দেবতা জেনে দূরে রই দাঁড়ায়ে, আপন জেনে আদর করি নে। পিতা বলে প্রণাম করি পায়ে, বন্ধু বলে দু-হাত ধরি নে। আপনি তুমি অতি সহজ প্রেমে আমার হয়ে এলে যেথায় নেমে সেথায় সুখে বুকের মধ্যে ধরে সঙ্গী বলে তোমায় বরি নে। ভাই তুমি যে ভায়ের মাঝে প্রভু, তাদের পানে তাকাই না যে তবু, ভাইয়ের সাথে ভাগ ক'রে মোর ধন তোমার মুঠা কেন ভরি নে। ছুটে এসে সবার সুখে দুখে দাঁড়াই নে তো তোমারি সম্মুখে, সঁপিয়ে প্রাণ ক্লান্তিবিহীন কাজে প্রাণসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ি নে।
তোমারে দিব না দোষ। জানি মোর ভাগ্যের ভ্রূকুটি, ক্ষুদ্র এই সংসারের যত ক্ষত, যত তার ত্রুটি, যত ব্যথা আঘাত করিছে তব পরম সত্তারে অহরহ। জানি যে তুমি তো নাই ছাড়ায়ে আমারে নির্লিপ্ত সুদূর স্বর্গে। আমি মোর তোমাতে বিরাজে; দেওয়া-নেওয়া নিরন্তর প্রবাহিত তুমি-আমি-মাঝে দুর্গম বাধারে অতিক্রমি। আমার সকল ভার রাত্রিদিন রয়েছে তোমারি 'পরে, আমার সংসার সে শুধু আমারি নহে। তাই ভাবি এই ভার মোর যেন লঘু করি নিজবলে, জটিল বন্ধনডোর একে একে ছিন্ন করি যেন, মিলিয়া সহজ মিলে দ্বন্দ্বহীন বন্ধহীন বিচরণ করি এ নিখিলে না চেয়ে আপনা-পানে। অশান্তিরে করি দিলে দূর তোমাতে আমাতে মিলি ধ্বনিয়া উঠিবে এক সুর।
সকালে উঠেই দেখি প্রজাপতি একি আমার লেখার ঘরে, শেলফের 'পরে মেলেছে নিস্পন্দ দুটি ডানা-- রেশমি সবুজ রঙ, তার 'পরে সাদা রেখা টানা। সন্ধ্যাবেলা বাতির আলোয় অকস্মাৎ ঘরে ঢুকে সারারাত কী ভেবেছে কে জানে তা-- কোনোখানে হেথা অরণ্যের বর্ণ গন্ধ নাই, গৃহসজ্জা ওর কাছে সমস্ত বৃথাই। বিচিত্র বোধের এ ভুবন, লক্ষকোটি মন একই বিশ্ব লক্ষকোটি ক'রে জানে রূপে রসে নানা অনুমানে। লক্ষকোটি কেন্দ্র তারা জগতের, সংখ্যাহীন স্বতন্ত্র পথের জীবনযাত্রার যাত্রী, দিনরাত্রি নিজের স্বাতন্ত্র৻রক্ষা-কাজে একান্ত রয়েছে বিশ্ব-মাঝে। প্রজাপতি বসে আছে যে কাব্যপুঁথির 'পরে স্পর্শ তারে করে, চক্ষে দেখে তারে, তার বেশি সত্য যাহা তাহা একেবারে তার কাছে সত্য নয়-- অন্ধকারময়। ও জানে কাহারে বলে মধু, তবু মধুর কী সে-রহস্য জানে না ও কভু। পুষ্পপাত্রে নিয়মিত আছে ওর ভোজ-- প্রতিদিন করে তার খোঁজ কেবল লোভের টানে, কিন্তু নাহি জানে লোভের অতীত যাহা। সুন্দর যা, অনির্বচনীয়, যাহা প্রিয়, সেই বোধ সীমাহীন দূরে আছে তার কাছে। আমি যেথা আছি মন যে আপন টানে তাহা হতে সত্য লয় বাছি। যাহা নিতে নাহি পারে তাই শূন্যময় হয়ে নিত্য ব্যাপ্ত তার চারি ধারে। কী আছে বা নাই কী এ, সে শুধু তাহার জানা নিয়ে। জানে না যা, যার কাছে স্পষ্ট তাহা, হয়তো-বা কাছে এখনি সে এখানেই আছে আমার চৈতন্যসীমা অতিক্রম করি' বহুদূরে রূপের অন্তরদেশে অপরূপপুরে। সে আলোকে তার ঘর যে আলো আমার অগোচর।