সুন্দরী তুমি শুকতারা সুদূর শৈলশিখরান্তে, শর্বরী যবে হবে সারা দর্শন দিয়ো দিক্ভ্রান্তে। ধরা যেথা অম্বরে মেশে আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র, আঁধারের বক্ষের 'পরে আধেক আলোকরেখা রন্ধ্র। আমার আসন রাখে পেতে নিদ্রাগহন মহাশূন্য, তন্ত্রী বাজাই স্বপনেতে তন্দ্রা ঈষৎ করি ক্ষুণ্ন। মন্দ চরণে চলি পারে, যাত্রা হয়েছে মোর সাঙ্গ। সুর থেমে আসে বারে বারে, ক্লান্তিতে আমি অবশাঙ্গ। সুন্দরী ওগো শুকতারা, রাত্রি না যেতে এসো তূর্ণ। স্বপ্নে যে বাণী হল হারা জাগরণে করো তারে পূর্ণ। নিশীথের তল হতে তুলি লহো তারে প্রভাতের জন্য। আঁধারে নিজেরে ছিল ভুলি, আলোকে তাহারে করো ধন্য। যেখানে সুপ্তি হল লীনা, যেথা বিশ্বের মহামন্দ্র, অর্পিনু সেথা মোর বাণী আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র।
রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা, ভাবি নি সম্ভব হবে কোনোদিন। আগে ওকে বারবার দেখেছি লালরঙের শাড়িতে দালিম ফুলের মতো রাঙা; আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়, আঁচল তুলেছে মাথায় দোলনচাঁপার মতো চিকনগৌর মুখখানি ঘিরে। মনে হল, কালো রঙে একটা গভীর দূরত্ব ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চার দিকে, যে দূরত্ব সর্ষেখেতের শেষ সীমানায় শালবনের নীলাঞ্জনে। থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা; চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে। হঠাৎ খবরের কাগজ ফেলে দিয়ে আমাকে করলে নমস্কার। সমাজবিধির পথ গেল খুলে, আলাপ করলেম শুরু -- কেমন আছ, কেমন চলছে সংসার ইত্যাদি। সে রইল জানলার বাইরের দিকে চেয়ে যেন কাছের দিনের ছোঁয়াচ-পার-হওয়া চাহনিতে। দিলে অত্যন্ত ছোটো দুটো-একটা জবাব, কোনোটা বা দিলেই না। বুঝিয়ে দিলে হাতের অস্থিরতায় -- কেন এ-সব কথা, এর চেয়ে অনেক ভালো চুপ করে থাকা। আমি ছিলেম অন্য বেঞ্চিতে ওর সাথিদের সঙ্গে। এক সময়ে আঙুল নেড়ে জানালে কাছে আসতে। মনে হল কম সাহস নয়; বসলুম ওর এক-বেঞ্চিতে। গাড়ির আওয়াজের আড়ালে বললে মৃদুস্বরে, "কিছু মনে কোরো না, সময় কোথা সময় নষ্ট করবার। আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই; দূরে যাবে তুমি, দেখা হবে না আর কোনোদিনই। তাই যে প্রশ্নটার জবাব এতকাল থেমে আছে, শুনব তোমার মুখে। সত্য করে বলবে তো? আমি বললেম, "বলব।" বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল, "আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই কি গেছে, কিছুই কি নেই বাকি।" একটুকু রইলেম চুপ করে; তারপর বললেম, "রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে।" খটকা লাগল, কী জানি বানিয়ে বললেম না কি। ও বললে, "থাক্, এখন যাও ও দিকে।" সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে; আমি চললেম একা।
মেঘের মধ্যে মা গো, যারা থাকে তারা আমায় ডাকে, আমায় ডাকে। বলে, "আমরা কেবল করি খেলা, সকাল থেকে দুপুর সন্ধেবেলা। সোনার খেলা খেলি আমরা ভোরে, রুপোর খেলা খেলি চাঁদকে-ধরে।' আমি বলি, "যাব কেমন করে।' তারা বলে, "এসো মাঠের শেষে। সেইখানেতে দাঁড়াবে হাত তুলে, আমরা তোমায় নেব মেঘের দেশে।' আমি বলি, "মা যে আমার ঘরে বসে আছে চেয়ে আমার তরে, তারে ছেড়ে থাকব কেমন করে।' শুনে তারা হেসে যায় মা, ভেসে। তার চেয়ে মা আমি হব মেঘ; তুমি যেন হবে আমার চাঁদ-- দু হাত দিয়ে ফেলব তোমায় ঢেকে, আকাশ হবে এই আমাদের ছাদ। ঢেউয়ের মধ্যে মা গো যারা থাকে, তারা আমায় ডাকে, আমায় ডাকে। বলে, "আমরা কেবল করি গান সকাল থেকে সকল দিনমান।' তারা বলে, "কোন্ দেশে যে ভাই, আমরা চলি ঠিকানা তার নাই।' আমি বলি, "কেমন করে যাই।' তারা বলে, "এসো ঘাটের শেষে। সেইখানেতে দাঁড়াবে চোখ বুজে, আমরা তোমায় নেব ঢেউয়ের দেশে।' আমি বলি, "মা যে চেয়ে থাকে, সন্ধে হলে নাম ধরে মোর ডাকে, কেমন ক'রে ছেড়ে থাকব তাকে।' শুনে তারা হেসে যায় মা, ভেসে। তার চেয়ে মা, আমি হব ঢেউ, তুমি হবে অনেক দূরের দেশ। লুটিয়ে আমি পড়ব তোমার কোলে, কেউ আমাদের পাবে না উদ্দেশ।