আমি যখন পাঠশালাতে যাই আমাদের এই বাড়ির গলি দিয়ে, দশটা বেলায় রোজ দেখতে পাই ফেরিওলা যাচ্ছে ফেরি নিয়ে। "চুড়ি চা--ই, চুড়ি চাই' সে হাঁকে, চীনের পুতুল ঝুড়িতে তার থাকে, যায় সে চলে যে পথে তার খুশি, যখন খুশি খায় সে বাড়ি গিয়ে। দশটা বাজে, সাড়ে দশটা বাজে, নাইকো তাড়া হয় বা পাছে দেরি। ইচ্ছে করে সেলেট ফেলে দিয়ে অম্নি করে বেড়াই নিয়ে ফেরি। আমি যখন হাতে মেখে কালি ঘরে ফিরি, সাড়ে চারটে বাজে, কোদাল নিয়ে মাটি কোপায় মালী বাবুদের ওই ফুল-বাগানের মাঝে। কেউ তো তারে মানা নাহি করে কোদাল পাছে পড়ে পায়ের 'পরে। গায়ে মাথায় লাগছে কত ধুলো, কেউ তো এসে বকে না তার কাজে। মা তারে তো পরায় না সাফ জামা, ধুয়ে দিতে চায় না ধুলোবালি। ইচ্ছে করে আমি হতেম যদি বাবুদের ওই ফুল-বাগানের মালী। একটু বেশি রাত না হতে হতে মা আমারে ঘুম পাড়াতে চায়। জানলা দিয়ে দেখি চেয়ে পথে পাগড়ি প'রে পাহারওলা যায়। আঁধার গলি, লোক বেশি না চলে, গ্যাসের আলো মিট্মিটিয়ে জ্বলে, লণ্ঠনটি ঝুলিয়ে নিয়ে হাতে দাঁড়িয়ে থাকে বাড়ির দরজায়। রাত হয়ে যায় দশটা এগারোটা কেউ তো কিছু বলে না তার লাগি। ইচ্ছে করে পাহারওলা হয়ে গলির ধারে আপন মনে জাগি।
পঞ্চাশোর্ধ্বে বনে যাবে এমন কথা শাস্ত্রে বলে, আমরা বলি বানপ্রস্থ যৌবনেতেই ভালো চলে। বনে এত বকুল ফোটে, গেয়ে মরে কোকিল পাখি, লতাপাতার অন্তরালে বড়ো সরস ঢাকাঢাকি। চাঁপার শাখে চাঁদের আলো, সে সৃষ্টি কি কেবল মিছে? এ-সব যারা বোঝে তারা পঞ্চাশতের অনেক নীচে। পঞ্চাশোর্ধ্বে বনে যাবে এমন কথা শাস্ত্রে বলে, আমরা বলি বানপ্রস্থ যৌবনেতেই ভালো চলে। ঘরের মধ্যে বকাবকি, নানান মুখে নানা কথা। হাজার লোকে নজর পাড়ে, একটুকু নাই বিরলতা। সময় অল্প, ফুরায় তাও অরসিকের আনাগোনায়-- ঘণ্টা ধরে থাকেন তিনি সৎপ্রসঙ্গ-আলোচনায়। হতভাগ্য নবীন যুবা কাছেই থাকে বনের খোঁজে, ঘরের মধ্যে মুক্তি যে নেই এ কথা সে বিশেষ বোঝে। পঞ্চাশোর্ধ্বে বনে যাবে এমন কথা শাস্ত্রে বলে, আমরা বলি বানপ্রস্থ যৌবনেতেই ভালো চলে। আমরা সবাই নব্যকালের সভ্য যুবা অনাচারী, মনুর শাস্ত্র শুধরে দিয়ে নতুন বিধি করব জারি-- বুড়ো থাকুন ঘরের কোণে, পয়সাকড়ি করুন জমা, দেখুন বসে বিষয়-পত্র, চালান মামলা-মকদ্দমা, ফাগুন-মাসে লগ্ন দেখে যুবারা যাক বনের পথে, রাত্রি জেগে সাধ্যসাধন থাকুক রত কঠিন ব্রতে । পঞ্চাশোর্ধ্বে বনে যাবে এমন কথা শাস্ত্রে বলে, আমরা বলি বানপ্রস্থ যৌবনেতেই ভালো চলে।