কাকা বলেন, সময় হলে সবাই চলে যায় কোথা সেই স্বর্গ-পারে। বল্ তো কাকী সত্যি তা কি একেবারে? তিনি বলেন, যাবার আগে তন্দ্রা লাগে ঘণ্টা কখন ওঠে বাজি, দ্বারের পাশে তখন আসে ঘাটের মাঝি। বাবা গেছেন এমনি করে কখন ভোরে তখন আমি বিছানাতে। তেমনি মাখন গেল কখন অনেক রাতে। কিন্তু আমি বলছি তোমায় সকল সময় তোমার কাছেই করব খেলা, রইব জোরে গলা ধরে রাতের বেলা। সময় হলে মানব না তো, জানব না তো, ঘণ্টা মাঝির বাজল কবে। তাই কি রাজা দেবেন সাজা আমায় তবে? তোমরা বল, স্বর্গ ভালো সেথায় আলো রঙে রঙে আকাশ রাঙায়, সারা বেলা ফুলের খেলা পারুলডাঙায়! হ'ক না ভালো যত ইচ্ছে-- কেড়ে নিচ্ছে কেই বা তাকে বলো, কাকী? যেমন আছি তোমার কাছেই তেমনি থাকি! ঐ আমাদের গোলাবাড়ি, গোরুর গাড়ি পড়ে আছে চাকা-ভাঙা, গাবের ডালে পাতার লালে আকাশ রাঙা। সেথা বেড়ায় যক্ষী বুড়ী গুড়ি গুড়ি আসশেওড়ার ঝোপে ঝাপে ফুলের গাছে দোয়েল নাচে, ছায়া কাঁপে। নুকিয়ে আমি সেথা পলাই, কানাই বলাই দু-ভাই আসে পাড়ার থেকে। ভাঙা পাড়ি দোলাই নাড়ি ঝেঁকে ঝেঁকে। সন্ধ্যেবেলায় গল্প বলে রাখ কোলে, মিটমিটিয়ে জ্বলে বাতি। চালতা-শাখে পেঁচা ডাকে, বাড়ে রাতি। স্বর্গে যাওয়া দেব ফাঁকি বলছি, কাকী, দেখব আমায় কে কী করে। চিরকালই রইব খালি তোমার ঘরে।
খোকার মনের ঠিক মাঝখানটিতে আমি যদি পারি বাসা নিতে-- তবে আমি একবার জগতের পানে তার চেয়ে দেখি বসি সে নিভৃতে। তার রবি শশী তারা জানি নে কেমনধারা সভা করে আকাশের তলে, আমার খোকার সাথে গোপনে দিবসে রাতে শুনেছি তাদের কথা চলে। শুনেছি আকাশ তারে নামিয়া মাঠের পারে লোভায় রঙিন ধনু হাতে, আসি শালবন-'পরে মেঘেরা মন্ত্রণা করে খেলা করিবারে তার সাথে। যারা আমাদের কাছে নীরব গম্ভীর আছে, আশার অতীত যারা সবে, খোকারে তাহারা এসে ধরা দিতে চায় হেসে কত রঙে কত কলরবে। খোকার মনের ঠিক মাঝখান ঘেঁষে যে পথ গিয়েছে সৃষ্টিশেষে সকল-উদ্দেশ-হারা সকল-ভূগোল-ছাড়া অপরূপ অসম্ভব দেশে-- যেথা আসে রাত্রিদিন সর্ব-ইতিহাস-হীন রাজার রাজত্ব হতে হাওয়া, তারি যদি এক ধারে পাই আমি বসিবারে দেখি কারা করে আসা-যাওয়া। তাহারা অদ্ভুত লোক, নাই কারো দুঃখ শোক, নেই তারা কোনো কর্মে কাজে, চিন্তাহীন মৃত্যুহীন চলিয়াছে চিরদিন খোকাদের গল্পলোক-মাঝে। সেথা ফুল গাছপালা নাগকন্যা রাজবালা মানুষ রাক্ষস পশু পাখি, যাহা খুশি তাই করে, সত্যেরে কিছু না ডরে, সংশয়েরে দিয়ে যায় ফাঁকি।