তোমার বীণার সাথে আমি সুর দিয়ে যে যাব তারে তারে খুঁজে বেড়াই সে সুর কোথায় পাব। যেমন সহজ ভোরের জাগা, স্রোতের আনাগোনা, যেমন সহজ পাতায় শিশির, মেঘের মুখে সোনা, যেমন সহজ জ্যোৎস্নাখানি নদীর বালু-পাড়ে, গভীর রাতে বৃষ্টিধারা আষাঢ়-অন্ধকারে খুঁজে মরি তেমনি সহজ, তেমনি ভরপুর, তেমনিতরো অর্থ-ছোটা আপনি-ফোটা সুর-- তেমনিতরো নিত্য নবীন, অফুরন্ত প্রাণ, বহুকালের পুরানো সেই সবার জানা গান। আমার যে এই নূতন-গড়া নূতন বাঁধা তার নূতন সুরে করতে সে যায় সৃষ্টি আপনার। মেশে না তাই চারি দিকের সহজ সমীরণে, মেলে না তাই আকাশ-ডোবা স্তব্ধ আলোর সনে। জীবন আমার কাঁদে যে তাই দণ্ডে পলে পলে, যত চেষ্টা করি কেবল চেষ্টা বেড়ে চলে। ঘটিয়ে তুলি কত কী যে বুঝি না এক তিল, তোমার সঙ্গে অনায়াসে হয় না সুরের মিল।
খ্যাতি নিন্দা পার হয়ে জীবনের এসেছি প্রদোষে, বিদায়ের ঘাটে আছি বসে। আপনার দেহটারে অসংশয়ে করেছি বিশ্বাস, জরার সুযোগ পেয়ে নিজেরে সে করে পরিহাস, সকল কাজেই দেখি কেবলি ঘটায় বিপর্যয়, আমার কর্তৃত্ব করে ক্ষয়; সেই অপমান হতে বাঁচাতে যাহারা অবিশ্রাম দিতেছে পাহারা, পাশে যারা দাঁড়ায়েছে দিনান্তের শেষ আয়োজনে, নাম না'ই বলিলাম তাহারা রহিল মনে মনে। তাহারা দিয়েছে মোরে সৌভাগ্যের শেষ পরিচয়, ভুলায়ে রাখিছে তারা দুর্বল প্রাণের পরাজয়; এ কথা স্বীকার তারা করে খ্যাতি প্রতিপত্তি যত সুযোগ্য সক্ষমদের তরে; তাহারাই করিছে প্রমাণ অক্ষমের ভাগ্যে আছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সেই দান। সমস্ত জীবন ধরে খ্যাতির খাজনা দিতে হয়, কিছু সে সহে না অপচয়; সব মূল্য ফুরাইলে যে দৈন্য প্রেমের অর্ঘ্য আনে অসীমের স্বাক্ষর সেখানে।