Home > Plays > কালের যাত্রা > কবির দীক্ষা

কবির দীক্ষা    



আমি তো ভরতি হয়েছিলাম তোমার দলেই।

দৌড় দিলে কেন।

ভয়ে।

ভয় কিসের।

ভবভয়নিবারিণী সভার সভাপতি--

আহা, পরম ধার্মিক--

বললেন আমাকে, ওই লক্ষ্মীছাড়াটা--

থামলে কেন।

আমি জানি বলেছেন,

লক্ষ্মীছাড়াটা দিচ্ছে তোমাকে রসাতলে।

একেবারে ওই শব্দটাই--

রসাতলে।

অন্যায় তো বলেননি।

বলো কী, কবি!

জীবন আমার যাঁর সাধনায় মগ্ন

সেই দেবতা তলিয়ে আছেন অতলে--

খুড়ো জ্যাঠারা বলেছেন সবাই--

তোমার দীক্ষায় না আছে অর্থের আশা,

না আছে পরমার্থের।

পণ্ডিত মানুষ তোমার খুড়ো জ্যাঠারা,

বলেন ঠিক কথাই।

সর্বনাশ তো তবে।

সত্য কথাটি বেরল মুখে,--

সর্বনাশ, ওইটের থেকেই সর্বলাভ--

সর্বনেশেই মন কেড়েছে কবির।

বুঝলেম কথাটা।

মিলছে তত্ত্বানন্দস্বামীর সঙ্গে।

শিবমন্ত্র দেন তিনি প্রলয়সাধনায়।

শিবমন্ত্র দিই আমিও।

অবাক করলে--

তুমি তো জানি কবি,

কবি হলে শৈব।

কালিদাস ছিলেন শৈব।

সেই পথের পথিক কবিরা।

 

কেন বল বেঠিক কথা।

তোমরা তো মেতে আছ নাচে গানে।

জগৎজোড়া নাচগানেরই পালা আমাদের প্রভুর।

কী বলেন তত্ত্বানন্দস্বামী।

প্রলয় ছাড়া কথা নেই তাঁর মুখে।

তত্ত্বানন্দস্বামীর নাচ!

শুনলে গম্ভীর গণেশ

বৃংহিতধ্বনি করবেন অট্টহাস্যে।

ত্যাগের দীক্ষা নিয়েছি তাঁর কাছে।

যদি পরামর্শ দেন সবই ফুঁকে দিতে

তবে কী করবে ত্যাগ।

উপুড় করবে শূন্য ঘড়াটাকে?

তুমি কাকে বলো ত্যাগ, কবি!

ত্যাগের রূপ দেখো ওই ঝর্নায়,

নিয়ত গ্রহণ করে তাই নিয়তই করে দান।

নিজেকে যে শুকিয়েছে যদি সেই হল ত্যাগী,

তবে সব-আগে শিব ত্যাগ করুন অন্নপূর্ণাকে।

কিন্তু সন্ন্যাসী শিব ভিক্ষুক, সেটা তো মানো।

মহত্ত্ব দিলেন তিনি জগতের দরিদ্রকে।

দারিদ্র৻ে তাঁরই মহত্ত্ব মহৎ যিনি ঐশ্বর্যে।

মহাদেব ভিক্ষা নেন পাবেন ব'লে নয়--

আমাদের দানকে করতে চান সার্থক।

ভরব কেমন করে তাঁর অসীম ভিক্ষার ঝুলি।

তিনি না চাইলে খুজেই পেতেম না দেবার ধন।

 

বুঝলেম না কথাটা।

কিছু তিনি চান নি কুকুর-বেড়ালের কাছে।

"অন্ন চাই' বলে ডাক দিলেন মানুষের দ্বারে।

বেরল মানুষ লাঙল কাঁধে--

যে মাটি ফাঁকা ছিল, প্রকাশ পেল তাতে অন্ন।

বললেন "চাই কাপড়'।

হাত পেতেই রইলেন--

বেরল ফলের থেকে তুলো,

তুলোর থেকে সুতো,

সুতোর থেকে কাপড়।

ভাগ্যে তাঁর ভিক্ষার ঝুলি অসীম

তাই মানুষ সন্ধান পায় অসীম সম্পদের।

নইলে দিন কাটত কুকুর-বেড়ালের মতো।

তোমরা কি বলো সব-চেয়ে বড়ো সন্ন্যাসী ওই কুকুর-বেড়াল।

তত্ত্বানন্দস্বামী কী বলেন।

তিনি বলেন, শিবের ভিক্ষার ঝুলির টানে আমরা হব নিষ্কিঞ্চন।

যার কিছু নেই দেবার, তার নেই দেনা।

সংসারের নালিশ একেবারে বন্ধ তার নামে।

মানুষকে যদি দেউলে করেন তিনি,

তবে ভিক্ষু দেবতার ব্যাবসা হবে অচল।

তাঁর ভিক্ষের ঝুলির টানে মানুষ হয় ধনী--

যদি দান করতেন ঘটত সর্বনাশ।

তোমার কথা শুনে বোধ হচ্ছে, মিথ্যে নয় পুরাণের কথাটা।

ভিক্ষুক শিবের বরেই রাবণের স্বর্ণলঙ্কা।

কিন্তু আগুন কেন লাগে সে লঙ্কায়।

 

সে যে করলে ভিক্ষে বন্ধ। লাগল জমাতে।

দিতে যেমনি পারলে না, যেমনি লাগল কাড়তে,

অমনি ঘটল সর্বনাশ।

ভিক্ষু দেবতা দ্বারে বসে হাঁকেন, দেহি দেহি।

তবু আমরা কোণে বসে আছি নেংটি প'রে। দেবো কিই বা!

কেউ বা লোভে পড়ে ভাঙতে চায় না জমানো ধন।

তবে কি য়ুরোপখণ্ডকে বলবে শিবের চেলা।

বলতে হয় বৈকি।

নইলে এত উন্নতি কেন।

মেনেছে ওরা মহাভিক্ষুর দাবি।

তাই বের করে আনছে নব নব সম্পদ--

ধনে প্রাণে জ্ঞানে মানে।

অশান্তিও তো কম দেখছি নে ওদের মধ্যে।

 

যখন শিবের ভোগ ভেঙে নিজের দিকে চুরি করে

উৎপাত বাধে তখন অশিবের।

ত্যাগের ধনে মানুষ ধনী, চুরির ধনে নয়।

আমরা কুঁড়ে, ভিক্ষুক দেবতাকে দিই নে কিছু।

তাই মরছি সব দিকেই--

খেতে ফসল যায় মরে,

পুকুরে জল যায় শুকিয়ে,

দেহে ধরে রোগ, মনে ধরে অবসাদ,

বিদেশী রাজা দেয় দুই কান মলে।

শিবের ঝুলি ভরব যেদিন, সেদিন আমাদের সব ভরবে।

কিন্তু গোড়ায় বলছিলে যে-রসের কথাটা

শিবের ঝুলিতে তো তার খবর মেলে না।

 

মেলে বৈকি। গাছের ত্যাগ ফল দিয়ে।

ফল ফলে না রস না হলে।

প্রাণের ধনই হল আনন্দ, যাকে বলি রস।

যেখানে রসের দৈন্য, ভরে না সেখানে প্রাণের কমণ্ডলু।

শ্মশানে কেন দেখি তোমার ওই দেবতাকে।

মৃত্যুতে তাঁর বিলাস বলে নয়, মৃত্যুকে জয় করবেন বলে।

যে দেবতারা অমরাবতীতে

দ্বন্দ্বই নেই তাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে।

মানুষের যিনি শিব

তিনি বিষপান করেন বিষকে কাটাবেন বলে।

"ভিক্ষা দাও' "ভিক্ষা দাও' দ্বারে দ্বারে রব উঠল তাঁর কণ্ঠে--

সে মুষ্টিভিক্ষা নয়, নয় অবজ্ঞার ভিক্ষা।

নির্ঝরিণীর স্রোত যখন হয় অলস

তখন তার দানে পঙ্ক হয় প্রধান।

দুর্বল আত্মার তামসিক দানে

দেবতার তৃতীয় নেত্রে আগুন ওঠে জ্বলে।

 

 

বৈশাখ ১২৯৪