখনো যে আসিবে না আমার জগতে, তার ছবি আঁকিয়াছি মনে-- একেলা সে বাতায়নে বিদেশিনী জন্মকাল হতে। সে যেন শেঁউলি ভাসে ক্ষীণ মৃদু স্রোতে, কোথায় তাহার দেশ নাই সে উদ্দেশ। চেয়ে আছে দূর-পানে কার লাগি আপনি সে নাহি জানে। সেই দূরে ছায়ারূপে রয়েছে সে বিশ্বের সকল-শেষে যে আসিতে পারিত তবুও এল না কভুও। জীবনের মরীচিকাদেশে মরুকন্যাটির আঁখি ফিরে ভেসে ভেসে।
ভালোবাসার মূল্য আমায় দু হাত ভরে যতই দেবে বেশি করে, ততই আমার অন্তরের এই গভীর ফাঁকি আপনি ধরা পড়বে না কি। তাহার চেয়ে ঋণের রাশি রিক্ত করি যাই-না নিয়ে শূন্য তরী। বরং রব ক্ষুধার কাতর ভালো সেও, সুধার ভরা হৃদয় তোমার ফিরিয়ে নিয়ে চলে যেয়ো। পাছে আমার আপন ব্যথা মিটাইতে ব্যথা জাগাই তোমার চিতে, পাছে আমার আপন বোঝা লাঘব-তরে চাপাই বোঝা তোমার 'পরে, পাছে আমার একলা প্রাণের ক্ষুব্ধ ডাকে রাত্রে তোমায় জাগিয়ে রাখে, সেই ভয়েতেই মনের কথা কই নে খুলে। ভুলতে যদি পারো তবে সেই ভালো গো, যেয়ো ভুলে। বিজন পথে চলেছিলেম, তুমি এলে মুখে আমার নয়ন মেলে। ভেবেছিলেম বলি তোমায়, "সঙ্গে চলো, আমায় কিছু কথা বলো।' হঠাৎ তোমার মুখে চেয়ে কী কারণে ভয় হল যে আমার মনে। দেখেছিলেম সুপ্ত আগুন লুকিয়ে জ্বলে তোমার প্রাণের নিশীথ রাতের অন্ধকারের গভীর তলে। তপস্বিনী, তোমার তপের শিখাগুলি হঠাৎ যদি জাগিয়ে তুলি, তবে যে সেই দীপ্ত আলোয় আড়াল টুটে দৈন্য আমার উঠিবে ফুটে। হবি হবে তোমার প্রেমের হোমাগ্নিতে এমন কী মোর আছে দিতে। তাই তো আমি বলি তোমায় নতশিরে-- তোমার দেখার স্মৃতি নিয়ে একলা আমি যাব ফিরে।
গানগুলি মোর বিষে ঢালা কী হবে আর তাহা বই? ফুটন্ত এ প্রাণের মাঝে বিষ ঢেলেছে বিষময়ী! গানগুলি মোর বিষেঢালা, কী হবে আর তাহা বই? বুকের মধ্যে সর্প আছে, তুমিও সেথা আছে অয়ি!