কিশোরগাঁয়ের পুবের পাড়ায় বাড়ি পিস্নি বুড়ি চলেছে গ্রাম ছাড়ি। একদিন তার আদর ছিল, বয়স ছিল ষোলো, স্বামী মরতেই বাড়িতে বাস অসহ্য তার হল। আর-কোনো ঠাঁই হয়তো পাবে আর-কোনো এক বাসা, মনের মধ্যে আঁকড়ে থাকে অসম্ভবের আশা। অনেক গেছে ক্ষয় হয়ে তার, সবাই দিল ফাঁকি, অল্প কিছু রয়েছে তার বাকি। তাই দিয়ে সে তুলল বেঁধে ছোট্ট বোঝাটাকে, জড়িয়ে কাঁথা আঁকড়ে নিল কাঁখে। বাঁ হাতে এক ঝুলি আছে, ঝুলিয়ে নিয়ে চলে, মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠে বসে ধূলির তলে। শুধাই যবে, কোন্ দেশেতে যাবে, মুখে ক্ষণেক চায় সকরুণ ভাবে; কয় সে দ্বিধায়, "কী জানি ভাই, হয়তো আলম্ডাঙা, হয়তো সান্কিভাঙা, কিংবা যাব পাটনা হয়ে কাশী।" গ্রাম-সুবাদে কোন্কালে সে ছিল যে কার মাসি, মণিলালের হয় দিদিমা, চুনিলালের মামি-- বলতে বলতে হঠাৎ যে যায় থামি, স্মরণে কার নাম যে নাহি মেলে। গভীর নিশাস ফেলে চুপটি ক'রে ভাবে, এমন করে আর কতদিন যাবে। দূরদেশে তার আপন জনা, নিজেরই ঝঞ্ঝাটে তাদের বেলা কাটে। তারা এখন আর কি মনে রাখে এতবড়ো অদরকারি তাকে। চোখে এখন কম দেখে সে, ঝাপসা যে তার মন, ভগ্নশেষের সংসারে তার শুকনো ফুলের বন। স্টেশন-মুখে গেল চলে পিছনে গ্রাম ফেলে, রাত থাকতে, পাছে দেখে পাড়ায় মেয়ে ছেলে। দূরে গিয়ে, বাঁশবাগানের বিজন গলি বেয়ে পথের ধারে বসে পড়ে, শূন্যে থাকে চেয়ে।
হে পদ্মা আমার, তোমায় আমায় দেখা শত শত বার। একদিন জনহীন তোমার পুলিনে, গোধূলির শুভলগ্নে হেমন্তের দিনে, সাক্ষী করি পশ্চিমের সূর্য অস্তমান তোমারে সঁপিয়াছিনু আমার পরান। অবসানসন্ধ্যালোকে আছিলে সেদিন নতমুখী বধূসম শান্ত বাক্যহীন; সন্ধ্যাতারা একাকিনী সস্নেহ কৌতুকে চেয়ে ছিল তোমাপানে হাসিভরা মুখে। সেদিনের পর হতে, হে পদ্মা আমার, তোমায় আমায় দেখা শত শত বার। নানা কর্মে মোর কাছে আসে নানা জন, নাহি জানে আমাদের পরানবন্ধন, নাহি জানে কেন আসি সন্ধ্যা-অভিসারে বালুকা শয়ন-পাতা নির্জন এ পারে। যখন মুখর তব চক্রবাকদল সুপ্ত থাকে জলাশয়ে ছাড়ি কোলাহল, যখন নিস্তব্ধ গ্রামে তব পূর্বতীরে রুদ্ধ হয়ে যায় দ্বার কুটিরে কুটিরে, তুমি কোন্ গান কর আমি কোন্ গান দুই তীরে কেহ তার পায় নি সন্ধান। নিভৃতে শরতে গ্রীষ্মে শীতে বরষায় শত বার দেখাশুনা তোমায় আমায়। কতদিন ভাবিয়াছি বসি তব তীরে পরজন্মে এ ধরায় যদি আসি ফিরে, যদি কোনো দূরতর জন্মভূমি হতে তরী বেয়ে ভেসে আসি তব খরস্রোতে-- কত গ্রাম কত মাঠ কত ঝাউঝাড় কত বালুচর কত ভেঙে-পড়া পাড় পার হয়ে এই ঠাঁই আসিব যখন জেগে উঠিবে না কোনো গভীর চেতন? জন্মান্তরে শতবার যে নির্জন তীরে গোপন হৃদয় মোর আসিত বাহিরে, আর বার সেই তীরে সে সন্ধ্যাবেলায় হবে না কি দেখাশুনা তোমায় আমায়?