এদের পানে তাকাই আমি, বক্ষে কাঁপে ভয়। সব পেরিয়ে তোমায় দেখি, আর তো কিছু নয়। একটুখানি সামনে আমার আঁধার জেগে থাকে সেইটুকুতে সূর্যতারা সবই আমার ঢাকে-- তার উপরে চেয়ে দেখি আলোয় আলোময়। ছোটো আমার বড়ো হয় যে যখন টানি কাছে-- বড়ো তখন কেমন করে লুকায় তারি পাছে। কাছের পানে তাকিয়ে আমার দিন তো গেছে কেটে, এবার যেন সন্ধ্যাবেলায় কাছের ক্ষুধা মেটে-- এতকাল যে রইলে দূরে তোমারি হোক জয়।
ছবি ও গান নিয়ে আমার বলবার কথাটা বলে নিই। এটা বয়ঃসন্ধিকালের লেখা, শৈশব যৌবন যখন সবে মিলেছে। ভাষায় আছে ছেলেমানুষি, ভাবে এসেছে কৈশোর। তার পূর্বেকার অবস্থায় একটা বেদনা ছিল অনুদ্দিষ্ট, সে যেন প্রলাপ ব'কে আপনাকে শান্ত করতে চেয়েছে। এখন সেই বয়স যখন কামনা কেবল সুর খুঁজছে না, রূপ খুঁজতে বেরিয়েছে। কিন্তু আলো-আঁধারে রূপের আভাস পায়, স্পষ্ট করে কিছু পায় না। ছবি এঁকে তখন প্রত্যক্ষতার স্বাদ পাবার ইচ্ছা জেগেছে মনে কিন্তু ছবি আঁকবার হাত তৈরি হয় নি তো। কবি সংসারের ভিতরে তখনও প্রবেশ করে নি, তখনও সে বাতায়নবাসী। দূর থেকে যার আভাস দেখে তার সঙ্গে নিজের মনের নেশা মিলিয়ে দেয়। এর কোনো-কোনোটা চোখে দেখা একটুকরো ছবি পেনসিলে আঁকা, রবারে ঘষে দেওয়া, আর কোনো-কোনোটা সম্পূর্ণ বানানো। মোটের উপরে অক্ষম ভাষার ব্যাকুলতায় সবগুলিতেই বানানো ভাব প্রকাশ পেয়েছে, সহজ হয় নি। কিন্তু সহজ হবার একটা চেষ্টা দেখা যায়। সেইজন্যে চলতি ভাষা আপন এলোমেলো পদক্ষেপে এর যেখানে-সেখানে প্রবেশ করেছে। আমার ভাষায় ও ছন্দে এই একটা মেলামেশা আরম্ভ হল। ছবি ও গান কড়ি ও কোমলের ভূমিকা করে দিলে।
পথের ধারে অশথতলে মেয়েটি খেলা করে; আপন মনে আপনি আছে সারাটি দিন ধরে। উপর পানে আকাশ শুধু, সমুখ পানে মাঠ, শরৎকালে রোদ পড়েছে মধুর পথ ঘাট। দুটি একটি পথিক চলে গল্প করে, হাসে। লজ্জাবতী বধূটি গেল ছায়াটি নিয়ে পাশে। আকাশ-ঘেরা মাঠের ধারে বিশাল খেলাঘরে, একটি মেয়ে আপন মনে কতই খেলা করে। মাথার 'পরে ছায়া পড়েছে রোদ পড়েছে কোলে, পায়ের কাছে একটি লতা বাতাস পেয়ে দোলে। মাঠের থেকে বাছুর আসে দেখে নূতন লোক, ঘাড় বেঁকিয়ে চেয়ে থাকে ড্যাবা ড্যাবা চোখ। কাঠবিড়ালি উসুখুসু আশেপাশে ছোটে, শব্দ পেলে লেজটি তুলে চমক খেয়ে ওঠে। মেয়েটি তাই চেয়ে দেখে কত যে সাধ যায়, কোমল গায়ে হাত বুলায়ে চুমো খেতে চায়। সাধ যেতেছে কাঠবিড়ালি তুলে নিয়ে বুকে, ভেঙে ভেঙে টুকুটুকু খাবার দেবে মুখে। মিষ্টি নামে ডাকবে তারে গালের কাছে রেখে, বুকের মধ্যে রেখে দেবে আঁচল দিয়ে ঢেকে। "আয় আয়" ডাকে সে তাই করুণ স্বরে কয়, "আমি কিছু বলব না তো আমায় কেন ভয়।" মাথা তুলে চেয়ে থাকে উঁচু ডালের পানে, কাঠবিড়ালি ছুটে পালায় ব্যথা সে পায় প্রাণে। রাখাল ছেলের বাঁশি বাজে সুদূর তরুছায়, খেলতে খেলতে মেয়েটি তাই খেলা ভুলে যায়। তরুর মূলে মাথা রেখে চেয়ে থাকে পথে, না জানি কোন্ পরীর দেশে ধায় সে মনোরথে। একলা কোথায় ঘুরে বেড়ায় মায়া-দ্বীপে গিয়ে; হেনকালে চাষী আসে দুটি গোরু নিয়ে। শব্দ শুনে কেঁপে ওঠে চমক ভেঙে চায়। আঁখি হতে মিলায় মায়া স্বপন টুটে যায়।