Home > Plays > মায়ার খেলা > মায়ার খেলা
Acts: 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | SINGLE PAGE

মায়ার খেলা    


প্রথম সংস্করণের বিজ্ঞাপন


সখীসমিতির মহিলাশিল্পমেলায় অভিনীত হইবার উপলক্ষে এই গ্রন্থ উক্ত সমিতি কর্তৃক মুদ্রিত হইল। ইহাতে সমস্তই কেবল গান, পাঠোপযোগী কবিতা অতি অল্প।

 

মাননীয়া শ্রীমতী সরলা রায়ের অনুরোধে এই নাট্য রচিত হইল এবং তাঁহাকেই সাদর উপহার- স্বরূপে সমর্পণ করিলাম।

 

ইহার আখ্যানভাগ কোনো সমাজবিশেষে দেশবিশেষে বদ্ধ নহে। সংগীতের কল্পরাজ্যে সমাজনিয়মের প্রাচীর তুলিবার আবশ্যক বিবেচনা করি নাই। কেবল বিনীত ভাবে ভরসা করি, এই গ্রন্থে সাধারণ মানব-প্রকৃতিবিরুদ্ধ কিছু নাই।

 

আমার পূর্বরচিত একটি অকিঞ্চিৎ কর গদ্যনাটিকার সহিত এই গ্রন্থের কিঞ্চিৎ সাদৃশ্য আছে। পাঠকেরা ইহাকে তাহারই সংশোধন-স্বরূপে গ্রহণ করিলে বাধিত হইব।

 

এই গ্রন্থের তিনটি গান ইতিপূর্বে আমার অন্য কাব্যে প্রকাশিত হইয়াছে।

 

পাঠক ও দর্শকদিগকে বুঝিতে হইবে যে, মায়াকুমারীগণ এই কাব্যের অন্যান্য পাত্রগণের দৃষ্টি বা শ্রুতি গোচর নহে।

 

এই নাট্যকাব্যের সংক্ষিপ্ত আখ্যায়িকা পরপৃষ্ঠায় বিবৃত হইল। নতুবা বিচ্ছিন্ন গানের মধ্য হইতে ইহার আখ্যান সংগ্রহ করা সহসা পাঠকদের পক্ষে দুরূহ বোধ হইতে পারে।

 

প্রথম দৃশ্য

 

প্রথম দৃশ্যে মায়াকুমারীগণের আবির্ভাব। মায়াকুমারীগণ কুহকশক্তিপ্রভাবে মানবহৃদয়ে নানাবিধ মায়া- সৃজন করে। হাসি, কান্না, মিলন, বিরহ, বাসনা, লজ্জা, প্রেমের মোহ এই-সমস্ত মায়াকুমারীদের ঘটনা। একদিন নব বসন্তের রাত্রে তাহারা স্থির করিল, প্রমোদপুরের যুবক-যুবতীদের নবীন হৃদয়ে নবীন প্রেম রচনা করিয়া তাহারা মায়ার খেলা খেলিবে।

 

দ্বিতীয় দৃশ্য

 

নবযৌবনবিকাশে গ্রন্থের নায়ক অমর সহসা হৃদয়ের মধ্যে এক অর্পূব আকাঙ্ক্ষা অনুভব রিতেছে। সে উদাসভাবে জগতে আপন মানসী মূর্তির অনুরূপ প্রতিমা খুঁজিতে বাহির হইতেছে। এ দিকে শান্তা আপন প্রাণমন অমরকেই সমর্পণ করিয়াছে। কিন্তু চিরদিন নিতান্ত নিকটে থাকাতে শান্তার প্রতি অমরের প্রেম জন্মিতে অবসর পায় নাই। অমর শান্তার হৃদয়ের ভাব না বুঝিয়া চলিয়া গেল। মায়াকুমারীগণ পরিহাসচ্ছলে গাহিল–

 

কাছে আছে দেখিতে না পাও,

কাহার সন্ধানে দূরে যাও!

 

 

তৃতীয় দৃশ্য

 

প্রমদার কুমারীহৃদয়ে প্রেমের উন্মেষ হয় নাই। সে কেবল মনের আনন্দে হাসিয়া খেলিয়া বেড়ায়। সখীরা ভালোবাসার কথা বলিলে সে অবিশ্বাস করিয়া উড়াইয়া দেয়। অশোক ও কুমার তাহার নিকটে আপন প্রেম ব্যক্ত করে, কিন্তু সে তাহাতে ভ্রূক্ষেপ করে না। মায়াকুমারীগণ হাসিয়া বলিল, তোমার এ গর্ব চিরদিন থাকিবে না। –

 

প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে,

কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে।

গরব সব হায় কখন টুটে যায়,

সলিল বহে যায় নয়নে।

 

 

চতুর্থ দৃশ্য

 

অমর পৃথিবী খুঁজিয়া কাহারো সন্ধান পাইল না। অবশেষে প্রমদার ক্রীড়াকাননে আসিয়া দেখিল, প্রমদার প্রেমলাভে অকৃতার্থ হইয়া অশোক আপন মর্মব্যথা পোষণ করিতেছে। অমর বলিল, যদি ভালোবাসিয়া কেবল কষ্টই সার তবে ভালোবাসিবার প্রয়োজন কী ? কেন যে লোকে সাধ করিয়া ভালোবাসে অমর বুঝিতেই পারিল না। এমন সময়ে সখীদের লইয়া প্রমদা কাননে প্রবেশ করিল। প্রমদাকে দেখিয়া অমরের মনে সহসা এক নূতন আনন্দ নূতন প্রাণের সঞ্চার হইল। প্রমদা দেখিল আর-সকলেই তৃষিত ভ্রমরের ন্যায় তাহার চারিদিকে ফিরিতেছে, কেবল অমর একজন অপরিচিত যুবক দূরে দাঁড়াইয়া আছে। সে আকৃষ্টহৃদয়ে সখীদিগকে বলিল, ‘উহাকে একবার জিজ্ঞাসা করিয়া আয় ও কী চায়। ‘ সখীদের প্রশ্নের উত্তরে অমরের অনতিস্ফুট হৃদয়ের ভাব স্পষ্ট ব্যক্ত হইল না। সখীরা কিছু বুঝিল না। কেবল মায়াকুমারীগণ বুঝিল এবং গাহিল–

 

প্রেমপাশে ধরা পড়েছে দুজনে,

দেখো দেখো সখী চাহিয়া।

দুটি ফুল খসে ভেসে গেল ওই

প্রণয়ের স্রোত বাহিয়া।

 

 

পঞ্চম দৃশ্য

 

অমরের মনে ক্রমে প্রমদার প্রতি প্রেম প্রবল হইয়া উঠিতে লাগিল। প্রমদারও হৃদয়ের ব্যাকুলতা বাড়িয়া উঠিল, বাহিরের চঞ্চলতা দূর হইয়া গেল। সখীরা প্রমাদার অবস্থা বুঝিতে পারিল। কিন্তু পূর্বদৃশ্যে অমরের অস্পষ্ট উত্তর এবং ভাবগতিক দেখিয়া অমরের প্রতি সখীদের বিশ্বাস নাই। এবং সখীদের নিকট হইতে সখীর হৃদয় হরণ করিয়া লইতেছে জানিয়া অমরের প্রতি হয়তো অলক্ষ্যে তাহাদের ঈষৎ মৃদু বিদ্বেষের ভাবও জন্মিয়াছে। অমর যখন প্রমদার নিকট আপনার প্রেম ব্যক্ত করিল প্রমদা কিছু বলিতে না বলিতে সখীরা তাড়াতাড়ি আসিয়া অমরকে প্রচুর ভর্ৎ সনা করিল। সরলহৃদয় অমর প্রকৃত অবস্থা কিছু না বুঝিয়া হতাশ্বাস হইয়া ফিরিয়া গেল। ব্যাকুলহৃদয়ে প্রমদা লজ্জায় বাধা দিবার অবসর পাইল না। মায়াকুমারীগণ গাহিল–

 

নিমেষের তরে শরমে বাধিল,

মরমের কথা হল না।

জনমের তরে তাহারি লাগিয়ে

রহিল হৃদয়বেদনা।

 

 

ষষ্ঠ দৃশ্য

 

অমরের অসুখী অশান্ত আশ্রয়হীন হৃদয় সহজেই শান্তার প্রতি ফিরিল। এই দীর্ঘ বিরহে এবং অন্য সকলের প্রেম হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া অমর শান্তার প্রতি নিজের এবং নিজের প্রতি শান্তার অচ্ছেদ্য গূঢ় বন্ধন অনুভব করিবার অবসর পাইল। শান্তার নিকটে আসিয়া আত্মসমর্পণ করিল। এদিকে প্রমদার সখীরা দেখিল অমর আর ফিরে না, তাহারা প্রত্যাশা করিয়াছিল বাধা পাইয়া অমরের প্রেমানল দ্বিগুণ প্রজ্বলিত হইয়া উঠিবে। তাহাতে নিরাশ হইয়া তাহারা নানা কথার ছলে অমরকে আহবান করিতে লাগিল–অমর ফিরিল না; সখীদের ইঙ্গিত বুঝিতেই পারিল না। ভগ্নহৃদয়া প্রমদা অমরের প্রেমের আশা একেবারেই পরিত্যাগ করিল। মায়াকুমারীগণ গাহিল–

 

বিদায় করেছ যাবে নয়নজলে,

এখন ফিরাবে তারে কিসের ছলে।

 

 

সপ্তম দৃশ্য

 

শান্তা ও অমরের মিলনোৎ সবে পুরনারীগণ কাননে সমাগত হইয়া আনন্দ-গান গাহিতেছে। অমর যখন পুষ্পমালা লইয়া শান্তার গলে আরোপণ করিতে যাইতেছে এমন সময় ম্লান ছায়ার ন্যায় প্রমদা কাননে প্রবেশ করিল। সহসা অনপেক্ষিত ভাবে উৎ সবের মধ্যে বিষাদপ্রতিমা প্রমদার নিতান্ত করুণ দীন ভাব অবলোকন করিয়া নিমেষের মতো আত্মবিস্মৃত অমরের হস্ত হইতে পুষ্পমালা খসিয়া পড়িয়া গেল। উভয়ের এই অবস্থা দেখিয়া শান্তা ও আর সকলের মনে বিশ্বাস হইল যে, অমর ও প্রমদার হৃদয় গোপনে প্রেমের বন্ধনে বাঁধা আছে। তখন শান্তা ও সখীগণ অমর ও প্রমদার মিলনসংঘটনে প্রবৃত্ত হইল। প্রমদা কহিল, ‘আর কেন! এখন বেলা গিয়াছে, খেলা ফুরাইয়াছে, এখন আর আমাকে কেন! এখন এ মালা তোমরা পরো, তোমরা সুখে থাকো। ' অমর শান্তার প্রতি লক্ষ্য করিয়া কহিল, ‘ আমি মায়ার চক্রে পড়িয়া আপনার সুখ নষ্ট করিয়াছি এখন আমার এই ভগ্ন সুখ এই ম্লান মালা কাহাকে দিব, কে লইবে ?' শান্তা ধীরে ধীরে কহিল, ‘আমি লইব। তোমার দুঃখের ভার আমি বহন করিব। তোমার সাধের ভুল প্রেমের মোহ দূর হইয়া জীবনের সুখ-নিশা অবসান হইয়াছে– এই ভুলভাঙা দিবালোকে তোমার মুখের দিকে চাহিয়া আমার হৃদয়ের গভীর প্রশান্ত সুখের কথা তোমাকে শুনাইব। ' অমর ও শান্তার এইরূপে মিলন হইল। প্রমদা শূন্য হৃদয় লইয়া কাঁদিয়া চলিয়া গেল। মায়াকুমারীগণ গাহিল–

 

এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মিলে না,

শুধু সুখ চলে যায়, – এমনি মায়ার ছলনা।

 

 


প্রথম দৃশ্য


কানন

 

মায়াকুমারীগণ

 

সকলে।

(মোরা) জলে স্থলে কত ছলে মায়াজাল গাঁথি।

 

 

প্রথমা।

(মোরা) স্বপন রচনা করি অলস নয়ন ভরি।

 

 

দ্বিতীয়া।

গোপনে হৃদয়ে পশি কুহক-আসন পাতি।

 

 

তৃতীয়া।

(মোরা) মদির-তরঙ্গ তুলি বসন্ত-সমীরে!

 

 

প্রথমা।

দুরাশা জাগায় প্রাণে প্রাণে, আধো-তানে ভাঙা গানে,

ভ্রমরগুঞ্জরাকুল বকুলের পাঁতি!

 

 

সকলে।

মোরা মায়াজাল গাঁথি।

 

 

দ্বিতীয়া।

নরনারী-হিয়া মোরা বাঁধি মায়াপাশে।

 

 

তৃতীয়া।

কত ভুল করে তারা,কত কাঁদে হাসে।

 

 

প্রথমা।

মায়া করে ছায়া ফেলি মিলনের মাঝে,

আনি মান-অভিমান।

 

 

দ্বিতীয়া।

বিরহী স্বপনে পায় মিলনের সাথী।

 

 

সকলে।

মোরা মায়াজাল গাঁথি।

 

 

প্রথমা।

চলো সখী, চলো।

কুহক-স্বপন-খেলা খেলাবে চলো।

 

 

দ্বিতীয়া ও তৃতীয়া।

নবীন হৃদয়ে রচি নব প্রেম-ছল,

প্রমোদে কাটাব নব বসন্তের রাতি।

 

 

সকলে।

মোরা মায়াজাল গাঁথি।

 

 


দ্বিতীয় দৃশ্য


গৃহ

 

গমনোন্মুখ অমর। শান্তার প্রবেশ

 

শান্তা।

পথহারা তুমি পথিক যেন গো সুখের কাননে,

ওগো যাও, কোথা যাও।

সুখে ঢল ঢল বিবশ বিভল পাগল নয়নে

তুমি চাও, কারে চাও।

কোথা গেছে তব উদাস হৃদয়,

কোথা পড়ে আছে ধরণী।

মায়ার তরণী বাহিয়া যেন গো

মায়াপুরী পানে ধাও।

কোন্‌ মায়াপুরী পানে ধাও!

 

 

অমর।

জীবনে আজ কি প্রথম এল বসন্ত।

নবীন বাসনাভরে হৃদয় কেমন করে,

নবীন জীবনে হল জীবন্ত।

সুখভরা এ ধরায় মন বাহিরিতে চায়,

কাহারে বসাতে চায় হৃদয়ে।

তাহার খুঁজিব দিক্‌-দিগন্ত।

 

 

মায়াকুমারীগণের প্রবেশ

 

সকলে।

কাছে আছে দেখিতে না পাও,

তুমি কাহার সন্ধানে দূরে যাও।

 

 

অমর।

(শান্তার প্রতি) যেমন দখিনে বায়ু ছুটেছে,

কে জানে কোথায় ফুল ফুটেছে।

তেমনি আমিও সখী যাব,

না জানি কোথায় দেখা পাব।

কার সুধাস্বর মাঝে, জগতের গীত বাজে,

প্রভাত জাগিছে কার নয়নে।

কাহার প্রাণের প্রেম অনন্ত।

তাহারে খুঁজিব দিক্‌-দিগন্ত।

 

 

[ প্রস্থান

 

মায়াকুমারীগণ।

মনের মতো কারে খুঁজে মর,

সে কি আছে ভুবনে,

সে তো রয়েছে মনে।

ওগো, মনের মতো সেই তো হবে,

তুমি শুভক্ষণে যাহার পানে চাও।

 

 

শান্তা।

(নেপথ্যে চাহিয়া)

আমার পরান যাহা চায়,

তুমি তাই, তুমি তাই গো।

তোমা ছাড়া আর এ জগতে

মোর, কেহ নাই কিছু নাই গো।

তুমি সুখ যদি নাহি পাও,

যাও, সুখের সন্ধানে যাও,

আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয়মাঝে,

আর কিছু নাহি চাই গো।

আমি তোমার বিরহে রহিব বিলীন,

তোমাতে করিব বাস,

দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী,

দীর্ঘ বরষ মাস।

যদি আর কারে ভালোবাস,

যদি আর ফিরে নাহি আস,

তবে, তুমি যাহা চাও, তাই যেন পাও,

আমি যত দুখ পাই গো।

 

 

মায়াকুমারীগণ।

(নেপথ্যে চাহিয়া)

কাছে আছে দেখিতে না পাও,

তুমি কাহার সন্ধানে দূরে যাও।

 

 

প্রথমা।

মনের মতো কারে খুঁজে মর,

 

 

দ্বিতীয়া।

সে কি আছে ভুবনে,

সে যে রয়েছে মনে।তৃতীয়া। ওগো, মনের মতো সেই তো হবে,

তুমি শুভক্ষণে যাহার পানে চাও।

 

 

প্রথমা।

তোমার আপনার যে জন, দেখিলে না তারে।

 

 

দ্বিতীয়া।

তুমি যাবে কার দ্বারে।

 

 

তৃতীয়া।

যারে চাবে তারে পাবে না,

যে মন তোমার আছে, যাবে তাও।

 

 


তৃতীয় দৃশ্য


কানন

 

প্রমদার সখীগণ

 

প্রথমা।

সখী, সে গেল কোথায়,

তারে ডেকে নিয়ে আয়।

 

 

সকলে।

দাঁড়াব ঘিরে তারে তরুতলায়।

 

 

প্রথমা।

আজি এ মধুর সাঁঝে, কাননে ফুলের মাঝে,

হেসে হেসে বেড়াবে সে, দেখিব তায়।

 

 

দ্বিতীয়া।

আকাশের তারা ফুটেছে, দখিনে বাতাস ছুটেছে,

পাখিটি ঘুমঘোরে গেয়ে উঠেছে।

 

 

প্রথমা।

আয় লো আনন্দময়ী, মধুর বসন্ত লয়ে,

 

 

সকলে।

লাবণ্য ফুটাবি লো তরুতলায়!

 

 

প্রমদার প্রবেশ

 

প্রমদা।

দে লো সখী দে পরাইয়ে গলে,

সাধের বকুলফুলহার।

আধফোটা জুঁইগুলি যতনে আনিয়া তুলি,

গাঁথি গাঁথি সাজায়ে দে মোরে

কবরী ভরিয়ে ফুলভার।

তুলে দে লো চঞ্চল কুন্তল

কপোলে পড়িছে বারেবার।

 

 

প্রথমা।

আজি এত শোভা কেন, আনন্দে বিবশা যেন।

 

 

দ্বিতীয়া।

বিম্বাধরে হাসি নাহি ধরে,

লাবণ্য ঝরিয়া পড়ে ধরাতলে!

 

 

প্রথমা।

সখী, তোরা দেখে যা, দেখে যা,

তরুণ তনু,এত রূপরাশি

বহিতে পারে না বুঝি আর!

 

 

তৃতীয়া।

সখী, বহে গেল বেলা, শুধু হাসিখেলা,

এ কি আর ভালো লাগে!

আকুল তিয়াষ, প্রেমের পিয়াস,

প্রাণে কেন নাহি জাগে!

কবে আর হবে থাকিতে জীবন

আঁখিতে আঁখিতে মদির মিলন,

মধুর হুতাশে মধুর দহন,

নিত-নব অনুরাগে।

তরল কোমল নয়নের জল

নয়নে উঠিবে ভাসি।

সে বিষাদ-নীরে নিবে যাবে ধীরে

প্রখর চপল হাসি।

উদাস নিশ্বাস আকুলি উঠিবে,

আশা-নিরাশায় পরান টুটিবে,

মরমের আলো কপোলে ফুটিবে,

শরম-অরুণ-রাগে।

 

 

প্রমদা।

ওলো রেখে দে, সখী, রেখে দে,

মিছে কথা ভালোবাসা।

সুখের বেদনা, সোহাগ যাতনা,

বুঝিতে পারি না ভাষা।

ফুলের বাঁধন, সাধের কাঁদন,

পরান সঁপিতে প্রাণের সাধন,

লহো লহো বলে পরে আরাধন

পরের চরণে আশা।

তিলেক দরশ পরশ মাগিয়া,

বরষ বরষ কাতরে জাগিয়া,

পরের মুখের হাসির লাগিয়া

অশ্রু-সাগরে ভাসা।

জীবনের সুখ খুঁজিবারে গিয়া

জীবনের সুখ নাশা।

 

 

মায়াকুমারীগণ।

প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে,

কে কোথা ধরা পড়ে, কে জানে।

গরব সব হায় কখন টুটে যায়,

সলিল বহে যায় নয়নে।

 

 

কুমারের প্রবেশ

 

কুমার।

(প্রমদার প্রতি) যেয়ো না, যেয়ো না ফিরে,

দাঁড়াও, বারেক দাঁড়াও হৃদয়-আসনে।

চঞ্চল সমীর সম ফিরিছ কেন,

কুসুমে কুসুমে, কাননে কাননে।

তোমায় ধরিতে চাহি, ধরিতে পারি নে,

তুমি গঠিত যেন স্বপনে,

এস হে, তোমারে বারেক দেখি ভরিয়ে আঁখি,

ধরিয়া রাখি যতনে।

প্রাণের মাঝে তোমারে ঢাকিব,

ফুলের পাশে বাঁধিয়ে রাখিব,

তুমি দিবস-নিশি রহিবে মিশি

কোমল প্রেম-শয়নে।

 

 

প্রমদা।

কে ডাকে! আমি কভু ফিরে নাহি চাই।

কত ফুল ফুটে উঠে, কত ফুল যায় টুটে,

আমি শুধু বহে চলে যাই।

পরশ পুলক-রস ভরা রেখে যাই, নাহি দিই ধরা।

উড়ে আসে ফুলবাস, লতাপাতা ফেলে শ্বাস,

বনে বনে উঠে হা-হুতাশ,

চকিতে শুনিতে শুধু পাই,

চলে যাই।

আমি কভু ফিরে নাহি চাই।

 

 

অশোকের প্রবেশ

 

অশোক।

এসেছি গো এসেছি, মন দিতে এসেছি,

যারে ভালো বেসেছি!

ফুলদলে ঢাকি মন যাব রাখি চরণে,

পাছে কঠিন ধরণী পায়ে বাজে,

রেখো রেখো চরণ হৃদি-মাঝে,

না হয় দলে যাবে, প্রাণ ব্যথা পাবে,

আমি তো ভেসেছি, অকূলে ভেসেছি।

 

 

প্রমদা।

ওকে বলো, সখী বলো, কেন মিছে করে ছল,

মিছে হাসি কেন, সখী, মিছে আঁখিজল!

জানি নে প্রেমের ধারা, ভয়ে তাই হই সারা,

কে জানে কোথায় সুধা কোথা হলাহল।

 

 

সখীগণ।

কাঁদিতে জানে না এরা, কাঁদাইতে জানে কল,

মুখের বচন শুনে মিছে কী হইবে ফল।

প্রেম নিয়ে শুধু খেলা প্রাণ নিয়ে হেলাফেলা,

ফিরে যাই এই বেলা, চল, সখী, চল।

 

 

[ প্রস্থান

 

মায়াকুমারীগণ।

প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে,

কে কোথা ধরা পড়ে, কে জানে।

গরব সব হায় কখন টুটে যায়,

সলিল বহে যায় নয়নে।

এ সুখ-ধরণীতে, কেবলি চাহ নিতে,

জান না হবে দিতে আপনা,

সুখের ছায়া ফেলি, কখন যাবে চলি,

বরিবে সাধ করি বেদনা।

কখন বাজে বাঁশি, গরব যায় ভাসি,

পরান পড়ে আসি বাঁধনে।

 

 


চতুর্থ দৃশ্য


কানন

 

অমর, কুমার ও অশোক

 

অমর।

মিছে ঘুরি এ জগতে কিসের পাকে,

মনের বাসনা যত মনেই থাকে।

বুঝিয়াছি এ নিখিলে, চাহিলে কিছু না মিলে,

এরা, চাহিলে আপন মন গোপনে রাখে।

এত লোক আছে কেহ কাছে না ডাকে।

 

 

অশোক।

তারে দেখাতে পারি নে কেন প্রাণ। (খুলে গো)

কেন বুঝাতে পারি নে হৃদয়-বেদনা।

কেমনে সে হেসে চলে যায়, কোন্‌ প্রাণে ফিরেও না চায়,

এত সাধ এত প্রেম করে অপমান।

এত ব্যথাভরা ভালোবাসা, কেহ দেখে না,

প্রাণে গোপনে রহিল।

এ প্রেম কুসুম যদি হত, প্রাণ হতে ছিঁড়ে লইতাম,

তার চরণে করিতাম দান,

বুঝি সে তুলে নিত না, শুকাত অনাদরে,

তবু তার সংশয় হত অবসান।

 

 

কুমার।

সখা, আপন মন নিয়ে কাঁদিয়ে মরি

পরের মন নিয়ে কী হবে।

আপন মন যদি বুঝিতে নারি,

পরের মন বুঝে কে কবে।

 

 

অমর।

অবোধ মন লয়ে ফিরি ভবে,

বাসনা ফাঁদে প্রাণে হা হা রবে,

এ মন দিতে চাও দিয়ে ফেলো

কেন গো নিতে চাও মন তবে।

স্বপন সম সব জানিয়ো মনে,

তোমার কেহ নাই এ ত্রিভুবনে;

যে জন ফিরিতেছে আপন আশে,

তুমি ফিরিছ কেন তাহার পাশে।

নয়ন মেলি শুধু দেখে যাও,

হৃদয় দিয়ে শুধু শান্তি পাও।

 

 

কুমার।

তোমারে মুখ তুলে চাহে না যে,

থাক্‌ সে আপনার গরবে।

 

 

অশোক।

আমি, জেনে শুনে বিষ করেছি পান।

প্রাণের আশা ছেড়ে সঁপেছি প্রাণ।

যতই দেখি তারে ততই দহি,

আপন মনোজ্বালা নীরবে সহি,

তবু পারি নে দূরে যেতে, মরিতে আসি,

লই গো বুক পেতে অনল-বাণ।

যতই হাসি দিয়ে দহন করে,

ততই বাড়ে তৃষা প্রেমের তরে,

প্রেম-অমৃত-ধারা ততই যাচি,

যতই করে প্রাণে অশনি দান।

 

 

অমর।

ভালোবেসে যদি সুখ নাহি

তবে কেন,

তবে কেন মিছে ভালোবাসা।

 

 

অশোক।

মন দিয়ে মন পেতে চাহি।

অমর ও কুমার। ওগো কেন,

ওগো কেন মিছে এ দুরাশা।

 

 

অশোক।

হৃদয়ে জ্বালায়ে বাসনার শিখা,

নয়নে সাজায়ে মায়া-মরীচিকা,

শুধু ঘুরে মরি মরুভূমে।

অমর ও কুমার। ওগো কেন,

ওগো কেন মিছে এ পিপাসা।

 

 

অমর।

আপনি যে আছে আপনার কাছে,

নিখিল জগতে কী অভাব আছে।

আছে মন্দ সমীরণ, পুষ্পবিভূষণ,

কোকিল-কূজিত কুঞ্জ।

 

 

অশোক।

বিশ্বচরাচর লুপ্ত হয়ে যায়,

এ কী ঘোর প্রেম অন্ধ রাহুপ্রায়

জীবন যৌবন গ্রাসে।

 

 

অমর ও কুমার।

তবে কেন,

তবে কেন মিছে এ কুয়াশা।

 

 

মায়াকুমারীগণ।

দেখো চেয়ে, দেখো ঐ কে আসিছে!

চাঁদের আলোতে কার হাসি হাসিছে।

হৃদয়-দুয়ার খুলিয়ে দাও, প্রাণের মাঝারে তুলিয়ে লও,

ফুলগন্ধ সাথে তার সুবাস ভাসিছে।

 

 

প্রমদা ও সখীগণের প্রবেশ

 

প্রমদা।

সুখে আছি সুখে আছি (সখা, আপন মনে।)

 

 

প্রমদা ও সখীগণ।

কিছু চেয়ো না, দূরে যেয়ো না,

শুধু চেয়ে দেখো, শুধু ঘিরে থাকো কাছাকাছি।

 

 

প্রমদা।

সখা, নয়নে শুধু জানাবে প্রেম, নীরবে দিবে প্রাণ,

রচিয়া ললিত মধুর বাণী আড়ালে গাবে গান।

গোপনে তুলিয়া কুসুম গাঁথিয়া রেখে যাবে মালাগাছি।

 

 

প্রমদা ও সখীগণ।

মন চেয়ো না, শুধু চেয়ে থাকো,

শুধু ঘিরে থাকো কাছাকাছি।

 

 

প্রমদা।

মধুর জীবন, মধুর রজনী, মধুর মলয়-বায়।

এই মাধুরী-ধারা বহিছে আপনি, কেহ কিছু নাহি চায়।

আমি আপনার মাঝে আপনি হারা, আপন সৌরভে সারা,

যেন আপনার মন, আপনার প্রাণ, আপনারে সঁপিয়াছি।

 

 

অশোক।

ভালোবেসে দুখ সে-ও সুখ, সুখ নাহি আপনাতে।

 

 

প্রমদা ও সখীগণ।

না না না, সখা, ভুলি নে ছলনাতে।

 

 

কুমার।

মন দাও দাও দাও সখী দাও পরের হাতে।

 

 

প্রমদা ও সখীগণ।

না না না, মোরা ভুলি নে ছলনাতে।

 

 

অশোক।

সুখের শিশির নিমেষে শুকায়, সুখ চেয়ে দুখ ভালো,

আনো, সজল বিমল প্রেম ছল ছল নলিন নয়ন-পাতে।

 

 

প্রমদা ও সখীগণ।

না না না, মোরা ভুলি নে ছলনাতে।

 

 

কুমার।

রবির কিরণে ফুটিয়া নলিনী আপনি টুটিয়া যায়,

সুখ পায় তায় সে।

চির-কলিকা-জনম, কে করে বহন চির-শিশির রাতে।

 

 

প্রমদা ও সখীগণ।

না না না, মোরা ভুলি নে ছলনাতে।

 

 

অমর।

ওই কে গো হেসে চায়, চায় প্রাণের পানে।

গোপনে হৃদয়-তলে কী জানি কিসের ছলে

আলোক হানে।

এ প্রাণ নূতন করে কে যেন দেখালে মোরে,

বাজিল মরম-বীণা নূতন তানে।

এ পুলক কোথা ছিল, প্রাণ ভরি বিকশিল,

তৃষা-ভরা তৃষা-হরা এ অমৃত কোথা ছিল।

কোন্‌ চাঁদ হেসে চাহে, কোন্‌ পাখি গান গাহে,

কোন্‌ সমীরণ বহে লতাবিতানে।

 

 

প্রমদা।

দূরে দাঁড়ায়ে আছে,

কেন আসে না কাছে।

যা, তোরা যা সখী, যা শুধা গে,

ঐ আকুল অধর আঁখি কী ধন যাচে।

 

 

সখীগণ।

ছি, ওলো ছি, হল কী, ওলো সখী।

 

 

প্রথমা।

লাজ-বাঁধ কে ভাঙিল, এত দিনে শরম টুটিল!

 

 

তৃতীয়া।

কেমনে যাব, কী শুধাব।

 

 

প্রথমা।

লাজে মরি, কী মনে করে পাছে।

 

 

প্রমদা।

যা, তোরা যা সখী, যা শুধা গে,

ওই আকুল অধর আঁখি কী ধন যাচে।

 

 

মায়াকুমারীগণ।

প্রেমপাশে ধরা পড়েছে দু-জনে,

দেখো দেখো সখী চাহিয়া।

দুটি ফুল খসে ভেসে গেল ওই,

প্রণয়ের স্রোত বাহিয়া।

 

 

সখীগণ।

(অমরের প্রতি) ওগো, দেখি, আঁখি তুলে চাও,

তোমার চোখে কেন ঘুমঘোর।

 

 

অমর।

আমি কী যেন করেছি পান,

কোন্‌ মদিরা রস-ভোর।

আমার চোখে তাই ঘুমঘোর।

 

 

সখীগণ।

ছি ছি ছি।

 

 

অমর।

সখী, ক্ষতি কী।

(এ ভবে) কেহ জ্ঞানী অতি, কেহ ভোলামন,

কেহ সচেতন, কেহ অচেতন,

কাহারো নয়নে হাসির কিরণ,

কাহারো নয়নে লোর।

আমার চোখে শুধু ঘুমঘোর।

 

 

সখীগণ।

সখা, কেন গো অচলপ্রায়

হেথা, দাঁড়ায়ে তরুছায়।

 

 

অমর।

অবশ হৃদয়ভারে, চরণ

চলিতে নাহি চায়,

তাই দাঁড়ায়ে তরুছায়।

 

 

সখীগণ।

ছি ছি ছি।

 

 

অমর।

সখী, ক্ষতি কী।

(এ ভবে) কেহ পড়ে থাকে, কেহ চলে যায়,

কেহ বা আলসে চলিতে না চায়,

কেহ বা আপনি স্বাধীন, কাহারো

চরণে পড়েছে ডোর।

কাহারো নয়নে লেগেছে ঘোর।

 

 

সখীগণ।

ওকে বোঝা গেল না--চলে আয় চলে আয়।

ও কী কথা যে বলে সখী, কী চোখে যে চায়।

চলে আয়, চলে আয়।

লাজ টুটে শেষে মরি লাজে,

মিছে কাজে,

ধরা দিবে না যে, বলো কে পারে তায়।

আপনি সে জানে তার মন কোথায়।

চলে আয়, চলে আয়।

 

 

[ প্রস্থান

 

মায়াকুমারীগণ।

প্রেম-পাশে ধরা পড়েছে দু-জনে,

দেখো দেখো সখী চাহিয়া।

দুটি ফুল খসে ভেসে গেল ওই,

প্রণয়ের স্রোত বাহিয়া।

চাঁদিনী যামিনী, মধু সমীরণ,

আধো ঘুমঘোর, আধো জাগরণ,

চোখোচোখি হতে ঘটালে প্রমাদ,

কুহুস্বরে পিক গাহিয়া,

দেখো দেখো সখী চাহিয়া।

 

 


পঞ্চম দৃশ্য


অমর।

দিবস রজনী, আমি যেন কার

আশায় আশায় থাকি।

(তাই) চমকিত মন, চকিত শ্রবণ,

তৃষিত আকুল আঁখি।

চঞ্চল হয়ে ঘুরিয়ে বেড়াই,

সদা মনে হয় যদি দেখা পাই,

"কে আসিছে" বলে চমকিয়ে চাই

কাননে ডাকিলে পাখি।

জাগরণে তারে না দেখিতে পাই,

থাকি স্বপনের আশে,

ঘুমের আড়ালে যদি ধরা দেয়,

বাঁধিব স্বপনপাশে।

এত ভালোবাসি, এত যারে চাই,

মনে হয় না তো সে যে কাছে নাই,

যেন এ বাসনা ব্যাকুল আবেগে,

তাহারে আনিবে ডাকি।

 

 

প্রমদা, সখীগণ, অশোক ও কুমারের প্রবেশ

 

কুমার।

সখী, সাধ করে যাহা দেবে তাই লইব।

 

 

সখীগণ।

আহা মরি মরি সাধের ভিখারি,

তুমি মনে মনে চাহ প্রাণমন।

 

 

কুমার।

দাও যদি ফুল, শিরে তুলে রাখিব

সখী। দেয় যদি কাঁটা।

 

 

কুমার।

তাও সহিব।

 

 

সখীগণ।

আহা মরি মরি সাধের ভিখারি,

তুমি মনে মনে চাহ প্রাণমন।

 

 

কুমার।

যদি এক বার চাও সখী মধুর নয়ানে,

ওই আঁখি-সুধাপানে,

চিরজীবন মাতি রহিব।

 

 

সখীগণ।

যদি কঠিন কটাক্ষ মিলে।

 

 

কুমার।

তাও হৃদয়ে বিঁধায়ে চিরজীবন বহিব।

 

 

সখীগণ।

আহা মরি মরি সাধের ভিখারি,

তুমি মনে মনে চাহ প্রাণমন।

 

 

প্রমদা।

আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল,

শুধাইল না কেহ।

সে তো এল না, যারে সঁপিলাম

এই প্রাণ মন দেহ।

সে কি মোর তরে পথ চাহে,

সে কি বিরহ-গীত গাহে,

যার বাঁশরি-ধ্বনি শুনিয়ে

আমি ত্যজিলাম গেহ।

 

 

মায়াকুমারীগণ।

নিমেষের তরে শরমে বাধিল,

মরমের কথা হল না।

জনমের তরে তাহারি লাগিয়ে

রহিল মরম-বেদনা।

 

 

অশোক।

(প্রমদার প্রতি)

ওগো সখী, দেখি, দেখি মন কোথা আছে।

 

 

সখীগণ।

কত কাতর হৃদয় ঘুরে ঘুরে, হেরো কারে যাচে।

 

 

অশোক।

কী মধু কী সুধা কী সৌরভ,

কী রূপ রেখেছ লুকায়ে।

 

 

সখীগণ।

কোন্‌ প্রভাতে কোন্‌ রবির আলোকে

দিবে খুলিয়ে কাহার কাছে।

 

 

অশোক।

সে যদি না আসে এ জীবনে,

এ কাননে পথ না পায়!

 

 

সখীগণ।

যারা এসেছে তারা বসন্ত ফুরালে

নিরাশ প্রাণে ফেরে পাছে!

 

 

প্রমদা।

এ তো খেলা নয়, খেলা নয়।

এ যে হৃদয়-দহন-জ্বালা, সখী।

এ যে, প্রাণভরা ব্যাকুলতা,

গোপন মর্মের ব্যথা,

এ যে, কাহার চরণোদ্দেশে জীবন মরণ ঢালা।

কে যেন সতত মোরে

ডাকিয়ে আকুল করে,

যাই যাই করে প্রাণ, যেতে পারি নে।

যে কথা বলিতে চাহি,

তা বুঝি বলিতে নাহি,

কোথায় নামায়ে রাখি, সখী, এ প্রেমের ডালা।

যতনে গাঁথিয়ে শেষে, পরাতে পারি নে মালা।

 

 

প্রথমা সখী।

সে জন কে, সখী, বোঝা গেছে,

আমাদের সখী যারে মনপ্রাণ সঁপেছে।

 

 

দ্বিতীয়া ও তৃতীয়া।

ও সে কে, কে, কে।

 

 

প্রথমা।

ওই যে তরুতলে, বিনোদ-মালা গলে,

না জানি কোন্‌ ছলে বসে রয়েছে।

 

 

দ্বিতীয়া।

সখী কী হবে,

ও কি কাছে আসিবে কভু, কথা কবে।

 

 

তৃতীয়া।

ও কি প্রেম জানে, ও কি বাঁধন মানে।

ও কী মায়াগুণে মন লয়েছে।

 

 

দ্বিতীয়া।

বিভল আঁখি তুলে আঁখি পানে চায়,

যেন কী পথ ভুলে এল কোথায়। (ওগো)

 

 

তৃতীয়া।

যেন কী গানের স্বরে, শ্রবণ আছে ভরে,

যেন কোন্‌ চাঁদের আলোয় মগ্ন হয়েছে।

 

 

অমর।

ওই মধুর মুখ জাগে মনে।

ভুলিব না এ জীবনে,

কী স্বপনে কী জাগরণে।

তুমি জান, বা না জান,

মনে সদা যেন মধুর বাঁশরি বাজে,

হৃদয়ে সদা আছে ব'লে।

আমি প্রকাশিতে পারি নে,

শুধু চাহি কাতর নয়নে।

 

 

সখীগণ।

তারে কেমনে ধরিবে, সখী, যদি ধরা দিলে।

 

 

প্রথমা।

তারে কেমনে কাঁদাবে, যদি আপনি কাঁদিলে।

 

 

দ্বিতীয়া।

যদি মন পেতে চাও, মন রাখো গোপনে।

 

 

তৃতীয়া।

কে তারে বাঁধিবে, তুমি আপনায় বাঁধিলে।

 

 

সকলে।

কাছে আসিলে তো কেহ কাছে রহে না।

কথা কহিলে তো কেহ কথা কহে না।

 

 

প্রথমা।

হাতে পেলে ভূমিতলে ফেলে চলে যায়।

 

 

দ্বিতীয়া।

হাসিয়ে ফিরায় মুখ কাঁদিয়ে সাধিলে।

 

 

অমর।

(নিকটে আসিয়া প্রমদার প্রতি)

সকল হৃদয় দিয়ে ভালো বেসেছি যারে,

সে কি ফিরাতে পারে, সখী।

সংসার-বাহিরে থাকি

জানি নে কী ঘটে সংসারে।

কে জানে, হেথায় প্রাণপণে প্রাণ যারে চায়,

তারে পায় কি না পায় (জানি নে),

ভয়ে ভয়ে তাই এসেছি গো,

অজানা হৃদয়-দ্বারে।

তোমার সকলি ভালোবাসি,

ওই রূপরাশি,

ওই খেলা, ওই গান, ওই মধুহাসি।

ওই দিয়ে আছ ছেয়ে জীবন আমারি,

কোথায় তোমার সীমা, ভুবন-মাঝারে।

 

 

সখীগণ।

তুমি কে গো, সখীরে কেন জানাও বাসনা।

 

 

দ্বিতীয়া।

কে জানিতে চায়, তুমি ভালোবাস, কি ভালোবাস না।

 

 

প্রথমা।

হাসে চন্দ্র, হাসে সন্ধ্যা, ফুল্ল কুঞ্জকানন,

হাসে হৃদয়-বসন্তে বিকচ যৌবন।

তুমি কেন ফেল শ্বাস, তুমি কেন হাস না।

 

 

সকলে।

এসেছ কি ভেঙে দিতে খেলা,

সখীতে সখীতে এই হৃদয়ের মেলা।

 

 

দ্বিতীয়া।

আপন দুঃখ আপন ছায়া লয়ে যাও।

 

 

প্রথমা।

জীবনের আনন্দ-পথ ছেড়ে দাঁড়াও।

 

 

তৃতীয়া।

দূর হতে করো পূজা হৃদয়-কমল-আসনা।

 

 

অমর।

তবে সুখে থাকো, সুখে থাকো-- আমি যাই-- যাই।

 

 

প্রমদা।

সখী, ওরে ডাকো, মিছে খেলায় কাজ নাই।

 

 

সখীগণ।

অধীর হ'য়ো না, সখী,

আশ মেটালে ফেরে না কেহ,

আশ রাখিলে ফেরে।

 

 

অমর।

ছিলাম একেলা সেই আপন ভুবনে,

এসেছি এ কোথায়।

হেথাকার পথ জানি নে, ফিরে যাই।

যদি সেই বিরাম-ভবন ফিরে পাই।

 

 

[ প্রস্থান

 

প্রমদা।

সখী, ওরে ডাকো ফিরে।

মিছে খেলা মিছে হেলা কাজ নাই।

 

 

সখীগণ।

অধীরা হ'য়ো না, সখী,

আশ মেটালে ফেরে না কেহ,

আশ রাখিলে ফেরে।

 

 

[ প্রস্থান

 

মায়াকুমারীগণ।

নিমেষের তরে শরমে বাধিল,

মরমের কথা হল না।

জনমের তরে তাহারি লাগিয়ে

রহিল মরম-বেদনা।

চোখে চোখে সদা রাখিবারে সাধ,

পলক পড়িল, ঘটিল বিষাদ,

মেলিতে নয়ন মিলাল স্বপন,

এমনি প্রেমের ছলনা।

 

 


ষষ্ঠ দৃশ্য


গৃহ

 

শান্তা। অমরের প্রবেশ

 

অমর।

সেই শান্তিভবন ভুবন কোথা গেল।

সেই রবি শশী তারা, সেই শোকশান্ত সন্ধ্যা-সমীরণ,

সেই শোভা, সেই ছায়া, সেই স্বপন।

সেই আপন হৃদয়ে আপন বিরাম কোথা গেল,

গৃহহারা হৃদয় লবে কাহার শরণ।

( শান্তার প্রতি ) এসেছি ফিরিয়ে, জেনেছি তোমারে,

এনেছি হৃদয় তব পায়--

শীতল স্নেহসুধা করো দান,

দাও প্রেম, দাও শান্তি, দাও নূতন জীবন।

 

 

মায়াকুমারীগণ।

কাছে ছিলে দূরে গেলে, দূর হতে এস কাছে।

ভুবন ভ্রমিলে তুমি, সে এখনো বসে আছে।

ছিল না প্রেমের আলো, চিনিতে পার নি ভালো,

এখন বিরহানলে প্রেমানল জ্বলিয়াছে!

 

 

শান্তা।

দেখো সখা ভুল করে ভালোবেসো না।

আমি ভালোবাসি বলে কাছে এসো না।

তুমি যাহে সুখী হও তাই করো সখা,

আমি সুখী হব বলে যেন হেসো না।

আপন বিরহ লয়ে আছি আমি ভালো,

কী হবে চির আঁধারে নিমেষের আলো।

আশা ছেড়ে ভেসে যাই, যা হবার হবে তাই,

আমার অদৃষ্ট-স্রোতে তুমি ভেসো না।

 

 

অমর।

ভুল করেছিনু ভুল ভেঙেছে।

এবার জেগেছি, জেনেছি,

এবার আর ভুল নয় ভুল নয়।

ফিরেছি মায়ার পিছে পিছে,

জেনেছি স্বপন সব মিছে।

বিঁধেছে বাসনা-কাঁটা প্রাণে,

এ তো ফুল নয় ফুল নয়!

পাই যদি ভালোবাসা হেলা করিব না,

খেলা করিব না লয়ে মন।

ওই প্রেমময় প্রাণে, লইব আশ্রয় সখী,

অতল সাগর এ সংসার,

এ তো কূল নয় কূল নয়!

 

 

প্রমদার সখীগণের প্রবেশ

 

সখীগণ।

( দূর হইতে ) অলি বার বার ফিরে যায়,

অলি বার বার ফিরে আসে।

তবে তো ফুল বিকাশে।

 

 

প্রথমা।

কলি ফুটিতে চাহে ফোটে না, মরে লাজে মরে ত্রাসে।

ভুলি মান অপমান, দাও মন প্রাণ, নিশি দিন রহ পাশে।

 

 

দ্বিতীয়া।

ওগো আশা ছেড়ে তবু আশা রেখে দাও,

হৃদয়-রতন আশে।

 

 

সকলে।

ফিরে এস ফিরে এস, বন মোদিত ফুলবাসে।

আজি বিরহ-রজনী ফুল্ল কুসুম শিশির-সলিলে ভাসে।

 

 

অমর।

ঐ কে আমায় ফিরে ডাকে।

ফিরে যে এসেছে তারে কে মনে রাখে।

 

 

মায়াকুমারীগণ।

বিদায় করেছ যারে নয়ন-জলে,

এখন ফিরাবে তারে কিসের ছলে।

আজি মধু সমীরণে, নিশীথে কুসুম-বনে,

তারে কি পড়েছে মনে বকুল-তলে?

এখন ফিরাবে আর কিসের ছলে।

 

 

অমর।

আমি চলে এনু বলে কার বাজে ব্যথা।

কাহার মনের কথা মনেই থাকে।

আমি শুধু বুঝি সখী, সরল ভাষা,

সরল হৃদয় আর সরল ভালোবাসা।

তোমাদের কত আছে, কত মন প্রাণ,

আমার হৃদয় নিয়ে ফেলো না বিপাকে।

 

 

মায়াকুমারীগণ।

সেদিনো তো মধুনিশি, প্রাণে গিয়েছিল মিশি,

মুকুলিত দশদিশি কুসুম-দলে।

দুটি সোহাগের বাণী, যদি হত কানাকানি

যদি ঐ মালাখানি পরাতে গলে।

এখন ফিরাবে তারে কিসের ছলে।

 

 

শান্তা।

( অমরের প্রতি )

না বুঝে কারে তুমি ভাসালে আঁখিজলে।

ওগো কে আছে চাহিয়া শূন্য পথপানে,

কাহার জীবনে নাহি সুখ, কাহার পরান জ্বলে।

পড় নি কাহার নয়নের ভাষা,

বোঝ নি কাহার মরমের আশা,

দেখ নি ফিরে,

কার ব্যাকুল প্রাণের সাধ এসেছ দ'লে।

 

 

অমর।

আমি কারেও বুঝি নে শুধু বুঝেছি তোমারে।

তোমাতে পেয়েছি আলো সংশয়-আঁধারে।

ফিরিয়াছি এ ভুবন, পাই নি তো কারো মন,

গিয়েছি তোমারি শুধু মনের মাঝারে।

এ সংসারে কে ফিরাবে, কে লইবে ডাকি,

আজিও বুঝিতে নারি ভয়ে ভয়ে থাকি।

কেবল তোমারে জানি, বুঝেছি তোমার বাণী,

তোমাতে পেয়েছি কূল অকূল পাথারে।

 

 

[ প্রস্থান

 

সখীগণ।

প্রভাত হইল নিশি কানন ঘুরে,

বিরহ-বিধুর হিয়া মরিল ঝুরে।

ম্লান শশী অস্ত গেল ম্লান হাসি মিলাইল

কাঁদি উঠিল প্রাণ কাতর সুরে।

 

 

প্রমদার প্রবেশ

 

প্রমদা।

চল্‌ সখী চল্‌ তবে ঘরেতে ফিরে

যাক ভেসে ম্লান আঁখি নয়ন-নীরে।

যাক ফেটে শূন্য প্রাণ, হোক্‌ আশা অবসান,

হৃদয় যাহারে ডাকে থাক্‌ সে দূরে।

 

 

মায়াকুমারীগণ।

মধুনিশি পূর্ণিমার, ফিরে আসে বার বার,

সে জন ফেরে না আর, যে গেছে চলে।

ছিল তিথি অনকূল, শুধু নিমেষের ভুল,

চিরদিন তৃষাকুল পরান জ্বলে।

এখন ফিরাবে তারে কিসের ছলে।

 

 


সপ্তম দৃশ্য


স্ত্রীগণ।

এস এস বসন্ত ধরাতলে।

আনো কুহুতান, প্রেমগান,

আনো গন্ধমদভরে অলস সমীরণ;

আনো নবযৌবন-হিল্লোল, নব প্রাণ,

প্রফুল্ল নবীন বাসনা ধরাতলে।

 

 

পুরুষগণ।

এস থরথর-কম্পিত, মর্মর-মুখরিত,

নব-পল্লব-পুলকিত

ফুল-আকুল-মালতী-বল্লি বিতানে,

সুখছায়ে মধুবায়ে, এস এস।

এস অরুণ-চরণ-কমল-বরন তরুণ উষার কোলে।

এস জ্যোৎস্না-বিবশ নিশীথে,

কল-কল্লোল তটিনী-তীরে,

সুখসুপ্ত সরসী-নীরে, এস এস।

 

 

স্ত্রীগণ।

এস যৌবন-কাতর হৃদয়ে,

এস মিলন-সুখালস নয়নে,

এস মধুর শরম মাঝারে,

দাও বাহুতে বাহু বাঁধি,

নবীন কুসুম পাশে রচি দাও নবীন মিলন-বাঁধন।

 

 

অমর।

( শান্তার প্রতি ) মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে।

মধুর মলয়-সমীরে মধুর মিলন রটাতে।

কুহক লেখনী ছুটায়ে কুসুম তুলিছে ফুটায়ে,

লিখিছে প্রণয়-কাহিনী বিবিধ বরন-ছটাতে।

হেরো পুরানো প্রাচীন ধরণী হয়েছে শ্যামল-বরনী,

যেন যৌবন-প্রবাহ ছুটিছে কালের শাসন টুটাতে;

পুরানো বিরহ হানিছে, নবীন মিলন আনিছে,

নবীন বসন্ত আইল নবীন জীবন ফুটাতে।

 

 

স্ত্রীগণ।

আজি আঁখি জুড়াল হেরিয়ে,

মনোমোহন মিলনমাধুরী যুগল মুরতি।

 

 

পুরুষগণ।

ফুলগন্ধে আকুল করে, বাজে বাঁশরি উদাস স্বরে,

নিকুঞ্জ প্লাবিত চন্দ্রকরে;

 

 

স্ত্রীগণ।

তারি মাঝে মনোমোহন মিলনমাধুরী যুগল মুরতি।

আনো আনো ফুলমালা, দাও দোঁহে বাঁধিয়ে।

 

 

পুরুষগণ।

হৃদয়ে পশিবে ফুলপাশ, অক্ষয় হবে প্রেমবন্ধন।

 

 

স্ত্রীগণ।

চিরদিন হেরিব হে

মনোমোহন মিলনমাধুরী যুগল মুরতি।

 

 

প্রমদা ও সখীগণের প্রবেশ

 

অমর।

এ কি স্বপ্ন! এ কি মায়া!

এ কি প্রমদা! এ কি প্রমদার ছায়া!

 

 

শান্তা।

( প্রমদার প্রতি ) আহা কে গো তুমি মলিন-বয়নে,

আধ-নিমীলিত নলিন-নয়নে,

যেন আপনারি হৃদয়-শয়নে

আপনি রয়েছ লীন।

 

 

পুরুষগণ।

তোমা তরে সবে রয়েছে চাহিয়া,

তোমা লাগি পিক উঠিছে গাহিয়া,

ভিখারি সমীর কানন বাহিয়া

ফিরিতেছে সারা দিন।

 

 

অমর।

এ কি স্বপ্ন! এ কি মায়া!

এ কি প্রমদা! এ কি প্রমদার ছায়া!

 

 

শান্তা।

যেন শরতের মেঘখানি ভেসে,

চাঁদের সভাতে দাঁড়ায়েছ এসে,

এখনি মিলাবে ম্লান হাসি হেসে,

কাঁদিয়া পড়িবে ঝরি।

 

 

পুরুষগণ।

জাগিছে পূর্ণিমা পূর্ণ নীলাম্বরে,

কাননে চামেলি ফুটে থরে থরে,

হাসিটি কখন ফুটিবে অধরে

রয়েছি তিয়াষ ধরি।

 

 

অমর।

এ কি স্বপ্ন! এ কি মায়া!

এ কি প্রমদা! এ কি প্রমদার ছায়া!

 

 

সখীগণ।

আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে,

এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়,

সখীর হৃদয় কুসুম-কোমল--

কার অনাদরে আজি ঝরে যায়।

কেন কাছে আস, কেন মিছে হাস,

কাছে যে আসিত সে তো আসিতে না চায়।

সুখে আছে যারা, সুখে থাক্‌ তারা,

সুখের বসন্ত সুখে হোক সারা,

দুখিনী নারীর নয়নের নীর

সুখী জনে যেন দেখিতে না পায়।

তারা দেখেও দেখে না, তারা বুঝেও বোঝে না,

তারা ফিরেও না চায়।

 

 

শান্তা।

আমি তো বুঝেছি সব, যে বোঝে না বোঝে,

গোপনে হৃদয় দুটি কে কাহারে খোঁজে।

আপনি বিরহ গড়ি, আপনি রয়েছ পড়ি,

বাসনা কাঁদিছে বসি হৃদয়-সরোজে।

আমি কেন মাঝে থেকে, দু-জনারে রাখি ঢেকে,

এমন ভ্রমের তলে কেন থাকি মজে।

 

 

অশোক।

( প্রমদার প্রতি ) এতদিন বুঝি নাই, বুঝেছি ধীরে,

ভালো যারে বাস তারে আনিব ফিরে।

হৃদয়ে হৃদয় বাঁধা, দেখিতে না পায় আঁধা,

নয়ন রয়েছে ঢাকা নয়ন-নীরে।

 

 

শান্তা ও স্ত্রীগণ।

চাঁদ হাসো, হাসো।

হারা হৃদয় দুটি ফিরে এসেছে।

 

 

পুরুষ।

কত দুখে কত দূরে, আঁধার সাগর ঘুরে,

সোনার তরণী দুটি তীরে এসেছে।

মিলন দেখিবে বলে, ফিরে বায়ু কুতূহলে,

চারি ধারে ফুলগুলি ঘিরে এসেছে।

 

 

সকলে।

চাঁদ হাসো, হাসো।

হারা হৃদয় দুটি ফিরে এসেছে।

 

 

প্রমদা।

আর কেন, আর কেন,

দলিত কুসুমে বহে বসন্ত-সমীরণ।

ফুরায়ে গিয়াছে বেলা, এখন এ মিছে খেলা,

নিশান্তে মলিন দীপ কেন জ্বলে অকারণ।

 

 

সখীগণ।

অশ্রু যবে ফুরায়েছে তখন মুছাতে এলে,

অশ্রুভরা হাসিভরা নবীন নয়ন ফেলে।

 

 

প্রমদা।

এই লও, এই ধরো, এ মালা তোমরা পরো,

এ খেলা তোমরা খেলো, সুখে থাকো অনুক্ষণ।

 

 

অমর।

এ ভাঙা সুখের মাঝে নয়ন-জলে,

এ মলিন মালা কে লইবে।

ম্লান আলো ম্লান আশা হৃদয়-তলে,

এ চির বিষাদ কে বহিবে।

সুখনিশি অবসান, গেছে হাসি গেছে গান,

এখন এ ভাঙা প্রাণ লইয়া গলে

নীরব নিরাশা কে সহিবে।

 

 

শান্তা।

যদি কেহ নাহি চায়, আমি লইব,

তোমার সকল দুখ আমি সহিব।

আমার হৃদয় মন, সব দিব বিসর্জন,

তোমার হৃদয়-ভার আমি বহিব।

ভুল-ভাঙা দিবালোকে, চাহিব তোমার চোখে,

প্রশান্ত সুখের কথা আমি কহিব।

[ অমর ও শান্তার প্রস্থান

 

 

মায়াকুমারীগণ।

দুখের মিলন টুটিবার নয়।

নাহি আর ভয় নাহি সংশয়।

নয়ন-সলিলে যে হাসি ফুটে গো,

রয় তাহা রয় চিরদিন রয়।

 

 

প্রমদা।

কেন এলি রে, ভালোবাসিলি, ভালোবাসা পেলি নে।

কেন সংসারেতে উঁকি মেরে চলে গেলি নে।

 

 

সখীগণ।

সংসার কঠিন বড়ো কারেও সে ডাকে না,

কারেও সে ধরে রাখে না।

যে থাকে সে থাকে, আর যে যায় সে যায়,

কারো তরে ফিরেও না চায়।

 

 

প্রমদা।

হায় হায়, এ সংসারে যদি না পুরিল

আজন্মের প্রাণের বাসনা,

চলে যাও ম্লান মুখে, ধীরে ধীরে ফিরে যাও,

থেকে যেতে কেহ বলিবে না।

তোমার ব্যথা তোমার অশ্রু তুমি নিয়ে যাবে,

আর তো কেহ অশ্রু ফেলিবে না।

 

 

সকলে।

এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না,

 

 

প্রথমা।

শুধু সুখ চলে যায়।

 

 

দ্বিতীয়া।

এমনি মায়ার ছলনা।

 

 

তৃতীয়া।

এরা ভুলে যায়, কারে ছেড়ে কারে চায়।

 

 

সকলে।

তাই কেঁদে কাটে নিশি, তাই দহে প্রাণ,

তাই মান অভিমান,

 

 

প্রথমা।

তাই এত হায় হায়।

 

 

দ্বিতীয়া।

প্রেমে সুখ দুখ ভুলে তবে সুখ পায়।

 

 

সকলে।

সখী চলো, গেল নিশি, স্বপন ফুরাল,

মিছে আর কেন বল।

 

 

প্রথমা।

শশী ঘুমের কুহক নিয়ে গেল অস্তাচল।

 

 

সকলে।

সখী চলো।

 

 

প্রথমা।

প্রেমের কাহিনী গান, হয়ে গেল অবসান।

 

 

দ্বিতীয়া।

এখন কেহ হাসে, কেহ বসে ফেলে অশ্রুজল।

 

 


Acts: 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | SINGLE PAGE