Home > Plays > ঋণশোধ > ঋণশোধ

ঋণশোধ    



নাটকের পাত্রগণ: সম্রাট বিজয়াদিত্য, শেখর কবি, ঠাকুরদাদা, লক্ষেশ্বর, উপনন্দ, রাজা সোমপাল, রাজদূত, অমাত্য, বালকগণ

 

গান

 

হৃদয়ে ছিলে জেগে,

দেখি আজ শরৎ মেঘে।

কেমনে আজকে ভোরে

গেল গো গেল সরে

তোমার ঐ আঁচলখানি

শিশিরের ছোঁওয়া লেগে॥

কী যে গান গাহিতে চাই,

বাণী মোর খুঁজে না পাই।

সে যে ঐ শিউলিদলে

ছড়াল কাননতলে,

সে যে ঐ ক্ষণিক ধারায়

উড়ে যায় বায়ুবেগে॥

 

 

রাজসভা

 

সম্রাট বিজয়াদিত্য ও মন্ত্রী

 

মন্ত্রী।

মহারাজ, এই হচ্ছে রাজনীতি।

 

বিজয়াদিত্য।

কী তোমার রাজনীতি?

 

মন্ত্রী।

রাজ্য রাখতে গেলে রাজ্য বাড়াতে হবে। ও যেন মানুষের দেহের মতো, বৃদ্ধি যেমনি বন্ধ হয় ক্ষয়ও তেমনি শুরু হতে থাকে।

 

বিজয়াদিত্য।

রাজ্য যতই বাড়বে তাকে রক্ষা করবার দায়ও তো ততই বাড়বে -- তাহলে থামবে কোথায়?

 

মন্ত্রী।

কোথাও না। কেবলই জয় করতে হবে, কেননা প্রতাপ জিনিসটা যেখানে থামে সেইখানে নিবে যায়।

 

বিজয়াদিত্য।

তাহলে তোমার পরামর্শ কী?

 

মন্ত্রী।

আমাদের উত্তর-পশ্চিম সীমানায় যে মানিকপুর আছে সেইটে জয় করে নেবার এই অবসর উপস্থিত হয়েছে।

 

বিজয়াদিত্য।

সেই অবসর আমি দিলুম উড়িয়ে। আমার রাজনীতির কথা আমি তোমাকে বলব?

 

মন্ত্রী।

বলুন।

 

বিজয়াদিত্য।

রাজ্যের লোভ মিটবে বলেই আমি রাজত্ব করি, বাড়বে বলে নয়। রাজা হয়েছি বলেই দেখতে পেয়েছি রাজ্যটা কিছুই নয়।

 

মন্ত্রী।

বলেন কী মহারাজ? ওর মধ্যে কোনো সত্যই কি --

 

বিজয়াদিত্য।

ওর মধ্যে একমাত্র সত্য হচ্ছে রাজা হওয়া। আমি রাজা হতে চাই।

 

মন্ত্রী।

সেইজন্যেই তো --

 

বিজয়াদিত্য।

সেইজন্যেই তো আমি রাজ্যে লোভ করতে চাই না। কোনো সাম্রাজ্যই তো আজ পর্যন্ত টেঁকেনি -- যে সাম্রাজ্য যতই বড়োই হ'ক। কিন্তু একবারের মতো যে সত্যকার রাজা হতে পেরেছে চিরকালের মতো সে বেঁচে রইল।

 

মন্ত্রী।

কিন্তু সৈন্যদল প্রস্তুত আছে।

 

বিজয়াদিত্য।

ভালোই হয়েছে।

 

মন্ত্রী।

তবে কি --

 

বিজয়াদিত্য।

তাদের লাগিয়ে দাও শারদোৎসবের কাজে।

 

সেনাপতির প্রবেশ

 

সেনাপতি।

মহারাজ, শরৎকালে জয়যাত্রায় বেরোবার নিয়ম -- মহারাজের পূর্বপুরুষেরা --

 

বিজয়াদিত্য।

আমিও বেরোব ঠিক করেছি।

 

সেনাপতি।

তাহলে আদেশ করুন কী ভাবে প্রস্তুত হতে হবে।

 

বিজয়াদিত্য।

তোমাদের কাউকে সঙ্গে আসতে হবে না।

 

সেনাপতি।

বলেন কী মহারাজ?

 

বিজয়াদিত্য।

আমি একলা যাব।

 

সেনাপতি।

সে কী কথা?

 

বিজয়াদিত্য।

সে তোমরা বুঝবে না। কবি কোথায়?

 

মন্ত্রী।

তাঁকে আমরা পাঠিয়ে দিচ্ছি।

 

[ উভয়ের প্রস্থান

 

শেখরের প্রবেশ

 

বিজয়াদিত্য।

কবি।

 

শেখর।

কী মহারাজ।

 

বিজয়াদিত্য।

আমার পিতার সিংহাসনে এক বছর মাত্র আমি বসেছি -- কিন্তু মনে হচ্ছে আমাদের বংশে যতদিন যত রাজা হয়েছে সকলের বয়স একত্র হয়ে আমার ঘাড়ে চেপে বসেছে। রাজাকে নবীন করবার কী উপায় আমাকে বলে দাও তো।

 

শেখর।

সিংহাসন থেকে একবার মাটিতে পা ফেলেন দিকি। ওই মাটির মধ্যে জীবন-যৌবনের জাদুমন্ত্র রয়েছে।

 

বিজয়াদিত্য।

আমার সিংহাসনের খাঁচার দরজা আমি চিরদিনের মতো খুলে রাখতে চাই -- যাতে মাটির সঙ্গে আমার সহজ আনাগোনা চলে।

 

শেখর।

যাতে শিউলির মালার সঙ্গে আপনার মুক্তোর মালার অদল-বদল হয়! তাহলে এই শরৎকালে আপনার ওই রাজবেশটা একবার খোলেন -- আপন বলে চিনতে কারও ভুল হবে না।

 

বিজয়াদিত্য।

আছে আমার সন্ন্যাসীর বেশ -- ধুলোর সঙ্গে তার সুর মেলে। কবি তোমাকেও কিন্তু আমার সঙ্গে যেতে হবে।

 

শেখর।

না মহারাজ, আমাকে যদি সঙ্গে নেন তাহলে আপনার 'পরে মন্ত্রী আর সেনাপতির বিষম অশ্রদ্ধা হবে, আর আমার 'পরে হবে রাগ।

 

বিজয়াদিত্য।

ঠিক বটে। মন্ত্রীর মনে এই বড়ো ক্ষোভ যে, রাজত্ব পাবার যে পিতৃঋণ, সে শোধ করবার জন্যে আমার মন নেই।

 

শেখর।

আমার মস্ত দোষ এই যে, আমি কেবল স্মরণ করাই, এই যে বিশ্ব আমাদের চিত্তে অমৃত ঢেলে দিচ্ছে তার ঋণ আমাদের শোধ করতে হবে।

 

বিজয়াদিত্য।

অমৃতের বদলে অমৃত দিয়ে তবে তো সেই ঋণ শোধ করতে হয়। তোমার হাতে সেই শক্তি আছে। তোমার কবিতার ভিতর দিয়ে তুমি বিশ্বকে অমৃত ফিরিয়ে দিচ্ছ। কিন্তু আমার কী ক্ষমতা আছে বলো। আমি তো কেবলমাত্র রাজত্ব করি।

 

শেখর।

প্রেমও যে অমৃত, মহারাজ। আজ সকালের সোনার আলোয় পাতায় পাতায় শিশির যখন বীণার ঝংকারের মতো ঝলমল করে উঠল তখন সেই সুরের জবাবটি ভালোবাসার আনন্দ ছাড়া আর কিছুতে নেই। আমার কথা যদি বলেন সেই আনন্দ আজ আমার চিত্তে অসীম বিরহ-বেদনায় উপছে পড়ছে --

 

গান

 

আজি শরত তপনে প্রভাত স্বপনে

কী জানি পরান কী যে চায়--

ওই শেফালির শাখে কী বলিয়া ডাকে

বিহগ বিহগী কী যে গায়।

 

 

বিজয়াদিত্য।

তুমি আমাকে ঘরে টিঁকতে দিলে না দেখছি। চললেম আমি অমৃতের ঋণ শোধ করতে।

 

শেখর।।

গান

 

আজ মধুর বাতাসে হৃদয় উদাসে

রহে না আবাসে মন হায়!

কোন্‌ কুসুমের আশে কোন্‌ ফুলবাসে

সুনীল আকাশে মন ধায়।

 

 

বিজয়াদিত্য।

কবি, ভালোবাসা তো দেব, কিন্তু কোথায় দেব?

 

শেখর।

মহারাজ, যেদিন সময় আসে, যেদিন ডাক পড়ে, সেদিন বাজে-খরচের দিন, একেবারে ঢেলে দিতে হয়, পথে পথে বনে বনে। আজ সেই দিন এসেছে -- আমার মন দিশেহারা হয়েছে।

 

গান

 

আমি যদি রচি গান অথির পরান

সে গান শোনাব কারে আর।

আমি যদি গাঁথি মালা লয়ে ফুলডালা

কাহারে পরাব ফুলহার।

আমি আমার এ প্রাণ যদি করি দান

দিব প্রাণ তবে কার পায়?

সদা ভয় হয় মনে, পাছে অযতনে

মনে মনে কেহ ব্যথা পায়!

 

 

বিজয়াদিত্য।

বুঝেছি, কবি, আজ আর কথা নেই, আজ অমৃতের ঋণ শোধ করতে বেরোব। তুমি একবার মন্ত্রীকে ডেকে দাও।

 

[ শেখরের প্রস্থান

 

মন্ত্রীর প্রবেশ

 

বিজয়াদিত্য।

মন্ত্রী, আমি আজই বাহির হব।

 

মন্ত্রী।

তার আয়োজন --

 

বিজয়াদিত্য।

বিনা আয়োজনে।

 

মন্ত্রী।

মহারাজ, কী এমন বিশেষ কর্তব্য আছে যে --

 

বিজয়াদিত্য।

আছে কর্তব্য। আমি সেই বীনকারকে ডাকতে যাব।

 

মন্ত্রী।

বীনকার? সেই সুরসেন? আমি এখনই লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি।

 

বিজয়াদিত্য।

না না, রাজার ডাকে বীণার ঠিক সুরটি বাজে না। আমি তার দরজার বাইরে মাটিতে বসে শুনব, তারপরে যদি ডাক পড়ে তবে ঘরের ভিতরে গিয়ে বসে শুনব।

 

মন্ত্রী।

মহারাজ, এ কী কথা বলছেন?

 

বিজয়াদিত্য।

সিংহাসনে সুর পৌঁছোয় না; শ্রোতার আসন থেকে আমাকে চিরদিন বঞ্চিত করতে পারবে না। আমি মাটিতে বসব মেঠো ফুলের সঙ্গে এক পংক্তিতে। কবিকে ডেকে দাও তো মন্ত্রী।

 

মন্ত্রী।

দিচ্ছি এখনই দিচ্ছি।

 

[মন্ত্রীর প্রস্থান

 

শেখরের প্রবেশ

 

বিজয়াদিত্য।

কবি, আমার বেরোবার সময় হল। যাবার আগে সেই মেঠো ফুলের গানটা শুনিয়ে দাও।

 

শেখর।।

গান

 

যখন সারা নিশি ছিলেম শুয়ে

বিজন ভুঁয়ে

মেঠো ফুলের পাশাপাশি;

তখন শুনেছিলেম তারার বাঁশি।

যখন সকাল বেলা খুঁজে দেখি

স্বপ্নে শোনা সে সুর এ কি

আমার মেঠো ফুলের চোখের জলে উঠে ভাসি।

এ সুর আমি খুঁজেছিলেম রাজার ঘরে

শেষে ধরা দিল ধরার ধূলির 'পরে।

এ যে ঘাসের কোলে আলোর ভাষা

আকাশ থেকে ভেসে-আসা,

এ যে মাটির কোলে মানিক-খসা হাসিরাশি।

 

 

মন্ত্রীর প্রবেশ

 

মন্ত্রী।

মহারাজ, বেতসিনীতীরে পিঞ্জরীতে বীনকার সুরসেনের বাস। যখন আপনি সেখানে যাওয়াই স্থির করেছেন তখন সেই সঙ্গে একটা রাজকার্যও সম্পন্ন করতে পারেন।

 

বিজয়াদিত্য।

সেখানে রাজকার্য আছে না কি?

 

মন্ত্রী।

হাঁ মহারাজ। পিঞ্জরীর রাজা সোমপাল প্রকাশ্য সভায় সর্বদাই মহারাজের নামে স্পর্ধাবাক্য ব্যবহার করে থাকেন। তাঁকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।

 

বিজয়াদিত্য।

বড়ো কৌতূহল হচ্ছে, মন্ত্রী। স্তুতিবাক্য অনেক শুনেছি, কিন্তু কোনোদিন নিজের কানে স্পর্ধাবাক্য শুনি নি।

 

মন্ত্রী।

ভগবানের কৃপায় কোনোদিন যেন না শুনতে হয়।

 

বিজয়াদিত্য।

রাজা হবার ওই তো বিড়ম্বনা। পরিহাস করে তোমরা আমাদের বল পৃথিবীপতি কিন্তু পৃথিবীকে সিংহাসনের মাপে ছোটো করে তোমরা আমাদের খেলনা বানিয়ে দিয়েছ -- সব দেখা দেখতে পাই নে, সব শোনা শোনাবার জো নেই।

 

মন্ত্রী।

যাদের সব দেখাই দেখতে হয়, সব শোনাই শুনতে হয় তারাই তো হতভাগ্য।

 

বিজয়াদিত্য।

সেই হতভাগ্যদের দশাই আমি পরীক্ষা করে দেখব। সোমপালের স্পর্ধাবাক্য আমি নিজের কানে শুনব।

 

মন্ত্রী।

তাহলে শেখরই মহারাজের সঙ্গে যাবেন, আর কেউ না?

 

শেখর।

না মন্ত্রী, এ-যাত্রায় আমার প্রয়োজন নেই। জানলার দরকার হয় যেখানে প্রাচীর আছে -- যেখানে খোলা আকাশ সেখানে জানলায় কী হবে -- রাজসভায় কবিকে না হলে চলে না।

 

মন্ত্রী।

তোমার কথা বুঝলেম না।

 

[ প্রস্থান

 

শেখর।

মহারাজ, চার দিকের ভ্রূভঙ্গি দেখে বুঝতে পারছি আপনি চলে গেলে কবির পক্ষে এখানে অরাজক হবে। আমিও আপনারই পথ ধরলেম।

 

বিজয়াদিত্য।

ভালো হল কবি, আজ শরতের নিমন্ত্রণ রাখতে চলেছি -- তুমি সঙ্গে না থাকলে তার প্রতিসম্ভাষণের বাণী পেতেম কোথায়?

 

বেতসিনী নদীর তীর

 

বালকগণ।

গান

 

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে

বাদল গেছে টুটি,

আজ আমাদের ছুটি, ও ভাই,

আজ আমাদের ছুটি।

কী করি আজ ভেবে না পাই,

পথ হারিয়ে কোন্‌ বনে যাই,

কোন্‌ মাঠে যে ছুটে বেড়াই,

সকল ছেলে জুটি।

কেয়া পাতায় নৌকো গড়ে

সাজিয়ে দেব ফুলে,

তাল দিঘিতে ভাসিয়ে দেব,

চলবে দুলে দুলে।

রাখাল ছেলের সঙ্গে ধেনু

চরাব আজ বাজিয়ে বেণু,

মাখব গায়ে ফুলের রেণু

চাঁপার বনে লুটি।

আজ আমাদের ছুটি, ও ভাই,

আজ আমাদের ছুটি।

 

 

লক্ষেশ্বর।

(ঘর হইতে ছুটিয়া বাহির হইয়া) ছেলেগুলো তো জ্বালালে। ওরে চোবে। ওরে গিরধারিলাল। ধর্‌ তো ছোঁড়াগুলোকে ধর্‌ তো।

 

ছেলেরা।

(দূরে ছুটিয়া গিয়া হাততালি দিয়া) ওরে লক্ষ্মীপেঁচা বেরিয়েছে রে, লক্ষ্মীপেঁচা বেরিয়েছে।

 

লক্ষেশ্বর।

হনুমন্ত সিং, ওদের কান পাকড়ে আন্‌ তো; একটাকেও ছাড়িস নে।

 

ঠাকুরদাদার প্রবেশ

 

ঠাকুরদাদা।

কী হয়েছে লখাদাদা। মার-মূর্তি কেন?

 

লক্ষেশ্বর।

আরে দেখো না! সক্কাল বেলা কানের কাছে চেঁচাতে আরম্ভ করেছে।

 

ঠাকুরদাদা।

আজ যে শরতে ওদের ছুটি, একটু আমোদ করবে না? গান গাইলেও তোমার কানে খোঁচা মারে! হায় রে হায়, ভগবান তোমাকে এত শাস্তিও দিচ্ছেন!

 

লক্ষেশ্বর।

গান গাবার বুঝি সময় নেই! আমার হিসাব লিখতে ভুল হয়ে যায় যে। আজ আমার সমস্ত দিনটাই মাটি করলে!

 

ঠাকুরদাদা।

তা ঠিক! হিসেব ভুলিয়ে দেবার ওস্তাদ ওরা। ওদের সাড়া পেলে আমার বয়সের হিসাবে প্রায় পঞ্চাশ পঞ্চান্ন বছরের গরমিল হয়ে যায়। ওরে বাঁদরগুলো আয় তো রে! চল তোদের পঞ্চাননতলার মাঠটা ঘুরিয়ে আনি। যাও দাদা, তোমার দপ্তর নিয়ে বসো গে! আর হিসেবে ভুল হবে না।

 

[ লক্ষেশ্বরের প্রস্থান

 

ঠাকুরদাদাকে ঘিরিয়া ছেলেদের নৃত্য

 

প্রথম।

হাঁ ঠাকুরদা চলো।

 

দ্বিতীয়।

আমাদের আজ গল্প বলতে হবে।

 

তৃতীয়।

না গল্প না, বটতলায় বসে আজ ঠাকুরদার পাঁচালি হবে।

 

চতুর্থ।

বটতলায় না, ঠাকুরদা আজ পারুলডাঙায় চলো।

 

ঠাকুরদাদা।

চুপ, চুপ, চুপ। অমন গোলমাল লাগাস যদি তো লখাদাদা আবার ছুটে আসবে।

 

লক্ষেশ্বরের পুনঃপ্রবেশ

 

লক্ষেশ্বর।

কোন্‌ পোড়ারমুখো আমার কলম নিয়েছে রে।

 

[ছেলেদের লইয়া ঠাকুরদাদার প্রস্থান

 

উপনন্দের প্রবেশ

 

লক্ষেশ্বর।

কী রে তোর প্রভু কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলে? অনেক পাওনা বাকি।

 

উপনন্দ।

কাল রাত্রে আমার প্রভুর মৃত্যু হয়েছে।

 

লক্ষেশ্বর।

মৃত্যু! মৃত্যু হলে চলবে কেন। আমার টাকাগুলোর কী হবে?

 

উপনন্দ।

তাঁর তো কিছুই নেই। যে বীণা বাজিয়ে উপার্জন করে তোমার ঋণ শোধ করতেন সেই বীণাটি আছে মাত্র।

 

লক্ষেশ্বর।

বীণাটি আছে মাত্র। কী শুভ সংবাদটাই দিলে।

 

উপনন্দ।

আমি শুভ সংবাদ দিতে আসি নি! আমি একদিন পথের ভিক্ষুক ছিলেম, তিনিই আমাকে আশ্রয় দিয়ে তাঁর বহুদুঃখের অন্নের ভাগে আমাকে মানুষ করেছেন। তোমার কাছে দাসত্ব করে আমি সেই মহাত্মার ঋণ শোধ করব।

 

লক্ষেশ্বর।

বটে! তাই বুঝি তাঁর অভাবে আমার বহুদুঃখের অন্নে ভাগ বসাবার মতলব করেছ। আমি তত বড়ো গর্দভ নই। আচ্ছা, তুই কী করতে পারিস বল দেখি।

 

উপনন্দ।

আমি চিত্রবিচিত্র করে পুঁথি নকল করতে পারি। তোমার অন্ন আমি চাই নে। আমি নিজে উপার্জন করে যা পারি খাব -- তোমার ঋণও শোধ করব।

 

লক্ষেশ্বর।

আমাদের বীনকারটিও যেমন নির্বোধ ছিল ছেলেটাকেও দেখছি ঠিক তেমনি করেই বানিয়ে গেছে। হতভাগা ছোঁড়াটা পরের দায় ঘাড়ে নিয়েই মরবে। এক-একজনের ওই-রকম মরাই স্বভাব। -- আচ্ছা বেশ, মাসের ঠিক তিন তারিখের মধ্যে নিয়মমতো টাকা দিতে হবে। নইলে--

 

উপনন্দ।

নইলে আবার কী! আমাকে ভয় দেখাচ্ছ মিছে। আমার কী আছে যে তুমি আমার কিছু করবে। আমি আমার প্রভুকে স্মরণ করে ইচ্ছা করেই তোমার কাছে বন্ধন স্বীকার করেছি। আমাকে ভয় দেখিয়ো না বলছি।

 

লক্ষেশ্বর।

না না, ভয় দেখাব না। তুমি লক্ষ্মীছেলে, সোনার চাঁদ ছেলে। টাকাটা ঠিক মতো দিয়ো বাবা। নইলে আমার ঘরে দেবতা আছে তার ভোগ কমিয়ে দিতে হবে -- সেটাতে তোমারই পাপ হবে।

 

[উপনন্দের প্রস্থান

 

ওই যে, আমার ছেলেটা এইখানে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি কোন্‌খানে টাকা পুঁতে রাখি ও নিশ্চয় সেই খোঁজে ফেরে। ওদেরই ভয়েই তো আমাকে এক সুরঙ্গ হতে আর এক সুরঙ্গে টাকা বদল করে বেড়াতে হয়। ধনপতি, এখানে কেন রে! তোর মতলবটা কী বল্‌ দেখি!

 

ধনপতি।

ছেলেরা আজ সকলেই এই বেতসিনীর ধারে আমোদ করবে বলে আসছে,-- আমাকে ছুটি দিলে আমিও তাদের সঙ্গে খেলি।

 

লক্ষেশ্বর।

বেতসিনীর ধারে! ওই রে খবর পেয়েছে বুঝি। বেতসিনীর ধারেই তো আমি সেই গজমোতির কৌটো পুঁতে রেখেছি। (ধনপতির প্রতি) না না, খবরদার বলছি, সে-সব না। চল্‌ শীঘ্র চল্‌, নামতা মুখস্থ করতে হবে।

 

ধনপতি।

(নিশ্বাস ফেলিয়া) আজ এমন সুন্দর দিনটা।

 

লক্ষেশ্বর।

দিন আবার সুন্দর কী রে। এই রকম বুদ্ধি মাথায় ঢুকলেই ছোঁড়াটা মরবে আর কি। যা বলছি ঘরে যা। (ধনপতির প্রস্থান) ভারি বিশ্রী দিন। আশ্বিনের এই রোদ্দুর দেখলে আমার সুদ্ধ মাথা খারাপ করে দেয়, কিছুতে কাজে মন দিতে পারি নে। মনে করছি মলয়দ্বীপে গিয়ে কিছু চন্দন জোগাড় করবার জন্যে বেরিয়ে পড়লে হয়।

 

শেখর কবির প্রবেশ

 

এ লোকটা আবার এখানে কে আসে? কে হে তুমি? এখানে তুমি কী করতে ঘুরে বেড়াচ্ছ?।

শেখর।

আমি সন্ধান করতে বেরিয়েছি।

 

লক্ষেশ্বর।

ভাব দেখে তাই বুঝেছি। কিন্তু কিসের সন্ধানে বলো দেখি?

 

শেখর।

সেইটে এখনও ঠিক করতে পারি নি।

 

লক্ষেশ্বর।

বয়স তো কম নয়, তবু এখনও ঠিক হয় নি? তবে কী উপায়ে ঠিক হবে?

 

শেখর।

ঠিক জিনিসে যেমনি চোখ পড়বে।

 

লক্ষেশ্বর।

ঠিক জিনিস কি এই রকম মাঠে-ঘাটে ছড়ানো থাকে।

 

শেখর।

তাইতো শুনেছি। ঘরের মধ্যে সন্ধান করে তো পেলেম না।

 

লক্ষেশ্বর।

লোকটা বলে কী? তুমি ঘরে বাইরে সন্ধান করবার ব্যবসা ধরেছ -- রাজা খবর পেলে যে তোমাকে আর ঘরের বার হতে দেবে না। পাহারা বসিয়ে দেবে।

 

শেখর।

আমি রাজাকে সুদ্ধ এই ব্যবসা ধরাব -- যা মাঠে ঘাটে ছড়ানো আছে তাই সংগ্রহ করবার বিদ্যে তাঁকে শেখাতে চাই।

 

লক্ষেশ্বর।

কথাটা আর একটু স্পষ্ট করে বলো তো।

 

শেখর।

তাহলে একেবারেই বুঝতে পারবে না।

 

লক্ষেশ্বর।

ওহে বাপু, তোমার ওই সন্ধানের কাজটা ঠিক আমার এই ঘরের কাছটাতে না হয়ে কিছু তফাতে হলে আমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারি।

 

শেখর।

আমাকে দেখে তোমার ভয় হচ্ছে কেন বলো তো।

 

লক্ষেশ্বর।

সত্যি কথা বলব? তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি রাজার চর। কোথা থেকে কী আদায় করা যেতে পারে রাজাকে সেই সন্ধান দেওয়াই তোমার মতলব।

 

শেখর।

আদায় করবার জায়গা তো আমি খুঁজি বটে। তোমার বুদ্ধি আছে হে।

 

লক্ষেশ্বর।

আছে বই কি। সেইজন্যেই হাত জোড় করে বলছি আমার ঘরটার দিকে উঁকি দিয়ো না -- আমি তোমাকে খুশি করে দেব।

 

শেখর।

তোমার চেহারা দেখেই বুঝেছি সন্ধান করবার মতো ঘর তোমার নয়।

 

লক্ষেশ্বর।

আশ্চর্য তোমার বুদ্ধি বটে। এ নইলে রাজকর্মচারী হবে কোন্‌ গুণে? রাজা বেছে বেছে লোক রাখে বটে। অকিঞ্চনের মুখ দেখলেই চিনতে পার?

 

শেখর।

তা পারি। অতএব তোমার ঘরে আমার আনাগোনা চলবে না।

 

লক্ষেশ্বর।

তোমার উপরে ভক্তি হচ্ছে। তাহলে আর বিলম্ব ক'রো না --এইখান থেকে একটুখানি --

 

শেখর।

আমি তফাতেই যাচ্ছি -- তফাতে যাব বলেই বেরিয়েছি।

 

[প্রস্থান

 

লক্ষেশ্বর।

"তফাতে যাব বলেই বেরিয়েছি "! লোকটা যখন কথা কয় সব ঝাপসা ঠেকে। রাজারা স্পষ্ট কথা সহ্য করতে পারে না, তাই বোধ হয় দায়ে পড়ে এই রকম অভ্যেস করেছে।

 

[প্রস্থান

 

পুঁথি প্রভৃতি লইয়া উপনন্দের প্রবেশ ও একটি কোণে লিখিতে বসা

 

ঠাকুরদাদা ও বালকগণের প্রবেশ

 

গান

 

আজ ধানের খেতে রৌদ্রছায়ায়

লুকোচুরি খেলা।

নীল আকাশে কে ভাসালে

সাদা মেঘের ভেলা।

 

 

একজন বালক।

ঠাকুরদা, তুমি আমাদের দলে।

 

দ্বিতীয় বালক।

না ঠাকুরদা, সে হবে না, তুমি আমাদের দলে।

 

ঠাকুরদাদা।

না ভাই, আমি ভাগাভাগির খেলায় নেই; সে সব হয়ে বয়ে গেছে। আমি সকল দলের মাঝখানে থাকব, কাউকে বাদ দিতে পারব না। এবার গানটা ধর্‌।

 

গান

 

আজ ভ্রমর ভোলে মধু খেতে

উড়ে বেড়ায় আলোয় মেতে,

আজ কিসের তরে নদীর চরে

চখাচখীর মেলা।

 

 

অন্য দল আসিয়া।

ঠাকুরদা, এই বুঝি! আমাদের তুমি ডেকে আনলে না কেন। তোমার সঙ্গে আড়ি। জন্মের মতো আড়ি।

 

ঠাকুরদাদা।

এত বড়ো দন্ড। নিজেরা দোষ করে আমাকে শাস্তি! আমি তোদের ডেকে বের করব, না তোরা আমাকে ডেকে বাইরে টেনে আনবি। না ভাই, আজ ঝগড়া না, গান ধর।

 

গান

 

ওরে যাব না, আজ ঘরে রে ভাই

যাব না আজ ঘরে।

ওরে আকাশ ভেঙে বাহিরকে আজ

নেব রে লুঠ করে।

যেন জোয়ার জলে ফেনার রাশি

বাতাসে আজ ছুটছে হাসি,

আজ বিনা কাজে বাজিয়ে বাঁশি

কাটবে সকল বেলা।

 

 

প্রথম বালক।

ঠাকুরদা, ওই দেখো কে আসছে, ওকে তো কখনো দেখি নি।

 

ঠাকুরদাদা।

পাগড়ি দেখে মনে হচ্ছে লোকটা পরদেশী।

 

প্রথম বালক।

পরদেশী! ভারি মজা।

 

দ্বিতীয় বালক।

আমি পরদেশী হব ঠাকুরদা।

 

তৃতীয় বালক।

আমিও হব পরদেশী -- কী মজা।

 

সকলে।

আমরা সবাই পরদেশী হব।

 

প্রথম বালক।

আমাদের ওই রকম পাগড়ি বানিয়ে দাও ঠাকুরদা, তোমার পায়ে পড়ি।

 

শেখরের প্রবেশ

 

প্রথম বালক।

তুমি পরদেশী?

 

শেখর।

ঠিক বলেছ।

 

দ্বিতীয় বালক।

তুমি কী কর?

 

শেখর।

আমি সব জায়গায়ই দেশ খুঁজে বেড়াই।

 

তৃতীয় বালক।

তার মানে কী, পরদেশী?

 

শেখর।

দেখো না, শরৎকালে রাজারা দেশ জয় করতে বেরোয় -- তার আসল কারণ পৃথিবীর অধীশ্বর হলেও এখনও তারা দেশ খুঁজে পায় নি, কোনো কালে পাবেও না।

 

প্রথম বালক।

কেন পাবে না?

 

শেখর।

তারা নির্বোধ, মনে করে লড়াই করে দেশ পাওয়া যায়। বিনা লড়াইয়ে যারা জয় করতে জানে তারাই আপন দেশ খুঁজে পায়।

 

দ্বিতীয় বালক।

তুমি খুঁজে পেয়েছ?

 

শেখর।

বড়ো শক্ত। কেননা, মানুষে লুকিয়ে রাখে। ওই বাড়িটার কাছে সন্ধানে গিয়েছিলেম একটা মানুষ ছুটে এসে বললে, এ তোমার জায়গা নয়, এ আমার।

 

সকলে।

ও বুঝেছি। লক্ষ্মীপেঁচা।

 

প্রথম বালক।

তার কোটরের কাছে গেলেই সে ঠোকর দিতে আসে।

 

দ্বিতীয় বালক।

কিন্তু পরদেশী, আমাদের কাছে তোমার কোনো ভয় নেই।

 

শেখর।

বাবা, তাহলে তোমাদের মধ্যেই আমার দেশ খুঁজে পাব।

 

গান

 

আমারে ডাক দিল কে ভিতর পানে --

ওরা যে ডাকতে জানে।

আশ্বিনে ওই শিউলি শাখে

মৌমাছিরে যেমন ডাকে

প্রভাতে সৌরভের গানে।

ঘর-ছাড়া আজ ঘর পেল যে,

আপন মনে রইল মজে।

হাওয়ায় হাওয়ায় কেমন করে

খবর যে তার পৌঁছোল রে,

ঘরছাড়া ওই মেঘের কানে।

 

 

ঠাকুরদাদা।

ও ভাই, আমার জায়গা তোমাকে ছেড়ে দিলেম।

 

শেখর।

ছাড়তে হবে কেন? দুজনেরই জায়গা আছে।

 

ঠাকুরদাদা।

তোমাকে চিনে নিয়েছি। তুমি মন ভোলাতে জান

 

শেখর।

আমার নিজের মন ভুলেছে বলেই আমি মন ভুলিয়ে বেড়াই।

 

প্রথম বালক।

তার মানে কী পরদেশী? কেমন করে মন ভোলে?

 

শেখর।।

গান

 

কেন যে মন ভোলে আমার মন জানে না।

তারে মানা করে কে, আমার মন মানে না।

কেউ বোঝে না তারে,

সে যে বোঝে না আপনারে,

সবাই লজ্জা দিয়ে যায়, সে তো কানে আনে না।

তার খেয়া গেল পারে

সে যে রইল নদীর ধারে।

কাজ করে সব সারা

(ঐ) এগিয়ে গেল কারা

আনমনা মন সেদিকপানে দৃষ্টি হানে না।

 

 

ঠাকুরদাদা।

তোমাকে ছাড়ছি নে ভাই, নিজের মনের কথা তোমার মুখ থেকে শুনে নেব।

 

ছেলেরা।

আমরা তোমাকে ছাড়ব না।

 

শেখর।

তোমরা ছাড়লে আমিই বুঝি তোমাদের ছাড়ব মনে করছ? একবার চারদিকটা ঘুরে আসছি -- কোথায় এলুম একবার বুঝে নিই।

 

[ প্রস্থান

 

প্রথম বালক।

ঠাকুরদা, ওই দেখো, ওই দেখো সন্ন্যাসী আসছে।

 

দ্বিতীয় বালক।

বেশ হয়েছে, বেশ হয়েছে, আমরা সন্ন্যাসীকে নিয়ে খেলব। আমরা সব চেলা সাজব।

 

তৃতীয় বালক।

আমরা ওঁর সঙ্গে বেরিয়ে যাব, কোন্‌ দেশে চলে যাব কেউ খুঁজেও পাবে না।

 

ঠাকুরদাদা।

আরে চুপ, চুপ।

 

সকলে।

সন্ন্যাসী ঠাকুর, সন্ন্যাসী ঠাকুর।

 

ঠাকুরদাদা।

আরে থাম্‌ থাম্‌। ঠাকুর রাগ করবে।

 

সন্ন্যাসীর প্রবেশ

 

বালকগণ।

সন্ন্যাসী ঠাকুর, তুমি কি আমাদের উপর রাগ করবে? আজ আমরা সব তোমার চেলা হব।

 

সন্ন্যাসী।

হা হা হা হা। এ তো খুব ভালো কথা। তার পরে আবার তোমরা সব শিশু-সন্ন্যাসী সেজো, আমি তোমাদের বুড়ো চেলা সাজব। এ বেশ খেলা, এ চমৎকার খেলা।

 

ঠাকুরদাদা।

প্রণাম হই। আপনি কে?

 

সন্ন্যাসী।

আমি ছাত্র।

 

ঠাকুরদাদা।

আপনি ছাত্র!

 

সন্ন্যাসী।

হাঁ, পুঁথিপত্র সব পোড়াবার জন্যে বের হয়েছি।

 

ঠাকুরদাদা।

ও ঠাকুর বুঝেছি। বিদ্যের বোঝা সমস্ত ঝেড়ে ফেলে দিব্যি একেবারে হালকা হয়ে সমুদ্রে পাড়ি দেবেন।

 

সন্ন্যাসী।

চোখের পাতার উপরে পুঁথির পাতাগুলো আড়াল করে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে -- সেইগুলো খসিয়ে ফেলতে চাই।

 

ঠাকুরদাদা।

বেশ, বেশ, আমাকেও একটু পায়ের ধুলো দেবেন। প্রভু, আপনার নাম বোধ করি শুনেছি -- আপনি তো স্বামী অপূর্বানন্দ।

 

ছেলেরা।

সন্ন্যাসী ঠাকুর, ঠাকুরদা কী মিথ্যে বকছেন। এমনি করে আমাদের ছুটি বয়ে যাবে।

 

সন্ন্যাসী।

ঠিক বলেছ, বৎস, আমারও ছুটি ফুরিয়ে আসছে।

 

ছেলেরা।

তোমার কতদিনের ছুটি?

 

সন্ন্যাসী।

খুব অল্পদিনের। আমার গুরুমশায় তাড়া করে বেরিয়েছেন, তিনি বেশি দূরে নেই, এলেন বলে।

 

ছেলেরা।

ও বাবা, তোমারও গুরুমশায়!

 

প্রথম বালক।

সন্ন্যাসী ঠাকুর, চলো আমাদের যেখানে হয় নিয়ে চলো। তোমার যেখানে খুশি।

 

ঠাকুরদাদা।

আমিও পিছনে আছি, ঠাকুর আমাকেও ভুলো না।

 

সন্ন্যাসী।

আহা, ও ছেলেটি কে? গাছের তলায় এমন দিনে পুঁথির মধ্যে ডুবে রয়েছে।

 

বালকগণ।

উপনন্দ।

 

প্রথম বালক।

ভাই উপনন্দ, এস ভাই। আমরা আজ সন্ন্যাসী ঠাকুরের চেলা সেজেছি, তুমিও চলো আমাদের সঙ্গে। তুমি হবে সর্দার চেলা।

 

উপনন্দ।

না ভাই, আমার কাজ আছে।

 

ছেলেরা।

কিচ্ছু কাজ নেই, তুমি এস।

 

উপনন্দ।

আমার পুঁথি নকল করতে অনেকখানি বাকি আছে।

 

ছেলেরা।

সে বুঝি কাজ! ভারি তো কাজ। ঠাকুর, তুমি ওকে বলো না। ও আমাদের কথা শুনবে না। কিন্তু উপনন্দকে না হলে মজা হবে না।

 

সন্ন্যাসী।

(পাশে বসিয়া) বাছা, তুমি কী কাজ করছ। আজ তো কাজের দিন না।

 

উপনন্দ।

(সন্ন্যাসীর মুখের দিকে ক্ষণকাল চাহিয়া, পায়ের ধুলা লইয়া) আজ ছুটির দিন -- কিন্তু আমার ঋণ আছে, শোধ করতে হবে, তাই আজ কাজ করছি।

 

ঠাকুরদাদা।

উপনন্দ, জগতে তোমার আবার ঋণ কিসের ভাই?

 

উপনন্দ।

ঠাকুরদা, আমার প্রভু মারা গিয়েছেন; তিনি লক্ষেশ্বরের কাছে ঋণী; সেই ঋণ আমি পুঁথি লিখে শোধ দেব।

 

ঠাকুরদাদা।

হায় হায়, তোমার মতো কাঁচা বয়সের ছেলেকেও ঋণ শোধ করতে হয়। আর এমন দিনেও ঋণশোধ। ঠাকুর, আজ নতুন উত্তরে হাওয়ায় ওপারে কাশের বনে ঢেউ দিয়েছে, এপারে ধানের খেতের সবুজে চোখ একেবারে ডুবিয়ে দিলে, শিউলি বন থেকে আকাশে আজ পুজোর গন্ধ ভরে উঠেছে, এরই মাঝখানে ওই ছেলেটি আজ ঋণশোধের আয়োজনে বসে গেছে এও কি চক্ষে দেখা যায়?

 

সন্ন্যাসী।

বল কী, এর চেয়ে সুন্দর কি আর কিছু আছে। ওই ছেলেটিই তো আজ সারদার বরপুত্র হয়ে তাঁর কোল উজ্জ্বল করে বসেছে। তিনি তাঁর আকাশের সমস্ত সোনার আলো দিয়ে ওকে বুকে চেপে ধরেছেন। আহা, আজ এই বালকের ঋণশোধের মতো এমন শুভ্র ফুলটি কি কোথাও ফুটেছে, চেয়ে দেখো তো। লেখো, লেখো, বাবা, তুমি লেখো, আমি দেখি। তুমি পঙ্‌ক্তির পর পঙ্‌ক্তি লিখছ, আর ছুটির পর ছুটি পাচ্ছ,--তোমার এত ছুটির আয়োজন আমরা তো পণ্ড করতে পারব না। দাও বাবা, একটা পুঁথি আমাকে দাও, আমিও লিখি। এমন দিনটা সার্থক হ'ক।

 

ঠাকুরদাদা।

আছে আছে চশমাটা ট্যাঁকে আছে, আমিও বসে যাই না।

 

প্রথম বালক।

ঠাকুর, আমরাও লিখব। সে বেশ মজা হবে।

 

দ্বিতীয় বালক।

হাঁ হাঁ, সে বেশ মজা হবে।

 

উপনন্দ।

বল কী ঠাকুর, তোমাদের যে ভারি কষ্ট হবে।

 

সন্ন্যাসী।

সেইজন্যেই বসে গেছি। আজ আমরা সব মজা করে কষ্ট করব। কী বল, বাবাসকল। আজ একটা কিছু কষ্ট না করলে আনন্দ হচ্ছে না।

 

সকলে।

(হাততালি দিয়া) হাঁ, হাঁ, নইলে মজা কিসের।

 

প্রথম বালক।

দাও, দাও, আমাকে একটা পুঁথি দাও।

 

দ্বিতীয় বালক।

আমাকেও একটা দাও না।

 

উপনন্দ।

তোমরা পারবে তো ভাই?

 

প্রথম বালক।

খুব পারব। কেন পারব না।

 

উপনন্দ।

শ্রান্ত হবে না তো?

 

দ্বিতীয় বালক।

কক্‌খনো না।

 

উপনন্দ।

খুব ধরে ধরে লিখতে হবে কিন্তু।

 

প্রথম বালক।

তা বুঝি পারি নে। আচ্ছা তুমি দেখো।

 

উপনন্দ।

ভুল থাকলে চলবে না।

 

দ্বিতীয় বালক।

কিচ্ছু ভুল থাকবে না।

 

প্রথম বালক।

এ বেশ মজা হচ্ছে। পুঁথি শেষ করব তবে ছাড়ব।

 

দ্বিতীয় বালক।

নইলে ওঠা হবে না।

 

তৃতীয় বালক।

কী বল ঠাকুরদা, আজ লেখা শেষ করে দিয়ে তবে উপনন্দকে নিয়ে নৌকো বাচ করতে যাব। বেশ মজা।

 

ছেলেরা।

এই যে পরদেশী, আমাদের পরদেশী।

 

শেখরের প্রবেশ

 

সন্ন্যাসী।

এ কী। তুমি পরদেশী না কি?

 

শেখর।

পর-দেশী আমার সাজমাত্র, আসলে আমি সব-দেশী।

 

সন্ন্যাসী।

সাজের দরকার কী ছিল?

 

শেখর।

রাজাকে সাজতে হয় সন্ন্যাসী, রাজা যে কী জিনিস সেই বোঝবার জন্যে। যে-মানুষ সব দেশেই দেশকে খুঁজতে চায় তাকে পরদেশী সাজতে হয়। এই আমাদের ঠাকুরদা বুড়ো হয়ে বসে আছেন ওটাও ওঁর সাজমাত্র --উনি যে বালক সেটা উনি বার্ধক্যের ভিতর দিয়ে খুব ভালো করে চিনে নিচ্ছেন।

 

ঠাকুরদাদা।

ভাই, এ খবর তুমি পেলে কোথা থেকে?

 

শেখর।

সাজের ভিতর থেকে মানুষকে খুঁজে বের করা, সেই তো আমার কাজ। ঠাকুরদা, আমি আগে থাকতে তোমাকে বলে রাখছি এই যে মানুষটিকে দেখছ উনি বড়ো যে-সে লোক নন -- একদিন হয়তো চিনতে পারবে।

 

ঠাকুরদাদা।

সে আমি কিছু কিছু চিনেছি -- নিজের বুদ্ধির গুণে নয় ওঁরই দীপ্তির গুণে।

 

সন্ন্যাসী।

আর এই পরদেশীকে কী রকম ঠেকছে ঠাকুরদা।

 

ঠাকুরদাদা।

সে আর কী বলব, যেন একেবারে চিরদিনের চেনা।

 

সন্ন্যাসী।

ঠিক বলেছ, আমার পক্ষেও তাই। কিন্তু আবার ক্ষণে ক্ষণে মনে হয় যেন ওঁকে চেনবার জো নেই। উনি যে কিসের খোঁজে কখন কোথায় ফেরেন তা বোঝা শক্ত।

 

শেখর।

 

গান

 

আমি তারেই খুঁজে বেড়াই যে রয় মনে, আমার মনে।

ও সে আছে বলে

আকাশ জুড়ে ফোটে তারা রাতে, প্রাতে ফুল ফুটে রয় বনে।

সে আছে বলে চোখের তারার আলোয়

এত রূপের খেলা রঙের মেলা অসীম সাদায় কালোয়,

ও সে সঙ্গে থাকে বলে

আমার অঙ্গে অঙ্গে পুলক লাগায় দখিন সমীরণে।

তারি বাণী হঠাৎ উঠে পুরে

আনমনা কোন্‌ তানের মাঝে আমার গানের সুরে।

দুখের দোলে হঠাৎ মোরে দোলায়

কাজের মাঝে লুকিয়ে থেকে

আমারে কাজ ভোলায়।

সে মোর চিরদিনের বলে

তারি পুলকে মোর পলকগুলি ভরে ক্ষণে ক্ষণে।

 

 

প্রথম বালক।

কিন্তু আর লিখতে ভালো লাগছে না।

 

দ্বিতীয় বালক।

না, আর নয়।

 

সকলে।

আজ এই পর্যন্ত থাক।

 

উপনন্দ।

আমাকে বাঁচালে। এখন পুঁথিগুলি ফিরে দাও।

 

প্রথম বালক।

আচ্ছা পরদেশী, তুমি এত গান গাও কেন?

 

শেখর।

আর কোনো গুণ যদি থাকত তাহলে গাইতেম না। ওই দেখ না কেন, তোমাদের সেই লক্ষ্মীপেঁচা তো গান গায় না।

 

সকলে।

না, সে চেঁচায়।

 

শেখর।

তার মানে, সার বস্তুর দ্বারা ভরতি হয়ে ও একেবারে নিরেট।

 

দ্বিতীয় বালক।

পরদেশী, তোমার দেশের গল্প তুমি আমাদের শোনাবে?

 

শেখর।

আমার দেশের গল্প ভারি অদ্ভুত।

 

সকলে।

আমরা অদ্ভুত গল্প শুনব।

 

শেখর।

আচ্ছা, তাহলে চলো, কোপাই নদীর ধার দিয়ে একবার পারুলডাঙায় তোমাদের ঘুরিয়ে নিয়ে আসি গে। চলতে চলতে গল্প হবে।

 

সন্ন্যাসী।

এই দেখো, ওর সঙ্গে আমরা পারব না -- আমাদের সব চেলা ভাঙিয়ে নিলে।

 

শেখর।

ভাঙিয়ে নেওয়া সহজ, কিন্তু টিঁকিয়ে রাখা শক্ত। এখনই ফিরে আসবে।

 

[ বালকদলের সঙ্গে শেখরের প্রস্থান

 

সন্ন্যাসী।

বাবা উপনন্দ, তোমার প্রভুর কী নাম ছিল?

 

উপনন্দ।

সুরসেন।

 

সন্ন্যাসী।

সুরসেন! বীণাচার্য!

 

উপনন্দ।

হাঁ ঠাকুর, তুমি তাঁকে জানতে?

 

সন্ন্যাসী।

আমি তাঁর বীণা শুনব আশা করেই এখানে এসেছিলেম।

 

উপনন্দ।

তাঁর কি এত খ্যাতি ছিল?

 

ঠাকুরদাদা।

তিনি কি এত বড়ো গুণী? তুমি তাঁর বাজনা শোনবার জন্যেই এদেশে এসেছ? তবে তো আমরা তাঁকে চিনি নি?

 

সন্ন্যাসী।

এখানকার রাজা?

 

ঠাকুরদাদা।

এখানকার রাজা তো কোনোদিন তাঁকে জানেন নি,চক্ষেও দেখেন নি। তুমি তাঁর বীণা কোথায় শুনলে?

 

সন্ন্যাসী।

তোমরা হয়তো জান না বিজয়াদিত্য বলে একজন রাজা --

 

ঠাকুরদাদা।

বল কী ঠাকুর। আমরা অত্যন্ত মূর্খ, গ্রাম্য, তাই বলে বিজয়াদিত্যের নাম জানব না এও কি হয়? তিনি যে আমাদের চক্রবর্তী সম্রাট।

 

সন্ন্যাসী।

তা হবে। তা সেই লোকটির সভায় একদিন সুরসেন বীণা বাজিয়েছিলেন, তখন শুনেছিলেম। রাজা তাঁকে রাজধানীতে রাখবার জন্যে অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই পারেন নি।

 

ঠাকুরদাদা।

হায় হায়, এত বড়ো লোকের আমরা কোনো আদর করতে পারি নি।

 

সন্ন্যাসী।

বাবা উপনন্দ, তোমার সঙ্গে তাঁর কী রকমে সম্বন্ধ হল?

 

উপনন্দ।

ছোটো বয়সে আমার বাপ মারা গেলে আমি অন্য দেশ থেকে এই নগরে আশ্রয়ের জন্যে এসেছিলেম। সেদিন শ্রাবণমাসের সকাল বেলায় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছিল, আমি লোকনাথের মন্দিরের এককোণে দাঁড়াব বলে প্রবেশ করছিলেম। পুরোহিত আমাকে বোধ হয় নীচ জাত মনে করে তাড়িয়ে দিলেন। সেদিন সকালে সেইখানে বসে আমার প্রভু বীণা বাজাচ্ছিলেন। তিনি তখনই মন্দির ছেড়ে এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরলেন -- বললেন এস বাবা, আমার ঘরে এস। সেই দিন থেকে ছেলের মতো তিনি আমাকে কাছে রেখে মানুষ করেছেন -- লোকে তাঁকে কত কথা বলেছে তিনি কান দেন নি। আমি তাঁকে বলেছিলেম, প্রভু, আমাকে বীণা বাজাতে শেখান, আমি তাহলে কিছু কিছু উপার্জন করে আপনার হাতে দিতে পারব; তিনি বললেন, বাবা, এ বিদ্যা পেট ভরাবার নয়; আমার আর এক বিদ্যা জানা আছে তাই তোমাকে শিখিয়ে দিচ্ছি। এই বলে আমাকে রং দিয়ে চিত্র করে পুঁথি লিখতে শিখিয়েছেন। যখন অত্যন্ত অচল হয়ে উঠত তখন তিনি মাঝে মাঝে বিদেশে গিয়ে বীণা বাজিয়ে টাকা নিয়ে আসতেন। এখানে তাঁকে সকলে পাগল বলেই জানত।

 

সন্ন্যাসী।

সুরসেনের বীণা শুনতে পেলেম না, কিন্তু বাবা উপনন্দ, তোমার কল্যাণে তাঁর আর এক বীণা শুনে নিলুম, এর সুর কোনোদিন ভুলব না। বাবা, লেখো, লেখো। আমরা ততক্ষণ আমাদের দলবলের খবর নিয়ে আসি গে।

 

[ প্রস্থান

 

শেখর ও রাজা সোমপালের প্রবেশ

 

শেখর।

বিজয়াদিত্যকে তুমি হার মানাতে চাও তাহলে আগে ওই অপূর্বানন্দ সন্ন্যাসীকে বশ করো। রাজা সোমপাল, তিনিও নিশ্চয় তোমার মনের কথা জানেন।

 

সোমপাল।

কোথায় তাঁকে পাব?

 

শেখর।

তিনি এখানেই এসেছেন আমি জানি। কাছাকাছি কোথাও আছেন।

 

সোমপাল।

দেখো আমি লোক চিনি। তোমাকে দেখে আমার মনে হচ্ছে তোমার দ্বারা আমার কাজ উদ্ধার হবে।

 

শেখর।

তা হতেও পারে, অসম্ভব নয়। বিজয়াদিত্যকে বশ করবার ফন্দি আমি হয়তো তোমাকে কিছু কিছু বলে দিতে পারব।

 

সোমপাল।

দেখো, তোমাকে আমি রাজমন্ত্রী করে দেব।

 

শেখর।

আমার যদি মন্ত্রণা চাও তাহলে আমাকে মন্ত্রী ক'রো না। মন্ত্রণা দেওয়াই যার কাজ তার মন্ত্রণা কোনো রাজার ভালো লাগে না। বিজয়াদিত্যের সভায় যে একজন কবি আছে আমি দেখেছি --

 

সোমপাল।

আরে ছি ছি, সে-ও আবার কবি হল! ওই তো রায়শেখরের কথা বলছ?

 

শেখর।

হাঁ সেই বটে।

 

সোমপাল।

সে আমার বিদূষকেরও যোগ্য নয়।

 

শেখর।

একেবারেই নয়।

 

সোমপাল।

বিজয়াদিত্য যেমন রাজা তার কবিটিও তেমনি।

 

শেখর।

তাই তো অনেকে বলে। তোমার সভায় তাকে --

 

সোমপাল।

আমার সভায় যতক্ষণ আমি আছি ততক্ষণ কিছুতেই --

 

শেখর।

নিশ্চয়ই। ততক্ষণ সে --

 

সোমপাল।

সে-কথা পরে হবে। এখন সন্ন্যাসীকে তুমি খুঁজে বের করো; দেখা হলেই তাকে আমার রাজসভায় পাঠিয়ে দিয়ো, বিলম্ব করো না। আমি বরঞ্চ আমার দূতকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

 

[ উভয়ের প্রস্থান

 

সন্ন্যাসী ও ঠাকুরদাদার প্রবেশ

 

সন্ন্যাসী।

উপনন্দ, ওই যে পরদেশী এসেছে ওকে দেখে তোমার মনে হয় না কি, তোমার আচার্য সুরসেনেরই ও জুড়ি?

 

উপনন্দ।

আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন তাঁরই বীণা শুনছি।

 

সন্ন্যাসী।

তুমি যেমন তাঁকে পেয়েছিলে তেমনি করেই এই মানুষটিকে পাবে।

 

উপনন্দ।

উনি কি আমাকে নেবেন?

 

সন্ন্যাসী।

ওর মুখ দেখেই কি বুঝতে পার নি?

 

উপনন্দ।

পেরেছি। আমার প্রভুই বুঝি ওঁকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

 

লক্ষেশ্বরের প্রবেশ

 

লক্ষেশ্বর।

আ সর্বনাশ! যেখানটিতে আমি কৌটো পুঁতে রেখেছিলুম ঠিক সেই জায়গাটিতেই যে উপনন্দ বসে গেছে! আমি ভেবেছিলেম ছোঁড়াটা বোকা বুঝি তাই পরের ঋণ শুধতে এসেছে। তা তো নয় দেখছি। পরের ঘাড় ভাঙাই ওর ব্যবসা। আমার গজমোতির খবর পেয়েছে। একটা সন্ন্যাসীকেও কোথা থেকে জুটিয়ে এনেছে দেখছি। সন্ন্যাসী হাত চেপে জায়গাটা বের করে দেবে। উপনন্দ।

 

উপনন্দ।

কী।

 

লক্ষেশ্বর।

ওঠ্‌ ওঠ্‌ ওই জায়গা থেকে। এখানে কী করতে এসেছিস?

 

উপনন্দ।

অমন করে চোখ রাঙাও কেন? এ কি তোমার জায়গা না কি?

 

লক্ষেশ্বর।

এটা আমার জায়গা কি না সে খোঁজে তোমার দরকার কী হে বাপু। ভারি সেয়ানা দেখছি। তুমি বড়ো ভালোমানুষটি সেজে আমার কাছে এসেছিলে। আমি বলি সত্যিই বুঝি প্রভুর ঋণশোধ করবার জন্যেই ছোঁড়াটা আমার কাছে এসেছে -- কেননা, সেটা রাজার আইনেও আছে --

 

উপনন্দ।

আমি তো সেইজন্যেই এখানে পুঁথি লিখতে এসেছি

 

লক্ষেশ্বর।

সেইজন্যেই এসেছ বটে। আমার বয়স কত আন্দাজ করছ বাপু। আমি কি শিশু।

 

সন্ন্যাসী।

কেন বাবা, তুমি কী সন্দেহ করছ?

 

লক্ষেশ্বর।

কী সন্দেহ করছি! তুমি তা কিছু জান না! বড়ো সাধু! ভণ্ড সন্ন্যাসী কোথাকার।

 

ঠাকুরদাদা।

আরে কী বলিস লখা? আমার ঠাকুরকে অপমান!

 

উপনন্দ।

এই রং-বাঁটা নোড়া দিয়ে তোমার মুখ গুঁড়িয়ে দেব না। টাকা হয়েছে বলে অহংকার। কাকে কী বলতে হয় জান না।

 

[ সন্ন্যাসীর পশ্চাতে লক্ষেশ্বরের লুক্কায়ন

 

সন্ন্যাসী।

আরে কর কী ঠাকুরদা, কর কী বাবা। লক্ষেশ্বর তোমাদের চেয়ে ঢের বেশি মানুষ চেনে। যেমনি দেখেছে অমনি ধরা পড়ে গেছে। ভণ্ড সন্ন্যাসী যাকে বলে। বাবা লক্ষেশ্বর, এত দেশের এত মানুষ ভুলিয়ে এলেম, তোমাকে ভোলাতে পারলেম না।

 

লক্ষেশ্বর।

না, ঠিক ঠাওরাতে পারছি নে। হয়তো ভালো করি নি। আবার শাপ দেবে, কি, কী করবে। তিনখানা জাহাজ এখনও সমুদ্রে আছে। (পায়ের ধুলা লইয়া) প্রণাম হই ঠাকুর,-- হঠাৎ চিনতে পারি নি। বিরূপাক্ষের মন্দিরে আমাদের ওই বিকটানন্দ বলে একটা সন্ন্যাসী আছে আমি বলি সেই ভণ্ডটাই বুঝি। ঠাকুরদা, তুমি এক কাজ করো। সন্ন্যাসী ঠাকুরকে আমার ঘরে নিয়ে যাও আমি ওঁকে কিছু ভিক্ষে দিয়ে দেব। আমি চললেম বলে। তোমরা এগোও।

 

ঠাকুরদাদা।

তোমার বড়ো দয়া। তোমার ঘরের এক মুঠো চাল নেবার জন্যে ঠাকুর সাত সিন্ধু পেরিয়ে এসেছেন।

 

সন্ন্যাসী।

বল কী ঠাকুরদা! এক মুঠো চাল যেখানে দুর্লভ সেখান থেকে সেটি নিতে হবে বই কি। বাবা লক্ষেশ্বর, চলো তোমার ঘরে।

 

লক্ষেশ্বর।

আমি পরে যাচ্ছি, তোমরা এগোও। উপনন্দ, তুমি আগে ওঠো। ওঠো, শীঘ্র ওঠো বলছি, তোলো তোমার পুঁথিপত্র।

 

উপনন্দ।

আচ্ছা তবে উঠলেম, কিন্তু তোমার সঙ্গে আমার কোনো সম্বন্ধ রইল না।

 

লক্ষেশ্বর।

না থাকলেই যে বাঁচি বাবা! আমার সম্বন্ধে কাজ কী। এত দিন তো আমার বেশ চলে যাচ্ছিল।

 

উপনন্দ।

আমি যে ঋণ স্বীকার করেছিলেম তোমার কাছে এই অপমান সহ্য করেই তার থেকে মুক্তি গ্রহণ করলেম। বাস চুকে গেল।

 

[ প্রস্থান

 

লক্ষেশ্বর।

ওরে। সব ঘোড়সওয়ার আসে কোথা থেকে। রাজা আমার গজমোতির খবর পেলে না কি! এর চেয়ে উপনন্দ যে ছিল ভালো। এখন কী করি। (সন্ন্যাসীকে ধরিয়া) ঠাকুর, তোমার পায়ে ধরি, তুমি ঠিক এইখানটিতে বসো -- এই যে এইখানে -- আর একটু বাঁ দিকে সরে এস--এই হয়েছে। খুব চেপে বসো। রাজাই আসুক আর সম্রাটই আসুক তুমি কোনোমতেই এখান থেকে উঠো না। তাহলে আমি তোমাকে খুশি করে দেব।

 

ঠাকুরদাদা।

আরে লখা করে কী। হঠাৎ খেপে গেল না কি।

 

লক্ষেশ্বর।

ঠাকুর, আমি তবে একটু আড়ালে যাই। আমাকে দেখলেই রাজার টাকার কথা মনে পড়ে যায়। শত্রুরা লাগিয়েছে আমি সব টাকা পুঁতে রেখেছি -- শুনে অবধি রাজা যে কত জায়গায় কূপ খুঁড়তে আরম্ভ করেছেন তার ঠিকানা নেই। জিজ্ঞাসা করলে বলেন প্রজাদের জলদান করছেন। কেন্‌দিন আমার ভিটেবাড়ির ভিত কেটে জলদানের হুকুম হবে, সেই ভয়ে রাত্রে ঘুমোতে পারি নে।

 

[ প্রস্থান

 

রাজদূতের প্রবেশ

 

রাজদূত।

সন্ন্যাসী ঠাকুর প্রণাম হই। আপনিই তো অপূর্বানন্দ।

 

সন্ন্যাসী।

কেউ কেউ আমাকে তাই বলেই তো জানে।

 

রাজদূত।

আপনার অসামান্য ক্ষমতার কথা চারিদিকে রাষ্ট্র হয়ে গেছে। আমাদের মহারাজ সোমপাল আপনার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছা করেন।

 

সন্ন্যাসী।

যখনই আমার প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন তখনই আমাকে দেখতে পাবেন।

 

রাজদূত।

আপনি তাহলে যদি একবার --

 

সন্ন্যাসী।

আমি একজনের কাছে প্রতিশ্রুত আছি এইখানেই আমি অচল হয়ে বসে থাকব। অতএব আমার মতো অকিঞ্চন অকর্মণ্যকেও তোমার রাজার যদি বিশেষ প্রয়োজন থাকে তাহলে তাঁকে এইখানেই আসতে হবে।

 

রাজদূত।

রাজোদ্যান অতি নিকেটই -- ওইখানেই তিনি অপেক্ষা করছেন।

 

সন্ন্যাসী।

যদি নিকটেই হয় তবে তো তাঁর আসতে কোনো কষ্ট হবে না।

 

রাজদূত।

যে আজ্ঞা, তবে ঠাকুরের ইচ্ছা তাঁকে জানাই গে।

 

[ প্রস্থান

 

ঠাকুরদাদা।

প্রভু, এখানে রাজসমাগমের সম্ভাবনা হয়ে এল আমি তবে বিদায় হই।

 

সন্ন্যাসী।

ঠাকুরদা, তুমি আমার শিশু বন্ধুগুলিকে নিয়ে ততক্ষণ আসর জমিয়ে রাখো, আমি বেশি বিলম্ব করব না।

 

ঠাকুরদাদা।

রাজার উৎপাতই ঘটুক আর অরাজকতাই হ'ক আমি প্রভুর চরণ ছাড়ছি নে।

 

[ প্রস্থান

 

লক্ষেশ্বরের প্রবেশ

 

লক্ষেশ্বর।

ঠাকুর তুমিই অপূর্বানন্দ! তবে তো বড়ো অপরাধ হয়ে গেছে। আমাকে মাপ করতে হবে।

 

সন্ন্যাসী।

তুমি আমাকে ভণ্ডতপস্বী বলেছ এই যদি তোমার অপরাধ হয় আমি তোমাকে মাপ করলেম।

 

লক্ষেশ্বর।

বাবাঠাকুর শুধু মাপ করতে তো সকলেই পারে -- সে ফাঁকিতে আমার কী হবে। আমাকে একটা কিছু ভালো রকম বর দিতে হচ্ছে। যখন দেখা পেয়েছি তখন শুধুহাতে ফিরছি নে।

 

সন্ন্যাসী।

কী বর চাই।

 

লক্ষেশ্বর।

লোকে যতটা মনে করে ততটা নয়, তবে কিনা আমার অল্পস্বল্প কিছু জমেছে -- সে অতি যৎসামান্য -- তাতে আমার মনের আকাঙক্ষা তো মিটছে না। শরৎকাল এসেছে, আর ঘরে বসে থাকতে পারছি নে -- এখন বাণিজ্যে বেরোতে হবে। কোথায় গেলে সুবিধা হতে পারে আমাকে সেই সন্ধানটি বলে দিতে হবে -- আমাকে আর যেন ঘুরে বেড়াতে না হয়।

 

সন্ন্যাসী।

আমিও সেই সন্ধানেই আছি আর যেন ঘুরতে না হয়।

 

লক্ষেশ্বর।

বল কী ঠাকুর।

 

সন্ন্যাসী।

আমি সত্যই বলছি।

 

লক্ষেশ্বর।

ওঃ তবে সেই কথাটাই বলো। বাবা, তোমরা আমাদের চেয়েও সেয়ানা।

 

সন্ন্যাসী।

তার সন্দেহ আছে!

 

লক্ষেশ্বর।

(কাছে ঘেঁষিয়া বসিয়া মৃদুস্বরে) সন্ধান কিছু পেয়েছ?

 

সন্ন্যাসী।

কিছু পেয়েছি বই কি। নইলে এমন করে ঘুরে বেড়াব কেন?

 

লক্ষেশ্বর।

(সন্ন্যাসীর পা চাপিয়া ধরিয়া) বাবাঠাকুর আর একটু খোলসা করে বলো। তোমার পা ছুঁয়ে বলছি আমিও তোমাকে একেবারে ফাঁকি দেব না। কী খুঁজছ বলো তো, আমি কাউকে বলব না।

 

সন্ন্যাসী।

তবে শোনো। লক্ষ্মী যে সোনার পদ্মটির উপরে পা দুখানি রাখেন আমি সেই পদ্মটির খোঁজে আছি।

 

লক্ষেশ্বর।

ও বাবা, সে তো কম কথা নয়। তাহলে যে একেবারে সকল ল্যাঠাই চোকে। ঠাকুর, ভেবে ভেবে এ তো তুমি আচ্ছা বুদ্ধি ঠাওরেছ। কোনোগতিকে পদ্মটি যদি জোগাড় করে আন তাহলে লক্ষ্মীকে আর তোমার খুঁজতে হবে না, লক্ষ্মীই তোমাকে খুঁজে বেড়াবেন; এ নইলে আমাদের চঞ্চলা ঠাকরুনটিকে তো জব্দ করবার জো নেই। তোমার কাছে তাঁর পা দুখানিই বাঁধা থাকবে। তা তুমি সন্ন্যাসী মানুষ, একলা পেরে উঠবে? এতে তো খরচপত্র আছে। এক কাজ করো না বাবা, আমরা ভাগে ব্যবসা করি।

 

সন্ন্যাসী।

তাহলে তোমাকে যে সন্ন্যাসী হতে হবে। বহুকাল সোনা ছুঁতেই পাবে না।

 

লক্ষেশ্বর।

সে যে শক্ত কথা।

 

সন্ন্যাসী।

সব ব্যবসা যদি ছাড়তে পার তবেই এ ব্যবসা চলবে।

 

লক্ষেশ্বর।

শেষকালে দুকূল যাবে না তো? যদি একেবারে ফাঁকিতে না পড়ি তাহলে তোমার তল্পি বয়ে তোমার পিছন পিছন চলতে রাজি আছি। সত্যি বলছি ঠাকুর, কারও কথায় বড়ো সহজে বিশ্বাস করি নে -- কিন্তু তোমার কথাটা কেমন মনে লাগছে। আচ্ছা। আচ্ছা রাজি। তোমার চেলাই হব। ওই যে রাজা আসছে। আমি তবে একটু আড়ালে দাঁড়াই গে।

 

বন্দিগণের গান

 

রাজরাজেন্দ্র জয় জয়তু জয় হে।

ব্যাপ্ত পরতাপ তব বিশ্বময় হে।

দুষ্টদলদলন তব দণ্ড ভয়কারী,

শত্রুজনদর্পহর দীপ্ত তরবারী,

সংকট শরণ্য তুমি দৈন্যদুখহারী,

মুক্ত অবরোধ তব অভ্যুদয় হে॥

 

 

রাজা সোমপালের প্রবেশ

 

সোমপাল।

প্রণাম হই ঠাকুর।

 

সন্ন্যাসী।

জয় হ'ক, কী বাসনা তোমার।

 

সোমপাল।

সে-কথা নিশ্চয় তোমার অগোচর নেই। আমি অখণ্ড রাজ্যের অধীশ্বর হতে চাই প্রভু।

 

সন্ন্যাসী।

তাহলে গোড়া থেকে শুরু করো। তোমার খণ্ডরাজ্যটি ছেড়ে দাও।

 

সোমপাল।

পরিহাস নয় ঠাকুর। বিজয়াদিত্যের প্রতাপ আমার অসহ্য বোধ হয়, আমি তার সামন্ত হয়ে থাকতে পারব না।

 

সন্ন্যাসী।

রাজন, তবে সত্য কথা বলি, আমার পক্ষেও সে ব্যক্তি অসহ্য হয়ে উঠেছে।

 

সোমপাল।

বল কী ঠাকুর!

 

সন্ন্যাসী।

এক বর্ণও মিথ্যা বলছি নে। তাকে বশ করবার জন্যেই আমি মন্ত্রসাধনা করছি।

 

সোমপাল।

তাই তুমি সন্ন্যাসী হয়েছ?

 

সন্ন্যাসী।

তাই বটে।

 

সোমপাল।

মন্ত্রে সিদ্ধি লাভ হবে?

 

সন্ন্যাসী।

অসম্ভব নেই।

 

সোমপাল।

তাহলে ঠাকুর আমার কথা মনে রেখো। তুমি যা চাও আমি তোমাকে দেব। যদি সে বশ মানে তাহলে আমার কাছে যদি --

 

সন্ন্যাসী।

তা বেশ, সেই চক্রবর্তী সম্রাটকে আমি তোমার সভায় ধরে আনব।

 

সোমপাল।

কিন্তু বিলম্ব করতে ইচ্ছা করছে না। শরৎকাল এসেছে-- সকাল বেলা উঠে বেতসিনীর জলের উপর যখন আশ্বিনের রৌদ্র পড়ে তখন আমার সৈন্যসামন্ত নিয়ে দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। যদি আশীর্ব্বাদ কর তাহলে --

 

সন্ন্যাসী।

কোনো প্রয়োজন নেই; শরৎকালেই আমি তাকে তোমার কাছে সমর্পণ করব, এই তো উপযুক্ত কাল। তুমি তাকে নিয়ে কী করবে?

 

সোমপাল।

আমার একটা কোনো কাজে লাগিয়ে দেব -- তার অহংকার দূর করতে হবে।

 

সন্ন্যাসী।

এ তো খুব ভালো কথা। যদি তার অহংকার চূর্ণ করতে পার তাহলে ভারি খুশি হব।

 

সোমপাল।

ঠাকুর, চলো আমার রাজভবনে।

 

সন্ন্যাসী।

সেটি পারছি নে। আমার দলের লোকদের অপেক্ষায় আছি। তুমি যাও বাবা। আমার জন্যে কিছু ভেবো না। তোমার মনের বাসনা যে আমাকে ব্যক্ত করে বলেছ এতে আমার ভারি আনন্দ হচ্ছে। বিজয়াদিত্যের যে এত শত্রু জমে উঠেছে তা তো আমি জানতেম না।

 

সোমপাল।

তবে বিদায় হই। প্রণাম।

 

[ প্রস্থান

 

(পুনশ্চ ফিরিয়া আসিয়া) আচ্ছা ঠাকুর, তুমি তো বিজয়াদিত্যকে জান, সত্য করে বলো দেখি, লোকে তার সম্বন্ধে যতটা রটনা করে ততটা কি সত্য?

 

সন্ন্যাসী।

কিছুমাত্র না। লোকে তাকে একটা মস্ত রাজা বলে মনে করে কিন্তু সে নিতান্তই সাধারণ মানুষের মতো। তার সাজসজ্জা দেখেই লোকে ভুলে গেছে।

 

সোমপাল।

বল কী ঠাকুর, হা হা হা হা! আমিও তাই ঠাউরেছিলেম। অ্যাঁ, নিতান্তই সাধারণ মানুষ।

 

সন্ন্যাসী।

আমার ইচ্ছে আছে আমি তাকে সেইটে আচ্ছা করে বুঝিয়ে দেব। সে যে রাজার পোশাক পরে ফাঁকি দিয়ে অন্য পাঁচ জনের চেয়ে নিজেকে মস্ত একটা কিছু বলে মনে করে আমি তার সেই ভুলটা একেবারে ঘুচিয়ে দেব।

 

সোমপাল।

ঠাকুর, তুমি সব ফাঁস করে দাও। ও যে মিথ্যে রাজা, ভুয়ো রাজা, সে যেন আর চাপা না থাকে। ওর বড়ো অহংকার হয়েছে।

 

সন্ন্যাসী।

আমি তো সেই চেষ্টাতেই আছি। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, যতক্ষণ না আমার অভিপ্রায় সিদ্ধ হয় আমি সহজে ছাড়ব না।

 

সোমপাল।

প্রণাম

 

[ প্রস্থান

 

উপনন্দের প্রবেশ

 

উপনন্দ।

ঠাকুর, আমার মনের ভার তো গেল না।

 

সন্ন্যাসী।

কী হল বাবা।

 

উপনন্দ।

মনে করেছিলেম লক্ষেশ্বর যখন আমাকে অপমান করেছে তখন ওর কাছে আমি আর ঋণ স্বীকার করব না। তাই পুঁথিপত্র নিয়ে ঘরে ফিরে গিয়েছিলেম। সেখানে আমার প্রভুর বীণাটি নিয়ে তার ধুলো ঝাড়তে গিয়ে তারগুলি বেজে উঠল -- অমনি আমার মনটার ভিতর যে কেমন হল আমি বলতে পারি নে। সেই বীণার কাছে লুটিয়ে পড়ে বুক ফেটে আমার চোখের জল পড়তে লাগল। মনে হল আমার প্রভুর কাছে আমি অপরাধ করেছি। লক্ষেশ্বরের কাছে আমার প্রভু ঋণী হয়ে রইলেন আর আমি নিশ্চিন্ত হয়ে আছি। ঠাকুর, এ তো আমার কোনোমতেই সহ্য হচ্ছে না। ইচ্ছে করছে আমার প্রভুর জন্যে আজ আমি অসাধ্য কিছু একটা করি। আমি তোমাকে মিথ্যা বলছি নে -- তাঁর ঋণ শোধ করতে যদি আজ প্রাণ দিতে পারি তাহলে আমার খুব আনন্দ হবে,-- মনে হবে আজকের এই সুন্দর শরতের দিন আমার পক্ষে সার্থক হল।

 

সন্ন্যাসী।

বাবা, তুমি যা বলছ সত্যই বলছ।

 

উপনন্দ।

ঠাকুর, তুমি তো অনেক দেশ ঘুরেছ আমার মতো অকর্মণ্যকেও হাজার কার্ষাপণ দিয়ে কিনতে পারেন এমন মহাত্মা কেউ আছেন? তাহলেই ঋণটা শোধ হয়ে যায়। এ নগরে যদি চেষ্টা করি তাহলে বালক বলে ছোটো জাত বলে সকলে আমাকে খুব কম দাম দেবে।

 

সন্ন্যাসী।

না বাবা, তোমার মূল্য এখানে কেউ বুঝবে না। আমি ভাবছি কি যিনি তোমার প্রভুকে অত্যন্ত আদর করতেন সেই বিজয়াদিত্য বলে রাজাটার কাছে গেলে কেমন হয়?

 

উপনন্দ।

বিজয়াদিত্য? তিনি যে আমাদের সম্রাট।

 

সন্ন্যাসী।

তাই না কি?

 

উপনন্দ।

তুমি জান না বুঝি?

 

সন্ন্যাসী।

তা হবে। না হয় তাই হল।

 

উপনন্দ।

আমার মতো ছেলেকে তিনি কি দাম নিয়ে কিনবেন?

 

সন্ন্যাসী।

বাবা, বিনামূল্যে কেনবার মতো ক্ষমতা তাঁর যদি থাকে তাহলে বিনামূল্যেই কিনবেন। কিন্তু তোমার ঋণটুকু শোধ করে না দিতে পারলে তাঁর এত ঋণ জমবে যে তাঁর রাজভাণ্ডার লজ্জিত হবে, এ আমি তোমাকে সত্যই বলছি।

 

উপনন্দ।

ঠাকুর এও কি সম্ভব?

 

সন্ন্যাসী।

বাবা, জগতে কেবল কি এক লক্ষেশ্বরই সম্ভব, তার চেয়ে বড়ো সম্ভাবনা কি আর কিছুই নেই?

 

উপনন্দ।

আচ্ছা, যদি সে সম্ভব হয় তো হবে, কিন্তু আমি ততদিন পুঁথিগুলি নকল করে কিছু কিছু শোধ করতে থাকি -- নইলে আমার মনে বড়ো গ্লানি হচ্ছে।

 

সন্ন্যাসী।

ঠিক কথা বলেছ বাবা। বোঝা মাথায় তুলে নাও, কারও প্রত্যাশায় ফেলে রেখে সময় বইয়ে দিয়ো না।

 

উপনন্দ।

তাহলে চললেম ঠাকুর। তোমার কথা শুনে আমি মনে কত যে বল পেয়েছি সে আমি বলে উঠতে পারি নে।

 

[ প্রস্থান

 

লক্ষেশ্বরের প্রবেশ

 

লক্ষেশ্বর।

ঠাকুর, অনেক ভেবে দেখলেম -- পারব না। তোমার চেলা হওয়া আমার কর্ম নয়। যা পেয়েছি তা অনেক দুঃখে পেয়েছি, তোমার এক কথায় সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে শেষকালে হায় হায় করে মরব। আমার বেশি আশায় কাজ নেই।

 

সন্ন্যাসী।

সে কথাটা বুঝলেই হল।

 

লক্ষেশ্বর।

ঠাকুর, এবার একটুখানি উঠতে হচ্ছে।

 

সন্ন্যাসী।

(উঠিয়া) তাহলে তোমার কাছ থেকে ছুটি পাওয়া গেল।

 

লক্ষেশ্বর।

(মাটি ও শুষ্কপত্র সরাইয়া কৌটা বাহির করিয়া) ঠাকুর, এইটুকুর জন্যে আজ সকাল থেকে সমস্ত হিসাব কিতাব ফেলে রেখে এই জায়গাটার চারদিকে ভূতের মতো ঘুরে বেড়িয়েছি। এই যে গজমোতি, এ আমি তোমাকে আজ প্রথম দেখালেম। আজ পর্যন্ত কেবলই এটাকে লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়িয়েছি; তোমাকে দেখাতে পেয়ে মনটা তবু একটু হালকা হল। (সন্ন্যাসীর হাতের কাছে অগ্রসর করিয়াই তাড়াতাড়ি ফিরাইয়া লইয়া) না হল না। তোমাকে যে এত বিশ্বাস করলেম, তবু এ জিনিস একটিবার তোমার হাতে তুলে দিই এমন শক্তি আমার নেই। এই যে আলোতে এটাকে তুলে ধরেছি আমার বুকের ভিতরে যেন গুরগুর করছে। আচ্চা ঠাকুর, বিজয়াদিত্য কেমন লোক বলো তো। তাকে বিক্রি করতে গেলে সে তো দাম না দিয়ে এটা আমার কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নেবে না? আমার ওই এক মুশকিল হয়েছে। আমি এটা বেচতেও পারছি নে, রাখতেও পারছি নে, এর জন্যে আমার রাত্রে ঘুম হয় না। বিজয়াদিত্যকে তুমি বিশ্বাস কর?

 

সন্ন্যাসী।

সব সময়ে কি তাকে বিশ্বাস করা যায়?

 

লক্ষেশ্বর।

সেই তো মুশকিলের কথা। আমি দেখছি এটা মাটিতেই পোঁতা থাকবে, হঠাৎ কোন্‌দিন মরে যাব, কেউ সন্ধানও পাবে না।

 

সন্ন্যাসী।

রাজাও না, সম্রাটও না, ওই মাটিই সব ফাঁকি দিয়ে নেবে। তোমাকেও নেবে, আমাকেও নেবে।

 

লক্ষেশ্বর।

তা নিক গে, কিন্তু আমার কেবলই ভাবনা হয় আমি মরে গেলে কোথা থেকে কে এসে হঠাৎ খুঁড়তে খুঁড়তে ওটা পেয়ে যাবে। যাই হ'ক ঠাকুর, কিন্তু তোমার মুখে ওই সোনার পদ্মর কথাটা আমার কাছে বড়ো ভালো লাগল। আমার কেমন মনে হচ্ছে ওটা তুমি হয়তো খুঁজে বের করতে পারবে। কিন্তু তা হ'ক গে, আমি তোমার চেলা হতে পারব না। প্রণাম।

 

[ প্রস্থান

 

ঠাকুরদাদা ও শেখরের প্রবেশ

 

সন্ন্যাসী।

ওহে পরদেশী, তুমি তো মানুষের ভিতরকার মতলব সব দেখতে পাও। তুমি জান আমি বেরিয়েছিলুম বিশ্বের ঋণ শোধ করতে।

 

ঠাকুরদাদা।

কী ঋণ প্রভু আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন না?

 

সন্ন্যাসী।

আনন্দের ঋণ ঠাকুরদা। শরতে যে সোনার আলোয় সুধা ঢেলে দিয়েছে -- তার শোধ করতে চাই যদি তো হৃদয় ঢেলে দিতে হবে। ওহে উদাসী, তুমি বল কী?

 

শেখর।।

গান

 

দেওয়া নেওয়া ফিরিয়ে দেওয়া

তোমায় আমায়

জনম জনম এই চলেছে

মরণ কভু তারে থামায়?

যখন তোমার গানে আমি জাগি

আকাশে চাই তোমার লাগি,

আবার একতারাতে আমার গানে

মাটির পানে তোমায় নামায়।

ওগো তোমার সোনার আলোর ধারা

তার ধারি ধার,

আমার কালো মাটির ফুল ফুটিয়ে

শোধ করি তার।

আমার শরৎ-রাতের শেফালি বন

সৌরভেতে মাতে যখন,

তখন পালটা সে তান লাগে তব

শ্রাবণ-রাতের প্রেম বরিষায়।

 

 

সন্ন্যাসী।

এই ঋণশোধের ছবি আমি দেখে নিলেম ওই উপনন্দের মধ্যে। ওই তো প্রেমের ঋণ প্রেম দিয়ে শুধছে। উপনন্দকে তুমি দেখেছ?

 

শেখর।

হাঁ তাকে দেখে নিয়েছি, বুঝেও নিয়েছি। ছেলেদের মুখে উপনন্দ আর ঠাকুরদা এই দুই নাম বাজছে। তাদের কাছ থেকে ওর সব খবর পেলুম।

 

সন্ন্যাসী।

ওকে সবাই ভালোবাসে, কেননা ও যে দুঃখের শোভায় সুন্দর।

 

শেখর।

ঠাকুর, যদি তাকিয়ে দেখ তবে দেখবে সব সুন্দরই দুঃখের শোভায় সুন্দর। এই যে ধানের খেত আজ সবুজ ঐশ্বর্যে ভরে উঠেছে এর শিকড়ে শিকড়ে পাতায় পাতায় ত্যাগ। মাটি থেকে জল থেকে হাওয়া থেকে যা-কিছু ও পেয়েছে সমস্তই আপন প্রাণের ভিতর দিয়ে একেবারে নিংড়ে নিয়ে মঞ্জরীতে মঞ্জরীতে উৎসর্গ করে দিলে। তাই তো চোখ জুড়িয়ে গেল।

 

সন্ন্যাসী।

ঠিক বলেছ উদাসী, প্রেমের আনন্দে উপনন্দ দুঃখের ভিতর দিয়ে জীবনের ভরা খেতের ফসল ফলিয়ে তুললে।

 

শেখর।

ওই দুঃখের রতনমালা বিশ্বের কণ্ঠে ঝলমল করছে।

 

গান

 

তোমার সোনার থালায় সাজাব আজ

দুখের অশ্রুধার।

জননী গো, গাঁথব তোমার

গলার মুক্তাহার।

চন্দ্রসূর্য পায়ের কাছে

মালা হয়ে জড়িয়ে আছে,

তোমার বুকে শোভা পাবে আমার

দুখের অলংকার।

ধনধান্য তোমারি ধন

কী করবে তা কও,

দিতে চাও তে দিয়ো আমায়,

নিতে চাও তো লও।

দুঃখ আমার ঘরের জিনিস,

খাঁটি রতন তুই তো চিনিস,

তোর প্রসাদ দিয়ে তারে কিনিস

এ মোর অহংকার॥

 

 

লক্ষেশ্বরের প্রবেশ

 

লক্ষেশ্বর।

এই যে, এ লোকটি এখানে এসে জুটেছে। (চোখ টিপিয়া) ঠাকুরদা, এঁকে চিনতে পেরেছ কি, ইনি একজন সন্ধানী লোক।

 

শেখর।

সেইজন্যেই তো তোমাকে ছেড়ে এখন এঁকে ধরেছি।

 

লক্ষেশ্বর।

এঁকে দেখে ঠাউরেছ ওঁর সঞ্চয় কিছু আছে, আমার মতো অকিঞ্চন না।

 

শেখর।

ঠিক বটে। সেইজন্যে লেগে আছি, আদায় না করে ছাড়ছি নে।

 

লক্ষেশ্বর।

কিন্তু এতক্ষণ তোমরা তিনজনে মিলে চুপিচুপি কী পরামর্শ করছিলে বলো দেখি?

 

সন্ন্যাসী।

আমাদের সেই সোনার পদ্মের পরামর্শ।

 

লক্ষেশ্বর।

অ্যাঁ! এরই মধ্যে সমস্ত ফাঁস করে বসে আছ? বাবা, তুমি এই ব্যবসাবুদ্ধি নিয়ে সোনার পদ্মর আমদানি করবে? তবেই হয়েছে। তুমি যেই মনে করলে আমি রাজি হলেম না অমনি তাড়াতাড়ি অংশীদার খুঁজতে লেগে গেছ! কিন্তু এসব কি ঠাকুরদার কর্ম। ওঁর পুঁজিই বা কী।

 

সন্ন্যাসী।

তুমি খবর পাও নি। কিন্তু একেবারে পুঁজি নেই তা নয়। ভিতরে ভিতরে জমিয়েছে।

 

লক্ষেশ্বর।

(ঠাকুরদাদার পিঠ চাপড়াইয়া) সত্যি না কি ঠাকুরদা? বড়ো তো ফাঁকি দিয়ে আসছ। তোমাকে তো চিনতেম না। লোকে আমাকেই সন্দেহ করে, তোমাকে তো স্বয়ং রাজাও সন্দেহ করে না। তাহলে এতদিনে খানাতল্লাশি পড়ে যেত। আমি তো, দাদা, গুপ্তচরের ভয়ে ঘরে চাকরবাকর রাখি নে।

 

ঠাকুরদাদা।

তবে যে আজ সকালে ছেলে তাড়াবার বেলায় উর্ধ্বস্বরে চোবে, তেওয়ারি, গিরধারিলালকে হাঁক পাড়ছিলে।

 

লক্ষেশ্বর।

যখন নিশ্চয় জানি হাঁক পাড়লেও কেউ আসবে না, তখন ঊর্ধ্বস্বরের জোরেই আসর গরম করে তুলতে হয়। কিন্তু বলে তো ভালো করলেম না। মানুষের সঙ্গে কথা কবার তো বিপদই ওই। সেইজন্যেই কারও কাছে ঘেঁষি নে। দেখো দাদা, ফাঁস করে দিয়ো না।

 

ঠাকুরদাদা।

ভয় নেই তোমার।

 

লক্ষেশ্বর।

ভয় না থাকলেও তবু ভয় ঘোচে কই। ওই যে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ আসছে। ওই দেখছ না দূরে -- আকাশে যে ধুলো উড়িয়ে দিয়েছে। সবাই খবর পেয়েছে স্বামী অপূর্বানন্দ এসেছেন। এবার পায়ের ধুলো নিয়ে তোমার পায়ের তেলো হাঁটু পর্যন্ত খইয়ে দেবে। যাই হ'ক তুমি যে-রকম আলগা মানুষ দেখছি, কথাটা আর কারও কাছে ফাঁস ক'রো না--অংশীদার আর বাড়িয়ো না।

 

[প্রস্থান

 

সন্ন্যাসী।

ঠাকুরদা, আর তো দেরি করলে চলবে না। লোকজন জুটতে আরম্ভ করেছে, পুত্র দাও ধন দাও করে আমাকে একেবার মাটি করে দেবে। ছেলেগুলিকে এইবেলা ডাকো। তারা ধন চায় না, পুত্র চায় না, তাদের সঙ্গে খেলা জুড়ে দিলেই পুত্রধনের কাঙালরা আমাকে ত্যাগ করবে।

 

ঠাকুরদাদা।

ছেলেদের আর ডাকতে হবে না। ওই যে আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। এল বলে।

 

[ দ্রুত প্রস্থান

 

শেখরকে সঙ্গে লইয়া ছেলেদের প্রবেশ

 

ছেলেরা।

সন্ন্যাসী ঠাকুর। সন্ন্যাসী ঠাকুর।

 

সন্ন্যাসী।

কী বাবা।

 

ছেলেরা।

তুমি আমাদের নিয়ে খেলো।

 

সন্ন্যাসী।

সে কি হয় বাবা! আমার কি সে ক্ষমতা আছে? তোমরা আমাকে নিয়ে খেলাও।

 

ছেলেরা।

কী খেলা খেলবে?

 

সন্ন্যাসী।

আমরা আজ শারদোৎসব খেলব।

 

প্রথম বালক।

সে বেশ হবে।

 

দ্বিতীয় বালক।

সে বেশ মজা হবে।

 

তৃতীয় বালক।

সে কী খেলা ঠাকুর?

 

চতুর্থ বালক।

সে কেমন করে খেলতে হয়?

 

সন্ন্যাসী।

এই পরদেশীকে তোমাদের সহায় করো, এ মানুষটি সকল খেলাই খেলতে জানে।

 

প্রথম বালক।

সে বেশ মজা হবে।

 

দ্বিতীয় বালক।

পরদেশী, তুমি বলে দাও আমাদের কী করতে হবে।

 

শেখর।

আচ্ছা, তাহলে চল তোমাদের সাজিয়ে নিয়ে আসি গে।

 

[বালকগণকে লইয়া কবির প্রস্থান

 

একজন লোকের প্রবেশ

 

প্রথম ব্যক্তি।

ওরে সন্ন্যাসী কোথায় গেল রে।

 

দ্বিতীয় ব্যক্তি।

কই বাবা, সন্ন্যাসী কই।

 

ঠাকুরদাদা।

এই যে আমাদের সন্ন্যাসী।

 

প্রথম ব্যক্তি।

ও যেন খেলার সন্ন্যাসী। সত্যিকার সন্ন্যাসী কোথায় গেলেন।

 

সন্ন্যাসী।

সত্যিকার সন্ন্যাসী কি সহজে মেলে। আমি একদল ছেলেকে নিয়ে সন্ন্যাসী সন্ন্যাসী খেলছি।

 

প্রথম ব্যক্তি।

ও তোমার কী-রকম খেলা গা!

 

দ্বিতীয় ব্যক্তি।

ওতে যে অপরাধ হবে।

 

তৃতীয় ব্যক্তি।

ফেলো ফেলো তোমার জটা ফেলো।

 

চতুর্থ ব্যক্তি।

ওরে দেখ না গেরুয়া পরেছে। কিন্তু এটা দামী জিনিস রে।

 

প্রথম ব্যক্তি।

বাবা, তোমার এই শখের সন্ন্যাসীর সাজ কেন।

 

সন্ন্যাসী।

আমি যে কবির কাছে দীক্ষা নিয়েছিলুম।

 

দ্বিতীয় ব্যক্তি।

কবির কাছে? এ যে শুনি নতুন কথা। আমাদের গাঁয়ে আছে ভূষণ কবি, কৈবত্তর পো, লেখে ভালো, কিন্তু দীক্ষা দিতে এলে তার ঘরে আগুন লাগিয়ে দিতুম না।

 

প্রথম ব্যক্তি।

তবে যে আমাদের কে একজন বললে কোথাকার কোন্‌ একজন স্বামী এসেছে।

 

সন্ন্যাসী।

যদি-বা এসে থাকে তাকে দিয়ে তোমাদের কোনো কাজ হবে না।

 

দ্বিতীয় ব্যক্তি।

কেন? সে ভণ্ড না কি?

 

সন্ন্যাসী।

তা নয় তো কী?

 

তৃতীয় ব্যক্তি।

বাবা, তোমার চেহারাটি কিন্তু ভালো। তুমি মন্ত্রতন্ত্র কিছু শিখেছ?

 

সন্ন্যাসী।

শেখবার ইচ্ছা তো আছে কিন্তু শেখায় কে?

 

তৃতীয় ব্যক্তি।

একটি লোক আছে বাবা -- সে থাকে ভৈরবপুরে, লোকটা বেতালসিদ্ধ। একটি লোকের ছেলে মারা যাচ্ছিল, তার বাপ এসে ধরে পড়তেই লোকটা করলে কী, সেই ছেলেটার প্রাণপুরুষকে একটা নেকড়ে বাঘের মধ্যে চালান করে দিলে। বললে বিশ্বাস করবে না, ছেলেটা ম'লো বটে কিন্তু নেকড়েটা আজও দিব্যি বেঁচে আছে। না, হাসছ কী, আমার সম্বন্ধী স্বচক্ষে দেখে এসেছে। সেই নেকড়েটাকে মারতে গেলে বাপ লাঠি হাতে ছুটে আসে। তাকে দুবেলা ছাগল খাইয়ে লোকটা ফতুর হয়ে গেল। বিদ্যে যদি শিখতে চাও তো সেই সন্ন্যাসীর কাছে যাও।

 

প্রথম ব্যক্তি।

ওরে চল্‌ রে বেলা হয়ে গেল। সন্ন্যাসী সন্ন্যাসী সব মিথ্যে। সে-কথা আমি তো তখনই বলেছিলেম। আজকালকার দিনে কি আর সে-রকম যোগবল আছে।

 

দ্বিতীয় ব্যক্তি।

সে তো সত্যি। কিন্তু আমাকে যে কালুর মা বললে তার ভাগনে নিজের চক্ষে দেখে এসেছে সন্ন্যাসী একটান গাঁজা টেনে কলকেটা যেমনি উপুড় করলে অমনি তার মধ্যে থেকে এক ভাঁড় মদ আর একটা আস্ত মড়ার মাথার খুলি বেরিয়ে পড়ল।

 

তৃতীয় ব্যক্তি।

বল কী, নিজের চক্ষে দেখেছে?

 

দ্বিতীয় ব্যক্তি।

হাঁ রে, নিজের চক্ষে বই কি।

 

তৃতীয় ব্যক্তি।

আছে রে আছে, সিদ্ধপুরুষ আছে; ভাগ্যে যদি থাকে তবে তো দর্শন পাব। তা চল না ভাই, কোন্‌ দিকে গেল একবার দেখে আসি গে।

 

[প্রস্থান

 

লক্ষেশ্বরের প্রবেশ

 

লক্ষেশ্বর।

দেখো ঠাকুর, তোমার মন্তর যদি ফিরিয়ে না নাও তো ভালো হবে না বলছি। কী মুশকিলেই ফেলেছ, আমার হিসাবের খাতা মাটি হয়ে গেল। একবার মনটা বলে যাই সোনার পদ্মর খোঁজে, আবার বলি থাক গে ও-সব বাজে কথা। একবার মনে ভাবি, এবার বুঝি তবে ঠাকুরদাই জিতলে বা, আবার ভাবি মরুক গে ঠাকুরদা। ঠাকুর, এ তো ভালো কথা নয়। চেলা-ধরা ব্যবসা দেখছি তোমার। কিন্তু সে হবে না, কোনোমতেই হবে না। চুপ করে হাসছ কী। আমি বলছি আমাকে পারবে না -- আমার শক্ত হাড়। লক্ষেশ্বর কোনোদিন তোমার চেলাগিরিতে ভিড়বে না।

 

[প্রস্থান

 

ফুল হইয়া ছেলেদের সঙ্গে শেখরের প্রবেশ

 

সন্ন্যাসী।

এবার অর্ঘ্য সাজানো যাক। এ যে টগর, এই বুঝি মালতী, শেফালিকাও অনেক এনেছ দেখছি। সমস্তই শুভ্র, শুভ্র, শুভ্র। এবারে সকলে মিলে শারদোৎসবের আবাহন গানটি ধরো। কবি, তুমি ধরিয়ে দাও। ঠাকুরদা, তুমিও যোগ দিয়ো।

 

গান

 

আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা

গেঁথেছি শেফালি মালা।

নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে

সাজিয়ে এনেছি ডালা।

এস গো শারদলক্ষ্মী, তোমার

শুভ্র মেঘের রথে,

এস নির্মল নীল পথে,

এস ধৌত শ্যামল আলো-ঝলমল

বনগিরি পর্বতে।

এস মুকুটে পরিয়া শ্বেত শতদল

শীতল শিশির-ঢালা॥

ঝরা মালতীর ফুলে

আসন-বিছানো নিভৃত কুঞ্জে

ভরা গঙ্গার কূলে,

ফিরিছে মরাল ডানা পাতিবারে

তোমার চরণমূলে।

গুঞ্জর তান তুলিয়ো তোমার

সোনার বীণার তারে

মৃদু মধু ঝংকারে,

হাসিঢালা সুর গলিয়া পড়িবে

ক্ষণিক অশ্রুধারে।

রহিয়া রহিয়া যে পরশমণি

ঝলকে অলককোণে,

পলকের তরে সকরুণ করে

বুলায়ো বুলায়ো মনে।

সোনা হয়ে যাবে সকল ভাবনা,

আঁধার হইবে আলা॥

 

 

শেখর।

পৌঁছেছে, গান আকাশের পারে গিয়ে পৌঁছেছে। দ্বার খুলেছে তাঁর। দেখতে পাচ্ছ কি, শারদা বেরিয়েছেন। দেখতে পাচ্ছ না? আচ্ছা তাহলে আগে ধ্যানের গানটি গেয়ে নিই।

 

গান

 

লেগেছে অমল ধবল পালে মন্দ মধুর হাওয়া।

দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী বাওয়া।

কোন্‌ সাগরের পার হতে আনে

কোন্‌ সুদূরের ধন।

ভেসে যেতে চায় মন,

ফেলে যেতে চায় এই কিনারায়

সব চাওয়া সব পাওয়া।

পিছনে ঝরিছে ঝর ঝর জল

গুরু গুরু দেয়া ডাকে,

মুখে এসে পড়ে অরুণ কিরণ

ছিন্ন মেঘের ফাঁকে।

ওগো কাণ্ডারী, কে গো তুমি, কার

হাসিকান্নার ধন।

ভেবে মরে মোর মন

কোন্‌ সুরে আজ বাঁধিবে যন্ত্র

কী মন্ত্র হবে গাওয়া॥

এবারে আর দেখতে পাই নি বলবার জো নেই।

 

 

প্রথম বালক।

কই দেখিয়ে দাও না।

 

শেখর।

ওই যে সাদা মেঘ ভেসে আসছে।

 

দ্বিতীয় বালক।

হাঁ হাঁ ভেসে আসছে।

 

তৃতীয় বালক।

হাঁ আমিও দেখেছি।

 

শেখর।

ওই যে আকাশ ভরে গেল।

 

প্রথম বালক।

কিসে?

 

শেখর।

কিসে! এই তো স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে আলোতে, আনন্দে। বাতাসে শিশিরের পরশ পাচ্ছ না?

 

দ্বিতীয় বালক।

হাঁ পাচ্ছি।

 

শেখর।

তবে আর কী! চক্ষু সার্থক হয়েছে, শরীর পবিত্র হয়েছে, মন প্রশান্ত হয়েছে। এসেছেন, এসেছেন, আমাদের মাঝখানেই এসেছেন। দেখছ না বেতসিনী নদীর ভাবটা। আর ধানের খেত কী রকম চঞ্চল হয়ে উঠেছে। এবার বরণের গানটা ধরিয়ে দিই। গাও।

 

গান

 

আমার নয়ন-ভুলানো এলে।

আমি কী হেরিলাম হৃদয় মেলে।

 

 

শেখর।

সমস্ত বনে বনে নদীর ধারে ধারে গেয়ে আসি গে।

 

[ ছেলেদের লইয়া গাহিতে গাহিতে শেখরের প্রস্থান

 

লক্ষেশ্বরের প্রবেশ

 

ঠাকুরদাদা।

এ কী হল! লখা গেরুয়া ধরেছে যে।

 

লক্ষেশ্বর।

সন্ন্যাসী ঠাকুর, এবার আর কথা নেই। আমি তোমারই চেলা। এই নাও আমার গজমোতির কৌটো -- এই আমার মণিমাণিক্যের পেটিকা তোমারই কাছে রইল। দেখো ঠাকুর, সাবধানে রেখো।

 

সন্ন্যাসী।

তোমার এমন মতি কেন হল লক্ষেশ্বর?

 

লক্ষেশ্বর।

সহজে হয় নি প্রভু! সম্রাট বিজয়াদিত্যের সৈন্য আসছে। এবার আমার ঘরে কি আর কিছু থাকবে? তোমার গায়ে তো কেউ হাত দিতে পারবে না, এ-সমস্ত তোমার কাছেই রাখলেম। তোমার চেলাকে তুমি রক্ষা করো বাবা, আমি তোমার শরণাগত।

 

সোমপালের প্রবেশ

 

সোমপাল।

সন্ন্যাসী ঠাকুর

 

সন্ন্যাসী।

বসো, বসো, তুমি যে হাঁপিয়ে পড়েছ। একটু বিশ্রাম করো।

 

সোমপাল।

বিশ্রাম করবার সময় নেই। ঠাকুর, চরের মুখে সংবাদ পাওয়া গেল যে, বিজয়াদিত্যের পতাকা দেখা দিয়েছে -- তাঁর সৈন্যদল আসছে।

 

সন্ন্যাসী।

বল কী। বোধ হয় শরৎ-কালের আনন্দে তাঁকে আর ঘরে টিঁকতে দেয় নি। তিনি রাজ্যবিস্তার করতে বেরিয়েছেন।

 

সোমপাল।

কী সর্বনাশ। রাজ্যবিস্তার করতে বেরিয়েছেন!

 

সন্ন্যাসী।

বাবা, এতে দুঃখিত হলে চলবে কেন? তুমিও তো রাজ্যবিস্তার করবার উদ্‌যোগে ছিলে।

 

সোমপাল।

না, সে হল স্বতন্ত্র কথা। তাই বলে আমার এই রাজ্যটুকুতে -- তা সে যাই হ'ক, আমি তোমার শরণাগত। এই বিপদ হতে আমাকে বাঁচাতেই হবে, বোধ হয় কোনো দুষ্টলোক তাঁর কাছে লাগিয়েছে যে আমি তাঁকে লঙ্ঘন করতে ইচ্ছা করেছি; তুমি তাঁকে ব'লো সে-কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা, সর্বৈব মিথ্যা। আমি কি এমনি উন্মত্ত? আমার রাজচক্রবর্তী হবার দরকার কী? আমার শক্তিই বা এমন কী আছে?

 

সন্ন্যাসী।

ঠাকুরদা।

 

ঠাকুরদাদা।

কী প্রভু?

 

সন্ন্যাসী।

দেখো, আমি গেরুয়া পরে এবং গুটিকতক ছেলেকে মাত্র নিয়ে শারদোৎসব কেমন জমিয়ে তুলেছিলেম আর ওই চক্রবর্তী সম্রাটটা তার সমস্ত সৈন্যসামন্ত নিয়ে এমন দুর্লভ উৎসব কেবল নষ্টই করতে পারে। লোকটা কী-রকম দুর্ভাগা দেখেছ।

 

সোমপাল।

চুপ করো, চুপ করো ঠাকুর! কে আবার কোন্‌ দিক থেকে শুনতে পাবে।

 

সন্ন্যাসী।

ওই বিজয়াদিত্যের পরে আমার --

 

সোমপাল।

আরে চুপ, চুপ। তুমি সর্বনাশ করবে দেখছি। তাঁর প্রতি তোমার মনের ভাব যাই থাক সে তুমি মনেই রেখে দাও।

 

সন্ন্যাসী।

তোমার সঙ্গে পূর্বেও তো সে-বিষয়ে কিছু আলোচনা হয়ে গেছে।

 

সোমপাল।

কী মুশকিলেই পড়লেম। সে-সব কথা কেন ঠাকুর, সে এখন থাক্‌ না। ওহে লক্ষেশ্বর, তুমি এখানে বসে বসে কী শুনছ। এখান থেকে যাও না।

 

লক্ষেশ্বর।

মহারাজ, যাই এমন আমার সাধ্য কী আছে। একেবারে পাথর দিয়ে চেপে রেখেছে। যমে না নড়ালে আমার আর নড়চড় নেই। নইলে মহারাজের সামনে আমি যে ইচ্ছাসুখে বসে থাকি এমন আমর স্বভাবই নয়।

 

বিজয়াদিত্যের অমাত্যগণের প্রবেশ

 

মন্ত্রী।

জয় হক মহারাজাধিরাজচক্রবর্তী বিজয়াদিত্য। ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম

 

সোমপাল।

আরে করেন কী, করেন কী। আমাকে পরিহাস করছেন নাকি। আমি বিজয়াদিত্য নই। আমি তাঁর চরণাশ্রিত সামন্ত সোমপাল।

 

মন্ত্রী।

মহারাজ, সময় তো অতীত হয়েছে এক্ষণে রাজধানীতে ফিরে চলুন।

 

সন্ন্যাসী।

ঠাকুরদা, পূর্বেই তো বলেছিলেম পাঠশালা ছেড়ে পালিয়েছি কিন্তু গুরুমশায় পিছন পিছন তাড়া করেছেন।

 

ঠাকুরদাদা।

প্রভু এ কী কাণ্ড। আমি তো স্বপ্ন দেখছি নে!

 

সন্ন্যাসী।

স্বপ্ন তুমিই দেখছ কি এঁরাই দেখছেন তা নিশ্চয় করে কে বলবে?

 

ঠাকুরদাদা।

তবে কি --

 

সন্ন্যাসী।

হাঁ, এঁরা কয়জনে আমাকে বিজয়াদিত্য বলেই তো জানেন।

 

ঠাকুরদাদা।

প্রভু, আমিই তো তবে জিতেছি। এই কয়দণ্ডে আমি তোমার যে পরিচয়টি পেয়েছি তা এঁরা পর্যন্ত পান নি। কিন্তু বড়ো সংকটে ফেললে তো ঠাকুর।

 

লক্ষেশ্বর।

আমিও বড়ো সংকট পড়েছি মহারাজ। আমি সম্রাটের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে সন্ন্যাসীর হাতে ধরা দিয়েছি, এখন আমি যে কার হাতে আছি সেটা ভেবেই পাচ্ছি নে।

 

সোমপাল।

মহারাজ দাসকে কি পরীক্ষা করতে বেরিয়েছিলেন?

 

সন্ন্যাসী।

না সোমপাল, আমি নিজের পরীক্ষাতেই বেরিয়েছিলেম।

 

সোমপাল।

মহারাজ, আপনি যে শরতের বিজয়যাত্রায় বেরিয়েছেন আজ তার পরিচয় পাওয়া গেল। আজ আমার হার মেনে আনন্দ।

 

উপনন্দের প্রবেশ

 

উপনন্দ।

ঠাকুর। এ কী, রাজা যে। এরা সব কারা।

 

[পলায়নোদ্যম

 

সন্ন্যাসী।

এস, এস, বাবা, এস। কী বলছিলে বলো। (উপনন্দ নিরুত্তর) এঁদের সামনে বলতে লজ্জা করছ? আচ্ছা, তবে সোমপাল একটু অবসর নাও। তোমরাও --

 

উপনন্দ।

সে কী কথা। ইনি যে আমাদের রাজা, এঁর কাছে আমাকে অপরাধী ক'রো না। আমি তোমাকে বলতে এসেছিলেম এই কদিন পুঁথি লিখে আজ তার পারিশ্রমিক তিন কাহন পেয়েছি। এই দেখো।

 

সন্ন্যাসী।

আমার হাতে দাও বাবা। তুমি ভাবছ এই তোমার বহুমূল্য তিন কার্ষাপণ আমি লক্ষেশ্বরের হাতে ঋণশোধের জন্য দেব? এ আমি নিজে নিলেম। আমি এখানে শারদার উৎসব করেছি এ আমার তারই দক্ষিণা। কী বল বাবা!

 

উপনন্দ।

ঠাকুর তুমি নেবে?

 

সন্ন্যাসী।

নেব বই কি। তুমি ভাবছ সন্ন্যাসী হয়েছি বলেই আমার কিছুতে লোভ নেই? এ-সব জিনি#স আমার ভারি লোভ।

 

লক্ষেশ্বর।

সর্বনাশ! তবেই হয়েছে। ডাইনের হাতে পুত্র সমর্পণ করে বসে আছি দেখছি।

 

সন্ন্যাসী।

ওগো শ্রেষ্ঠী।

 

শ্রেষ্ঠী।

আদেশ করুন।

 

সন্ন্যাসী।

এই লোকটিকে হাজার কার্ষাপণ গুণে দাও।

 

শ্রেষ্ঠী।

যে আদেশ।

 

উপনন্দ।

তবে ইনিই কি আমাকে কিনে নিলেন?

 

সন্ন্যাসী।

উনি তোমাকে কিনে নেন ওঁর এমন সাধ্য কী। তুমি আমার।

 

উপনন্দ।

(পা জড়াইয়া ধরিয়া) আমি কোন্‌ পুণ্য করেছিলেম যে আমার এমন ভাগ্য হল।

 

সন্ন্যাসী।

ওগো সুভূতি।

 

মন্ত্রী।

আজ্ঞা।

 

সন্ন্যাসী।

আমার পুত্র নেই বলে তোমরা সর্বদা আক্ষেপ করতে। এবারে সন্ন্যাসধর্মের জোরে এই পুত্রটি লাভ করেছি।

 

লক্ষেশ্বর।

হায় হায় আমার বয়স বেশি হয়ে গেছে বলে কী সুযোগটাই পেরিয়ে গেল।

 

মন্ত্রী।

বড়ো আনন্দ। তা ইনি কোন্‌ রাজগৃহে --

 

সন্ন্যাসী।

ইনি যে গৃহে জন্মেছেন সে গৃহে জগতের অনেক বড়ো বড়ো বীর জন্মগ্রহণ করেছেন -- পুরাণ ইতিহাস খুঁজে সে আমি তোমাকে পরে দেখিয়ে দেব। লক্ষেশ্বর।

 

লক্ষেশ্বর।

কী আদেশ।

 

সন্ন্যাসী।

বিজয়াদিত্যের হাত থেকে তোমার মণিমাণিক্য আমি রক্ষা করেছি এই তোমাকে ফিরে দিলেম।

 

লক্ষেশ্বর।

মহারাজ, যদি গোপনে ফিরিয়ে দিতেন তাহলেই যথার্থ রক্ষা করতেন, এখন রক্ষা করে কে?

 

সন্ন্যাসী।

এখন বিজয়াদিত্য স্বয়ং রক্ষা করবেন, তোমার ভয় নেই। কিন্তু তোমার কাছে আমার কিছু প্রাপ্য আছে।

 

লক্ষেশ্বর।

সর্বনাশ করলে।

 

সন্ন্যাসী।

ঠাকুরদা সাক্ষী আছেন।

 

লক্ষেশ্বর।

এখন সকলেই মিথ্যে সাক্ষ্য দেবে।

 

সন্ন্যাসী।

আমাকে ভিক্ষা দিতে চেয়েছিলে। তোমার কাছে এক মুঠো চাল পাওনা আছে। রাজার মুষ্টি কি ভরাতে পারবে?

 

লক্ষেশ্বর।

মহারাজ, আমি সন্ন্যাসীর মুষ্টি দেখেই কথাটা পেড়েছিলেম।

 

সন্ন্যাসী।

তবে তোমার ভয় নেই, যাও।

 

লক্ষেশ্বর।

মহারাজ, ইচ্ছে করেন যদি তবে এইবার কিছু উপদেশ দিতে পারেন।

 

সন্ন্যাসী।

এখনও দেরি আছে।

 

লক্ষেশ্বর।

তবে প্রণাম হই। চারদিকে সকলেই কৌটোটার দিকে বড্ড তাকাচ্ছে।

 

[প্রস্থান

 

সন্ন্যাসী।

রাজা সোমপাল, তোমার কাছে আমার একটি প্রার্থনা আছে।

 

সোমপাল।

সে কী কথা! সমস্তই মহারাজের, যে আদেশ করবেন,--

 

সন্ন্যাসী।

তোমার রাজ্য থেকে আমি একটি বন্দী নিয়ে যেতে চাই?

 

সোমপাল।

যাকে ইচ্ছা নাম করুন সৈন্য পাঠিয়ে দিচ্ছি। না হয় আমি নিজেই যাব।

 

সন্ন্যাসী।

বেশি দূরে পাঠাতে হবে না। (ঠাকুরদাদাকে দেখাইয়া) তোমার এই প্রজাটিকে চাই।

 

সোমপাল।

কেবল মাত্র এঁকে! মহারাজ যদি ইচ্ছা করেন তবে আমার রাজ্যে যে শ্রুতিধর স্মৃতিভূষণ আছেন তাঁকে আপনার সভায় নিয়ে যেতে পারেন।

 

সন্ন্যাসী।

না, অত বড়ো লোককে নিয়ে আমার সুবিধা হবে না আমি এঁকেই চাই। আমার প্রাসাদে অনেক জিনিস আছে কেবল বয়স্য নেই।

 

ঠাকুরদাদা।

বয়সে মিলবে না প্রভু, গুণেও না; তবে কিনা ভক্তি দিয়ে সমস্ত অমিল ভরিয়ে তুলতে পারব এই ভরসা আছে।

 

সন্ন্যাসী।

ঠাকুরদা, সময় খারাপ হলে বন্ধুরা পালায় তাই তো দেখছি। আমার উৎসবের বন্ধুরা এখন সব কোথায়? রাজদ্বারের গন্ধ পেয়েই দৌড় দিয়েছে না কি।

 

ঠাকুরদাদা।

কারও পালাবার পথ কি রেখেছ? আটঘাট ঘিরে ফেলেছ যে। ওই আসছে।

 

শেখরের সঙ্গে বালকগণের প্রবেশ

 

সকলে।

সন্ন্যাসী ঠাকুর, সন্ন্যাসী ঠাকুর।

 

সন্ন্যাসী।

(উঠিয়া দাঁড়াইয়া) এস, বাবা, সব এস।

 

সকলে।

একী! এ যে রাজা। আরে পালা, পালা।

 

[পলায়নোদ্যম

 

ঠাকুরদাদা।

আরে পালাস নে পালাস নে।

 

সন্ন্যাসী।

তোমরা পালাবে কি, উনিই পালাচ্ছেন। যাও সোমপাল, সভা প্রস্তুত করো গে, আমি যাচ্ছি।

 

সোমপাল।

যে আদেশ।

 

বালকেরা।

আমরা বনে পথে সব জায়গায় গেয়ে গেয়ে এসেছি এইবার এখানে গান শেষ করি।

 

শেখর।

হাঁ ভাই, তোরা ঠাকুরকে প্রদক্ষিণ করে করে গান গা।

 

সকলের গান

 

আমার নয়ন-ভুলানো এলে।

আমি কী হেরিলাম হৃদয় মেলে।

শিউলিতলার পাশে পাশে,

ঝরা ফুলের রাশে রাশে,

শিশির-ভেজা ঘাসে ঘাসে

অরুণরাঙা চরণ ফেলে

নয়ন-ভুলানো এলে।

আলোছায়ার আঁচলখানি

লুটিয়ে পড়ে বনে বনে,

ফুলগুলি ঐ মুখে চেয়ে

কী কথা কয় মনে মনে।

তোমায় মোরা করব বরণ,

মুখের ঢাকা করো হরণ,

ঐটুকু ঐ মেঘাবরণ

দু-হাত দিয়ে ফেলো ঠেলে।

নয়ন-ভুলানো এলে।

বনদেবীর দ্বারে দ্বারে

শুনি গভীর শঙ্খধ্বনি,

আকাশবীণার তারে তারে

জাগে তোমার আগমনী।

কোথায় সোনার নূপুর বাজে,

বুঝি আমার হিয়ার মাঝে,

সকল ভাবে, সকল কাজে

পাষাণ-গালা সুধা ঢেলে --

নয়ন-ভুলানো এলে।