মালঞ্চ

প্রথম অঙ্ক

প্রথম দৃশ্য

পিঠের দিকে বালিশগুলো উঁচু-করা। নীরজা আধশোওয়া পড়ে আছে রোগশয্যায়। পায়ের উপরে সাদা রেশমের চাদর টানা।
মেঝে সাদা মার্বেলে বাঁধানো, দেয়ালে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ছবি, ঘরে পালঙ্ক, একটি টিপাই ও দুটি বেতের মোড়া ছাড়া আর-কোনো আসবাব নেই, এক কোণে পিতলের কলসীতে রজনীগন্ধার গাছ
পূব দিকের জানলা খোলা। দেখা যায় নীচের বাগানে অর্কিডের ঘর, ছিটেবেড়ার তৈরি। বেড়ার গায়ে গায়ে অপরাজিতার লতা।
নীরজা।
রোশনি!
আয়া এল ঘরে। প্রৌঢ়া, কাঁচা-পাকা চুল। শক্ত হাতে মোটা পিতলের কঙ্কণ। ঘাঘরার উপর শাড়ি।
মাংসবিরল দেহের ভঙ্গিতে ও শুষ্ক মুখের ভাবে একটা চিরস্থায়ী কঠিনতা।
রোশনি।
জল এনে দেব খোঁখী?
নীরজা।
না বোস্‌।

মেঝের উপর আয়া বসল হাঁটু উঁচু করে

আজ ভোরবেলায় দরজা খোলার শব্দ শুনলুম। সরলাকে নিয়ে বুঝি উনি বাগানে গিয়েছিলেন? ...আমাকেও তো এমনি করে ভোরে জাগিয়ে বাগানের কাজে রোজ নিয়ে যেতেন, ঠিক ঐ সময়েই। সে তো বেশি দিনের কথা নয়।
রোশনি।
এতগুলো মালী মাইনে খাচ্ছে তবু ওঁকে নইলে বাগান শুকিয়ে যেত বুঝি?
নীরজা।
নিয়ুমার্কেটে ভোরবেলাকার ফুলের চালান না পাঠিয়ে আমার একদিনও কাটত না। আজও ফুলের চালান গিয়েছিল। গাড়ির শব্দ শুনেছি। আজকাল চালান কে দেখে দেয় রোশনি?

আয়া কোনো উত্তর করলে না--ঠোঁট চেপে রইল বসে

আর যাই হোক, আমি যতদিন ছিলুম মালীরা ফাঁকি দিতে পারে নি।
রোশনি।
আর সেদিন নেই। লুঠ চলছে এখন দু-হাতে।
নীরজা।
সত্যি নাকি?
রোশনি।
আমি কি মিথ্যে বলছি? কলকাতার নতুন বাজারে ক-টা ফুলই বা পৌঁছয়? জামাইবাবু বেরিয়ে গেলেই খিড়কির দরজায় ফুলের বাজার বসে যায়।
নীরজা।
এরা কেউ দেখে না?
রোশনি।
চোখ থাকতেও যদি না দেখে তো কী আর বলব?
নীরজা।
জামাইবাবুকে বলিস-নে কেন?
রোশনি।
বলব! এত বড়ো বুকের পাটা কার! এখন কি আর সে রাজত্তি আছে? মান বাঁচিয়ে চলতে হয়। তুমি একটু জোর করে বলো-না কেন খোঁখী! তোমারি তো সব!
নীরজা।
হোক না, হোক না! বেশ তো! এমনি চলুক-না কিছুদিন, যখন ছারখার হয়ে আসবে আপনিই পড়বে ধরা। তখন বুঝবে মায়ের চেয়ে সৎমায়ের ভালোবাসা বড়ো নয়। ওঁর সরলার চেয়ে বাগানের দরদ কেউ জানে না! চুপ করে থাক্‌-না, দর্পহারী মধুসূদন আছেন।
রোশনি।
কিন্তু তাও বলি খোঁখী, তোমার ঐ হলা মালীটাকে দিয়ে কোনো কাজ পাওয়া যায় না।
নীরজা।
আমি মালীকে দোষ দিই নে। নতুন মনিবকে ও সইবে কেমন করে? ওদের হল সাতপুরুষে মালীগিরি, আর তোমার দিদিমণির বইপড়া বিদ্যে। ওকে হুকুম করতে আসে। হলা আমার কাছে নালিশ করেছিল, শুধিয়েছিল এ-সব ছিষ্টিছাড়া আইন মানতে হবে না কি? আমি ওকে বলে দিলুম-- "শুনিস্‌ কেন? চুপ করে থাক্‌, কিচ্ছু করতে হবে না।'
রোশনি।
সেদিন জামাইবাবু রাগ করে ওকে ছাড়িয়ে দিতে গিয়েছিলেন। বাগানে গোরু ঢুকেছিল। তিনি বললেন, "গোরু তাড়াস-নে কেন?' ও মুখের উপর জবাব করলে, "আমি তাড়াব গোরু?--গোরুই তো আমাকে তাড়া করে। আমার প্রাণের ভয় নেই?'
নীরজা।
তা যাই হোক, ও যাই করুক, ও আমার নিজের হাতে তৈরি। ওকে তাড়িয়ে বাগানে নতুন লোক আনলে, সে আমি সইতে পারব না। তা গোরুই ঢুকুক আর গণ্ডারই তাড়া করুক। কী দুঃখে ও গোরু তাড়ায় নি সে আমি কি বুঝি নে? ওর যে আগুন জ্বলেছে বুকে।--ঐ যে হলা চলেছে দাঁতন করতে করতে দিঘির দিকে। ডাক্‌ তো ওকে।
রোশনি।
হলা, হলা।
হলধরের প্রবেশ
নীরজা।
কী রে, আজকাল নতুন ফরমাশ আছে কিছু?
হলা।
আছে বৈকি বউদিদি, শুনে চোখে জল আসে।
নীরজা।
কী রকম?
হলা।
পাশে মল্লিকদের বাড়ি ভাঙা হচ্ছে, হুকুম হল তারি ইঁট-পাটকেল সব গাছের গোড়ায় গোড়ায় দিতে। আমি বললুম, রোদের বেলা গরম লাগবে গাছের। কান দেয় না আমার কথায়।
নীরজা।
বাবুকে বলিস-নে কেন?
হলা।
বলেছিলুম। বাবু ধমক দিয়ে বললে, চুপ করে থাক্‌। বউদিদি, আমাকে ছুটি দাও, আমি তো আর এ সইতে পারি নে।
নীরজা।
তাই দেখেছি বটে তুই ঝুড়ি করে রাবিশ বয়ে আনছিলি।
হলা।
বউদিদি, তুমিই তো আমার চিরদিনের মনিব-- তোমার চোখের সামনে আমার এত অপমান ঘটতে দেবে?
নীরজা।
আচ্ছা যা, তোদের দিদিমণি যখন তোকে ইঁটসুরকি বইতে বলবে বলিস আমি তোকে বারণ করেছি। এখন যা-দাঁড়িয়ে রইলি যে?
হলা।
দেশ থেকে চিঠি এসেছে হালের গোরু একটা মারা গেছে। না কিনতে পারলে চাষ বন্ধ। কাকে জানাব দুঃখ!
নীরজা।
সব তোর মিথ্যে কথা।
হলা।
মিথ্যে হলেও তো দয়া করতে হয়। হলা তোমার দুঃখী তো বটে।
নীরজা।
আচ্ছা সে হবে। রোশনি, সরকারবাবুকে বলে দিস ওকে দুটো টাকা দেবে। আবার কী! যা চলে।
হলা।
বউয়ের জন্যে একটা তোমার পুরোনো কাপড়-- দেশে পাঠিয়ে দিই জয়জয়কার।
নীরজা।
রোশনি, ওকে দে তো ঐ আলনার কাপড়খানা।
রোশনি।
সে কি কথা! ও যে তোমার ঢাকাই শাড়ি।
নীরজা।
হোক্‌-না ঢাকাই শাড়ি! আমার কিসের দরকার? কবেই বা আর পরব?
রোশনি।
সে হবে না খোঁখী। ওকে তোমার সেই লালপেড়ে কলের কাপড়টা দিয়ে দেব।
হলা।
(নীরজার পা ধরে) আমার কপাল ভেঙেছে বউদিদি।
নীরজা।
কেন রে? কী হল তোর?
হলা।
আয়াজিকে মাসি বলে এসেছি, এতদিন জানতেম হতভাগা হলাকে আয়াজি ভালোই বাসেন। আজ বউদিদি, তোমার যদি দয়া হল উনি কেন দেন বাগ্‌ড়া? আমার যদি এমন দশা না হবে তবে তোমার হলাকে পরের হাতে দিয়ে তুমি আজ বিছানায় পড়ে!
নীরজা।
না রে, তোর মাসি তোকে ভালোই বাসে-- এইমাত্র তোর গুণগান করছিল। রোশনি, দিয়ে দাও ওকে কাপড়টা, নইলে ও ধন্না দিয়ে পড়ে থাকবে।
আয়া অপ্রসন্ন মুখে কাপড়টা ফেলে দিলে ওর সামনে। হলা সেটা তুলে নিয়েই প্রণাম করে বললে--
হলা।
এই গামছাটা দিয়ে মুড়ে নিই বউদিদি, নইলে দাগ লাগবে।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
নীরজা।
আচ্ছা আয়া, তুই ঠিক জানিস বাবু বেরিয়ে গেছেন?
রোশনি।
নিজের চক্ষে দেখলুম। কী তাড়া! টুপিটা নিতে ভুলে গেলেন।
নীরজা।
এমন তো একদিনও হয় নি। সকালবেলায় ফুল একটা দিয়ে যেতেন-- সময় হল না। জানি জানি আগেকার দিনের আর কিছুই থাকবে না। আমি থাকব পড়ে আমার সংসারের আঁস্তাকুড়ে নিবে-যাওয়া উনুনের পোড়াকয়লা ঝেঁটিয়ে ফেলবার জায়গায়। সে কোন্‌ দেবতা এমন বিচার যার?
[ উভয়ের প্রস্থান ]
সরলার প্রবেশ। হাতে তার একটি অর্কিড। ....সরলা ছিপছিপে লম্বা, শামলা রঙ। দেখবামাত্র সব চেয়ে লক্ষ্য হয় তার বড়ো বড়ো চোখ, উজ্জ্বল এবং করুণ। মোটা খদ্দরের শাড়ি, চুল অযত্নে বাঁধা, শ্লথ বন্ধনে নেমে পড়েছে কাঁধের দিকে। অসজ্জিত দেহ যৌবনের সমাগমকে অনাদৃত করে রেখেছে। নীরজা তার মুখের দিকে তাকালে না। যেন কেউ আসে নি ঘরে। সরলা আস্তে আস্তে ফুলটি বিছানায় তার সামনে রেখে দিলে।
নীরজা।
(বিরক্তিতে) কে আনতে বলেছে?
সরলা।
আদিৎদা।
নীরজা।
নিজে এলেন না যে?
সরলা।
নিয়ুমার্কেটের দোকানে তাড়াতাড়ি যেতে হল চা-খাওয়া সেরেই।
নীরজা।
এত তাড়া কিসের?
সরলা।
কাল রাত্রে তালা ভেঙে টাকা চুরির খবর এসেছে।
নীরজা।
টানাটানি করে পাঁচ মিনিটও কি সময় দিতে পারতেন না?
সরলা।
কাল রাত্রে তোমার ব্যথা বেড়েছিল, ঘুমোতে পার নি। ভোরবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছিলে,দরজা পর্যন্ত এসে ফিরে গেলেন। আমাকে বলে গেলেন, দুপুরের মধ্যে যদি নিজে না আসতে পারেন তবে এই ফুলটি তোমাকে দিই যেন।
নীরজা।
(ফুলটা অবজ্ঞার সঙ্গে ঠেলে দিয়ে) জানো মার্কেটে এ ফুলের দাম কত? পাঠিয়ে দাও সেখানে, মিছে নষ্ট করবার দরকার কী।...জানো এ ফুলের নাম?
সরলা।
এমারিলিস।
নীরজা।
ভারি তো জানো তুমি। ওর নাম গ্র৻াণ্ডিফ্লোরা।
সরলা।
তা হবে।
নীরজা।
তা হবে মানে কী? নিশ্চয়ই তাই। আমি জানি নে?
ধীরে ধীরে সরলা প্রস্থানোদ্যত
সরলা।
অর্কিডের ঘরে।
নীরজা।
অর্কিডের ঘরে তোমার ঘন ঘন যাবার এত কী দরকার?
সরলা।
পুরোনো অর্কিড চিরে ভাগ করে নতুন অর্কিড করবার জন্য আদিৎদা আমাকে বলে গিয়েছিলেন।
নীরজা।
আনাড়ির মতো সব নষ্ট করবে তুমি। আমি নিজের হাতে হলা মালীকে তৈরি করে শিখিয়েছি, তাকে হুকুম করলে সে কি পারত না?...দাও বন্ধ করে দাও ঐ জানলা।
সরলা।
(জানালা বন্ধ করে দিয়ে) এইবার কমলালেবুর রস নিয়ে আসি।
নীরজা।
না, কিছু আনতে হবে না। এখন যেতে পারো।
সরলা।
মকরধ্বজ খাবার সময় হয়েছে।
নীরজা।
না, দরকার নেই মকরধ্বজ। তোমার উপর বাগানের আর-কোনো কাজের ফরমাশ আছে নাকি?
সরলা।
গোলাপের ডাল পুঁততে হবে।
নীরজা।
তার সময় এই বুঝি! এ বুদ্ধি তাঁকে দিলে কে, শুনি।
সরলা।
মফস্বল থেকে হঠাৎ অনেকগুলো অর্ডার এসেছে দেখে কোনো মতে আসছে বর্ষার আগেই বেশি করে গাছ বানাতে পণ করেছেন। আমি বারণ করেছিলুম।
নীরজা।
বারণ করেছিলে বুঝি? আচ্ছা আচ্ছা, ডেকে দাও হলা মালীকে।

হলা মালীকে সরলা ডেকে আনল

(হলা মালীর প্রতি) বাবু হয়ে উঠেছ? গোলাপের ডাল পুঁততে হাতে খিল ধরে, দিদিমণি তোমার অ্যাসিস্টেণ্ট মালী না কি? বাবু শহর থেকে ফেরবার আগেই যতগুলো পারিস ডাল পুঁতবি; আজ তোদের ছুটি নেই বলে দিচ্ছি। পোড়া ঘাসপাতার সঙ্গে বালি মিশিয়ে জমি তৈরি করে নিস ঝিলের ডান পাড়িতে।
শ্রান্তিতে নীরজা বালিশে মাথা এলিয়ে চুপ করে পড়ে রইল। ধীরে ধীরে ঘর থেকে সরলার প্রস্থান
হলা।
বউদিদি, একটা পিতলের ঘটি। কটকের তৈরি। এ জিনিসের দরদ তুমিই বুঝবে, তোমার ফুলদানি মানাবে ভালো।
নীরজা।
এর দাম কত হবে?
হলা।
(জিভ কেটে) এমন কথা বলো না। ঐ ঘটির দাম নেব? তোমার খেয়ে-পরেই মানুষ!

ঘটি টেবিলে রেখে অন্য ফুলদানি থেকে ফুল নিয়ে সাজিয়ে দিলে। যাবার মুখো হয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে

আমার ভাগনীর বিয়েতে সেই বাজুবন্ধের কথাটা ভুলো না বউদিদি। পিতলের জিনিস যদি দিই তাতে তোমারি নিন্দে হবে।
নীরজা।
আচ্ছা আচ্ছা, স্যাকরাকে ফরমাশ দেব, তুই এখন যা।
[ উভয়ের প্রস্থান ]

দ্বিতীয় দৃশ্য

নীরজা শয্যায় অর্ধশায়িত। তার খুড়তুতো দেওর রমেনের প্রবেশ
রমেন।
বউদি, দাদা পাঠিয়ে দিলেন। আজ আপিসে কাজের ভিড়, হোটেলে খাবেন, দেরি হবে ফিরতে।
নীরজা।
(হেসে) খবর দেবার ছুতো করে এক দৌড়ে ছুটে এসেছ, ঠাকুরপো। কেন, আপিসের বেহারাটা মরেছে বুঝি?
রমেন।
তোমার কাছে আসতে তুমি ছাড়া অন্য ছুতোর দরকার কিসের বউদি? বেহারা বেটা কী বুঝবে এই দূতপদের দরদ।
নীরজা।
ওগো মিষ্টি ছড়াচ্ছ অস্থানে। এ ঘরে এসেছ কোন্‌ ভুলে? তোমার মালিনী আছেন আজ একাকিনী নেবু কুঞ্জবনে। দেখো গে যাও।
রমেন।
কুঞ্জবনের বনলক্ষ্মীকে দর্শনী দিই আগে, তার পরে যাব মালিনীর সন্ধানে।
এই বলে বুকের পকেট থেকে একখানা গল্পের বই বের করে নীরজার হাতে দান
নীরজা।
"অশ্রুশিকল"-- এই বইটাই চাচ্ছিলুম। আশীর্বাদ করি,তোমার মালঞ্চের মালিনী চিরদিন বুকের কাছে বাঁধা থাক্‌ হাসির শিকলে।-- ঐ যাকে তুমি বলো তোমার কল্পনার দোসর-- তোমার স্বপ্নসঙ্গিনী। কী সোহাগ গো!
রমেন।
আচ্ছা বউদি, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, ঠিক উত্তর দিয়ো।
নীরজা।
কী কথা?
রমেন।
সরলার সঙ্গে আজ কি তোমার ঝগড়া হয়ে গেছে?
নীরজা।
কেন বলো তো?
রমেন।
দেখলুম ঝিলের ধারে ঘাটে চুপ করে সে বসে আছে। মেয়েদের তো পুরুষদের মতো কাজ-পালানো উড়ো-মন নয়। এমন বেকার দশা আমি সরলার কোনোদিন দেখি নি। জিজ্ঞাসা করলুম "মন কোন্‌ দিকে?' ও বললে-- "যে দিকে তপ্ত হাওয়া শুকনো পাতা ওড়ায় সেই দিকে।' আমি বললুম-- "ওটা হল হেঁয়ালি, স্পষ্ট ভাষায় কথা কও।' সে বললে-- "সব কথারই কি ভাষা আছে?' আবার দেখি হেঁয়ালি। তখন গানের বুলিটা মনে পড়ল "কাহার বচন দিয়েছে বেদন'।
নীরজা।
হয়তো তোমার দাদার বচন।
রমেন।
হতেই পারে না।
নীরজা।
কেন হতেই পারে না?
রমেন।
দাদা যে পুরুষমানুষ। সে তোমার ঐ মালীগুলোকে হুঙ্কার দিতে পারে, কিন্তু "পুষ্পরাশাবিবাগ্নিঃ'--এও কি সম্ভব হয়?
নীরজা।
আচ্ছা, বাজে কথা বকতে হবে না। একটা কাজের কথা বলি, আমার অনুরোধ রাখতেই হবে। দোহাই তোমার, সরলাকে তুমি বিয়ে করো। আইবড়ো মেয়েকে উদ্ধার করলে মহাপুণ্য।
রমেন।
পুণ্যের লোভ রাখি নে কিন্তু ঐ কন্যার লোভ রাখি, এ কথা বলছি তোমার কাছে হলফ করে।
নীরজা।
তা হলে বাধাটা কোথায়? ওর কি মন নেই?
রমেন।
সে কথা জিজ্ঞাসাও করি নি। বলেছিই তো ও আমার কল্পনার দোসরই থাকবে, সংসারের দোসর হবে না।
নীরজা।
(হঠাৎ তীব্র আগ্রহের সঙ্গে রমেনের হাত চেপে ধরে) কেন হবে না, হতেই হবে। মরবার আগে তোমাদের বিয়ে দেখবই, নইলে ভূত হয়ে তোমাদের জ্বালাতন করব বলে রাখছি।
রমেন।
(বিষ্মিতভাবে নীরজার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে চেয়ে মাথা নেড়ে) বউদি, আমি সম্পর্কে ছোটো, কিন্তু বয়সে বড়ো। উড়ো বাতাসে আগাছার বীজ আসে ভেসে, প্রশ্রয় পেলে শিকড় ছড়ায়, তার পরে আর ওপড়ায় কার সাধ্যি।
নীরজা।
আমাকে উপদেশ দিতে হবে না। আমি তোমার গুরুজন, তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, বিয়ে করো। দেরি কোরো না। এই ফাল্গুন মাসে ভালো দিন আছে।
রমেন।
আমার পাঁজিতে তিনশো পঁয়ষট্টি দিনই ভালো দিন| কিন্তু দিন যদি বা থাকে, রাস্তা নেই। আমি একবার গেছি জেলে, এখনো আছি পিছল পথে জেলের কবলটার দিকে, ও পথে প্রজাপতির পেয়াদার চল নেই।
নীরজা।
এখনকার মেয়েরাই বুঝি জেলখানাকে ভয় করে?
রমেন।
না করতে পারে কিন্তু সপ্তপদীগমনের রাস্তা ওটা নয়। ও রাস্তায় বধূকে পাশে না রেখে মনের মধ্যে রাখলে জোর পাওয়া যায়। রইল চিরদিন আমার মনে।
হরলিক্স দুধের পাত্রটা টিপাইয়ের উপর রেখে সরলা চলে যাচ্ছিল
নীরজা।
যেয়ো না, শোনো সরলা, এই ফোটোগ্রাফটা কার, চিনতে পারো?
সরলা।
ও তো আমার।
নীরজা।
তোমার সেই আগেকার দিনের ছবি। যখন তোমার জ্যাঠামশায়ের ওখানে তোমরা বাগানের কাজ করতে। দেখে মনে হচ্ছে বয়েস পনেরো হবে। মারাঠি মেয়ের মতো মালকোঁচা দিয়ে শাড়ি পরেছ।
সরলা।
এ তুমি কোথা থেকে পেলে?
নীরজা।
আমি জানতুম ওঁর একটা ডেস্কের মধ্যে ছিল, সেখান থেকে আনিয়ে নিয়েছি। ঠাকুরপো, তখনকার চেয়ে সরলাকে এখন আরো অনেক ভালো দেখতে হয়েছে। তোমার কী মনে হয়।
রমেন।
তখন সরলাকে জানতুম না তাই আমার কাছে এখনকার সরলাই সত্য।
নীরজা।
ওর এখনকার চেহারা হৃদয়ের কোন্‌ একটা রহস্যে ভরে উঠেছে --যেন যে মেঘ ছিল সাদা তার ভিতর থেকে শ্রাবণের জল আজ ঝরি-ঝরি করছে-- একেই তোমরা রোম্যাণ্টিক বলো, না ঠাকুরপো!
[সরলার প্রস্থানোদ্যম--
নীরজা।
সরলা, একটু রোসো।-- ঠাকুরপো, একবার পুরুষমানুষের চোখ দিয়ে সরলাকে দেখে নিই। ওর কী সকলের আগে তোমাদের চোখে পড়ে বলো দেখি!
রমেন।
সমস্তটাই একসঙ্গে।
নীরজা।
নিশ্চয়ই ওর চোখ দুটো, কেমন একরকম মিষ্টি করে চাইতে জানে। না, উঠো না সরলা। আর-একটু বোসো। ওর দেহটাও কেমন নিরেট নিটোল।
রমেন।
তুমি কি ওকে নীলেম করতে বসেছ না কি বউদি? জানোই তো অমনিতেই আমার উৎসাহের কিছু কমতি নেই।
নীরজা।
ঠাকুরপো, দেখো সরলার হাত-দুখানি, যেমন জোরালো তেমনি সুডোল, কোমল, তেমনি তার শ্রী। এমনটি আর দেখেছ?
রমেন।
(হেসে) আর কোথাও দেখেছি কি না তার উত্তরটা তোমার মুখের সামনে রূঢ় শোনাবে।
নীরজা।
অমন দুটি হাতের 'পরে দাবি করবে না?
রমেন।
চিরদিনের দাবি নাই করলেম, ক্ষণে ক্ষণে দাবি করে থাকি। তোমাদের ঘরে যখন চা খেতে আসি তখন চায়ের চেয়ে বেশি কিছু পাই ঐ হাতের গুণে। সেই রসগ্রহণে পাণিগ্রহণের যেটুকু সম্পর্ক থাকে অভাগার পক্ষে সেই যথেষ্ট।

সরলা মোড়া ছেড়ে উঠে পড়ল। ঘর থেকে বেরোবার উপক্রম করতেই
রমেন দ্বার আগলে বললে--

একটা কথা দাও; তবে পথ ছাড়ব।
সরলা।
কী বলো!
রমেন।
আজ শুক্লা চতুর্দশী, আমি মুসাফির আসব তোমার বাগিচায়, কথা যদি থাকে তবু কইবার দরকারই হবে না। আকাল পড়েছে, পেট ভরে দেখাই জোটে না। হঠাৎ এই ঘরে মুষ্টিভিক্ষার দেখা-- এ মঞ্জুর নয়। আজ তোমাদের গাছতলায় বেশ একটু রয়ে বসে মনটা ভরিয়ে নিতে চাই।
সরলা।
আচ্ছা এসো তুমি।
রমেন।
(খাটের কাছে ফিরে এসে) তবে আসি বউদি।
নীরজা।
আর থাকবার দরকার কী? বউদির যে কাজটুকু ছিল সে তো সারা হল।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
নীরজা।
রোশনি, শুনে যা।
রোশনির প্রবেশ
রোশনি।
কী খোঁখী।
নীরজা।
তোদের জামাইবাবু একদিন আমাকে ডাকত রঙমহলের রঙ্গিণী। দশ বছর আমাদের বিয়ে হয়েছে, সেই রঙ এখনো ফিকে হয় নি কিন্তু সেই রঙমহল!
রোশনি।
যাবে কোথায়, আছে তোমার মহল। কাল তুমি সারারাত ঘুমোও নি, একটু ঘুমোও তো, পায়ে হাত বুলিয়ে দিই।
নীরজা।
রোশনি, আজ তো পূর্ণিমার কাছাকাছি। এমন কত রাত্রে ঘুমোই নি। দুজনে বেড়িয়েছি বাগানে। সেই জাগা আর এই জাগা! আজ তো ঘুমোতে পারলে বাঁচি, কিন্তু পোড়া ঘুম আসতে চায় না যে।
রোশনি।
একটু চুপ করে থাকো দেখি, ঘুম আপনি আসবে।
নীরজা।
আচ্ছা, ওরা কি বাগানে বেড়ায় জ্যোৎস্নারাত্রে?
রোশনি।
ভোরবেলাকার চালানের জন্য ফুল কাটতে দেখেছি। বেড়াবে কখন, সময় কোথায়?
নীরজা।
মালীগুলো আজকাল খুব ঘুমোচ্ছে--তা হলে ওদের বুঝি জাগায় না ইচ্ছে করেই?
রোশনি।
তুমি নেই এখন ওদের গায়ে হাত দেয় কার সাধ্যি।
নীরজা।
ঐ না শুনলেম শব্দ?
রোশনি।
হ্যাঁ, বাবুর গাড়ি এল।
নীরজা।
হাত-আয়নাটা এগিয়ে দে। বড়ো গোলাপটা নিয়ে আয় ফুলদানী থেকে, সেফটি পিনের বাক্সটা কোথায় দেখি। আজ আমার মুখ বড়ো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। যা তুই ঘর থেকে।
রোশনি।
যাচ্ছি কিন্তু দুধ বার্লি পড়ে আছে, খেয়ে নাও, লক্ষ্মী তুমি।
নীরজা।
থাক্‌ পড়ে, খাব না।
রোশনি।
দু দাগ ওষুধ তোমার আজ খাওয়া হয় নি।
নীরজা।
তোর বকতে হবে না, তুই যা বলছি, ঐ জানলাটা খুলে দিয়ে যা।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
ঢংঢং করে তিনটে বাজল। দূরে ঝিলের জল টলমল করছে, জানলা দিয়ে তার কিছুটা দেখা যাচ্ছে, নীরজা সে দিকে চেয়ে আছে। দ্রুত পদে আদিত্য ছুটে এল ঘরে। হাত জোড়া বাসন্তী রঙের দেশী ল্যাবার্নাম ফুলের মঞ্জরীতে। তাই দিয়ে ঢেকে দিল নীরজার পায়ের কাছটা। বিছানায় বসেই তার হাত চেপে ধরে বললে--
আদিত্য।
আজ কতক্ষণ তোমাকে দেখি নি নীরু!
নীরজা আর থাকতে পারল না, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আদিত্য খাটের থেকে নেমে মেঝের উপর হাঁটু গেড়ে নীরজার গলা জড়িয়ে| ধরে ললাটের চুলগুলো সিঁথিতে পাট করে তুলে দিতে দিতে বললে--
আদিত্য।
মনে মনে তুমি নিশ্চয় জানো আমার দোষ ছিল না।
নীরজা।
অত নিশ্চয় করে কী করে জানব বলো? আমার কি আর সেদিন আছে?
আদিত্য।
দিনের কথা হিসেব করে কী হবে? তুমি তো আমার সেই তুমিই আছ।
নীরজা।
আজ যে আমার সকল তাতেই ভয় করে। জোর পাই নে যে মনে।
আদিত্য।
অল্প একটু ভয় করতে ভালো লাগে। না? খোঁটা দিয়ে আমাকে একটুখানি উসকিয়ে দিতে চাও। এ চাতুরী মেয়েদের স্বভাবসিদ্ধ।
নীরজা।
আর ভুলে যাওয়া বুঝি পুরুষদের স্বভাবসিদ্ধ? নয়?
আদিত্য।
ভুলতে ফুরসত দাও কই!
নীরজা।
বোলো না, বোলো না, পোড়া বিধাতার শাপে লম্বা ফুরসত দিয়েছি যে।
আদিত্য।
উলটো বললে। সুখের দিনে ভোলা যায়, ব্যথার দিনে নয়।
নীরজা।
সত্যি বলো, আজ সকালে তুমি ভুলে চলে যাও নি?
আদিত্য।
কী কথা বলো তুমি। চলে যেতে হয়েছিল কিন্তু যতক্ষণ না ফিরেছি মনে স্বস্তি ছিল না।
নীরজা।
কেমন করে বসেছ তুমি! তোমার পা দুটো বিছানায় তোলো।
আদিত্য।
বেড়ি দিতে চাও পাছে পালাই?
নীরজা।
হাঁ, বেড়ি দিতেই চাই। জনমে মরণে তোমার পা দুখানি নিঃসন্দেহে রইল আমার কাছে বাঁধা।
আদিত্য।
মাঝে মাঝে একটু একটু সন্দেহ কোরো, তাতে আদরের স্বাদ বাড়ায়।
নীরজা।
না, একটুও সন্দেহ না। এতটুকুও না। তোমার মতো এমন স্বামী কোন্‌ মেয়ে পেয়েছে? তোমাকেও সন্দেহ, তাতে যে আমাকেই ধিক্কার।
আদিত্য।
আমি তা হলে তোমাকেই সন্দেহ করব, নইলে জমবে না নাটক।
নীরজা।
তা কোরো, কোনো ভয় নেই। সেটা হবে প্রহসন।
আদিত্য।
যাই বলো আজ কিন্তু রাগ করেছিলে আমার 'পরে!
নীরজা।
কেন আবার সে কথা? শাস্তি তোমাকে দিতে হবে না।-- নিজের মধ্যেই তার দণ্ডবিধান।
আদিত্য।
দণ্ড কিসের জন্য? রাগের তাপ যদি মাঝে মাঝে দেখা না দেয় তা হলে বুঝব ভালোবাসার নাড়ি ছেড়ে গেছে।
নীরজা।
যদি কোনোদিন ভুলে তোমার উপরে রাগ করি, নিশ্চয় জেনো সে আমি নয়, কোনো অপদেবতা আমার উপরে ভর করেছে।
আদিত্য।
অপদেবতা আমাদের সকলেরই একটা করে থাকে, মাঝে মাঝে অকারণে জানান দেয়। সুবুদ্ধি যদি আসে, রাম নাম করি, দেয় সে দৌড়।
আয়া এল ঘরে
রোশনি।
জামাইবাবু, আজ সকাল থেকে খোঁখী দুধ খায় নি, ওষুধ খায় নি, মালিশ করে নি। এমন করলে আমরা ওর সঙ্গে পারব না।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
আদিত্য।
(দাঁড়িয়ে উঠে) এবার তবে আমি রাগ করি?
নীরজা।
হাঁ, করো, অন্যায় করেছি, কিন্তু মাপ কোরো তার পরে।
আদিত্য।
(দরজার কাছে এসে) সরলা! সরলা!

সরলা এল ঘরে

(সরলাকে বিরক্তভাবে) নীরুকে ওষুধ দাও নি আজ, সারাদিন কিছু খেতেও দেওয়া হয় নি?
নীরজা।
ওকে বক্‌ছ কেন? ওর দোষ কী? আমিই দুষ্টুমি করে খাই নি। আমাকে বকো-না। সরলা, তুমি যাও। মিছে কেন দাঁড়িয়ে বকুনি খাবে।
আদিত্য।
যাবে কি, ওষুধ বের করে দিক, হরলিক্স মিল্ক তৈরি করে আনুক।
নীরজা।
আহা, সমস্ত দিন ওকে মালীর কাজে খাটিয়ে মারো তার উপরে আবার নার্সের কাজ কেন! একটু দয়া হয় না তোমার মনে? আয়াকে ডাকো-না।
আদিত্য।
আয়া কি ঠিকমত পারবে এ-সব কাজ?
নীরজা।
ভারি তো কাজ, খুব পারবে। আরো ভালোই পারবে।
আদিত্য।
কিন্তু--
নীরজা।
কিন্তু আবার কিসের। আয়া! আয়া!
আদিত্য।
অত উত্তেজিত হোয়ো না। একটা বিপদ ঘটবে দেখছি।
সরলা।
আমি আয়াকে ডেকে দিচ্ছি।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
আয়া এসে ওষুধ পথ্য করাল
আদিত্য।
(আয়াকে) সরলাদিদিকে ডেকে দাও।
নীরজা।
কথায় কথায় কেবলই সরলাদিদি, বেচারাকে তুমি অস্থির করে তুলবে দেখছি।
আদিত্য।
কাজের কথা আছে।
নীরজা।
থাক্‌-না এখন কাজের কথা।
আদিত্য।
বেশিক্ষণ লাগবে না।
নীরজা।
সরলা মেয়েমানুষ, ওর সঙ্গে এত কাজের কথা কিসের? তার চেয়ে হলা মালীকে ডাকো -না।
আদিত্য।
তোমাকে বিয়ে করবার পর থেকে একটা কথা আবিষ্কার করেছি যে, মেয়েরাই কজের, পুরুষরা হাড়ে অকেজো। আমরা কাজ করি দায়ে পড়ে, তোমরা কাজ করো প্রাণের উৎসাহে। এই সম্বন্ধে একটা থীসিস্‌ লিখব মনে করেছি। আমার ডায়রি থেকে বিস্তর উদাহরণ পাওয়া যাবে।
নীরজা।
সেই মেয়েকেই আজ তার প্রাণের কাজ থেকে বঞ্চিত করেছে যে বিধাতা, তাকে কি বলে নিন্দে করব? ভূমিকম্পে হুড়মুড় করে আমার কাজের চূড়া পড়েছে ভেঙে, তাই তো পোড়ো বাড়িতে ভূতের বাসা হল।
সরলার প্রবেশ
আদিত্য।
অর্কিড-ঘরের কাজ হয়ে গেছে?
সরলা।
হ্যাঁ, হয়ে গেছে।
আদিত্য।
সবগুলো?
সরলা।
সবগুলোই।
আদিত্য।
আর গোলাপের কাটিং?
সরলা।
মালী তার জমি তৈরি করছে।
আদিত্য।
জমি! সে তো আমি আগেই তৈরি করে রেখেছি। হলা মালীর উপর ভার দিয়েছ, তা হলেই দাঁতনকাঠির চাষ হবে আর কি।
নীরজা।
সরলা, যাও তো, কমলালেবুর রস করে নিয়ে এসো গে, তাতে একটু আদার রস দিয়ো, আর মধু।

[সরলা মাথা হেঁট করে বেরিয়ে গেল

(আদিত্যকে) আজ তুমি ভোরে উঠেছিলে যেমন আমরা রোজ উঠতুম?
আদিত্য।
হ্যাঁ, উঠেছিলুম।
নীরজা।
ঘড়িতে তেমনি এলার্‌মের দম দেওয়া ছিল?
আদিত্য।
ছিল বৈকি।
নীরজা।
সেই নিম গাছতলায় সেই কাঁটাগাছের গুঁড়ি। তার উপরে চায়ের সরঞ্জাম। সব ঠিক রেখেছিল বাসু?
আদিত্য।
রেখেছিল। নইলে খেসারতের দাবিতে নালিশ রুজু করতুম তোমার আদালতে।
নীরজা।
দুটো চৌকিই পাতা ছিল?
আদিত্য।
পাতা ছিল সেই আগেকার মতোই। আর ছিল সেই নীল-পাড়দেওয়া বাসন্তী রঙের চায়ের সরঞ্জাম, দুধের জাগ রুপোর, ছোটো সাদা পাথরের বাটিতে চিনি, আর ড্রাগন-আঁকা জাপানী ট্রে।
নীরজা।
অন্য চৌকিটা খালি রাখলে কেন?
আদিত্য।
ইচ্ছে করে রাখি নি। আকাশে তারাগুলো গোনাগুনতি ঠিকই ছিল, কেবল শুক্লাপঞ্চমীর চাঁদ রইল দিগন্তের বাইরে। সুযোগ থাকলে তাকে আনতেম ধরে।
নীরজা।
সরলাকে কেন ডাকো না তোমার চায়ের টেবিলে?
আদিত্য।
সকালবেলায় বোধ হয় সে জপতপ কিছু করে, আমার মতো ভজনপূজনহীন ম্লেচ্ছ তো নয়।
নীরজা।
চা খাওয়ার পরে আজ বুঝি অর্কিড-ঘরে তাকে নিয়ে গিয়েছিলে?
আদিত্য।
হ্যাঁ, কিছু কাজ ছিল, ওকে বুঝিয়ে দিয়েই ছুটতে হল দোকানে।
নীরজা।
আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, সরলার সঙ্গে রমেনের বিয়ে দাও না কেন?
আদিত্য।
ঘটকালি কি আমার ব্যাবসা?
নীরজা।
না, ঠাট্টা নয়। বিয়ে তো করতেই হবে, রমেনের মতো পাত্র পাবে কোথায়?
আদিত্য।
পাত্র আছে একদিকে, পাত্রী আছে আর-একদিকে, মাঝখানটাতে মন আছে কি না সে খবর নেবার ফুরসত পাই নি। দূরের থেকে মনে হয় যেন ঐখানটাতেই খটকা।
নীরজা।
কোনো খটকা থাকত না যদি তোমার সত্যিকার আগ্রহ থাকত।
আদিত্য।
বিয়ে করবে অন্যপক্ষ, সত্যিকার আগ্রহটা থাকবে একা আমার, এটাতে কি কাজ চলে? তুমি চেষ্টা দেখো-না।
নীরজা।
কিছুদিন গাছপালা থেকে ঐ মেয়েটার দৃষ্টিটাকে ছুটি দাও দেখি, ঠিক জায়গায় আপনি চোখ পড়বে।
আদিত্য।
শুভদৃষ্টির আলোতে গাছপালা পাহাড়-পর্বত সমস্তই স্বচ্ছ হয়ে যায়। ও একজাতের এক্সরেজ আর-কি।
নীরজা।
মিছে বকছ। আসল কথা তোমার ইচ্ছে নয় বিয়েটা ঘটে।
আদিত্য।
এতক্ষণে ধরেছ ঠিক। সরলা গেলে আমার বাগানের দশা কী হবে বলো। লাভলোকসানের কথাটাও ভাবতে হয়। ও কি ও, হঠাৎ তোমার বেদনাটা বেড়ে উঠল না কি?
নীরজা।
(রুক্ষভাবে) কিছু হয় নি। আমার জন্যে তোমাকে তত ব্যস্ত হতে হবে না।

আদিত্য ওঠবার উপক্রম করছে

...আমাদের বিয়ের পরেই ঐ অর্কিড-ঘরের প্রথম পত্তন, ভুলে যাও নি তো সে কথা? তার পরে দিনে দিনে আমরা দুজনে মিলে ঐ ঘরটাকে সাজিয়ে তুলেছি। ওটাকে নষ্ট করতে দিতে তোমার মনে একটুও লাগে না?
আদিত্য।
(বিস্মিতভাবে) সে কেমন কথা? নষ্ট হতে দেবার শখ আমার দেখলে কোথায়?
নীরজা।
(উত্তেজিত হয়ে) সরলা কী জানে ফুলের বাগানের?
আদিত্য।
বলো কী? সরলা জানে না? যে-মেসোমশায়ের ঘরে আমি মানুষ তিনি যে সরলার জ্যাঠামশায়। তুমি তো জানো তাঁরি বাগানে আমার হাতে-খড়ি। জ্যাঠামশায় বলতেন ফুলের বাগানের কাজ মেয়েদেরই, আর গোরু দোওয়ানো। তাঁর সব কাজে ও ছিল তাঁর সঙ্গিনী।
নীরজা।
আর তুমি ছিলে সঙ্গী।
আদিত্য।
ছিলেম বৈকি। কিন্তু আমাকে করতে হত কলেজের পড়া, ওর মতো অত সময় দিতে পারি নি। ওকে মেশোমশায় নিজে পড়াতেন।
নীরজা।
সেই বাগান নিয়ে তোমার মেসোমশায়ের সর্বনাশ হয়ে গেল, এমনি ও মেয়ের পয়! আমার তো তাই ভয় করে। অলক্ষুণে মেয়ে। দেখো-না মাঠের মতো কপাল, ঘোড়ার মতো লাফিয়ে চলন। মেয়েমানুষের পুরুষালি বুদ্ধিটা ভালো নয়। ওতে অকল্যাণ ঘটায়।
আদিত্য।
তোমার আজ কী হয়েছে বলো তো নীরু? কী কথা বলছ? মেসোমশায় বাগান করতেই জানতেন, ব্যাবসা করতে জানতেন না। ফুলের চাষ করতে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়, নিজের লোকসান করতেও তাঁর সমকক্ষ কেহ ছিল না। সকলের কাছে তিনি নাম পেতেন, দাম পেতেন না। বাগান করবার জন্যে আমাদের যখন মূলধনের টাকা দিয়েছিলেন আমি কি জানতুম তখনি তাঁর তহবিল ডুবুডুবু। আমার একমাত্র সান্ত্বনা এই যে, তাঁর মরবার আগেই সমস্ত দিয়েছি শোধ করে।
সরলা কমলালেবুর রস নিয়ে এল
নীরজা।
(সরলাকে) ঐখানে রেখে যাও।

[রেখে সরলা চলে গেল

(আদিত্যকে) সরলাকে তুমি বিয়ে করলে না কেন?
আদিত্য।
শোনো একবার কথা! বিয়ের কথা কোনোদিন মনেও আসে নি।
নীরজা।
মনেও আসে নি? এই বুঝি তোমার কবিত্ব!
আদিত্য।
জীবনে কবিত্বের বালাই প্রথম দেখা দিল যেদিন তোমাকে দেখলুম। তার আগে আমরা দুই বুনো মিলে দিন কাটিয়েছি বনের ছায়ায়, নিজেদের ছিলুম ভুলে। হাল আমলের সভ্যতায় যদি মানুষ হতুম তা হলে কী হত বলা যায় না।
নীরজা।
কেন, সভ্যতার অপরাধটা কী?
আদিত্য।
এখনকার সভ্যতাটা দুঃশাসনের মতো হৃদয়ের বস্ত্র হরণ করতে চায়। অনুভব করবার পূর্বেই জানিয়ে দেয় চোখে আঙুল দিয়ে। গন্ধের ইশারা ওর পক্ষে বেশি সূক্ষ্ম, খবর নেয় পাপড়ি ছিঁড়ে।
নীরজা।
সরলাকে তো দেখতে মন্দ নয়।
আদিত্য।
সরলাকে জানতুম সরলা বলেই। ও দেখতে ভালো কি মন্দ সে তত্ত্বটা সম্পূর্ণ বাহুল্য ছিল।
নীরজা।
আচ্ছা সত্যি বলো| ওকে তুমি ভালোবাসতে না?
আদিত্য।
নিশ্চয় ভালোবাসতুম। আমি কি জড়পদার্থ যে, ওকে ভালোবাসব না। মেশোমশায়ের ছেলে রেঙ্গুনে ব্যারিস্টারি করে, তার জন্যে কোনো ভাবনা নেই। তাঁর বাগানটি নিয়ে সরলা থাকবে এই ছিল তাঁর জীবনের সাধ। এমন-কি, তাঁর বিশ্বাস ছিল, এই বাগানই ওর সমস্ত মনপ্রাণ অধিকার করবে। ওর বিয়ে করবার গরজ থাকবে না। তার পরে তিনি চলে গেলেন। অনাথা হল সরলা, পাওনাদারের হাতে বাগানটি গেল বিকিয়ে। সেদিন আমার বুক ভেঙে গিয়েছিল, দেখো নি কি তুমি? ও যে ভালোবাসার জিনিস, ভালোবাসব না ওকে? মনে তো আছে একদিন সরলার মুখে হাসিখুশি ছিল উচ্ছ্বসিত। মনে হত যেন পাখির ওড়া ছিল ওর পায়ের চলার মধ্যে। আজ ও চলেছে বুকভরা বোঝা বয়ে বয়ে, তবু ভেঙে পড়ে নি। একদিনের জন্যে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে নি আমারও কাছে, নিজেকে তার অবকাশও দিলে না।
নীরজা।
থামো গো থামো, অনেক শুনেছি ওর কথা তোমার কাছে; আর বলতে হবে না। অসামান্য মেয়ে। সেইজন্যে বলছি ওকে সেই বারাসতের মেয়ে-স্কুলের হেড্‌মিস্‌ট্রেস করে দাও। তারা তো কতবার ধরাধরি করেছে।
আদিত্য।
বারাসতের মেয়ে-ইস্কুল! কেন, আণ্ডামানও তো আছে?
নীরজা।
না, ঠাট্টা নয়। সরলাকে তোমার বাগানের আর যে-কোনো কাজ দিতে হয় দিয়ো কিন্তু ঐ অর্কিড-ঘরের কাজ দিতে পারবে না।
আদিত্য।
কেন, হয়েছে কী?
নীরজা।
আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি সরলা অর্কিড ভালো বোঝে না।
আদিত্য।
আমিও তোমাকে বলছি, আমার চেয়ে সরলা ভালো বোঝে। মেসোমশায়ের প্রধান শখ ছিল অর্কিডে। তিনি নিজের লোক পাঠিয়ে সেলিবিস দ্বীপ থেকে, জাভা থেকে, এমন-কি, চীন থেকে অর্কিড আনিয়েছেন, তার দরদ বোঝে এমন লোক তখন কেউ ছিল না।
নীরজা।
আচ্ছা, আচ্ছা, বেশ বেশ, ও না-হয় আমার চেয়ে ঢের ভালো বোঝে, এমন-কি, তোমার চেয়েও। তা হোক, তবু বলছি ঐ অর্কিডের ঘর শুধু কেবল তোমার আমার, ওখানে সরলার কোনো অধিকার নেই। তোমার সমস্ত বাগানটা ওকেই দিয়ে দাও-না যদি তোমার নিতান্ত ইচ্ছে হয়, কেবল খুব অল্প একটু কিছু রেখো যেটুকু কেবল আমাকেই উৎসর্গ-করা। এতকাল পরে অন্তত এইটুকু দাবি করতে পারি। কপাল-দোষে না-হয় আজ আছি বিছানায় পড়ে, তাই বলে--
কথা শেষ করতে পারল না, বালিশে মুখ গুঁজে অশান্ত হয়ে কাঁদতে লাগল। আদিত্য স্তম্ভিত হয়ে বসে ভাবতে লাগলে--কিছুক্ষণ পরে নীরজার হাত ধরে বললে--
আদিত্য।
কেঁদো না নীরু, বলো কী করব। তুমি কি চাও সরলাকে বাগানের কাজে না রাখি?
নীরজা।
(হাত ছিনিয়ে নিয়ে) কিচ্ছু চাই নে; কিচ্ছু না; ও তোমারই বাগান, তুমি যাকে খুশি রাখতে পারো আমার তাতে কী?
আদিত্য।
নীরু, এমন কথা তুমি বলতে পারলে, আমারই বাগান? তোমার নয়? আমাদের মধ্যে এই ভাগ হয়ে গেল কবে থেকে?
নীরজা।
যবে থেকে তোমার রইল বিশ্বের আর সমস্ত-কিছু, আর আমার রইল কেবল এই ঘরের কোণ। আমার এই ভাঙা প্রাণ নিয়ে দাঁড়াব কিসের জোরে তোমার ঐ আশ্চর্য সরলার সামনে! আমার সে শক্তি আজ কোথায় যে তোমার সেবা করি, তোমার বাগানের কাজ করি?
আদিত্য।
নীরু, তুমি তো কতদিন এর আগে আপনি সরলাকে ডেকে পাঠিয়েছ, নিয়েছ ওর পরামর্শ। মনে নেই কি এই কয়েক বছর আগে বাতাবী নেবুর সঙ্গে কলম্বা নেবুর কলম বেঁধেছ দুইজনে, আমাকে আশ্চর্য করে দেবার জন্যে।
নীরজা।
তখন তো ওর এত গুমর ছিল না। বিধাতা যে আমারই দিকে আজ অন্ধকার করে দিলে, তাই তো তোমার কাছে হঠাৎ ধরা পড়েছে-- ও এত জানে, ও তত জানে, অর্কিড চিনতে আমি ওর কাছে লাগি নে। সেদিন তো এ-সব কথা কোনোদিন শুনি নি। তবে আজ আমার এই দুর্ভাগ্যের দিনে কেন তুলনা করতে এলে? আর আমি ওর সঙ্গে পারব কেন? মাপে সমান হব কী নিয়ে?
আদিত্য।
নীরু, আজ তোমার কাছে এই যা-সব শুনছি তার জন্য একটুও প্রস্তুত ছিলুম না। মনে হচ্ছে এ যেন আমার নীরুর কথা নয়, এ যেন আর কেউ।
নীরজা।
না গো না, সেই নীরুই বটে। তার কথা এতদিনেও তুমি বুঝলে না এই আমার সব চেয়ে শাস্তি। বিয়ের পর যেদিন আমি জেনেছিলেম তোমার বাগান তোমার প্রাণের মতো প্রিয়, সেদিন থেকে ঐ বাগান আর আমার মধ্যে ভেদ রাখি নি একটুও। নইলে তোমার বাগানের সঙ্গে আমার ভীষণ ঝগড়া বাধত। ওকে সইতে পারতুম না। ও হত আমার সতীন। তুমি তো জানো আমার দিনরাতের সাধনা। জানো কেমন করে ওকে মিলিয়ে নিয়েছি আমার মধ্যে। একেবারে এক হয়ে গেছি ওর সঙ্গে।
আদিত্য।
জানি বৈকি। আমার সব-কিছুকে নিয়েই যে তুমি।
নীরজা।
ও-সব কথা রাখো। আজ দেখলুম ঐ বাগানের মধ্যে অনায়াসে প্রবেশ করলে আর-একজন, কোথাও একটুকু ব্যথা লাগল না। আমার দেহখানাকে চিরে ফেলবার কথা কি মনে করতেও পারতে, আর কারু প্রাণ তার মধ্যে চালিয়ে দেবার জন্যে? আমার বাগান কি আমার দেহ নয়? আমি হলে কি এমন করতে পারতুম?
আদিত্য।
কী করতে তুমি?
নীরজা।
বলব কী করতুম? বাগান ছারখার হয়ে যেত হয়তো। ব্যাবসা হত দেউলে। একটার জায়াগায় দশটা মালী রাখতুম কিন্তু আসতে দিতুম না আর-কোনো মেয়েকে। বিশেষত এমন কাউকে যার মনে গুমর আছে সে আমার চেয়েও বাগানের কাজ ভালো জানে। ওর এই অহংকার দিয়ে তুমি আমাকে অপমান করবে প্রতিদিন, যখন আমি আজ মরতে বসেছি, যখন উপায় নেই নিজের শক্তির প্রমাণ করবার। এমনটা কেন হতে পারল বলব?
আদিত্য।
বলো।
নীরজা।
তুমি আমার চেয়ে ওকে ভালোবাস বলে। এতদিন সে কথা লুকিয়ে রেখেছিলে।
আদিত্য কিছুক্ষণ মাথার চুলের মধ্যে হাত গুঁজে বসে রইল
আদিত্য।
(বিহ্বলকণ্ঠে) নীরু, দশ বৎসর তুমি আমাকে জেনেছ। সুখে দুঃখে নানা অবস্থায় নানা কাজে, তার পরেও তুমি যদি এমন কথা আজ বলতে পারো তবে আমি কোনো জবাব করব না। চললুম, কাছে থাকলে তোমার শরীর খারাপ হবে। ফর্নারির পাশে যে জাপানী ঘর আছে সেইখানে থাকব; যখন আমাকে দরকার হবে ডেকে পাঠিয়ো।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
  •  
  •