কালো অন্ধকারের তলায় পাখির শেষ গান গিয়েছে ডুবে। বাতাস থমথমে, গাছের পাতা নড়ে না, স্বচ্ছরাত্রের তারাগুলি যেন নেমে আসছে পুরাতন মহানিম গাছের ঝিল্লি-ঝংকৃত স্তব্ধ রহস্যের কাছাকাছি। এমন সময়ে হঠাৎ আবেগে আমার হাত ধরলে চেপে; বললে, "তোমাকে ভুলব না কোনোদিনই।" দীপহীন বাতায়নে আমার মূর্তি ছিল অস্পষ্ট, সেই ছায়ার আবরণে তোমার অন্তরতম আবেদনের সংকোচ গিয়েছিল কেটে। সেই মুহূর্তে তোমার প্রেমের অমরাবতী ব্যাপ্ত হল অনন্ত স্মৃতির ভূমিকায়। সেই মুহূর্তের আনন্দবেদনা বেজে উঠল কালের বীণায়, প্রসারিত হল আগামী জন্মজন্মান্তরে। সেই মুহূর্তে আমার আমি তোমার নিবিড় অনুভবের মধ্যে পেল নিঃসীমতা। তোমার কম্পিত কণ্ঠের বাণীটুকুতে সার্থক হয়েছে আমার প্রাণের সাধনা, সে পেয়েছে অমৃত। তোমার সংসারে অসংখ্য যা-কিছু আছে তার সবচেয়ে অত্যন্ত ক'রে আছি আমি, অত্যন্ত বেঁচে। এই নিমেষটুকুর বাইরে আর যা-কিছু সে গৌণ। এর বাইরে আছে মরণ, একদিন রূপের আলো-জ্বালা রঙ্গমঞ্চ থেকে সরে যাব নেপথ্যে। প্রত্যক্ষ সুখদুঃখের জগতে মূর্তিমান অসংখ্যতার কাছে আমার স্মরণচ্ছায়া মানবে পরাভব। তোমার দ্বারের কাছে আছে যে কৃষ্ণচূড়া যার তলায় দুবেলা জল দাও আপন হাতে, সেও প্রধান হয়ে উঠে' তার ডালপালার বাইরে সরিয়ে রাখবে আমাকে বিশ্বের বিরাট অগোচরে। তা হোক, এও গৌণ।
আকাশের দূরত্ব যে, চোখে তারে দূর বলে জানি, মনে তারে দূর নাহি মানি। কালের দূরত্ব সেও যত কেন হোক-না নিষ্ঠুর তবু সে দুঃসহ নহে দূর। আঁধারের দূরত্বই কাছে থেকে রচে ব্যবধান, চেতনা আবিল করে, তার হাতে নাই পরিত্রাণ শুধু এই মাত্র নয়-- সে-যে সৃষ্টি করে নিত্যভয়। ছায়া দিয়ে রচি তুলে আঁকাবাঁকা দীর্ঘ উপছায়া, জানারে অজানা করে--ঘেরে তারে অর্থহীনা মায়া। পথ লুপ্ত করে দিয়ে যে পথের করে সে নির্দেশ নাই তার শেষ। সে পথ ভুলায়ে লয় দিনে দিনে দূর হতে দূরে ধ্রুবতারাহীন অন্ধপুরে। অগ্নিবীণা বিস্তারিয়া যে প্রলয় আনে মহাকাল, চন্দ্রসূর্য লুপ্ত করে আবর্তে-ঘূর্ণিত জটাজাল, দিব্য দীপ্তিচ্ছটায় সে সাজে, বজ্রের ঝঞ্ঝনামন্দ্রে বক্ষে তার রুদ্রবীণা বাজে। যে বিশ্বে বেদনা হানে তাহারি দাহনে করে তার পবিত্র সৎকার। জীর্ণ জগতের ভস্ম যুগান্তের প্রচণ্ড নিশ্বাসে লুপ্ত হয় ঝঞ্ঝার বাতাসে। অবশেষে তপস্বীর তপস্যাবহ্নির শিখা হতে নবসৃষ্টি উঠে আসে নিরঞ্জন নবীন আলোতে। দানব বিলুপ্তি আনে, আঁধারের পঙ্কিল বুদ্বুদে নিখিলের সৃষ্টি দেয় মুদে; কণ্ঠ দেয় রূদ্ধ করি, বাণী হতে ছিন্ন করে সুর, ভাষা হতে অর্থ করে দূর; উদয়দিগন্তমুখে চাপা দেয় ঘন কালো আঁখি, প্রেমেরে সে ফেলে বাঁধি সংশয়ের ডোরে; ভক্তিপাত্র শূন্য করি শ্রদ্ধার অমৃত লয় হরে। মূক অন্ধ মৃত্তিকার স্তর, জগদ্দল শিলা দিয়ে রচে সেথা মুক্তির কবর।
সত্য মোর অবলিপ্ত সংসারের বিচিত্র প্রলেপে, বিবিধের বহু হস্তক্ষেপে, অযত্নে অনবধানে হারালো প্রথম রূপ,দেবতার আপন স্বাক্ষর লুপ্তপ্রায়-- ক্ষয়ক্ষীণ জ্যোতির্ময় আদিমূল্য তার। চতুষ্পথে দাঁড়াল সে ললাটে পণ্যের ছাপ নিয়ে আপনারে বিকাইতে-- অঙ্কিত হতেছে তার স্থান পথে-চলা সহস্রের পরীক্ষাচিহ্নিত তালিকায়। হেনকালে একদিন আলো-আঁধারের সন্ধিস্থলে আরতিশঙ্খের ধ্বনি যে লগ্নে বাজিল সিন্ধুপারে, মনে হল, মুহূর্তেই থেমে গেল সব বেচাকেনা, শান্ত হল আশাপ্রত্যাশার কোলাহল। মনে হল, পরের মুখের মূল্য হতে মুক্ত, সব চিহ্ন-মোছা অসজ্জিত আদিকৌলীন্যের শান্ত পরিচয় বহি যেতে হবে নীরবের ভাষাহীন সংগীতমন্দিরে একাকীর একতারা হাতে। আদিমসৃষ্টির যুগে প্রকাশের যে আনন্দ রূপ নিল আমার সত্তায় আজ ধূলিমগ্ন তাহা, নিদ্রাহারা রুগ্ণ বুভুক্ষার দীপধূমে কলঙ্কিত। তারে ফিরে নিয়ে চলিয়াছি মৃত্যু স্নানতীর্থতটে সেই আদি নির্ঝরতলায়। বুঝি এই যাত্রা মোর স্বপ্নের অরণ্যবীথিপারে পূর্ব ইতিহাস-ধৌত অকলঙ্ক প্রথমের পানে-- যে প্রথম বারে বারে ফিরে আসে বিশ্বের সৃষ্টিতে কখনো বা অগ্নিবর্ষী প্রচণ্ডের প্রলয়হুংকারে, কখনো বা অকস্মাৎ স্বপ্নভাঙা পরম বিস্ময়ে শুকতারানিমন্ত্রিত আলোকের উৎসবপ্রাঙ্গণে।