সত্য মোর অবলিপ্ত সংসারের বিচিত্র প্রলেপে, বিবিধের বহু হস্তক্ষেপে, অযত্নে অনবধানে হারালো প্রথম রূপ,দেবতার আপন স্বাক্ষর লুপ্তপ্রায়-- ক্ষয়ক্ষীণ জ্যোতির্ময় আদিমূল্য তার। চতুষ্পথে দাঁড়াল সে ললাটে পণ্যের ছাপ নিয়ে আপনারে বিকাইতে-- অঙ্কিত হতেছে তার স্থান পথে-চলা সহস্রের পরীক্ষাচিহ্নিত তালিকায়। হেনকালে একদিন আলো-আঁধারের সন্ধিস্থলে আরতিশঙ্খের ধ্বনি যে লগ্নে বাজিল সিন্ধুপারে, মনে হল, মুহূর্তেই থেমে গেল সব বেচাকেনা, শান্ত হল আশাপ্রত্যাশার কোলাহল। মনে হল, পরের মুখের মূল্য হতে মুক্ত, সব চিহ্ন-মোছা অসজ্জিত আদিকৌলীন্যের শান্ত পরিচয় বহি যেতে হবে নীরবের ভাষাহীন সংগীতমন্দিরে একাকীর একতারা হাতে। আদিমসৃষ্টির যুগে প্রকাশের যে আনন্দ রূপ নিল আমার সত্তায় আজ ধূলিমগ্ন তাহা, নিদ্রাহারা রুগ্ণ বুভুক্ষার দীপধূমে কলঙ্কিত। তারে ফিরে নিয়ে চলিয়াছি মৃত্যু স্নানতীর্থতটে সেই আদি নির্ঝরতলায়। বুঝি এই যাত্রা মোর স্বপ্নের অরণ্যবীথিপারে পূর্ব ইতিহাস-ধৌত অকলঙ্ক প্রথমের পানে-- যে প্রথম বারে বারে ফিরে আসে বিশ্বের সৃষ্টিতে কখনো বা অগ্নিবর্ষী প্রচণ্ডের প্রলয়হুংকারে, কখনো বা অকস্মাৎ স্বপ্নভাঙা পরম বিস্ময়ে শুকতারানিমন্ত্রিত আলোকের উৎসবপ্রাঙ্গণে।
কে নিল খোকার ঘুম হরিয়া। মা তখন জল নিতে ও পাড়ার দিঘিটিতে গিয়াছিল ঘট কাঁখে করিয়া।-- তখন রোদের বেলা সবাই ছেড়েছে খেলা, ও পারে নীরব চখা-চখীরা; শালিক থেমেছে ঝোপে, শুধু পায়রার খোপে বকাবকি করে সখা-সখীরা; তখন রাখাল ছেলে পাঁচনি ধুলায় ফেলে ঘুমিয়ে পড়েছে বটতলাতে; বাঁশ-বাগানের ছায়ে এক-মনে এক পায়ে খাড়া হয়ে আছে বক জলাতে। সেই ফাঁকে ঘুমচোর ঘরেতে পশিয়া মোর ঘুম নিয়ে উড়ে গেল গগনে, মা এসে অবাক রয়, দেখে খোকা ঘর-ময় হামাগুড়ি দিয়ে ফিরে সঘনে। আমার খোকার ঘুম নিল কে। যেথা পাই সেই চোরে বাঁধিয়া আনিব ধরে, সে লোক লুকাবে কোথা ত্রিলোকে। যাব সে গুহার ছায়ে কালো পাথরের গায়ে কুলু কুলু বহে যেথা ঝরনা। যাব সে বকুলবনে নিরিবিলি সে বিজনে ঘুঘুরা করিছে ঘর-করনা। যেখানে সে-বুড়া বট নামায়ে দিয়েছে জট, ঝিল্লি ডাকিছে দিনে দুপুরে, যেখানে বনের কাছে বনদেবতারা নাচে চাঁদিনিতে রুনুঝুনু নূপুরে, যাব আমি ভরা সাঁঝে সেই বেণুবন-মাঝে আলো যেথা রোজ জ্বালে জোনাকি-- শুধাব মিনতি করে, "আমাদের ঘুমচোরে তোমাদের আছে জানাশোনা কি।' কে নিল খোকার ঘুম চুরায়ে। কোনোমতে দেখা তার পাই যদি একবার লই তবে সাধ মোর পুরায়ে। দেখি তার বাসা খুঁজি কোথা ঘুম করে পুঁজি, চোরা ধন রাখে কোন্ আড়ালে। সব লুঠি লব তার, ভাবিতে হবে না আর খোকার চোখের ঘুম হারালে ডানা দুটি বেঁধে তারে নিয়ে যাব নদীপারে সেখানে সে ব'সে এক কোণেতে জলে শরকাঠি ফেলে মিছে মাছ-ধরা খেলে দিন কাটাইবে কাশবনেতে। যখন সাঁঝের বেলা ভাঙিবে হাটের মেলা ছেলেরা মায়ের কোল ভরিবে, সারা রাত টিটি-পাখি টিটকারি দিবে ডাকি-- "ঘুমচোরা কার ঘুম হরিবে।'
যখন রব না আমি মর্তকায়ায় তখন স্মরিতে যদি হয় মন তবে তুমি এসো হেথা নিভৃত ছায়ায় যেখা এই চৈত্রের শালবন। হেথায় যে মঞ্জরী দোলে শাখে শাখে, পুচ্ছ নাচায়ে যত পাখি গায়, ওরা মোর নাম ধরে কভু নাহি ডাকে, মনে নাহি করে বসি নিরালায়। কত যাওয়া কত আসা এই ছায়াতলে আনমনে নেয় ওরা সহজেই, মিলায় নিমেষে কত প্রতি পলে পলে হিসাব কোথাও তার কিছু নেই। ওদের এনেছে ডেকে আদিসমীরণে ইতিহাসলিপিহারা যেই কাল আমারে সে ডেকেছিল কভু খনে খনে, রক্তে বাজায়েছিল তারি তাল। সেদিন ভুলিয়াছিনু কীর্তি ও খ্যাতি, বিনা পথে চলেছিল ভোলা মন; চারি দিকে নামহারা ক্ষণিকের জ্ঞাতি আপনারে করেছিল নিবেদন। সেদিন ভাবনা ছিল মেঘের মতন, কিছু নাহি ছিল ধরে রাখিবার; সেদিন আকাশে ছিল রূপের স্বপন, রঙ ছিল উড়ো ছবি আঁকিবার। সেদিনের কোনো দানে ছোটো বড়ো কাজে স্বাক্ষর দিয়ে দাবি করি নাই; যা লিখেছি যা মুছেছি শূন্যের মাঝে মিলায়েছে, দাম তার ধরি নাই। সেদিনের হারা আমি-- চিহ্নবিহীন পথ বেয়ে কোরো তার সন্ধান, হারাতে হারাতে যেথা চলে যায় দিন, ভরিতে ভরিতে ডালি অবসান। মাঝে মাঝে পেয়েছিল আহ্বান-পাঁতি যেখানে কালের সীমারেখা নেই-- খেলা করে চলে যায় খেলিবার সাথি গিয়েছিল দায়হীন সেখানেই। দিন নাই, চাই নাই, রাখি নি কিছুই ভালো মন্দের কোনো জঞ্জাল; চলে-যাওয়া ফাগুনের ঝরা ফুলে ভুঁই আসন পেতেছে মোর ক্ষণকাল। সেইখানে মাঝে মাঝে এল যারা পাশে কথা তারা ফেলে গেছে কোন্ ঠাঁই; সংসার তাহাদের ভোলে অনায়াসে, সভাঘরে তাহাদের স্থান নাই। বাসা যার ছিল ঢাকা জনতার পারে, ভাষাহারাদের সাথে মিল যার, যে আমি চায় নি কারে ঋণী করিবারে, রাখিয়া যে যায় নাই ঋণভার, সে আমারে কে চিনেছ মর্তকায়ায়, কখনো স্মরিতে যদি হয় মন, ডেকো না ডেকো না সভা-- এসো এ ছায়ায় যেথা এই চৈত্রের শালবন।